Bengali novel, Fire asar din [last part]

Bengali novel - Fire asar din. Written by - Bappaditya Mukhopadhyay


Bengali novel - jodi search korchen tahole ei Bangla novelta porun. Sob paben, Bangla love story to bangla politics. Sob dik diyei Fire asar din best bengali novel.

ষষ্ঠ অংশ,  সপ্তম অংশ

নবম অংশ

(শারদীয় উপন্যাস ১৪২৬, ফিরে আসার দিন) 

‘তুই মাকে কেমন করে বললি ? তোর না কবে যে বুদ্ধি হবে ভগবান জানে, আর তিতলির কথাটাও বলে দিয়েছিস ?’ শিল্পীর মাথায় ছোট্ট করে একটা গাট্টা মারে অন্তু। শিল্পী কিছু না বলে মিচকে শয়তানের মতো মিটিমিটি হাসতে থাকে।
মায়ের কাছ থেকে গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে বিকেলেই অন্তু চলে এসেছিল শিল্পীদের বাড়ি। আজকে তেমন কেউ নেই। আত্মীয়স্বজন যারা এসেছিল তারা বিদেয় হয়েছে সকাল সকাল। এরপর সবাই আবার আসবে ঘাটের দিন। কেউ কেউ শ্রাদ্ধের দিন। শিল্পীদের বাড়িতে ঢুকেই মনটা কেমন যেন খাঁ-খাঁ করে উঠেছিল অন্তুর। বাড়িটার আনাচে কানাচে শোকের ছায়া। অপরিচিত কেউ এসে বাড়িতে ঢুকলেও বুঝতে পারবে কিছু একটা হয়েছে। শিল্পী নিজের ঘরে একা। শিল্পীর মা শান্তনুর ছোটবেলার একটা ছবিকে আঁকড়ে অপলক ভাবে বসে রয়েছে। বাড়িটায় ঢুকে শিল্পীর মাকে দেখার পর কেমন যেন থতমত খেয়ে গিয়েছিল অন্তু। শিল্পী বলেছে, ‘মা সময় নিচ্ছে নিজেকে সামলাতে। মায়ের কয়েকটা মাস সময় লাগবে জীবনের স্বাভাবিক গতিটা ধরতে।’ অন্তু ভালমতোই জানে শিল্পী নিজেও স্বাভাবিক হতে পারেনি। ওর মায়ের অস্বাভাবিক আচরণই ওকে স্বাভাবিক হওয়ার নাটক করতে শিখিয়ে দিয়েছে। আসলে এমন একটা কল্পনাতীত ঘটনা ঘটার কয়েকদিনের ভেতর কেউই পারে না স্বাভাবিক হতে। সময় মানুষকে স্মৃতি ভুলতে সাহায্য করে। স্বাভাবিক হতে সাহায্য করে। এই সময়টা যতই নিষ্ঠুর নির্মম হোক না কেন সময়ের সঙ্গে পা মিলিয়েই চলতে হয়।
শিল্পীর মায়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শিল্পীর ঘরে গিয়ে ঢুকেছিল অন্তু। কাবেরী-মহিমের আলোচনা দিয়ে আলাপ শুরু হলেও আলোচনা এসে থেমেছিল তিতলির কাছে। তারপর শিল্পীর অভিমান ভাঙাতে ভাঙাতেই সন্ধা। এখন ওরা চলেছে মেলার পথে। ফুরফুরে বাতাসে ছুটছে অন্তুর সাইকেলটা। শিল্পী সামনে বসে টর্চ ধরে আছে। ও কিছুতেই আসতে চাইছিল না। কিন্ত শেষ পর্যন্ত অন্তুর ‘চল না মনটা ফ্রেস হবে...’ ‘চল না মনটা ফ্রেস হবে...’ কথাটা কাটতে পারেনি।

‘মাকে বলে অবশ্য ভালই করেছিস নতুবা আমাকে বলতে হত।’
‘মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে তোমার যে কত দম সেটা আমার ভালমতোই জানা আছে। বাইরেই তোমার যত দাদাগিরি জেঠিমার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা বেড়াল হয়ে যাও।’
‘দেখবি দম দেখবি...’ বলে চলন্ত সাইকেলটায় ঝাঁকুনি দেয় অন্তু।
‘বেশি কায়দা না দেখিয়ে ঠিকঠাক চালাও পড়লে আমি একা পড়ব না তুমিও পড়বে।’      
        ডাংরা নদীর ব্রিজ দিয়ে যেতে যেতেই মেলার আলোগুলো দেখা যাচ্ছে। হরেকরকম শব্দ কানে আসছে। আবার মাঝে মাঝেই শালগাছের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে আলোগুলো। তখন শান্তনুর কথা ভিড় করে আসছে শিল্পীর মাথায়। আনমনা হয়ে পড়ছে শিল্পী। অন্তু শিল্পীর মনের অবস্থাটা বুঝতে পেরে বলে, ‘এখানে খুব সুন্দর বাতাস বইছে চল এখানেই বসি কিছুক্ষণ।’
সাইকেলটাকে বিজ্রের ধারে দাঁড় করিয়ে ব্রিজটার উপরেই বসে পড়ে দুজনে। মৃদুমন্দ বাতাসে ফুরফুর করে উড়ছে শিল্পীর চুলগুলো। এখান থেকে মেলার আলগুলোকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে মনে হবে কে বা কারা যেন নদীটার ধারে আলোর মোটা রেখা টেনে দিয়েছে। নদীটার আধমরা স্রোতে আলোর দানাগুলো ঝিলমিল ঝিলমিল করছে এখন।
‘জলটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখ মনে হবে যেন আলোগুলো নাচ করছে।’ 
‘ওটাই তো দেখছি।’ অন্তুর কাঁধে মাথাটা হেলান দেয় শিল্পী। ভাললাগে অন্তুর। 
‘মাকে নিয়ে খুব চিন্তা হচ্ছে জানো। আমিই পারছি না তা মা পারবে তো এই শোকটা কাটিয়ে উঠতে।’
‘সময় সব ঠিক করে দেয়। স্বামীর শোক কাটিয়ে ওঠার পর উনি যখন তোদেরকে মানুষ করেছেন তখন এটাও উনি ঠিক কাটিয়ে উঠবেন। তোর দাদার কাজগুলো পেরিয়ে গেলে দেখবি অনেকটাই স্বাভাবিক হবে কাকিমা।’
‘হলেই ভাল। আচ্ছা বিয়ের পর তুমি আমার মাকে দেখবে তো ? মায়ের কিন্তু আর কেউ রইল না।’
‘এতদিনে এটুকু তুই নিশ্চয় আমাকে চিনেছিস। চিন্তা করিস না আমি দুই মায়ে ভেদাভেদ করব না। দুজনকেই সমান ভাবে দেখব।’
‘আমিও।’ বলে অন্তুকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে শিল্পী।
‘এই মা বলেছে বৈশাখে ভাল দিন থাকলে বৈশাখেই বিয়ে দিয়ে দেবে...’
‘না দিলে চলবে কেন মশায়...’ অন্তুকে দেখিয়ে দেখিয়ে তলপেটটায় হাত বোলায় শিল্পী।
‘তোর ডেট পেরিয়ে গেছে ?’
‘যায়নি তবে পেরিয়ে যাবে আমি জানি...’
‘কী করে জানলি ?’
‘আমার মন বলছে তাই। আচ্ছা হলে কি তোমার সমস্যা হবে ?’
‘না আর সমস্যা হবে না। আসলে বিয়ে হওয়ার আগেই...। আমি কেন যেন ঠিক মেনে নিতে পারি না।’
‘বৈশাখে বিয়েটা হলে কোনও সমস্যা থাকবে না।’
‘হ্যাঁ তাহলে নো প্রবলেম।’
‘প্রবলেম নেই মানে ? এবার তো একটা চাকরি দেখো নইলে আমার বাচ্চা কী খাবে ?’
‘এটা খাবে...’ শিল্পীর বুকে হাত দিয়ে দেখিয়ে দেয় অন্তু।
‘ধ্যাত তুমি না যাতা একটা।’
আরও বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর উঠে দাঁড়ায় দুজনে। অন্তু জড়িয়ে ধরে শিল্পীকে। চুমু খায়। তারপর সাইকেলটার দিকে এগিয়ে যায়। মেলায় গান শুরু হয়েছে এতক্ষণে...
‘কতক্ষণ থাকবে মেলায় ? এখানেই তো অনেক দেরি হয়ে গেল।’ সাইকেলে চড়তে গিয়ে জিজ্ঞেস করে শিল্পী।
‘মেলায় ভাল লাগলে ঘণ্টা খানেকের মতো আর ভাল না লাগলে বেশিক্ষণ না।’
‘মা একা ঘরে আছে তাই জিজ্ঞেস করলাম। যদিও রানু কাকিমা আসবে বলেছে কিন্তু কতক্ষণ থাকে...’
‘কে রানু কাকিমা ?’
‘তুমি চিনবে না আমাদের গ্রামের ভেতর দিকে ওদের বাড়ি।’
‘ও, তুই বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত তাহলে থাকবে। তাছাড়া একবার কল করেনিবি।’
‘মা কল ধরলে তো ভালই হত...’
‘মা নয় তোর ওই কাকিমাকে।’
‘উনার ফোন নেই...’

