Bengali novel, Fire asar din [part 8]

Bengali novel - Fire asar din. Written by - Bappaditya Mukhopadhyay


Bengali novel - jodi search korchen tahole ei Bangla novelta porun. Sob paben, Bangla love story to bangla politics. Sob dik diyei Fire asar din best bengali novel.

ষষ্ঠ অংশসপ্তম অংশ


(শারদীয় উপন্যাস ১৪২৬, ফিরে আসার দিন) 



একটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে। অনেকটা ঠিক পূর্ণিমার মতোই দেখতে। মেয়েটা ছাগলের বাচ্চা দুটোকে নিয়ে খেলছে। কোঁকড়া চুল, টানা টানা চোখ, ফর্সা টুকটুকে গায়ের রঙ। কীযেন বলছে ছাগলের বাচ্চা দুটোকে। রান্নাঘরে বসে কাবেরী সেটা শোনার চেষ্টা করেও শুনতে পাচ্ছে না...
‘মাগী তর লইজ্জ্যা সরম নাই ? নিজের ভাতারটাকে খায়্যেও তর পেট ভরে নাই মাগী ? তর আবার শিশুযৌইবন হইচ্যে। পরের মরদ লিয়ে ফুত্তি মারিস হারামজাদী। সায়ার নিচ্যে ডানা গজ্যাইচ্যে লয় ? আমার বাপ কী দোষটা কইর‍্যেছিল-লো মাগী যে উয়াকে মার খুয়ালি ?...
এতক্ষণ পর্যন্ত সুন্দর একটা স্বপ্নে ডুবেছিল কাবেরী। একটা ফুটফুটে মেয়ের স্বপ্নে। মাতৃত্বের স্বপ্নে। মহিম যাওয়ার পর সাত সকালের ঘুমটা একটা স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল। ঠিক এমন একটা স্বপ্নই তো কাবেরী দেখে এসেছে এতকাল। বিধবা জীবনের বন্ধা জমিতে মাতৃত্বের স্বপ্ন দেখতে কার না ভাললাগে। এতদিন এই স্বপ্নটা দেখতে ইচ্ছে করলেও ভয় হত কাবেরীর। সমাজচ্যুত হবার ভয়। অসতীত্বের কলঙ্ক লাগার ভয়। মহিম জীবনে আসার পর থেকে স্বপ্ন দেখতে ভাললাগে। স্বপ্ন সাজাতে ভাললাগে। ইচ্ছে করে অনেক দূরে কোথাও গিয়ে আবার সব নতুন করে শুরু করতে। কাবেরী এটুকু বুঝতে পারে মহিম ঘর বাঁধার গান গাইতে পারে। একজীবন বাঁচার জন্য ওটুকুই যথেষ্ট।
এত সুন্দর স্বপ্নটা মাটি হল ফুলকির চিৎকারে। ফুলকি পরানের মেয়ে। গ্রামেই বিয়ে হয়েছে। বিয়ের আগেই পেট করিয়ে বসেছিল...। ওসব কথা থাক এখন। ফুলকি গাল দিচ্ছে মানে নিশ্চয় কারু মুখে শুনেছে গত সন্ধার ব্যাপারটা। বিছানা ছেড়ে উঠোনে বেরিয়ে আসে কাবেরী। এখনো ফুলকির মুখ থেকে ফুলকি বেরিয়েই চলেছে। কাবেরী পাত্তা না দিয়ে উনুনে ডালপালা গুঁজে আগুন ধরায়। বেলা ভালই হয়েছে। ফুলকির সঙ্গে মুখ লাগতে যাওয়াটা নেহাতেই মুর্খামি হবে সেটা ভাল মতোই জানে কাবেরী। গালা গালিতে ফুলকি ডিলিট পাওয়া। এখন অনায়াসে নতুন নতুন গালাগালি আমদানি করতে পারে। প্রতিদিন কাউকে না কাউকে গালি দিতেই থাকে। যেদিন কারুর সঙ্গেই কিছু হয় না ? সেদিন পুরনো ঝগড়ার রেশ ধরে গালি দেয়। মোটকথা গালি না দিয়ে ফুলকি বাঁচবে না। আজকে সকালে কাবেরীকে গালি দেওয়া সবে শুরু হয়েছে নতুন কোনও কেস না পাওয়া পর্যন্ত এটা চলতেই থাকবে।
মুখ ধোয়ার পর চা এর কাপে চুমুক দিতে দিতে কাবেরী স্বপ্নটাকে নিয়ে ভাবতে থাকে। এতদিন তপনা কোত্থেকে কোত্থেকে পিল এনে গেলাত... 
‘আইজক্যে মাসের কত হৈল ?’ নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করে কাবেরী। ঠিক মনে করতে পারে না। চা এর কাপটা হাতে নিয়েই ঘরের ভিতরে যায়। বাংলা ক্যালেন্ডার খুলে বার মিলিয়ে দেখে। ‘আইজ আঠ্যাইশ চৈত্ত। মানে কাইলক্যে নীল পূজা। পরশু চড়ক।’ ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে আবার খাটিয়ার উপরেই বসে কাবেরী। খুব মনোযোগ দিয়ে কর গোনে। ‘...নয় দশ এগার বার । মানে বারদিন পার হৈচ্যে এখনো শরীদ খারাব হয় নাই...’
