Bengali novel, Fire asar din [part 7]

Bengali novel - Fire asar din. Written by - Bappaditya Mukhopadhyay


Bengali novel - jodi search korchen tahole ei Bangla novelta porun. Sob paben, Bangla love story to bangla politics. Sob dik diyei Fire asar din best bengali novel.

(শারদীয় উপন্যাস ১৪২৬, ফিরে আসার দিন) 



গ্রামের কাঁচা রাস্তাটা জুড়ে অন্ধকার পড়ে আছে। দুএকটা শেয়াল-কুকুর আর রাতচরা কয়েকটা পাখি ছাড়া পুরো গ্রামটাই ঘুমিয়ে। এমন নিস্তব্ধ রাত্রিতে ধিকধিক করে এক টুকরো আগুনের উজ্জ্বলতা কমছে আর বাড়ছে। ওটা বিড়ির আগুন। জীবনের যন্ত্রণায় জ্বলতে জ্বলতে বিড়ি টানছে মহিম। রাগে ক্ষোভে বিরক্তিতে ঘুম আসেনি ওর। ঘরের ভেতর ভাদু আর পূর্ণিমা গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে। ঘুমের ভেতরেও মাঝে মাঝে গোঙাচ্ছে ভাদু। ভেতরে ভেতরে যন্ত্রণা হচ্ছে হয়তো। এই যন্ত্রণাটুকু মহিম উপলব্ধি করতে পারলেও ওর করার কিছুই নেই। ওর কেন আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়েও কারুর কিছুই করার নেই। নির্বাক ভাবে তাকিয়ে শুধু দেখো প্রিয়জনের চলে যাওয়াটুকু। এই যন্ত্রণার সঙ্গেই কাবেরীর জীবন জড়িয়ে আরও এক নতুন যন্ত্রণাকে উসকে দিয়েছে মহিমের জীবনে।
আজকে সন্ধার দিকে হারু নামের একটা ছেলেকে পাঠিয়ে মহিমকে নিজের ঘরে ডেকেছিল পরান। তপনা যাওয়ার পর থেকেই মহিমের মন বলছিল খুড়োর ডাক আসতে পারে, কিন্তু সেই ডাকটা যে আজকে সন্ধাতেই আসবে সেটা অবশ্য মহিম ভাবেনি। পরানের ঘরে গিয়েই মহিম দেখে ঘরের নিম গাছটার নীচে খাট পেতে পরানের সঙ্গেই সত্যবান আর তপনা বসে আছে। পরানের হাতে জ্বলন্ত কলকে। মহিম দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ওদের গল্প শোনার চেষ্টা করেছিল ঠিকই কিন্তু মহিমের কান এতোটা শক্তিশালী নয় যে শয়তানের শলাপরামর্শ শোনে।
মহিম যখন পরানের ঘরে ঢোকে তখন সত্যবান, ‘এতেই ফাঁইসব্যেক এতেই ফাঁইসব্যেক...’ বলে কিছু একটা বলছিল কিন্তু মহিমকে ঘরে ঢুকতে দেখে চুপ করে যায়। পরান হাসতে হাসতে বলে, ‘বল্যেছিলম আমার কতা ফেইলত্যে লাইরব্যেক। দেকইর‍্যে দেক আইল কিনা। বাপ-কাকা সবেই এক, যারা সম্মান করার ঠিক্যেই কইরব্যেক। আয়র‍্যে ইখ্যেনেই আয়, তর কতাই হচ্চিল। আমি জাইনতম তুই আমার কতা ফেলবি নাই...’