অন্ধকার রাস্তার বুকে টর্চের আলো ফেলে ছুটছে সাইকেলটা। আর কিছুটা গিয়ে জয়নগর ঢোকার মুখে ডান দিকে বাঁক নিলেই মেলাটা যেখানে হচ্ছে সেখানে পৌঁছে যাবে ওরা। মেলার পরিচিত সুরগুলোও এতক্ষণে কানে ভেসে আসছে। শিল্পীর মাথায় চিবুক নামিয়ে হেলতে দুলতে সাইকেলটা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অন্তু। মনের ভেতর থেকে বিয়ে নামক একটা মিষ্টি গন্ধ বেরিয়ে আসছে ভুরভুর করে। নিজের বরবেশ আর শিল্পীর কনে সাজটা মনে মনে একবার কল্পনা করে অন্তু। হাসি পেয়ে যায় ওর...
‘এই দাঁড়াও দাঁড়াও...’
‘কেন ?’
‘কোথায় যেন খুব ঝগড়া হচ্ছে।’ ঝগড়া কথাটা শুনে দাঁড়িয়ে পড়ে অন্তু। ঠিক কোত্থেকে গলার আওয়াজগুলো ভেসে আসছে শোনার চেষ্টা করে। মেলার হাজার রকম শব্দের ভেতরেও অন্তু এটা বুঝতে পারে যে গ্রামের ভেতর কোথাও একটা জোর ঝামেলা হচ্ছে। ‘চল জলদি চাপ। গ্রামে কিছু হয়েছে মনে হয়। কালকের ঘটনাটাকে নিয়ে মহিম কাকার সঙ্গে ঝগড়া বাঁধতে পারে...’
‘আমার কিন্তু খুব ভয় করছে। তুমি তো বললে তুমি কালকে পঞ্চায়েত প্রধানকে পিটিয়েছ। ওরা তোমার কোনও ক্ষতি করবে না তো ?’
‘ওদের সেই সাহস থাকলে সেটা কালকেই করতে পারত। আমি তো ভেবেছিলাম পুলিশে জানাবে মনে হয়, পঁদে ভয় আছে বলে সেটাও করেনি। ওরাও ভাল মতোই জানে কালকে দোষটা কারা করেছিল।’
‘আচ্ছা ওই বিধবা বউটা তো পুলিশে জানাতে পারত...’
‘তাতেও কিছুই হত না। উল্টে থানাতেও ওকে কাপড় খুলতে হত। এটাই আমাদের দেশের আইন। ধর্ষণটা কীভাবে হয়েছে সেটা দেখানোর জন্য মেয়েটাকে আরও একবার ধর্ষিত হতে হয়। আর কেস আদালতে গেলে তো ধর্ষণের বিবরণ দিতে দিতে আরও কয়েকশবার ধর্ষণ...’

জয়নগরের দিকে সাইকেলটা বাঁক নিতেই অন্তু-শিল্পী দুজনেই দেখতে পায় রাস্তায় প্রচুর লোক ছোটাছুটি করছে। সবাই ছুটছে মহিমের ঘর যেদিকে সেদিকেই। আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেয় অন্তু। কোনরকমে ভিড়টাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে আসে। অন্তুর সাইকেলের সামনে পাশের গ্রামের একটা মেয়ে চেপে রয়েছে, তবু যেন কেউ দেখেও দেখছে না। সবাই হনহন করে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। মহিমের ঘর যাওয়ার গলিটার দিকে সাইকেল ঘোরাতেই অন্তু দেখতে পায় ভিড়টা জমেছে হাবলুর ঘরের সামনে।
সাইকেল আর শিল্পীকে রাস্তার একপাশে দাঁড় করিয়ে লম্বা পা ফেলে অন্তু এগিয়ে যায় হাবলুর ঘরের দিকে। ভিড় ঠেলে কোনক্রমে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখকেই বিশ্বাস হয় না ওর। বঁটি হাতে পরানের গলায় একটা পা-দিয়ে উন্মাদিনীর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে কাবেরী। পরান আদৌ বেঁচে আছে কি না সেটাও বুঝতে পারে না অন্তু। তপনার অবস্থা ততধিক খারাপ। কাঁধের কাছাকাছি বঁটির বেশ কয়েকটা কোপ পড়েছে। দরজার কাছেই রক্তে লাল হয়ে পড়ে আছে তপনা। সত্যবান আর কার্তিক হাবলুকে আঁকড়ে ঘরের চালাটার নীচে বসে রয়েছে। ওদের শরীরেও ক্ষতচিহ্ন। ঠেলাঠেলি করে কয়েকজনকে সরিয়ে ভেতরে ঢোকে অন্তু। এর পরই ওর চোখ পড়ে হাবলুর বউ এর উপর। সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় উঠোনের কোনার বসে কাঁপছে বউটা। মনে হয় পিছন দিকে ঘুরিয়ে বাধা আছে ওর হাতদুটো।
‘আইজক্যের পত্তে আর কন বউ কন মেয়্যার দিকে ভাইলত্যে লারবি তরা...’ পরানের পেটে লাথি মারতে থাকে কাবেরী।
অন্তুও বুঝে উঠতে পারে না এখন কাবেরীর কাছে যাওয়াটা কতটা নিরাপদ। কিন্তু কাবেরীকে থামাতে না পারলে পরানের মৃত্যু নিশ্চিত, যদি ও এখনো বেঁচে আছে তো। বারেক্কে ভিড় বাড়ছে, কিন্তু সবাই দর্শক। ওরা নিজেদের ভেতর আলোচনা সমালোচনা করছে মাত্র। কাবেরীকে শান্ত করার লক্ষণ ওদের শরীরী ভাষাতে নেই। শেষ পর্যন্ত কাবেরীর দিকে অন্তু নিজেই কয়েক-পা এগিয়ে যায়। কেউ কেউ অন্তুকে কাবেরীর কাছে যেতে নিষেধ করে। অন্তু নিজেও জানে এমন মুহুর্তে যে কোনও পুরুষের ঘাড়েই কোপ বসিয়ে দিতে পারে কাবেরী। ভাল মন্দের বিচার করার ক্ষমতা এখন ওর নেই।
আরও কয়েক-পা সামনে যেতেই অন্তুর দিকে রক্তচক্ষুতে তাকায় কাবেরী। আর পা নড়ে না অন্তুর। ভয় যেন গ্রাস করে পা-দুটোকে। ঠিক এমন সময় হাবলুর ঘরে ঢোকে মহিম। ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে মেলা থেকে ফিরছে ও। পুরো উঠোনটায় একবার চোখ বুলিয়েই যা বোঝার বুঝে নেই মহিম। দ্রুত কাবেরীর দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু মহিমের দিকেও বঁটি উঁচিয়ে ধরে কাবেরী। মহিম পাত্তা দেয় না। কাবেরীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ওর হাত থেকে কাড়িয়ে নেয় বঁটিটা। এক ঝটকায় ওকে টেনে নেয় পরানের কাছ থেকে। কয়েক সেকেন্ডের ভেতরেই জ্ঞান হারায় কাবেরী। মহিমের বুকের উপর লুটিয়ে পড়ে।                
         

আকাশে ভোরের আলো ফুটে উঠছে এখন। রাত যত বেড়েছে হাবলুর ঘরের সামনে ভিড় ততই বেড়েছে। মেলার পুরো ভিড়টাই হামলে পড়েছিল এক সময়। মিনিট চল্লিশ হল পুলিশ এসেছে ইঁন্দপুর থানা থেকে। ভিড়টা তাই তুলনামূলক কম। পরান আর তপনাকে গবিন্দনগর হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে এসেছে গ্রামের কয়েকটা ছেলে মিলে। ডাক্তার তপনাকে বিপদমুক্ত জানালেও বাহাত্তর ঘণ্টার আগে পরানের ব্যাপারে কিছু বলতে পারবে না জানিয়েছে। এটা তো গেল নিছক সাধারণ ঘটনা। কিন্তু এর পরের ঘটনাটাই অবিশ্বাস্য...
থানা থেকে পুলিশ এসে কাবেরীকে এরেস্ট করতে গেলে প্রথম বাধা আসে অন্তুর মা লতিকার কাছ থেকে। লতিকার দেখাদেখি বাধা দেয় শিল্পী সঙ্গে আরও পাঁচটা মেয়ে বউ। তারপর পাঁচটা-দশটা করে সেই সংখ্যা বাড়তেই থাকে। কুড়ুল হাতে সবাইকে অবাক করে চূড়ান্ত বাধাটা দেয় তপনার বউ, ‘হাত কাইট্যে ফাঁক কইর‍্যে দিব যদি উয়ার গায়ে হাত দিস...।’ তপনার বউ কোনওদিন কাবেরীর পক্ষ নিয়ে দাঁড়াবে সেটা সত্যিই সবার কল্পনার অতীত ছিল। তপনার বউ কুড়ুল হাতে কাবেরীর পাশে দাঁড়াতেই মেলা দেখতে আসা মেয়ে-বউগুলো কীভাবে যেন লড়াইটাকে মেয়েলি লড়াই বানিয়ে তোলে। আর এতেই পিছু হাঁটতে হয় পুলিশকে।
এই পরান, সত্যবান, তপনা, কার্তিক এদেরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে জয়নগরের মেয়ে-বউদের মনের ভেতর যে কালবৈশাখী দানা বাঁধছিল সেটা কাবেরীর আহ্বানে ঝাঁপিয়ে পড়ল পহেলা বৈশাখের একদিন আগেই। আসলে এটা একদিন হওয়ারই ছিল। কাবেরী শুধুমাত্র দিনটা নির্ধারণ করে দিয়েছে।          

।২৮।
অন্তু শিল্পীর সঙ্গে কাবেরীকেও নিজের ঘরেই নিয়ে গিয়েছিল লতিকা। না নিয়ে গিয়ে উপায় ছিল না। বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল কাবেরীর। সেটা কাবেরীর নিজের ঘরে বা মহিমের ঘরে সম্ভব ছিল না কিছুতেই। শরীরখেকো শয়তানগুলোর বিরুদ্ধে কাবেরীর এই প্রতিবাদ জয়নগরের পাশাপাশি গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়তেও সময় লাগেনি। কে এই কাবেরী ? এটা জানতেই মেলা দেখতে আসা মানুষগুলো ভিড় করছিল কাবেরীর ঘরে। মহিমের ঘরে। কাবেরী নিজেও ভাবেনি ওর এই প্রতিবাদটা গ্রামের অন্ধকারে থাকা প্রত্যেকটা মেয়ে-বউ এর মনে ভোর এনে দেবে।
বিকেলের দিকে লতিকা কাবেরীকে সঙ্গে নিয়েই মহিমের ঘরে আসে। ওদের পিছু পিছু অন্তু আর শিল্পী। সবাই মিলেই মেলায় যাবে আজ। লতিকাকে সঙ্গে নিয়ে ভাদুর ঘরে ঢোকে কাবেরী। আজকে ভাদুকেও বেশ ভাল লাগছে। ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করে লতিকা, ‘চিনত্যে পাচ্চিস আমাক্যে ?’
ভাদু ঘাড় নেড়ে বলে, ‘দিদিমুনির মুক ভুইল্ল্যে উপরবালাও মাপ কইরব্যেক নাই।’
ভাদুর কথা শুনে কাবেরীর মুখের দিকে তাকিয়ে লতিকা বলে, ‘শোন মেয়্যার কতা। তা আমার মুকটা কী এমন গুড় লাগা শুনি ?’
ভাদু এই কথার উত্তরে কিছু বলে না। শুধু ইশারায় দুজনকেই বসতে বলে। তারপর মাথার কাছে রাখা গোলাপি রঙের একটা শাড়ি কাবেরীর হাতে দিয়ে বলে, ‘আইজ এইট্যা পইর‍্যে মেল্যায় যাবি। পুনিকে দিয়ে বার কর‍্যাই রাইক্যেচি।’
কাবেরী কাপড়টা হাতে নিয়ে একবার লতিকার মুখের দিকে একবার ভাদুর মুখের দিকে তাকায়। বুঝে উঠতে পারে না ঠিক কী বলবে।
‘এই কাপইড়ট্যা বিয়া বচরে পুনির বাপ দিয়্যেচিল। আমার খুব ইচ্চ্যা এইট্যা পল্ল্যে তকে কেমন লাইগচ্যে সেটা দেকার। আমি যাবার আগুত্যেই পুনিকে একটা মায়্যের পারা মা দিয়্যে যাত্যে চাই। ওই বোবা মিয়্যাট্যার জন্যে আমার বড চিন্ত্যা হয়। উয়াকে দেকিস, তাহৈল্যেই হব্যেক।’
লতিকা আর কাবেরী নির্বাক ভাবে ভাদুর অসহায় মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘পুনি হওয়ার আগুত্যে ওই মন্দির‍্যেই ত মানত কইর‍্যেছিলম...’ ভাদু নিজের খেয়ালে এক একটা গল্প শুনিয়ে যায়। অনেক অনেক গল্প বলার আছে ওর। ওর হাতে অত সময় নেই। তাই খুব কম সময়েই অনেক বেশি বেশি গল্প বলতে হবে ওকে...