‘কাবেরী এই কাবেরী ঘর‍্যে আচিস ?’
‘দিদিমুনির গলা না...’ ডাকটা আরেকবার শোনার অপেক্ষা করতে থাকে কাবেরী।
‘কাবেরী...’
‘যাচ্চি দিদিমুনি...’ হড়বড় করে এসে দরজাটা খোলে কাবেরী। ‘আসুন ভিত্রে আসুন। তা বহুদিন পর মনে পইড়ল বড ?’
‘মনে পড়ল্যেই কী উপায় আচে বল। এক সকাল সেন্টার, তারপর রান্নাবান্না কত্ত্যে কত্ত্যেই দুপুর। ইবার সিনান কইর‍্যে দুটা খাবি না গপ্প কত্ত্যে আসবি ?’
‘হঁ সেটা ত বঠেই। আপন আপন সংসারের কাম-কাইজ কত্ত্যে কত্ত্যেই বেলা শেষ। তা একন কুতায় গেইচল্যে ?’
‘বলচি বলচি টুকু জল দ্যে আগে, যা গরম। আর হ্যে-লো ওই মেয়্যাটা কে বঠে ? ডবাটার ওই দিকে দাঁড়াই গাইল দিচ্চ্যে দেইখলম...’
‘উটা পরানের বিটি...’ কথাটা বলেই ঘরের ভিতর ঢুকে মাটির কলশি থেকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল নিয়ে আসে কাবেরী। ‘উ মাগীর গাইল দিয়্যা ছাড়া আর কাইজ কী...’
‘তা তকে গাইল দিচ্চ্যে ক্যেন্যে ?’
‘আর বইল না, কাইল সন্দ্যায় মহিম নাকি পরাইন্যাকে মাইর‍্যেচে...’
‘ক্যেন্যে মাইর‍্যেচ্যে ক্যেন্যে ?’
‘মহিমের বউ এর নামে নকি কীসব বইল্যেছিল তাই টুটি চিপ্যে ধইর‍্যেচ্যে। আর পরাইন্যার বিটি ভাইব্যেছে আমি পাঠাইছি উয়ার বাপকে মাত্ত্যে।’
‘শুন ওই পরাইন্যার ল্যাঠায় থাকিস না। উয়ার অসাধ্য কনো কাইজ নাই।’
‘সেটা আর আমার চাইত্যে ভাল কে জানে। তা তুমি একন কুতায় গেইচল্যে বলল্যে নাই যে ?’
‘আমি গেইছলম সোনাপুর।’
‘এই সাত সকালে সোনাপুর ?’
‘উঁ গাঁয়ের দিদিমণির ছেইল্যাটা মইর‍্যেচে নাই। সত্তি মানুষ্যের জীবনের কনুই দাম নাই। শিবানী ত কত ভাল মেয়্যা। কনদিন সেন্টারের দুপয়সা মার‍্যে নাই। কেউ বইলত্যে লাইরব্যেক কারুর সাতে কনদিন গণ্ডগোল লাইগ্যেচে। কিন্তু দেক ওই বিধবার মাতাতেই আইজ বাজ পইড়ল।’
‘ইমা কাইল রাইত্যে তাই দেকছিলম নদীর ঘাটে আগুন জলচ্যে। জলজ্যান্ত ছেল্যাটা ছিল যে গো দিদিমনি। হটাত কী হৈচিল ?’
‘টাকের সঙ্গে এক্সিডেন। একটা পা বাদ দিত্যে হৈছিল। তাও বাঁইচ্যে থাক...’
‘ওই ছেইল্যাটাই ত ফুটবল খেইলত লয় ?’
‘হঁ হঁ ওই ছেইল্যাটাই।’
‘কপাল বুজলি কপাল। শিবানীকে দেইখ্যে চিনাই যায় নাই। কথাও বইলচ্যে নাই কারুর সাতে। ইবার পাছে উয়ার কিচু হৈয়্যে যায়...। তাই ত বলি যতদিন বাঁচ ফুত্তি কইর‍্যে বাঁচ। আইজ মল্ল্যে কাইল দুদিন। তা হ্যে-লো তকে যে বইল্যে ছিলম একটা বিহাঁটিয়া কর, তা কল্লি নাই।’
‘বিহাঁ কর বল্ল্যেই মরদটা কুতায় পাব ?’
‘মেয়্যা মাইনষ্যের শরীদ থাইকল্যে মরদের অভাব হয় নাই। আমি যকন বিধবা হইচি তকন অন্তু হামা দিচ্চ্যে। আমি চাইল্যেই বিহাঁ কত্ত্যে পাত্তইম। করিনাই ছেল্যাটাকে মানুইষ কইরব বইল্যে। তর ত তেমন কিচু নাই দেদার বিহাঁ কত্ত্যে পারিস। তা ছাড়া এক একটা মরদের সাতে রাইত কাট্যাতে একন ভাল লাইগব্যেক কিন্তু দুদিন বাদেই মনে হব্যেক বাঁচার মত কিচুই নাই। তাই বলচি...’