‘হ-ব খুড়া তুমার কতা কাইটত্যে লাইরলম। তা সন্দ্যা বেলিতে ডাইকল্যে যে, কন বিশেষ কাম আছে নকি ?’ সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিল মহিম। ভাব খানাও এমন ছিল যেন ও কিছুই জানে না কিছুই শুনেনি।
‘কামের কতা পরে হব্যেক ক্ষণ। তা দাঁড়াই রইলি যে, বৈস।’ পরানের কথাতে খাটের উপরেই বসে মহিম। তপনার চোখেমুখে এখনো তীব্র বিরক্তির ছাপ লেগে আছে।
‘তা তর বউ একন কে-কেমন আচে ?’ কল্কেতে কয়েকবার ফোঁস-ফোঁস করে সজোরে একটা টান দিয়ে কথাটা জিজ্ঞেস করে পরান।
মহিম উত্তর দিতে গিয়েও থমকে যায়। কাবেরীর কথাটা মনে পড়ে ওর। পরানের চোখের দিকে তাকিয়ে ভাদুর প্রতি ওর কামুক দৃষ্টিটাকে খোঁজার চেষ্টা করে মহিম। আলোন্ধকারে তেমন কিছুই চোখে পড়ে না। গাঁজার টানে পরানের চোখদুটো রক্তিম হয়ে আছে। কথা বলতে গিয়ে জিব লাটিয়ে যাচ্ছে। নিজের মাথাটাকে ঠাণ্ডা রেখেই মহিম উত্তর দেয়, ‘ওই রকম আচে। ই রোগেই আবার ভাল না মন্দ।’
‘সেটা ঠিক, ই রোগে কেউই বাঁচে নাই...’  সত্যবান বলে। তপনাও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু মহিমের মুখের দিকে তাকিয়ে সাহস কম পড়ল ওর।
‘তা তুই কী ঠিক কল্লি ?’ কল্কেতে আরেকটা টান দিয়ে জিজ্ঞেস করে পরান।
মহিম কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে। এই প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই ওর কাছে। তবুও ওর মুখ থেকে কিছু একটা শোনার জন্য ছ’টা চোখ অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে দেখেই মহিমকে বলতে হয়, ‘একন কিচুই ঠিক করি নাই।’
‘কী ঠিকের কতাটা খুড়া বইলল সেটা বুজত্যে পাল্লি ?’ জিজ্ঞেস করে সত্যবান।
‘না বুজার ত কিচুই নাই। তবে একন ঠিক কিচুই হয় নাই। যতদিন ভাদু আচে ততদিন এমন চইলব্যেক।’ বেশ দৃঢ় কণ্ঠেই জবাবটা দেয় মহিম।
‘যেমন চলচ্যে সেটা ত আর ভাল কিচু লয়। অন্তত তু-তুই তর বউয়ের কতাটা না ভাইব্যে বাইরের একটা বিধবা মিয়্যার লাইগ্যে জীবন দিচ্ছিস। ওই মেয়্যাকে না ছাড়ল্যে চুলায়মুলায় তর সবেই যাব্যেক। শরীরের নেশা ততদিনেই ভাল যতদিন মনের নেশা থাকে। এই কটা দিন ত নিজের বউটাক্যেই সমুই দিত্যে পারতিস...’
পরানের মুখটা মনে পড়তেই মহিমের ভেতরের রাগটা আবার দপ করে জলে ওঠে। পরান যে কবিরাজির নামে ধড়িবাজি করে বেড়ায় সেটা হয়তো গ্রামের কেউই তেমন জানে না। আর জানে না বলেই পরানের রোজগারটাও ভালই হয়। বেশ কয়েকটা ঘরে যজমান নিয়ে যথারীতি গুরুদেব হয়ে বসেছে ও। মহিম চিৎকার করে বলে বেড়ালেও হয়তো কেউ বিশ্বাস করবে না। পরানের মোটা নামাবলী ভেদ করা মুখের কথা নয়। নতুবা মানুষের এমন সাহস হয় কী করে যে গর্বের সঙ্গে এমন কথা বলে, ‘তর খুড়ি মইর‍্যেচে বলেই কি আমার শরীদের খিদ্যা শেষ? ওই কাবেরীর ত কন মরদ নাই... এখন যদি তুই ওই খানকিকে বলিস ঘরে তুলবি সেটা বল্ল্যেই ত হব্যেক নাই। শুন শরীদ দিয়ে শরীদ খাউয়াটা পাপের লয়। এই যে বৈশাখীর বিটি টগরি আমার ঘরে ঝ্যাইট দেয়, বাসন ধুয়্যে, রান্না করে, সুদু এই কটা কাজের লাগ্যেই হাজার টাকা দিব মাসে ? অত লয়রে বাপ। তবে বৈশির বিটিটাও ভাল যকন বলি তকন শাড়ি খুইল্যে কোলের উপর বসে। এই ত গেল শনিবার সত্যবান আইচিল। জিগ্যাইস করে দেক আমার এক কতাতে টগরি উয়াকেউ দিয়েচে কি দেয় নাই...’ 