পড়ন্ত বিকেলে মহিমের ঘরের পিছন দিকের লাল মাটির কাঁচা রাস্তাটা ধরে ডাংরা নদীটার দিকে হাঁটতে থাকে ওরা। সবার আগে আগে প্রজাপতির মতো উড়ে চলেছে পূর্ণিমা। তারপর কাবেরী আর শিল্পী। পশ্চিম আকাশটা আজকে কাবেরীর শাড়িটার মতো লালচে গোলাপি হয়ে আছে। বেশ ফুরফুরে লাগছে শিল্পীকেও। কাবেরীর সাথে সমান তালে তাল মিলিয়ে হাঁটছে শিল্পী। ভোররাতে লতিকার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছে শিল্পীর মা। শিল্পী কল্পনাও করেনি ওর মা ফোন ধরবে। রাতে বাড়ি ফিরতে না পারার জন্য উল্টে ভয় পাচ্ছিল শিল্পী। শিবানী শুধু ফোন ধরেছে তাই নয় শিল্পী আর অন্তুর বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারেও কীসব যেন বলেছে। যদিও ঠিক কী বলেছে সেটা লতিকা শিল্পীকে বলেনি। শিল্পীর মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হেসেছে শুধু।
পথ চলতে চলতেই লতিকা কীসব যেন বলছে মহিমকে। কাবেরীর টেস্টের ব্যাপারে কিছু হবে হয়তো। নিছক কৌতূহল মেটাতেই আজকে দুপুরের দিকে কাবেরীর পেচ্ছাব টেস্ট করেছিল লতিকা। রিপোর্ট পজেটিভ। যদিও সকালের প্রথম পেচ্ছাব হলে বেশি নিশ্চিত হওয়া যায় তবুও উত্তর যখন পজেটিভ তখন সম্ভাবনাই বেশি।
সবার পিছনে হেলতে দুলতে আসছে অন্তু। মা সঙ্গে আছে বলেই শিল্পীর পাশাপাশি হাঁটা সম্ভব নয় ওর পক্ষে। তার উপর সিগারেটের নেশাটা মাথায় চড়ে ডুগডুগি বাজাচ্ছে। তাই ইচ্ছাকৃত ভাবেই পিছিয়ে পড়ছে ও। পলাশগাছ পলাশগাছ ভাবতে ভাবতেই এতক্ষণ এসেছে। কিন্তু সুযোগ আসেনি। এতক্ষণে রাস্তার ধারে মস্ত একটা পলাশের ঝোপ দেখতে পেয়েই ঝুপ করে ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হয় অন্তু। পকেট থেকে সিগারেট আর দেশলাই বের করে নিমেষে ধরিয়ে নেয়। একটা লম্বা টান দিয়ে উপরের দিকে মুখ তুলে সবে পেচ্ছাব করতে যাবে না মোবাইল বাজতে শুরু। ‘এই হয়েছে শালা এক বিরক্তি। সময় জ্ঞান বলে কিছু নেই...’ পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখে তিতলির সেই নতুন নম্বরটা। এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে মোবাইলের কভারটা খুলে ফেলে অন্তু। তারপর ব্যাটারিটা তুলে নখ দিয়ে সিমটা টেনে বের করে। তারপর......, মুত্রে বিসর্জন। পেচ্ছাব আর সিগারেট শেষ হলে আবার রাস্তায় বেরিয়ে আসে অন্তু। এখন আর কোনও স্মৃতির টান নেই, সম্মুখে হেঁটে যাচ্ছে নতুন জীবন। এখন ওর অ-সিম আনন্দ। 
 
আকাশে নানান রঙের হাট বসিয়ে সূর্যটা ডুবছে এখন। বছরের শেষ সূর্য এটা। কালকে পহেলা বৈশাখ। নতুন সকালের একটা গল্প নিয়ে নতুন একটা সূর্য আসবে কাল। হঠাৎ করেই অন্তুর চোখ পড়ে কাবেরীর উপর। সূর্যের শেষ কিরণগুলো এমন ভাবেই কাবেরীর খোলা চুল আর শাড়িতে পড়ছে, মনে হচ্ছে ঠিক যেন কোনও এক আলোকিতা নারী আলোকরশ্মি ছড়িয়ে সামনের দিকে চলেছে। অন্তু বিড়বিড় করে বলে, ‘এই সেই নারী যাকে কত সহজেই সেদিন সবার সামনে নগ্ন হতে হয়েছিল। আবার এই নারীই তো বঁটি হাতে শয়তানের বুকে পা রেখে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সেই নারীটিই এখন শরীরে শীতল সূর্য মেখে নতুন জীবনে ফেরার পথে এগিয়ে চলেছে।’ দুচোখ ভরা শ্রদ্ধা নিয়ে কয়েক মুহূর্ত কাবেরীর চলার পথে তাকিয়ে থাকে অন্তু। তারপর নিজেও চলতে শুরু করে। ওরা সবাই অনেকটা পথ এগিয়ে গেছে এখন অন্তুকেও লম্বা পা ফেলে চলতে হবে।
[সমাপ্ত]


Bengali novel, Fire asar din [part 9]

Bengali novel - Fire asar din. Written by - Bappaditya Mukhopadhyay


Bengali novel - jodi search korchen tahole ei Bangla novelta porun. Sob paben, Bangla love story to bangla politics. Sob dik diyei Fire asar din best bengali novel.

ষষ্ঠ অংশ,  সপ্তম অংশ


(শারদীয় উপন্যাস ১৪২৬, ফিরে আসার দিন) 



‘পঞ্চ্যাইত ? কীসের পঞ্চ্যাইত। তুমাদের ওই ষোলুআনা-পঞ্চ্যাইত ঠিক কইরব্যেক আমি কার সাতে শুব, কাকে শাঙা কইরব ? কার সাতে কতা কইব ? শালা তুমাদের ওই পঞ্চ্যাইত আমাকে খাত্যে দেয় না তুমরা আমাকে খাত্যে দাও ?’ কাবেরীর এই কথাটা শোনার পরেই দাঁড়িয়ে পড়েছিল অন্তু। মনমেজাজ ভাল নেই বলে ইচ্ছে ছিল না ষোলোআনার তামাশা দেখার। যদিও ও জানত না তামাশা চলছে মহিম-কাবেরীকে নিয়ে। কাবেরীর গলা পেতেই...। কাবেরীর সঙ্গে মহিমের সম্পর্ক নিয়ে কানাকানি অন্তুও যে শোনেনি তা নয়, কিন্তু আমল দেয়নি তেমন। সাইকেলটাকে রাস্তার ধারে দাঁড় করিয়ে ভিড়ের ভেতর ঢুকে অন্তু যা দেখে তা এক জীবনে ভোলা সম্ভব নয়।
ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় একশ নেকড়ে গোল করে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে আছে আদিম কালের বিশ-পঁচিশটা ডাইনি। উস্খখুস্ক চুল, ধারালো নখ, দাঁত। জিব বের করে রক্ত চুষছে কাবেরীর। ওরা মেয়ে বা মহিলা হতে পারে না। ওরা ডাইনি, অন্তত অন্তুর তাই মনে হয়েছিল।
হাঁ করে খোলা আছে কাবেরীর ব্লাউজটা। বাতাসে উড়ছে। না না কাবেরীর হাত দুটো বাঁধা নেই, হাত খোলাই আছে। আসলে কাবেরীর খেয়াল নেই ওর ব্লাউজের বোতাম খোলা আছে। খেয়াল থাকবেই বা কেমন করে? ওর শাড়ি-সায়াটাও তো খুলে মাটিতে পড়ে আছে। কয়েকশ কৌতূহলী চোখ কাবেরীর ডান উরুতে একটা কাটা দাগ খুঁজছে। হালকা আলোয় খুঁজতে সমস্যা হচ্ছে বলে কেউ কেউ আবার টর্চের আলোতে দেখে নিচ্ছে। কাটা দাগটা আছে কি না ? 
শেয়াকুল গাছের কাঁটায় একবার কেটে গিয়েছিল কাবেরীর। তখন কাবেরী বছর আট-দশ হবে হয়তো। সেই দাগ আজও আছে। সেদিনও ছিল, যেদিন পরান সত্যবান কিংবা তপনা ঝুপঝাপ করে কাবেরীর উরুতে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তাহলে পরান কিংবা তপনরা মিথ্যে বলেনি, দাগ তো আছে। হিসেব খাপে-খাপ। তার মানে কাবেরী মিথ্যে বলেছে। পরানের কথাই ঠিক, ‘কাবেরী পয়স্যা লিয়্যে কত্ত্যে দেয়।’ প্রথমে পরানের কথাটা কেউ কেউ বিশ্বাস করেনি। আর কেউ কেউ বিশ্বাস করেনি বলেই প্রয়োজন হল প্রমাণ। প্রমাণ কাবেরীর ডান উরুর দাগটা। পঞ্চায়েত প্রধান এতটাও মূর্খ নন যে নিজের চোখে না দেখে বিশ্বাস করবেন। টর্চ জ্বালিয়ে ভাল করে নেড়েচেড়ে দেখলেন। তপনা অবশ্য শাড়ি-সায়া তুলতে আর দাগটা খুঁজতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু শুধু পঞ্চায়েত প্রধান দেখলেই হবে ? ওই দাগ দেখার অধিকার জনগনেরও যথেষ্ট আছে। অতয়েব নিতান্তই নিরুপায় হয়ে কাবেরীর শরীর থেকে শাড়ি-সায়ার জঙ্গাল সরাতেই হল। এই অপমানের হাত থেকে বাঁচার জন্য কাবেরী একবার ভেবেছিল ছুটে পালিয়ে যাবে। কিন্তু এত লোকের ভেতর দিয়ে পালিয়ে ও যাবেটা কোথায় ? 