হঠাৎ করেই মুখটা থমথমে হয়ে আসে কাবেরীর। এর ওর সাতে রাত কাটানোর গল্প মানুষ কত সহজেই বলে, কিন্তু কেউ জানতেও চায় না কেন ওকে এর ওর সাতে রাত কাটাতে হয়। মানুষ কতটা অসহায় হলে তবে গিয়ে অনিচ্ছায় শরীর দেয় সেটা কাবেরী জানে।
‘তপনার ত বউ বিটি আচে তাহৈল্যে উটার সাতে পিরিত করিস ক্যেন্যে ?’
‘আগুতে যা যা কইর‍্যেচি দায়্যে পইড়্যে কইর‍্যেচি। এখন ত উসব কিচুই করি নাই। মহিমকেই শাঙা কইরব ভাবচি। মানুইষটাও ভাল, খেয়াল রাকে। কেউ মন্দ কতা বইলল্যে পতিবাদ করে। সেই জন্যেই ত পরাইন্যা মার খাইচ্যে।’
‘তা হ্যেঁ-লো উয়ার বউ এর ত শুইন্যেচি...’
‘থাকুক বাঁইচ্যে, উটায় ত ভাল। যদি মানুইষটাকে সেবা কইর‍্যে সারাই তুইলত্যে পারি...’
‘ধুর পাগলী, উ রোগ সাইরব্যার লয়। তবে তুই যে মুখে সেবা করার কতাটা বললি ইটাই ত অনেক। তুই একদিন সুখি ঠিক্যেই হবি দেখিস।’
‘একটা কতা বইলব দিদিমণি ?’ চোখের পাতায় লজ্জা আর কৌতূহল মাখিয়েই প্রশ্নটা করে কাবেরী।
‘হঁ বল। এত লইজ্জ্যা পাবার দরকার নাই।’
‘দিন বার হৈল আমার শরীদ খারাব করে নাই...’
কাবেরীর কথা শুনে হেসে ফেলে অন্তুর মা। পরে হাসি থামলে বলে, ‘উটা অনেক কারণেই হৈত্যে পারে। তবে পেচ্ছাব টেস্ট করাই লিয়াই ভাল। দেকি কাইল যদি আইসত্যে পারি...’
‘কাইল ত নীলের পূজা...’
‘ইমা তাই ত। আমি ত অন্তুকে ফলমূল কিচুই আইনত্যে বলি নাই। দেকি বিকালে একবার বিবড়দা পাঠাইত্যে হব্যেক। তুই চিন্তা করিস না আমি সমুই কইর‍্যে আইস্যে টেস্ট কইর‍্যে দিব। একন মহিমক্যেও কিচুই বলিস না।’
‘আচ্চা সেটা না হয় হব্যেক ক্ষণ। ইবার টুকু চাঁ করি...’ অপরিচিত মাতৃত্বের আনন্দে কাবেরীর চোখ দুটো চক-চক করতে থাকে। 
‘না না আর চাঁ কৈত্ত্যে হব্যেক নাই। ঢের দেরি হৈচে, ঘর যায়্যে রান্না কত্ত্যে হব্যেক। ছেল্যাটা আবার কী কচ্চ্যে কে জানে। আমি একন উঠি।’ শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে কথাগুলো বলে অন্তুর মা।
‘চাঁ কত্ত্যে বেশি দেরি হব্যেক নাই...’
‘না না আইজ থাক। ওই যেদিন টেস্ট কত্ত্যে আইসব সেদিন খাব।’ উঠে দাঁড়ায় অন্তুর মা। তারপর কাবেরীর মুখের উপর চোখ দুটোকে মেলে দিয়ে বলে, ‘কাঁচা আমগুলাইন খায়্যে শেষ কইর‍্যে দিস না। আচার করার লাইগ্যে কয়েকটা আমাকে দিস। একন আবার তর জিবে টক টানাবেক...’
লজ্জায় কাবেরীর মুখটা লাল হয়ে আসে। কি বলবে খুঁজে না পেয়ে অন্তুর মায়ের কথায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি দেয়। হাসতে হাসতে অন্তুর মা রাস্তায় বেরিয়ে আসে। কাবেরীও পিছনে পিছনে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। নটা-দশটা বাজতে না বাজতেই সূর্য আপন পরাক্রম দেখাতে শুরু করে দিয়েছে। মাঠ ঘাটগুলোতে যেন আগুন জ্বলছে দাউ-দাউ করে।
এক দৃষ্টিতে রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে থাকায় মাথাটা ঝিমঝিম করে আসে কাবেরীর। ঘরে ঢুকে চুপচাপ বসে কিছুক্ষণ। মাথার ঝিমঝিমানি কমলে চালের হাঁড়িটার দিকে এগিয়ে যায়। হাঁড়ি মুখে ঢাকা দেওয়া টিনের থালাটা সরিয়ে হাত ঢুকিয়ে চালের পরিমাণ দেখে কাবেরী। টেনেটুনে দিন তিনেক চলবে আর। তারপর...