কাবেরী বলেছিল, ‘পয়সা লিয়ে কারুর সাতে শুই নাই আমি...।’ এটা মিথ্যে। কারণ কাবেরী শুয়েছে। এবার পয়সা নিয়ে শুয়েছে কি না নিয়ে সেটা পঞ্চায়েত প্রধানের বিচার করার বিষয় নয়। শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হল, কাবেরী বেশ্যা। আর যেহেতু কাবেরী বেশ্যা তাই ওকে একঘরে করা হল। কেউ কোনও ভাবেই কাবেরীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারবে না। কোনও সাহায্য করতেও পারবে না। এমনকি কথা বলতেও না।
এই বিচারের প্রতীবাদেই কাবেরীর উত্তর ছিল, ‘পঞ্চ্যাইত ? কীসের পঞ্চ্যাইত... পঞ্চ্যাইত আমাকে খাত্যে দেয় না তুমরা আমাকে খাত্যে দাও ?’
অন্তু কাবেরীকে এই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই ছুটে গিয়ে কাবেরীর পায়ের তলা থেকে কাপড়টা কুড়িয়ে ওর কোমর থেকে বুক পর্যন্ত জড়িয়ে দেয়। এই ঘটনায় কেউ কেউ ঘাবড়ে গিয়ে টর্চ বন্ধ করে। প্রথম সারির কেউ কেউ দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়-চতুর্থ সারিতে গিয়ে গা ঢাকা দেয়।
নিজের অতীতটাকে নিয়ে একটা রাগ একটা অভিমান বুকের ভেতর দাউ-দাউ করছিল। শিল্পীকে সব কিছু বলার পরেও ভেতরটা হালকা হয়নি ওর। হয়তো সবকিছু আজকেই স্বাভাবিক হতে পারত। কিন্তু শিল্পীর সামনেই তিতলির ফোনটা এসে পরিবেশটাকে আরও গরম করে তুলল। ‘এই জন্যেই চাইছিলে আমি ওষুধ খাই, তাই না ? যদি বাচ্চা আসেও; নষ্ট করে দেবো, ঠিক নষ্ট করে দেবো দেখো। অন্তত তোমার বাচ্চার জন্ম আর দেবো না, কিছুতেই না...’ কাঁদতে কাঁদতে ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল শিল্পী। অন্ধকারে অনেকক্ষণ একা দাঁড়িয়েছিল অন্তু। অশুভ সুরে শেয়াল ডাকছিল জোড়-বাঁধটার ওপার থেকে...
বুকের ভেতর জমতে থাকা পুরো রাগটাই এসে জমাট বেঁধে গেল অন্তুর ঘাড় আর হাতের শিরায় শিরায়। ফুলতে শুরু করল শিরাগুলো। টান-টান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল গলার শিরাগুলো। লাল চকচকে হয়ে আসছিল চোখের মনি দুটো। দুমদাম করে কয়েক পা ফেলেই পঞ্চায়েত প্রধানের দিকে এগিয়ে গেল অন্তু। উনি যে ফাইবারের চেয়ারটায় বসে বিচার করছিলেন সেই চেয়ারটারেই একটা পায়াকে ধরে টান দিতেই চেয়ারটা চলে এলো অন্তুর হাতে। প্রধান মহাশয় একপাক ঘুরে বেরিয়ে গেলেন চেয়ারের বাইরে। তারপর...
মিনিট কয়েক ধরে সপাৎ-সপ আর দুম-দাম শব্দে অস্থির হয়ে পড়েছিল প্রধান মহাশয় এবং প্রধান অন্তঃপ্রাণ কয়েকজন। তবে একথা না বললে অন্তুর প্রতি অন্যায় করা হবে হয়তো। প্রধান মহাশয়কে নিজের শরীরের দাগ দেখানোর জন্য ধুতি খুলতে হবে না। কেন না ধুতির ভেতরের দাগগুলোকে অনুমান করার জন্য বাইরের দাগগুলোই যথেষ্ট। তবে বাংলার জনগন তো ? নিজের চোখে পুরোটা না দেখে আবার কিছুই বিশ্বাস করতে চায় না। তাই প্রয়োজন হলে প্রধান মহাশয়কেও মাঝে মাঝে ধুতি উত্তোলন করতে হতেও পারে।
প্রধান মহাশয়কে উত্তমমধ্যম দেওয়ার সময় যাদের দর্শক হয়ে দেখার কথা ছিল তারা যে অন্ধকারের ভেতর ঝুপঝাপ-ঝপাং করে কোথায় হারিয়ে গেল কে জানে। ভিড় কমার পর মহিমকে দেখতে পেয়ে অন্তুর খুব ইচ্ছে করছিল মহিমকেও কয়েকটা ঘা বসিয়ে দিতে। অন্তু যেটা করল সেটা অনেক আগেই মহিমের করা উচিৎ ছিল। কিন্তু মহিম পারেনি...


থকথকে পিচের মতো অন্ধকার ছড়িয়ে আছে মহিমের ঘরের উঠোনে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই মহিমকে অনুস্মরণ করে ঘরে ঢুকল অন্তু আর কাবেরী। কাবেরীর মানসিক অবস্থা যে মোটেও ভাল নয় সেটা ওর নিঃশব্দ পা ফেলাতেই পরিষ্কার। সারা রাস্তা একটাও কথা বলেনি কাবেরী।
‘আচ্ছা মহিম কাকা তোমার মতো লোক প্রতিবাদ না করে চুপচাপ ছিল কী করে ? কষ্ট হয়নি তোমার ? ইচ্ছে করেনি ওদের মুণ্ডুগুলো ধড় থেকে আলাদা করে দিতে ?’
মহিম কিছু না বলে ঘরের ভেতর থেকে দড়ির খাটিয়াটা এনে উঠোনে পেতে দেয়। অন্তু বসলেও কাবেরী দাঁড়িয়েই থাকে। ‘জানো তো মহিম কাকা প্রতিবাদ না করাটাও একরকম অন্যায়। পাগলা কুকুরের ঘেউ-ঘেউ শুনা বা কামড় খওয়াটা বাহাদুরি নয়। পাগলা কুকুরটাকে মেরে দেওয়াই বাহাদুরি। তুমি মিলিয়ে নিও ওই পঞ্চায়েত প্রধান অবনী আর কোনওদিন কোথাও বিচার করতে যাবে না।’
এতক্ষণে মুখ খোলে মহিম, ‘বচর তিরিশ আগুকার কতা। তকন আমার বয়স এগার-বার হব্যেক। ওই পঞ্চ্যাইতের একটা বিচার লিয়ে আমার বাপের সাতে পদানের পাড়াপাড়ি হইচিল। ধান চুরি না আলু চুরি... কিচু একটা ছিল মনে হয়। তা জানিসর‍্যে বাপ বচর ঘুত্ত্যে দিল নাই। ওই পদান আমাদের বিঘা দুয়্যেক জমি জরিমানা কইর‍্যে দিল। ঝাঁটা লিয়ে পদানকে মাত্ত্যে আইচিল আমার খুড়ি। কদিন বাদেই খুড়িক্যে ডাইন বইল্যে... শুধু বইল্যে লয় পমান কইর‍্যে আমাদের সবার সামনে বাঁইধ্যে পুড়্যাই মাইর‍্যেছিল...’ চোখের জল মোছে মহিম।
‘আর তোমার বাবা জ্যাঠারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিল ?’ এবার অন্তুর গলাটাও যথেষ্ট নরম।
‘শুদু আমার বাবা জ্যাঠারা লয়, থানার পুলিশগুল্যাও দাঁড়াই দেইখ্যেছিল কেউ কিচুই কত্ত্যে পারে নাই।’
‘কেন ?’
‘ভয়ে। তাছাড়া কী বইলব্যেক ? বল্ল্যে ঘরে আগুন লাগাই দিব্যেক। যা শালা মারাবি যা...। পাটির লোক্যের সাতে বাদ কইর‍্যে বাঁচা সহজ ছিল নাইর‍্যে। মা তকন মাতা ছুঁয়্যায় পতিজ্ঞা কর‍্যাইছিল পঞ্চ্যাইতের সাতে যাতে কনুদিন না লাগি। আইজ মা নাই বইল্যে কী কতাটার দামট্যাও নাই ?’
‘কিন্তু কাকা তখনকার সময় আর এখনকার সময় তো এক নয় ? এখন সমাজ অনেক উন্নত...’
‘উন্নত ? হ্যেঁরে বাপ সেটা কুন দিক দিয়্যে ? একন ডেলি রেপ হচ্চ্যে, খুইন হচ্চ্যে কিন্তু বিচার হচ্চ্যে নাই হেইটা উন্নতি ? কদিন আগুত্যেই ত ডাইন বল্যে একটা বুড়িকে পড়্যাই দিল। যারা পড়্যাইল তাদের কী হৈল ? আমড়ার আটি হৈল। যে যাকে পাচ্চ্যে ধইর‍্যে কইর‍্যে দিচ্চ্যে কেউ দেক্যেও দেকচ্যে নাই। আর তুই বলচিস উন্নতি। ইস্কুক যাবার নাম কইর‍্যে বনের ভিত্রে বইস্যে ন্যাংটা ভিডুয়্যা দেকাটা আর যাই হক উন্নতি লয়র‍্যে বাপ। আইজক্যেও ত একশর উপর লোক আইচিল তামাশা দেইকত্যে। একন একলা পতিবাদ কত্ত্যে যাব, কাইল দিন আমার ঘরে ঢুইক্যে আমার বউ বিটিকে...’ কিছু একটা মাথায় আসতেই চুপ করে যায় মহিম। খানিক বাদে হতভম্ব সুরেই বলে, ‘ইবাবা পুনি গেল কুতায়? ঘরে ত নাই...’ কথাটা বলেই ঘর ভেতরকার অন্ধকারে অদৃশ্য হয় মহিম। তারপর টর্চ হাতে একছুটে বাইরে বেরিয়ে এসে বলে, ‘ভিতর ঘরেও নাই। তাহল্যে কুতায় গ্যেল ? শালা মামাগ বলচি পুনির কিচু হৈল্যে তপনা উয়াদেরকে আমি কাইট্যে ফাঁক কইর‍্যে দিব...’
‘তুমি শান্ত হয়ে বোসো মহিম কাকা। আমি পাড়ায় খোঁজ করে আসছি...’
‘না না আমিই যাব...’ মহিমের গলাতে রাগ আর আতঙ্ক যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
‘আমিও যাব।’ এতক্ষণে কথা বলে কাবেরী।
‘না না তুই মেয়্যালোক এই অন্ধকারে তকে যাত্যে হব্যেক নাই। তুই বরংচ ভিত্রে যায়্যে বৈস।’ 
ছুটে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে মহিম। মহিমের পিছুপিছু অন্তু। ঘুটঘুটে অন্ধকার মেখে পুরো পাড়াটা পড়ে আছে এখন। অনান্যদিন হলে রাস্তার ধারে খাট পেতে দু-একজনকে গল্প করতে দেখা যায়। খাট পেতে শুয়েও থাকে অনেকেই। আজকে কিন্তু কেউ বাইরে নেই। থমথম করছে পুরো পাড়াটা। মনসা মেলার ভেতরে বসে যে বুড়গুলো রোজ তাস খেলে ওরাও আসেনি আজ। অন্ধকারের ভেতর টর্চের আলো ফেলে এগিয়ে যায় মহিম আর অন্তু।
মহিম আর অন্তু বেরিয়ে গেলে কাবেরী অন্ধকার হাতড়েই ঘরের ভেতর ঢোকে। গোটা ঘর জুড়ে ভ্যাপসা একটা গন্ধ। ভাদু যে ঘরটায় শুয়ে রয়েছে সেটাতে টিমটিম করছে একটা বাল্ব। তেলচিট পড়ে প্রায় কালো হয়ে আছে বাল্বটা। কাপড় সেলাই করে করে বানানো সিলিংটাও ঝুলছে দোলনার মতো। ঘরের যেখানে সেখানে ইঁদুরের গর্ত, ইঁদুরমাটির স্তূপ। 
ভাদুর বিছানাটার পাশে যে চেয়ারটা রয়েছে সেটাতেই বসে কাবেরী। চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে ভাদু। কাবেরী ডাকে, ‘ভাদি এই ভাদি চিন্ত্যে পাচ্চিস ?’ 
কাবেরীর ডাকে চোখ মেলে তাকায় ভাদু। ঘোলাটে হয়ে আছে ওর চোখ দুটো। ‘বল ত কে বঠি ?’ আবার জিজ্ঞেস করে কাবেরী। ভাদু কোনও উত্তর না দিয়ে আবার চোখ দুটোকে বন্ধ করে। মুখটাকে ধীরে ধীরে দেওয়ালের দিকে ফিরিয়ে নেয়। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ দুটোকে মুছে নেয় কাবেরী। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে গেলে ভাদু আবার মুখ ফেরায়। তাকায় কাবেরীর মুখের দিকে। 
‘কিচু বলবি ?’ জিজ্ঞেস করে কাবেরী।
ভাদু কিছু একটা বলার চেষ্টা করে। মুখ দিয়ে কোন শব্দ বার না হলে জিব বোলায় শুকন ঠোঁট দুটোতে। কাবেরী খাটের নীচে রাখা জলের গ্লাসটা নিয়ে ভাদুর মুখে অল্প একটু জল দেয়। জলটা খাওয়ার কিছুক্ষণ পর ভাদু বিড়বিড় করে বলে, ‘পুনিকে দেকবি। পুনিকে...’
চোখদুটো ছলছল করে আসে কাবেরীরও। হ্যাঁ না কিছুই না বলে ভাদুর হাতটা শক্ত করে ধরে। ভাদু কাঁদতে গিয়েও কাঁদে না, ঠোঁটে ঠোঁট চাপা দিয়ে রাখে।

‘মহিম কই-র‍্যে মহিম, শালা আচ্চা বাপ বঠিস কেল্যা তুই...’
পাতমার গলা শুনে বাইরে বেরিয়ে আসে কাবেরী। পূর্ণিমার কোনও খবর আছে ভেবেই সোজা উঠোনে এসে দাঁড়ায়। এদিকে মহিমের ঘরের ভেতর ঢুকতে গিয়ে কাবেরীকে দেখে টর্চটা বন্ধ করে থমকে দাঁড়ায় পাতাম, ‘তুই ইখানে ?’ জিজ্ঞেস করে। 
পাতামের মুখ থেকে চোলাই মদের উগ্র টকটক গন্ধ কাবেরীর নাকে এসে ধাক্কা খায়। শাড়ির আঁচলে নাকমুখ চাপা দিয়ে কাবেরী বলে, ‘হঁ মহিম আইন্যেচে।’
‘তা ভালই কইর‍্যেচে। কিন্তু উ শালা কুতায় গেল ?’
‘পুনিকে খুঁজত্যে গেইচ্যে উয়ারা ?’
‘শালা বাপ না পাপ। তা কে কে গেইচ্যে খুঁজত্যে ?’ যথেষ্ট বিরক্তি নিয়েই জিজ্ঞেস করে পাতাম।
‘অন্তুর সাতে গেইচ্যে।’
‘অঁ দিদিমুনির ব্যাটার সাতে। আইজ ত পদানকে মাইর‍্যে ফুঁটাই দিয়েছ্যে শুইনলম।’
কাবেরী কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ করে যায়। শতাধিক লোকের সামনে নিজের অপমানটা চোখে ভেসে ওঠে। কাবেরীকে চুপ থাকতে দেখে পাতাম বলে, ‘পুন্নিমা আমার ঘরে আচে। সন্দ্যা বেলিতে আমার বউ এর সাতে ভাত খায়্যে ঘুমাই দিয়্যেছে।’
‘তর ঘর গেল কেমন কইর‍্যে ?’
‘কেমন কইর‍্যে আবার, আমি আইস্যে লিয়্যে গেইচ্যি। আমি আইচিলম ষোলআনায় যাব বল্যেই। আইস্যে দ্যেখি ঘরে কেউ নাই। পুন্নিমা একলা বইস্যে কাঁদছে, উদিকে উয়ার মায়ের দিশাদশা নাই। ভাইবলম মেয়্যাটা ভয় পাত্যে পারে। ইটা ভাব্যেই লিয়ে গেলম। আর ষোলোআনাতেও যাবার সমুয় হৈল নাই।’
‘দেক উয়ারা আবার কুতায় কুতায় খুইজ্যে বেড়্যাইচ্চে। মহিমকে তাহল্যে বইল্যে দিবি যা।’
‘খুঁইজ্যে মরুক শালা। ঘর ঢুকল্যে বইল্যে দিবি। আমি চইল্লম।’ হনহন পাতাম বেরিয়ে যায়।
পাতাম বেরিয়ে গেলে কাবেরী অন্ধকার খাটিয়াটার উপরেই বসে। কাঁদে। ডুকরে ডুকরে কাঁদে। অসহ্য যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে ভেতরটা। তবুও ওকে স্বাভাবিক হতে হবে, স্বাভাবিক আচরণ করতে হবে। প্রয়োজনে হাসতেও হতে পারে। কাবেরিরা তো এভাবেই বেঁচেছে এতকাল। 

।২৫।
ছাদের উপর মাদুর পেতে আকাশের দিকে মুখ করে চুপচাপ শুয়ে আছে শিল্পী। কিছুতেই ঘুম আসছে না ওর। কান্না পাচ্ছে খুব কিন্তু কান্নাও আসছে না এখন। ওর মামা মামি আর কে কে যেন গল্প করছে নীচে। ওদের গলার আওয়াজ ভেসে আসছে শিল্পীর কানে। সেটাতে আরও বেশি বিরক্তি লাগছে ওর। ওদের গল্পে শান্তনুর কোনও কথা নেই, ওরা গল্প করছে সেয়ারবাজার নিয়ে সারদা নিয়ে সব্জির দাম নিয়ে। অথচ ওরাই এই অসময়ের আত্মীয়। ওরাই কালকে কত চোখের জল ফেলেছে। এমনকি শিল্পীর মামিও জল ফেলার চেষ্টা করেছে।
মাথার উপর দিয়ে লাল-নীল আলোয় ঝিকমিক ঝিকমিক করতে করতে একটা বিমান উড়ে যাচ্ছে এখন। একটা সময়ছিল যখন আকাশে গুড়-গুড় গুড়-গুড় শব্দ হলে দড়বড় করে দুই ভাইবোন ছাদে এসে দাঁড়াত। হাঁ করে তাকিয়ে থাকত উপরের দিকে।
‘দেক মেগট্যাকে সেলাই কইরচ্চ্যে। ওইটা ছুঁইচ গাড়ি। আর জল হব্যেক নাই...’
শান্তনুর কথা বিশ্বাস না করে পারত না ছোট্ট শিল্পী। কৌতূহলী দুচোখ নিয়ে দাদাকে প্রশ্ন করত, ‘ওই গাড়িট্যা কে চালাচ্চ্যে ?’ তখন শিল্পীর মুখেও বাঁকড়ি ভাষার গন্ধছিল।
শান্তনু উত্তর দিত, ‘ক্যে আবার চালাচ্চ্যে ভগবান চালাচ্চ্যে। তাছাড়া অত উপরে কি কেউ যাত্যে পারে ?’
ছোটবেলার কথাগুলো মনে পড়তেই দুচোখ ভিজতে থাকে শিল্পীর। এলোমেলো ভাবে কত কথাই না মনে পড়ছে। শান্তনুর চলে যাওয়াটা কিছুতেই মানতে পারছে না ওর মনটা। যে ট্রাকটায় শান্তনুর এক্সিডেন্ট হয়েছিল তার মালিক বলেছে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেড়লাখ টাকা দেবে। এমন ক্ষতির কোনও পূরণ হয় বলে শিল্পীর জানা নেই। তবুও কেমন অদ্ভুত না ? একদিন শান্তনু বলেছিল, ‘ছুটকি আমি চাকরি পেলে তোকে দেড়লাখ টাকা দেব।’ আসলে ‘দেড়লাখ’ শব্দটা শান্তনুর ঠোঁটে লেগেই থাকত।
‘জুতো দুটোর দাম কত নিল দাদা ?’
‘দেড়লাখ।’
‘কীরে কটা গোল হজম করলি ?’
‘দেড়লাখ।’
মা মেয়ে দুজনেই তিতিবিরক্ত হত দেড়লাখের অত্যাচারে। আজকে শান্তনুর জীবনটার মূল্য নির্ধারিত হল দেড়লাখে। সত্যিই অদ্ভুত জীবনের হিসেবগুলো।
চোখেমুখে বালিশ চাপা দিয়ে কাঁদতে থাকে শিল্পী। স্মৃতিতে স্মৃতিতে ভেঙে যাচ্ছে ভেতরটা। আসলে দাদার স্মৃতিতে মনটা এমন ভাবে ভরে না থাকলে হয়তো অন্তুর অতীতটা মেনে নেওয়াও এতোটা সহজ হত না। শেষ সময়ে তিতলির কলটা না এলে হয়তো...


বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হয়েছে অন্তুর। শেষ পর্যন্ত পাতামের বাড়ি না গেলে তপনাদের কপালে আজকে চূড়ান্ত দুঃখছিল। পাতামের বাড়ি গিয়ে পূর্ণিমাকে দেখার পর শান্ত হয়েছিল মহিম। যে লোকটা বুড়ো শেয়ালের মতো সবার সামনে দাঁড়িয়ে কাবেরীর অপমান দেখছিল সেই লোকটারেই কী ভয়ংকর পরিবর্তন! ভাগ্যিস তপনা বা সত্যবান ওরা ঘরে ছিল না। নয়তো হাত দিয়েই সিংহের মতো মুণ্ডু ছিঁড়ে নামিয়ে দিত। তপনাকে ঘরে না পেয়ে ‘শালা হারামি’ বলে ওদের আমগাছটায় এক লাথি মারতেই ঝড়-ঝড় করে কতগুলো যে আম ঝড়েছিল কে জানে। তপনার বউ মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ‘মামেগুয়া...’ ডায়লগ দিয়ে মঞ্চে নামলেও মহিমের, ‘এই শালি...’ গর্জন শুনে আর টুঁশব্দটুকুও করেনি।
মহিমের এই পরিবর্তনটা যথেষ্ট অবাক করেছে অন্তুকে। কোন ত্রিশ বছর আগে গ্রামের পঞ্চায়েত বিচার করে ওর ঠাকুমাকে ডাইনি বলে পুড়িয়ে দিয়েছিল। মায়ের মাথায় হাত দিয়ে মহিমকে কথা দিতে হয়েছিল কোনওদিন পঞ্চায়েতের চক্করে পড়বে না ও। কেবলমাত্র সেই কথা রাখার জন্য ও কাবেরীর বস্ত্রহরণ দেখেছে, কল্পনাও করা যায় না। ‘শালা দুনিয়ায় কত রকমের মাল আছে... যাক কেউ কথা রাখে না বললে তাহলে ভুল বলা হবে, কেউ কেউ কথা রাখে...’ নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতেই হাসে অন্তু।  
একটা চেয়ারকে বগলদাবা করে ছাদে উঠে আসে অন্তু। নদীটার দিকে মুখ করে বসে। মাঝরাত পেরিয়েছে তবুও কিছু লোক কাজ করেই চলেছে মনে হয়। তাই এখনো নদীটার এক একটা জায়গায় আগুন জ্বলছে। কাল সকাল থেকেই মেলা শুরু হবে। ‘হরেক মাল দশ টাকা দশ টাকা দশ টাকা...’ ‘দাদা দেখে যান দেখে যান একটা ছেলের দুটো মাথা...’ ‘মরণ কুয়া মরণ কুয়া মরণ কুয়া, কুয়ার ভেতর বনবন করছে তিন তিনটা মোটর সাইকেল...’ মুখস্ত হয়ে গেছে অন্তুর।
‘শিল্পী কি সত্যি কল করবে না নাকি ? কটা বাজে দেখি তো...’ পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে অন্তু। দুটো বাজতে দশ। ‘ঘুমিয়ে পড়েছে ?’ আবার নিজেকে জিজ্ঞেস করে অন্তু। মোবাইলটা নিয়ে নাড়াচাড়া করে কিছুক্ষণ। এই তিতলির ফোনটা এসেই যত ক্যাচাল হয়ে গেল। ‘ধুর ভাল্ললাগে না শালা...’ চেয়ারটা থেকে উঠে ছাদের একটা কোনায় গিয়ে দাঁড়ায়। মোবাইলটা হাতে নিয়ে উল্টাতে পাল্টাতে কী যেন ভাবতে থাকে, তারপর দুম করেই কল করে তিতলিকে। ‘একদিন আপ মুঝে মিল যায়েঙ্গে...’ বেজেই চলেছে কলারটোন। আবার কল করে অন্তু। এতক্ষণে রিসিভ করেছে তিতলি, ‘কে বলছেন ?’ ঘুম জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করে তিতলি।
‘আমি বলছি।’
‘কোন আমি ?’ আবার জিজ্ঞেস করে তিতলি।
অন্তু বুঝতে পারে তিতলির স্বামী ওর সঙ্গে আছে। সেটা বুঝতে পেরেই আরও জোরে জোরে বলে, ‘এই ন্যাকামি কেন করছ ? আজকে দেখা করব বললে কিন্তু এলে না। মাতাল বলদ বাড়ি ফিরেছে নাকি ?’ ফোনটা কেটে দেয় তিতলি। অন্তু আবার কল করে। ‘একদিন...’ হতে না হতেই আবার কলটা কেটে দেয় তিতলি। অন্তু আবার কল করে। এবার সুইচ অফ.... 
অন্তু জানে ওপারে মিলন না হলে এপারে বিরহ নিশ্চিত। তিতলির বর যদি তিতলিকে সন্দেহ করে নিজের কাছে টানে সেটাই বা মন্দ কী ? এই মাঝ রাতের অপরিচিত কল মাঝে মাঝে সম্পর্কের ভাঙা সেতুটা মেরামত করে দেয়। হাতের নাগালে থাকা জিনিশ নিয়ে কে আর কবে ভেবেছে, কিন্তু সেই নাগালের জিনিশ নাগালের বাইরে যাচ্ছে ভাবলেই মানুষ কোমর বেঁধে সেটাকে ঠেকানোর চেষ্টা করে।

অতীত-বর্তমান আর বর্তমান-অতীত এই পথটুকু হাঁটতে হাঁটতেই অন্তুর ভোর হয়ে আসে। নীচে নেমে আসার জন্য চেয়ারটা ছেড়ে উঠতে যাবে ঠিক এমন সময় মোবাইলটা বেজে ওঠে। ‘শালা তিতলি নয় তো...’ পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে অন্তু। না, শিল্পী কল করছে। ‘শিল্পী কল করছে এখন ?’
ফোনটা রিসিভ করে অন্তু, ‘হ্যাঁ বল।’
‘জেগেই ছিলে নাকি ?’
‘হ্যাঁ জেগেই ছিলাম।’
‘আচ্ছা যার সঙ্গে কথা বলছিতে বলো, সরি টু ডিস্টার্ব ইউ...’ ফোনটা কেটে দেয় শিল্পী। ‘শালা আজব মেয়ে মাইরি...’ কলব্যাক করে অন্তু। রিং হতে হতে না হতেই রিসিভ করে শিল্পী।
‘যার সঙ্গে কথা বলছিলে মানে ? কার সঙ্গে কথা বলছিলাম আমি ?’ অন্তুর গলার রাগটা পরিষ্কার।
‘তোমার কথা বলার মানুষের অভাব...’
শিল্পীর মুখের কথা কাড়িয়ে নিয়ে অন্তু বলে, ‘অভাব বলেই না এত রাত পর্যন্ত...’
‘কাকে কল করবে ভাবছিলে ?’
‘দ্যাখ ফালতু বকবি না। আমি তোর কলেরেই অপেক্ষা করছিলাম।’
‘কেন অপেক্ষা কেন ? কল করলেই তো পারতে। আমার মোবাইল নম্বর তোমার কাছে না থাকা তো নয়। নাকি ডিলিট করে দিয়েছ ?’ ইচ্ছে করেই পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে প্রশ্ন করে শিল্পী।
‘ধুর শালা...’ ফোনটা কেটে দেয় অন্তু।
চেয়ারটাকে নিয়ে নীচে নেমে আসে। চুপচাপ বসে পড়ে বিছানায়। বিরক্তিতে চোখ ছলছল করে আসে ওর। এবার ফোনটাকে এক্কেবারে সুইচ অফ করে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ে।