পেটে হাত বোলাতে বোলাতে হাসে কাবেরী। সে হাসির অনেক অর্থ হতে পারে। একদিন এই পেট বাঁচাতেই তো তপনাকে...। না না আজ আর অন্ধকার দিনগুলো মনে করতে চায় না কাবেরী। সেদিন আর কোনও উপায় ছিল না। কোনও দরজা খোলা ছিল না ওর জন্য। 
পেটে হাত বোলাতে বোলাতে নাভির নীচ দিয়ে হাতটাকে শাড়ি সায়ার ভেতর অল্প ঢুকিয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়ায় কাবেরী। তলপেটের ভেতরটা অনুভব করার চেষ্টা করে। কিছুই বুঝতে পারে না তবুও অনন্দ হয় ওর। সব যেন কেমন নতুন নতুন লাগছে। হঠাৎ লতিকা দিদিমণির কথাটা মনে পড়তেই বাইরে বেরিয়ে আসে কাবেরী। খেজুর পালায় বেড়া দেওয়া বাথরুমটায় ঢুকে পা ফাঁক করে শাড়ি-সায়া তুলে দাঁড়ায়। পেচ্ছাব করে। তারপর পেচ্ছাবটার দিকে তাকিয়ে নতুন কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করে...

‘কা...বেরি এই কা...বেরি...’ হন্তদন্ত হয়ে কাবেরীর ঘরের উঠোনে এসে দাঁড়ায় মহিম। কাবেরী পরীক্ষা নিরীক্ষা ফেলে বাইরে বেরিয়ে আসে। ‘তপনা উয়ারা কেউ আইচিল ?’ জিজ্ঞেস করে মহিম। ঘামে ওর পুরো শরীরটা ভিজে চবচব করছে। চোখ-মুখ দিয়ে উত্তেজনার ছাপ ঠিকরে পড়ছে।
‘না আসে নাই ত। ক্যেন্যে কী হইচ্যেটা কী ?’ মহিমকে এমন উত্তেজিত এর আগে কোনওদিন দেখেনি কাবেরী।
‘তা হৈল্যে শালারা...’
‘কী হৈচ্যে সেটা বলবি ত...’ এবার কাবেরীর গলাতেও যথেষ্ট উত্তেজনা।
‘না না হয়নাই তেমন কিছুই। মানে কী হইচ্যে বুঝলি উয়ারা মানে ওই উয়ারা ন...’
‘কী মানে উয়ারা উয়ারা কচ্চিস ? ঘর ভিত্রে টুকু বৈস। জল খা। তারপর বল।’
‘হঁ জল দে-ত এক গেলাস।’
‘আয় ভিত্রে আয়।’ কাবেরীর পিছনে পিছনে ঘরের ভেতর ঢোকে মহিম। বিছানায় বসে। এখনো ওর চোখ-মুখ থেকে উত্তেজনার ছাপ লেশমাত্র উধাও হয়নি। হঠাৎ করে মানুষ ভয় পেলে যেমনটা হয় মহিমকে দেখেও ঠিক তেমন মনে হচ্ছে।
‘লতিকা দিদিমুনি আইচিল।’ মাটির কলশি থেকে জল ঢালতে ঢালতে কাবেরী বলে।
‘রাস্তায় দেইখলম। তা কী বইলছিল দিদিমুনি ?’
‘না না এমনি আইচিল। ওই সনাপুর গেইছল ত তাই আইচিল...’
‘হঁ হঁ সনাপুরের দিদিমুনির ছেইল্যাটাই মইর‍্যেচে লয় ? ওই শানু না সনু কী যে বেশ নামটা ছিল ছেইল্যাটার। ধুর কেল্যা মনেও পড়ছ্যে নাই। চাইড়্যে ফুটবল খেইলত ছেইল্যাটা...’
‘হঁ ওই দিদিমুনির ছেইল্যাটাই। তা তুই কী বলচিলি বল।’ মহিমের চোখের দিকে তাকায় কাবেরী।
‘কাইলক্যের ওই ঘটন্যাটার লাইগ্যে আইজক্যে মামেগুয়ারা ষোলআনা ডাইক্যেচে। বইল্যেচে পায়্যে ধইর‍্যে ক্ষমা না খুইজল্যে পুলিশে যাব্যেক।’ মহিমের কপালে চিন্তার বক্ররেখাগুলো পরিষ্কার ভাবে দেখা দিয়ে আবার মিলিয়ে যায়।
‘তর কনুই দোষ নাই আর পুলিশের ভয় দেকাল্যেই হোইয়্যে যাব্যেক ?’
‘ওই গলাটা টিপেছি নাই, উটাই ত দোষের। লোক্যে বইলব্যেক মুকে-মুকে হচ্চিল হাত তুইল্ল ক্যেন্যে ?’
‘হঁ হাত তুইলব্যেক নাই। আঁটকুড়ার ব্যাটাগুলার মুক ভাইঙ্যে দিতে হয়...। তুই ছাড় ষোলআনায় দাঁড়াই আমি যা-বলার বইলব।’
‘তুই মেয়্যালোক তারপর উখান্যে থাকিস নাই...’
‘তুইও ত থাকিস নাই।’
‘আমিই ত ছিলম।’ কাবেরীর চোখের দিকে তাকায় মহিম।
‘না তুইও ছিলি নাই। উয়ারা মিছা বইলচ্যে...’
‘হঁ ইটা বিশ্বাইস কইরব্যেক ক্যেন্যে ?’
‘ক্যেন্যে কইরব্যেক নাই ? আমি ত বইলব সন্দ্যাই আমার ঘরে ছিল।’
‘যদি বলে তর ঘর‍্যে কী কচ্চ্যিল ?’
‘উসব তকে ভাইবত্যে হব্যেক নাই। আমি একলাই সামলাই লিব। আমি যা বইলব তুই শুধু সেটাত্যেই হঁ বলবি। ওই তিন শালাকে আইজ ছাইড়ব নাই। বহুদিন ধইর‍্যে বতর খুইজছিলম। আইজ রসের ঝাল মিট্যাই দিব খালভরাদ্যের...’
‘অত সজা লয়, তুই উয়াদিকে চিনিস নাই...’
‘আমাকে আর চিনাত্যে হব্যেক নাই।’
‘ছটায় তাহৈল্যে মনসাতলায় চইল্যে আসবি। দেক টুকু বাদেই কেউ না কেউ আইসব্যেক খবুর দিতে।’
‘আসুক তকে ভাইবত্যে হব্যেক নাই। তুই ঘর যায়্যে ঘুমাবি যা।’

এই গ্রামের ষোলআনার বিচার বরাবর উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্তের পক্ষেই গেছে। কখনো কখনো জীবন দিয়েও জরিমানা ভরেছে নীচের মানুষগুলো। মহিমের শৈশব অভিজ্ঞতা সেকথাই বলে। ঘরপোড়া গরু তো তাই সিঁদুরে মেঘ দেখেই ছুটে এসেছিল কাবেরির কাছে। 
।২৩।
‘আচ্ছা এখন কি তোমার সাহসটা কমে গেছে ? চিন্তা করে দেখো তো সেদিন আমার বাড়িতেই... তাও আবার মা বাড়িতেই ছিল। ভাবতে পার...’
‘না না বিষয়টা সাহসের নয় সময়ের। তখন অতশত বুঝতাম না।’
‘তা এখন কি একটু বেশিই বোঝো না অন্যের বউ ভেবে ভয় পাচ্ছ ?’ হাসতে হাসতেই কথাটা জিজ্ঞেস করে তিতলি। তিতলির প্রশ্নের ধরণ দেখে অন্তুও হেসে ফেলে। ‘কি বল ঠিক বললাম কি না ?’
‘মোটেই না। ওসব কিছুই নয়। আসলে আমিই চাইছি না আবার নতুন করে কোনও সমস্যা তৈরি হোক। যেটা পেরিয়ে গেছে সেটা ভুলে যাওয়াই ভাল।’
‘কিন্তু যেটা পেরিয়ে যায়নি ?’
‘মানে ?’
‘তুমি চাইছ না নতুন সমস্যায় জড়াতে কারণ তুমি শিল্পী নামের একটা মেয়েকে ভালবাস। এই জন্যেই তোমার কাছে মনে হচ্ছে সব পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আমি তো সেই সেখানেই থমকে দাঁড়িয়ে আছি।’
ফোনটাকে বাঁ-কানে চাপা দিয়ে একটা সিগারেট ধরায় অন্তু। তারপর ধোঁয়াটা শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে বলে, ‘দেখো তিতলি এটা সত্যি যে আমি এখনো তোমার প্রতি দুর্বল। তোমার কথা ভীষণ ভাবে মনে পড়ে আমার। কিন্তু আমি এটাকে কখনোই আর ভালবাসা বলতে পারি না। এটা জাস্ট একটা টান। প্রতিটা মানুষের এই পিছুটান থাকে। থাকতেই হয়। আচ্ছা আমাকে একটা কথা বলো, যদি সত্যিই তুমি অতীতে দাঁড়িয়ে রয়েছ তাহলে তুমি বিয়েটা করেছিলে কেন ?’ অন্তুর গলাতে বিরক্তিটা পরিষ্কার এবার।
‘বিয়ে না করলেই কি তুমি ওই মেয়েটাকে ছেড়ে আসতে ? আসতে না নিশ্চয় ?’
‘না যেতাম না।’
‘তাহলে বিয়েটা বিষয় নয়। আর তোমাকে আগেই বললাম কেন বিয়েটা আমাকে করতে হয়েছে...’ কথাটা বলে কিছুক্ষণ সময় নেয় তিতলি। তারপর বলে, ‘দেখো এগুলো নিয়ে আমার মনে হয় এত আলোচনার কিছুই নেই। তোমার প্রেমিকা আছে, আমার স্বামী। আমি তোমাকে বলছিও না তুমি ওকে ছেড়ে আমাকে ধরো। আমি জাস্ট বলছি আমি তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। সেটা পাঁচ মিনিটের জন্য হোক বা পাঁচ ঘণ্টা। এতে এতো আপত্তির কী আছে ? নাকি তুমি ভয় পাচ্ছ আমি তোমাকে বিপদে ফেলতে পারি কিংবা তুমি নিজের ভালবাসার প্রতি ভরসা রেখে আমার সঙ্গে দেখা করতে পারছ না আরও দুর্বল হয়ে পড়ার ভয়ে ?’