জানালার ফাঁক-ফোঁক দিয়ে ভোরের আলো ঢুকছে এখন। জানালার ওপারে শালিকের কিচিরমিচির। ঘুমটা ভেঙে যায় অন্তুর। বিছানা থেকে উঠে চোখেমুখে জল নিয়ে এসে সোফায় বসে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে অন করতেই গত রাতের কথাগুলো মনে পড়ে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা আবার বিছানায় ছুঁড়ে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। ওর মা ওঠেনি এখনো। দরজা বন্ধই আছে। অন্তু বাইরে বেরিয়ে এসে পেয়ারা গাছটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মাধবীলতা গাছটা অনেকটাই উঠে পড়েছে। ঠিকঠাক জল পেলে এবছরই ফুল ফুটবে মনে হয়। অন্তু কুয়োর পাড় থেকে জলের বালতিটা নিয়ে এসে জল দেয় মাধবীলতা গাছটার গড়ায়, গায়ে। এই মাধবীলতা গাছটাকে দেখলে মায়ের মুখটা মনে পড়ে ওর। অন্তু নিজেও জানে না কেন এমনটা হয়। তবে এর পিছনে একটাই কারণ খুঁজে পেয়েছে ও। সেই স্কুলের মাধবীলতা গাছটা। প্রথম প্রথম মাকে ছেড়ে স্কুলে আসতে ভাললাগত না অন্তুর। মায়ের জন্য মনকেমন করত খুব। আর মায়ের জন্য মন খারাপ হলেই অন্তু মাধবীলতা গাছটার দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে রইত। লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছে কতবার। এখন ঐসব দিনগুলো মনে পড়লে কেমন যেন বিষণ্ণতা গ্রাস করে। তবুও ভাললাগে ঐসব দিনগুলো মনে করতে।
‘আইজক্যে এত সকালেই উইঠ্যেছিস যে ?’
অন্তু খেয়াল করেনি কখন ওর মা ওর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। পিছন ফিরে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘হুম ঠিকঠাক ঘুম হয়নি রাতে। তা তুমি এত সকাল সকাল উঠেছ যে ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।
‘কাইলক্যে রাইত্যে আর ঘুমের বড়িটা খাই নাই।’
‘কেন ?’
‘তর ফিত্ত্যে দেরি হচ্চ্যে দেইখ্যে কপাটটা ঠেস্যাই বস্যেই ছিলম। কখন ঘুমাইছি ক্যে জানে...’
‘বসেছিলে কেন ? খাবার ঢাকা দিয়ে রেখে দিলেই তো হত।’
‘কাইলক্যে মনটা বড কু-গাইছিল। তা মহিম্যের কী হৈল-র‍্যে কাইল ?’
‘মহিম কাকার কিছুই হয় নাই। সব শেয়াল-কুকুরগুলো মিলে বরং কাবেরীকে...’
‘কী কইর‍্যেছে কাবেরীক্যে ?’
‘না মানে...’ অন্তু বলতে গিয়েও ভাবে বলবে কি বলবে না।
‘চুপ কইর‍্যে রইলি যে, কী কইর‍্যেছে ?’
‘আমি যখন পৌঁছাই তখন দেখি কাবেরীকে উলঙ্গ করে দাঁড় করিয়ে রেখেছে সবার সামনে।’
‘অতবড় মানুষ্যের নাম ধইর‍্যে কতা বলিস না, পিসি কিম্বা কাকি বলবি...’ ধমক দেয় লতিকা। ‘তা তুই কিচু বইলত্যে পাল্লিনাই উয়াদিকে...’
‘ওই পঞ্চায়েত প্রধানকে বেদম পিটিয়ে দিয়েছি। ওর সঙ্গে সঙ্গে আরও দু-তিনজনকে।’
‘ভাল কইর‍্যেছিস। তর বাপ থাইকল্যে ঘাড় ভাইঙ্যে দিত। যতদিন তর বাপছিল কার বুকের পাটা গাঁয়ে অন্যাই কইরব্যেক। তা কাবেরীর অপমান হওয়ার আগুতে তুই ছিলিটা কুতায় ?’
‘আমি একটু বাইরে গিয়েছিলাম।’ এই প্রশ্নটার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না অন্তু।
‘সেটাই ত শুধাচ্ছি যে ছিলিটা কুতায় ?’
‘না মানে আমি সোনাপুর গিয়েছিলাম।’
‘কী জন্যে ? কাইলক্যেও ত ছেল্যামেয়্যা গুল্যাইন পইড়ত্যে আইস্যে ঘুর‍্যে গেল। ডেলি-ডেলি এমন কল্ল্যে কে পইড়ত্যে আইসব্যেক তর কাচে ?’
‘আমি রাজার কাছে...’
‘রাজা ত তকে খুঁইজত্যেই ঘরক্যে আইচিল। সত্তি-সত্তি বল তুই কার সাতে কুতায় ছিলি ?’ কথাটা বলেই লতিকা কুয়ো থেকে এক বালতি জল তুলে তার থেকে এক ঘটি জল নিয়ে চা-টা চাপিয়ে দিয়ে আসে। ‘মুক ধুয়্যেছিস ?’ জিজ্ঞেস করে লতিকা।
‘না এখনো ধুইনি।’
‘ধুইয়্যে-লে তর সাতে আইজক্যে আমার কতা আছে।’
মা চলে যাওয়ার পরেও একা একাই দাঁড়িয়ে থাকে অন্তু। কিছুই বোধগম্য হয় না। মাকে এমন ভাবে কথা বলতে এই প্রথম দেখছে অন্তু। নিজের চোখ-কান কোনটাকেই বিশ্বাস হচ্ছে না ওর।
‘কী হৈল দাঁড়াই রইলি ?’ দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে লতিকা।
‘আরে যাচ্ছি যাচ্ছি।’

আজ দীর্ঘদিন পর অন্তুর মুখোমুখি চেয়ারে চা খেতে বসেছে লতিকা। চা এর কাপ শেষ হওয়ার মুখে অথচ অন্তু একবারের জন্যেও মায়ের মুখের দিকে চেয়েও দেখেনি। লতিকাও একটা কথা বলেনি এতক্ষণ। এবার চা এর কাপটা নামিয়ে বলে, ‘কাইলক্যে শিল্পীক্যে লিয়ে কুতায় গেইছলি ?’ সরাসরি প্রশ্নে বেশ ঘাবড়ে যায় অন্তু।
‘না মানে আসলে শানুর...’
‘শানুক্যে আইজক্যে অন্তত টানিস না। সত্তিটা বল...’
‘জোড়-বাঁধ গিয়েছিলাম।’
‘কী জন্যে লিয়ে গেইছলি পরের মেয়্যাকে ?’
অন্তু কী উত্তর দেবে খুঁজে না পেয়ে চুপ করে থাকে। ‘কী ভাইব্যেছিস ডানা গজ্যাই গ্যেছে তর ? মুখ থেইক্যে একনো মায়ের গন্দ যায় নাই আর পেম কত্ত্যে শিক্যেচিস।’
‘না আসলে...’
‘ওই আসল্যেটাই শুইনত্যে চাইছি নকল গল্প শুইনব নাই। সত্তি সত্তি ভালবাসিস না ফুত্তি কচ্চিস ?’
‘ও খুব ভালবাসে তাই...’
‘তাই কী ? তাই তুই ফুত্তি করিস ?’
‘না মানে আমিও বাসি...’ একটু হাসার চেষ্টা অন্তু করে কিন্তু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসিটা বাসি ফুলের মতো মনে হয়।
‘তাহল্যে শিল্পীকে ভালবাসিস ?’
‘হ্যাঁ। বাসি।’
‘আর ওই ইটলিক্যে ?’
‘কে ইটলি ? চিনি না তো আমি।’
‘ওই য্যে পুরুলিয়্যার মেয়্যাটা ?’
‘শালা মাকে কে বলল...’ বিড়বিড় করে অন্তু।
‘কী বলছিস জোর‍্যে বল।’ ধমক দেয় লতিকা।
‘ও ওই তিতলি ?’
‘হঁ হঁ ওই পুরুলিয়্যার মেয়্যাটা ?’
‘তিতলি তো আমার বোনের...’
‘চুপকর হতচ্ছাড়া বুন্যের মত...’ এবার হো-হো করে হেসে ফেলে লতিকা। এতক্ষণ সিরিয়াস অভিনয় এই প্রথম মনে হয়। আসলে কালকে রাতেই শিল্পী কল করে অন্তুর মাকে যা বলার বলেছে। লতিকাও ভেবেছিল রাতেই ছেলেকে পাকড়াও করবে কিন্তু সেটা আর হয়নি। যাই হোক অন্তুর মুখটা কিন্তু এখনো দেখার মতোই লাগছে। বেচারা এখনো পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারছে না ওর মা একসঙ্গে এতগুলো তথ্য পেল কোথায়।
‘আমাকে কাইলক্যে রাইত্যেই শিল্পী ফোন কইর‍্যে সব বইল্যেচে...’
‘কী কী বলেছে ?’ এতক্ষণে স্বাভাবিক মনে হয় অন্তুর মুখটা।
‘উসব শুইন্যে তর লাভ নাই। আমিও শিবানীক্যে বইলব বইলব কইর‍্যে বলার সমুই পাই নাই। যাক শুইনলম শিবানীও সবেই জানে। ভালই বঠে। অমন মেয়্যা তর বউ হব্যেক সপ্নেও ভাবি নাই আমি। ভাইব্যেছিলম কীজানি কেমন মেয়্যা ঘর‍্যে আইন্যে ঢুক্যাইস... যাক পছন্দটা ঠিক্যেই কইর‍্যেছিস। তবে ওই ইটলি না তিটলি উসব মেয়্যাকে আর যদি ফোন করিস ত আমার চাইয়্যে খারাপ কেউ হব্যেক নাই বইল্যে দিলম।’
অন্তু আর একটাও কথা না বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে মায়ের পায়ের কাছে বসে, কোলে মাথা রাখে। লতিকাও কিছু বলে না। অন্তুর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে অন্তুর বাবার ছবিটার দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে থাকে। অন্তুর জন্মদিনটা মনে পড়ছে এখন। দুঃখ-সুখের স্মৃতিতে চোখদুটো ভারী হয়ে আসছে লতিকার...

।২৬।
‘পুনি বইলছিল আইজ থেক্যেই মেল্যা শুরু। তা তুই মেল্যায় যাবি নাই ?’ কাবেরীকে জিজ্ঞেস করে ভাদু। কাবেরী কিছু বলে না, জলের গ্লাসটা ভাদুর মুখের দিকে এগিয়ে দেয়। আজকে সকাল থেকে পূর্ণিমা আর কাবেরী মিলে ভাদুর ঘরটা পরিষ্কার করেছে। মহিমকে দিয়ে ঘরের ভেতরে এমনকি উঠোনেও নতুন বাল্ব লাগানো করিয়েছে। তারপর মহিমকে সঙ্গে নিয়ে উঠোনে বের করে স্নান করিয়েছে ভাদুকে। আজ কতদিন পর ভাদু আকাশ দেখল সেটা হয়তো ও নিজেও মনে করে বলতে পারবে না। বাইরে খাটিয়া পেতে তার উপর কাঁথা বিছিয়ে ভাদুকে ঘণ্টা খানেক বসিয়ে রেখেছিল কাবেরী আর মহিম। অপলক ভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে বসেছিল ভাদু। যেন এর আগে কোনওদিন আকাশ দেখেনি। আসলে ভাদু হয়তো কল্পনাও করেনি আবার কোনওদিন আকাশ দেখবে, গাছ দেখবে, পাখি দেখবে। কাবেরীর মুখের দিকে কেমন ভাবে যেন চেয়েছিল ভাদু। সেই চাওয়াটাতে নিছক তৃপ্তি ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
‘কির‍্যে তুই যাবি নাই ?’ আবার জিজ্ঞেস করে ভাদু। আজকে ভাদুর কথাগুলোও বেশ পরিষ্কার।
‘তকে একলা ঘরে রাইখ্যে ক্যেমন কইর‍্যে যাব।’
‘আমি একলা থ্যাইকত্যে পইরব।’
‘আচ্চা সেট্যা না হয় পরে ক্ষণ দেকা যাব্যেক। তুই একন টুকু ঘুম্যাইল্যে। আইজ সারাদিন ধকল অন্যেক হৈচ্যে...’ কাবেরী উঠে দাঁড়াতে গেলে ভাদু ওর হাতটা ধরে, ‘কী হৈচ্যে তর ?’
ভাদুর প্রশ্নের কী উত্তর দেবে খুঁজে পায় না কাবেরী। কাল সারারাত আজ সারাদিন ধরে শুধু গতকাল বিকেল-সন্ধার ভয়ংকর ছবিগুলো চোখের পাতায় ভেসেছে। বারবার ভিজেছে চোখের পাতা। মনটা তবুও শান্ত হচ্ছে না কিছুতেই। গ্রামের সবাই দেখেছে ওর নগ্ন শরীরটা। একমাথা লজ্জা আর অপমান নিয়ে ঘরেও যেতে পারেনি ও। রাস্তায় বেরোলেই লোকে হাসবে...... 
ভাদুর হাতটা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ে কাবেরী। বুকের ভেতর অসহ্য জ্বালা হচ্ছে। সারা শরীর জুড়ে যেন কিলবিল কিলবিল করছে কতশত চোখ। সবকিছু ছেড়ে ছুট্টে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে অনেক অনেক দূরে কোথাও, যেখানে ওকে কেউ চেনে না কেউ না।
‘কাঁদচ্যিস ক্যেন্যে তুই ? মনট্যাকে ছটু করিস না। আমি সব্যেই জানি লো। তুই আমার সতীন হৈল্যে আমার‍্যেই ত লাব। কনুই অন্যায় করিস নাই তুই। আমি আর কদিন, তারপর আমার পুনিক্যে ক্যে দেইকত ? পুনির বাপক্যে ক্যে দুইট্যা ভাত ফুট্যায় দিত...’ বলেই চলে ভাদু। ভাদুর পক্ষে কাবেরীর কান্নার এই কারণ ভাবাটাই স্বাভাবিক।
‘অমন কতা বলিস না। তর কিচ্যুই হব্যেক নাই, তুই আবার ভাল হৈয়্যে যাবি। তর ঘর-বর তর‍্যেই থ্যাইকব্যেক...’
‘ইটা আশা কইর‍্যে বাঁচার রোগ লয় লো। ই রোগে কেউ বাঁচে নাই। আমি বুজত্যে পাচ্চি আমার দিন ফুর‍্যাই আইসছ্যে। তুই আমাক্যে কতা দ্যে তুই আমার পুনির বিহাঁ দিবি...’
‘অনম কইর‍্যে বইলত্যে নাই। তুই নিজ্যেই নিজ্যের বিটির বিহাঁ দিত্যে পারবি।’         
‘উসব শুইন্যে আমার লাব নাই আমি জানি। তুই কতা দিল্যে শান্তিত্যে যাত্যে পাইরব। তুই কতা দ্যে আমাক্যে।’
‘কী কতা দিব ?’
‘পুনির বিহাঁ তুই দাঁড়াই থাইক্যে দিবি।’
‘কতা দিলম পুনির বিহাঁর সমুয় তুই না থাইকল্যে আমি নিজ্যে দাঁড়াই রইয়্যে পুনির বিহাঁ দিব। ল্যে ইবার হৈচ্যে ? একন তবে ঘুমা...’ উঠে দাঁড়ায় কাবেরী।
ভাদু আর একটাও কথা বলে না। কাবেরীর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর দেওয়ালের দিকে পাশ ফিরে শোয়।