‘না এর কোনটাই নয়। আমার নিজের উপর নিজের ভালবাসার উপর যথেষ্ট ভরসা আছে।’
‘না নেই।’
‘যথেষ্টই আছে।’ জোর গলায় কথাটা বলে অন্তু।
‘থাকলে তুমি বলতে না তুমি এখনো আমার প্রতি দুর্বল। একজনকে সত্যি কারের ভালবাসলে আরেক জনের প্রতি দুর্বলতা আসে না। আর যদি তোমার নিজের ভালবাসার উপর এতটাই ভরসা তাহলে ওকে বলোনি কেন আমার কথা ? আমাদের সম্পর্কের গভীরতার কথা।’
‘বলিনি কারণ বিবেকে বেঁধেছে। নিজেকে ওর কাছে ছোট করতে চাইনি।’
‘এতে ছোট হওয়ার কিছুই যে ছিল না তুমি সেটা ভাল মতোই জান। আর এটাও জান যে তোমার অতীত জানার পর তোমার বর্তমান তোমার ভবিষ্যতে সঙ্গ দেবে না। এটা জান বলেই বলোনি। পারোনি বলতে। ভয় পেয়েছ, হারিয়ে ফেলার ভয়। আমিও চাই না তুমি তোমার অতীত বলে তোমার বর্তমান হারাও।’
অন্তু কিছু না বলে চুপচাপ সিগারেট টানতে থাকে। তিতলির বিষাক্ত সত্যি কথাগুলো হজম করতে কানের পাটা লাল হয়ে আসছে ওর। তিতলি যেন কথার পরিবর্তে দংশন করছে কানের ভেতর।
‘কী হল চুপ করে গেলে যে ?’ জিজ্ঞেস করে তিতলি।
‘এমনি। তোমার সঙ্গে বকবক করতে ভাল লাগছে না।’
‘উমহু বলো এত চূড়ান্ত সত্য সহ্য হচ্ছে না। যাও এবার কয়েকটা হজমের বড়ি খেয়ে পায়খানা করে এসো।’
‘ফালতু বোকো না। আজকে যখন স্বামী ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে তখন অতীত হাতড়াতে এসেছ। এতদিন কোথায় ছিল তোমার অতীত প্রেম ? আসলে তোমার স্বামী এখন অন্য শরীরে সাঁতার কেটে ঘুরছে আর তোমার শরীরের সুইমিংপুলটা ফাঁকা পড়ে আছে তাই তুমি চাইছ আমি...’ টুঁক টুঁক টুঁক করছে মোবাইল। মানে তিতলি ফোনটা কেটে দিয়েছে। এই সব না বলে অন্তুর কাছেও দ্বিতীয় কোনও রাস্তা ছিল না। তিতলি ওর জিবটাকে ব্লেডের মতোই ব্যাবহার করছিল এতক্ষণ।
ফোনটাকে পকেটে ভরে আরেকটা সিগারেট ধরায় অন্তু। অতীতের কিছু ছেঁড়া-ফাটা টুকরো ছবি সিগারেটের ধোঁয়ায় নাচতে নাচতে মিলিয়ে যায়। অতীতটাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা কারুরেই নেই তাইবলে অতীতে মুখগুঁজে পড়ে থাকাটাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আবার ফোনটা বাজছে ওর। আবার হয়তো...
না তিতলি নয়। শিল্পী। ‘হ্যাঁ বল...’ গলার স্বরটাকে নীচে নামিয়ে কথাটা বলে অন্তু।
‘কী করছিলে ?’
‘কিছুই না। বল...’
‘না আসলে একটাও ফোন করনি তো তাই আরকি...’ সত্যিই শানুকে দাহ করে আসার পর থেকে শিল্পীকে একটাও কল করেনি অন্তু।
‘না আসলে ঘুম থেকে উঠতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে...’
‘ঘুম থেকে উঠে তো করতে পারতে।’
‘সরি-রে করা উচিৎ ছিল। তা কী করছিস এখন ?’
‘আমি তো সকাল থেকেই নদীঘাটে গিয়ে বসেছিলাম। এই ফিরলাম কিছুক্ষণ আগে।’
‘নদীঘাটে ? ওখানে গিয়েছিলি কেন ?’
‘এমনি। দাদার জন্য খুব খুব মন খারাপ করছে...’ কান্নার সুর মিশে শিল্পীর কথাগুলো যন্ত্রণার স্থির ছবি হয়ে অন্তুর কানে ধরা দেয়। 
অন্তু দুচোখ বন্ধ করে শিল্পীর ভেজা চোখদুটো দেখতে পায়। অন্তত এই সময়টা অন্তুর উচিৎ ছিল শিল্পীর কাছে থাকা। কিন্তু অন্তু সেটা করেনি। তিতলির ফোন আর মেসেজগুলো ওকে যেন কেমন একটা করে তুলছিল। শান্তনুর মৃত্যুটাও স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছিল অন্তুর কাছে। এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। এখন হালকা লাগছে নিজেকে। তিতলিকে কয়েকটা কথা শোনাতে পেরেই হয়তো অতীতের পাপবোধটা কমেছে বলে মনে হচ্ছে এখন। এতদিন অন্তু নিজেকে আসামী সাজিয়ে বারবার অতীতের কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। দোষ স্বীকার করেছে বারবার। কিন্তু সত্যিই কি ওরই সব দোষ ছিল। সময়, সুযোগ, বয়স আর তিতলির সঙ্গ এগুলো কিছুই ছিল না ?
‘একবার দেখা করতে পারবে ?’ জিজ্ঞেস করে শিল্পী।
‘কখন ? কোথায় ?’
‘ওই পাঁচটা নাগাদ। নদীঘাটেই এসো।’
‘না না নদীঘাট নয়। তুই বরং জোড়-বাঁধের কাছে আয়। ওটা তোর বাড়ি থেকে কাছেও হবে। বেশ নিরিবিলি। জায়গাটাও ভাল।’ অন্তু ইচ্ছে করেই নদীর দিকে শিল্পীকে আনতে চায় না। ওখানে এলে শান্তনুর চিতাটা দেখে ওকে আরও বেশি বেশি মনে পড়বে শিল্পীর। অন্তুর পক্ষেও সম্ভব হবে না তখন শিল্পীকে সামলানো। 
‘আচ্ছা তাই এসো।’
‘ওকে আমি আসছি, টাটা।’ ফোনটা রেখে দেয় অন্তু।


এদিকটা সত্যিই বেশ নিরবিলি। শান্ত। এমন জায়গায় এসে বসলে নিতান্ত বেরসিকও আস্ত দুচারটা প্রেমের কবিতা নামিয়ে দিতে পারে। নদীটার থেকে বেশ কিছুটা দূরে জায়গাটা, সোনাপুরের ভেতরের দিকে। সোনাপুরের ধান জমিগুলোর বাড়তি জল গড়িয়ে এসে এই জোড়টার জন্ম দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে সোনাপুরের লোকেরাই জোড়টাকে বেঁধেছে চাষের সুবিধার জন্য। এখনো যথেষ্ট জল আছে জোড়-বাঁধটায়। শালূক ফুলে ভরে আছে পুরো জলাশয়টা। জলে পা ডুবিয়ে বসেছে শিল্পী। অন্তু সাইকেলটা একটা পলাশগাছে হেলান দিয়ে রেখে শিল্পীর পিছনে এসে দাঁড়ায়। চুড়িদারের পা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে বসেছে শিল্পী।
‘তোর নদী নামটা সার্থক বলে মনে হচ্ছে আজকে। মনে হচ্ছে জোড়টা তোর পায়ে এসে মিশছে।’
অন্তুর কথা শুনে পিছন ফিরে তাকায় শিল্পী। হাসার চেষ্টা করে। বড্ড ম্লান দেখায় সে হাসি। শিল্পীর মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ ছলছল করে আসে অন্তুর। এই একটা দিনে কী চেহারা হয়েছে মেয়েটার।
‘সকাল থেকে কিছু খেয়েছিস ?’ শিল্পীর পাশে এসে বসে জিজ্ঞেস করে অন্তু।
ঘাড় নেড়ে ‘না’ উত্তর দেয় শিল্পী।
‘কেন খাসনি কেন ?’ গলাটা ভারী হয়ে আসে অন্তুর।
‘খেতে ইচ্ছেই করেনি। জানো এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না বাড়ি গিয়ে সত্যিই দাদাকে দেখতে পাব না। এই ছুটকিকে ছাড়া চলতই না ওর। ছুটকি চা, ছুটকি জামা, ছুটকি সাবান, ছুটকি কলমটা কোথায়, মোজাগুলো কোথায় রেখেছিস...। মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত হতাম জান। ভাবতাম এই বাড়িটার থেকে বিদাই হতে পারলে বাঁচি। আজকে দেখো সেই দাদাটাই চলে গেল। সেই অর্ডার সেই আপদার করার কেউ রইল না। কিন্তু বিশ্বাস কর ওর একটা পা না থাকলেও আমি ওর সব কাজ করে দিতাম একটুও বিরক্ত হতাম না। ও তো ভাল হচ্ছিল ধীরে ধীরে তারপর কেন... কেন ?...’ অন্তুর বুকে মাথা রেখে হো-হো করে কাঁদতে থাকে শিল্পী। অন্তুর মনে হয় শিল্পীর যন্ত্রণায় পুরো প্রকৃতিটাই যেন কাঁদছে। ও কী বলে শিল্পীকে সামলাবে বুঝে উঠতে পারে না। শিল্পীর মাথায় চিবুক রেখে দূরের দিকে নীরবে তাকিয়ে থাকে শুধু।
এখন জোড়-বাঁধের জলের উপর সূর্যের হালকা লাল-হলুদ আলো এসে পড়ছে। তাতে লালচে-গোলাপি শালূক ফুলগুলোকে আরও বেশি সুন্দর বলে মনে হচ্ছে। কয়েকটা বালিহাঁসও এসে বসেছে জলের উপর। ওরা তাকিয়ে আছে এদের দুজনের দিকে।
‘আমি চকলেট এনেছি, খাবি ?’ শিল্পীর মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করে অন্তু।
মাথা নাড়িয়ে ‘না’ উত্তর দেয় শিল্পী। ওর গলায় এখনো কান্না লেগে রয়েছে। চোখ আর মনের পাতা জুড়ে শুধুই শান্তনুর স্মৃতি। ওর খেতে ইচ্ছে না করাটাই স্বাভাবিক। তবুও তো খেতে হয়। খাওয়ার চেয়েও বড় কথা সব ভুলে নতুন করে বাঁচতে হয়।
‘একটু খা নতুবা এবার তোর শরীর খারাপ করবে।’
এবার শিল্পী কিছু বলে না। অন্তুর বুক থেকে মুখ তুলে বাঁধের শান্ত জলটার দিকে চেয়ে থাকে। অন্তু পকেট থেকে একটা ক্যাটবেরি বের করে সেটার মোড়ক খুলে শিল্পীর মুখের সামনে তুলে ধরে। শিল্পী একবার চকলেটটার দিকে তাকায় একবার অন্তুর মুখের দিকে তাকায়...