মহিম পূর্ণিমাকে সঙ্গে নিয়ে বিকেলের দিকে সেই যে বেরিয়েছে আর ফেরার নাম নেই। হয়তো মেলায় গিয়ে মেতেছে বাপবেটি। ‘আমার হৈচ্যে মরণ কে কী বইলব্যেক সেই ডরে না পাচ্চি ঘরক্যে যাত্যে না পাচ্চি ইখ্যানে থ্যাইকত্যে...’ বিড়বিড় করে কাবেরী। হয়তো আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু দরজায় মহিমকে দেখে চুপ করে যায়। পূর্ণিমাকে হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি পরিয়ে ঘরে ফিরেছে মহিম। নতুন বাল্বের আলোয় ঝলমল করছে পূর্ণিমার হাতদুটো। ওর হাতে ঝুলতে থাকা পলিথিন প্যাকেটেও প্রচুর চুড়ি রয়েছে। ওগুলোও কাঁচের চুড়ি।
কাবেরী পূর্ণিমার গালদুটো আলতো করে নাড়িয়ে আদর করে। হাতদুটোকে নাড়িয়ে বাজায় চুড়িগুলোকে। তারপর বলে, ‘তর মাক্যে দেক্যায় আয় যা...’
পূর্ণিমা হাসতে হাসতে মায়ের কাছে গেলে কাবেরী মহিমকে বলে, ‘আমি একবার ঘর যাব।’
‘ক্যেন্যে এই সন্দ্যা ব্যেলায় ক্যেন্যে আবার। একবার‍্যেই কাইল সকালে যাবি। তারপর আইজ মেলা...’
‘না না আমি মেল্যায় যাব নাই। আর ঘরক্যে না গ্যেলে জাইনব ক্যেমন কইর‍্যে ছাগলগুল্যাইন...’
‘ছ্যাগল দেইকত্যে যাত্যে হব্যেক নাই, আমি রামপদক্যে ত বল্যেই দিয়্যেছি জল-পালা খাউয়্যাই দিত্যে। অবলা জীবের কাইজ রামপদ না করা হব্যেক নাই। আর মেল্যা যাবি নাই ক্যেন্যে ?’
‘না আমার যাবার ইচ্চ্যা নাই।’
‘ত ইচ্চ্যা নাইট্যা ক্যেন্যে সেইট্যা বলবি ত, শুধুই বইলছ্যিস যাব নাই আর যাব নাই। আইজক্যে বিজয় পাল আইসচ্যে। পু...রা রসের গান চইলব্যেক।’
‘উসব রসের গান তুই শুনবি যা, কাইলক্যে তর যা রস দেক্যার দেইখ্যেছি। এই মুক লিয়ে আর রসের গান শুইনত্যে যাবার কনুই ইচ্চ্যা নাই আমার।’
‘তর রাগ হউয়্যা মন খারাব হউয়্যা সবেই সাবাবিক কিন্তু আমি কী কইত্তম বল ?’
‘সেইট্যায় তুই আর কী কত্তিস ? ততে আর তপনাতে তাহল্যে ফারাকটা কুতায়। উ সইব্যাইকার সামনে আমাক্যে নেংটা কইল্ল আর তুই বাকি লোকগুল্যার মত ভালছিলি। অমন মরদের মইর‍্যে দিয়্যা দরকার।’
‘তাহল্যে অজ্জুন ভীম সব্যাইকার মইর‍্যে দিয়্যা দরকার ছিল। কাইলক্যে ত বইল্লম আমি মায়ের...’
‘তর লইজ্জ্যা লাগ্যে নাই মা খুড়িক্যে লিয়ে বানাই বানাই গল্প বলচিস ?’
‘একটা কতাও মিত্যা বলি নাই। এই তর মাতায়...’ কাবেরীর মাথায় হাত দেওয়ার জন্য মহিম এগিয়ে গেলে কাবেরী বলে, ‘থাক অন্যেক হইচ্যে। আমাক্যে ইবার ঘর যাত্যে হব্যেক।’
‘তুই কী চাইচিস আবার একটা খারাব কিচু হক, তক্যে একা পাল্যে উয়ারা ছাইড়ব্যেক ?’
মহিমের কথা শুনে হাসি পায় কাবেরীর, ‘আমার আর হারাবার কিচুই নাই। আর তুই যাদের কতা ভাইব্যে ভয় পাচ্চিস উয়ারা আমার লতুন কইর‍্যে আর কী ক্ষতিটা কইরব্যেক। কাইল যা হৈচ্যে তারপর...। ছাড় তুই উসব্যের আর কী বুজবি, সবার সামনে নেংটা কল্ল্যে কেমন লাগ্যে উটা তুই বুজবি নাই।’ শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জলটা মুছে মহিমের ঘর থেকে রাস্তায় বেরিয়ে আসে কাবেরী। মহিম কী করবে খুঁজে না পেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।

রাস্তাটা ঠিক অন্ধকার নয়, কিন্তু নির্জন। কোথাও জনপ্রাণীর চিহ্নমাত্র নেই। মেলার এই দুটোদিন বিকেল সন্ধা থেকেই গ্রামটা ফাঁকা হতে শুরু করে। সবাই গিয়ে জড়ো হয় নদীর পারে। নটা বাজতে না বাজতেই পুরো গ্রামটাই শুনশান। চারপাশটা ভালভাবে দেখে নিয়ে ঘরের দিকে এগিয়ে চলে কাবেরী। মহিমের সঙ্গে মেলায় ঘোরার ইচ্ছে যে ওর ছিল না এমনটা তো নয়, খুব ইচ্ছেছিল। কিন্তু কালকের ওই ঘটনাটা সব কেমন যেন এলোমেলো করে দিয়েছে। আবার চোখদুটো ছলছল করে আসে কাবেরীর। নিজেকে নিজের কাছেও অসহায় বলে মনে হয় ওর। মনে হয় শুধুমাত্র বাঁচার লোভেই শরীর নামক একটা বোঝা ও বয়ে চলেছে। কিন্তু করবেটাই বা কী?
কিছুদূর আসার পরেই হাবলুর ঘরের সামনে থমকে দাঁড়ায় কাবেরী। হাবলুর ঘরের ভেতর থেকে তপনার গলার আওয়াজ ভেসে আসছে। এমন সময় হাবলুর ঘরে তপনার উপস্থিতি সন্দেহ জাগিয়ে তোলে কাবেরীর মনে।
‘তপনা মেল্যায় না যায়্যে ইখ্যানে কী কৈচ্চ্যে ?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে কাবেরী। এগিয়ে যায় হাবলুর ঘরের দিকে। দরজাটা দেওয়া রয়েছে। দুটো দরজার মাঝের ফাঁকটা দিয়ে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করে ও। অস্পষ্ট ভাবে তপনা সত্যবান আর হাবলুকে মদ গিলতে দেখেই কাবেরী বুঝতে পারে ভেতরে ঠিক কী নাটক চলছে। এর পরিনতি ভালভাবেই জানে ও। এর পরিনতি আরেকটা কাবেরীর জন্ম। যাকে যখন তখন ইচ্ছে মতো ভোগ করা যাবে।
আর এক মুহূর্তের জন্য না দাঁড়িয়ে কাবেরী ঘরের দিকে ছুটতে শুরু করে। ফেলে আসা ইতিহাস ভাসছে এখন ওর চোখের পাতায়। সেই তপনা-সত্যবান-কার্তিক-পরান, পরিমল টলে-টলে পড়ছে নেশায়। পরিমলের চলার শক্তি নেই। চোখ খোলার শক্তি নেই। ভয়ে জড়সড় হয়ে মদের গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে কাবেরী...
সজোরে ধাক্কা দিয়ে বাইরের দরজাটা খুলে নিজের ঘরে ঢোকে কাবেরী। পাঁঠিছাগলটা বারদুই ম্যাঁ-ম্যাঁ করে চুপ করে যায়। ভেতর ঘরের দরজা খুলতেই চোখ পড়ে চকচকে বঁটিটার উপর...