বালিহাঁসগুলো এখন ডানার ভেতর ঠোঁট ডুবিয়ে শরীরচর্চার মন দিয়েছে। সূর্যের রঙ লালচে। আকাশের রঙে মস্ত প্রজাপতির ডানা। শিল্পীর দুই ঠোঁটে চকলেটের রঙ। মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতোই একটা মৃদুমন্দ বাতাস বইছে এখন। এমন পরিবেশ বিরহীর মনেও প্রেম জাগিয়ে দেয়।
‘একটা কথা জিজ্ঞেস করব তোকে ?’
‘হ্যাঁ বলো।’ অন্তুর চোখে চোখ দুটোকে মেলে দেয় শিল্পী। 
‘জানি না এমন সময় ঐ-সব প্রসঙ্গে কথা বলা ঠিক হবে কী না তাও বলছি, আচ্ছা তুই ওষুধ খেলি না কেন ?’
‘এমনিই খাইনি। আসলে যেটা হয়েছে সেটা তো অনিচ্ছায় নয় তাহলে যদি কেউ আসে তাকে ইচ্ছে করে বাধা দেব কেন ?’
‘সেটা তো ঠিক আছে কিন্তু বিয়ের আগে...’
‘বিয়েটা কোনও বিষয় হতে পারে না, অন্তত আজকের দিনে দাঁড়িয়ে।’
‘বিষয় বিয়েটা নয় বিষয় সমাজ, সংস্কার এগুলোই। আজও ভারতে কুমারী মায়ের সন্তানকে সম্মান দেওয়া হয় না।’
‘আজ হয় না কাল তো হবে। কেন মিছিমিছি সমাজের ভয়ে মাতৃত্বের প্রথম অনুভূতিটাকে নষ্ট করে দেবো বলো। এতো সমাজের দেওয়া নয়।’
‘কিন্তু তোর মা, আমার মা ওদেরকে...’
‘ওদের নিয়ে ভয় নেই।’
‘কেন নেই কেন ?’
‘ওরাও তো মা।’
‘কিন্তু...’
‘কোনও কিন্তুতেই আমি ওটা পারব না যেটা তুমি চাইছ। আমি বলছি না কেউ আসবেই, হতেই পারে কেউই এলো না। তবে এলে আমি ওকে আনব। তুমি পাশে না থাকলেও আমি ওকে আনব।’
‘আমি পাশে না থাকার কথা বলছি না। কিন্তু...’
‘তাহলে কীসের কিন্তু ? তুমি যদি তোমার মাকে বলতে ভয় পাচ্ছ তাহলে আমি বলব। উনি অন্তত আমার কথাটা বুঝতে পারবেন।’
‘শিল্পী আমার একটা অতীত আছে, আর সেটা না জেনে তোর এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া মনে হয় ঠিক হবে না।’
‘সে অতীত যাই থাক তাতে আমার সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হবে না। তোমার কোনও সমস্যা না থাকলে বলতে পারো কী সেই তোমার অতীত।’
‘আমি ফোনে সব বলব তোকে। এখন চল সন্ধা হয়ে আসছে।’
‘আমার মনে হয় কিছু গল্প শোনার জন্য সামনা সামনি অন্ধকারটাই উপযুক্ত। হোক সন্ধা তুমি বলতে পার।’
‘না আসলে আমিই মনে হয় পারব না তোর সামনে বসে এই কথাগুলো বলতে।’
‘পারবে ঠিক পারবে। যখন নিজেকে নিজে বলতে পেরেছ তখন আমাকেও বলতে পারবে। আমি কথা দিচ্ছি যতই ভয়ংকর হোক তোমার অতীত আমি সেটা হাসি মুখে মেনে নেব।’ শিল্পীর কথা শুনে অন্তু শিল্পীর মুখটা দেখার চেষ্টা করে কিন্তু পাতলা অন্ধকারে শিল্পীর মুখটা ভালভাবে দেখা যায় না। এখন বাঁধের জলটাও কালো হয়ে এসেছে। খানিক আগেই সাঁই-সাঁই করে উড়ে গেছে বালিহাঁসগুলো। দু-একটা তারার মুখ উঁকি দিচ্ছে আকাশে। দু-একটা তারা ভাসছে জলে। অনেক দূরে কীসের যেন ঝগড়া হচ্ছে। অন্তুর হাতটা চেপে ধরে শিল্পী।
‘আমি জানি তুই শোনার পর ভুল বুঝবি আমাকে।’ অন্তুর গলাটা ধরা-ধরা লাগছে এবার। ভেতরের ভয়টা দলা পাকিয়ে গলায় এসে জাঁকিয়ে বসছে।
‘না হয় ভুলই বুঝলাম তাও তো জানব তুমি ঠিকটা বলেছিলে।’ অন্তুর হাতটা আরও শক্ত করে ধরে শিল্পী। হয়তো ভেতর ভেতর নিদারুণ কিছু একটা আঘাতের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে ও।
‘কলেজ জীবনে একটা মেয়েকে ভালবাসতাম আমি...’
‘হ্যাঁ তাতে হয়েছেটা কী ?’
‘না মানে ওর সঙ্গে আমার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল...’
Previous
Next Post »