ঘাড় নেড়ে অহংকার করেই সত্যবান সে কথা স্বীকার করেছিল। ‘দেকইর‍্যে বাপ একটা ক-কতা বলি শুন, গাঁয়ে শরীদ দিবার মে-মেয়্যা-বউয়ের অভাব নাই। আর দিব্যেক নাই কইরব্যেকট্যা বা কী ? মরদে যা রোজগার করে তার দেইড়্যা টাকার মদ মারে। আবার ঘরে চাল নাই ডাইল নাই ইসব শু-শুনল্যেও বউ এর ষষ্টিপূজা। তাহল্যে বিশ-পঁচিশ টাকায় শাড়ি খুইল্যে সায়া তুইলব্যেক নাই ত কী কইরব্যেক ?’
কথা আটকে আটকে গেলেও গাঁজার নেশাতে বুঁদ হয়ে কথা বলেই যাচ্ছিল পরান, ‘দেক ওই মাগিটাকে আ-আগল্যাই না রাইখ্যে আরও পাঁচ ঘাটের জল খা। আর হ্যাঁরে ওই শালা প-পরিমলকে মদের নেশাটা ক্যে ধর‍্যাই ছিল ? আমি ধ-ধর‍্যাইচি বুজলি। আমিই বইল্যেছিলম হাঁইড়্যা না খ্যালে তর পে-পেটের রোগ সা-সাইরব্যেক নাই। বাস ওইটুকু কতাতেই... কিন্তু তকন তর খুড়ি বাইচ্যেছিল বল্যেই তপনা ফুট্যাইছে... কীর‍্যে তপনা মিছা কতা বলছি ?’ সম্মতি জানিয়েছিল তপনা। 
‘...শুন সরকার মুখ্যেই বইলব্যেক একশ দিনের কাইজ পাঁচশ দিনের কাইজ কিন্তু কে-কেল্যা কাইজ দিব্যেক। বচরে ওই দশ-পনের দিন। ইখানের রুখাশুখা জমি চাষ লয় বাঁশ হব্যেক। শুন পারিস ত হাবল্যাকে হাঁইড়্যার নেশাটা ধরা। উয়ার বউটাকে দেক্যেছিস ? শালা ক-কলশির পারা পাছা। ওই মাগিটাকে না খাল্যে আমার ঘুম ধইরব্যেক নাই। তবে হ ওই কাবেরী আমাদের সবার। তুইও খা আমরাও খাই। কেউ বলার নাই। আরেকটা কতা ওই হাবল্যাকে যদি নেশা ধরাত্যে পাইর‍্যেছিস তাহল্যে বাউরি বাঁধের যে মাটিকাটা হব্যেক উটাতে তোকেই সুপার-ভইজার কৈরব। কীরে সত্যবান ঠিক বইল্যেছি ত ?’      
এতক্ষণ পর্যন্ত মহিমের রাগ খুব বেশি ওঠেনি। ও ভাবছিল পরান নেশার ঘোরে বকছে, কিন্তু এর পরের কথাগুলো সহ্য হয়নি ওর। বারেক্কে গাঁজার নেশাটাও চাপছিল পরানের মাথায়। দুলছিল পরানের মাথাটাও, ‘এই যে তর বউটার শরীদ খারাপ হৈল দ্যাখেই আমার ভি-ভিতরিটা আ-আঁকুপাঁকু কইরচ্চিল, এমনি এমনি ? শালা তর বউটার রোগ না হয়্যে যদি ত-তর হৈত তাহৈল্যে কী কৈত্ত ? এই শালা পরাইন্যার কাচেই শা-শাড়ি সায়া খু...’ আর কথাটা বলতে পারেনি পরান। হিংস্র নেকড়ের মতো ওর টুঁটি চেপে ধরেছিল মহিম। তপনা আর সত্যবান মিলে মহিমের চুলের মুঠি ধরে ঘাড়ে কামড় বসিয়ে কোনও রকমে ছাড়িয়েছিল। আর কয়েক সেকেন্ড হলে হয়তো...। বেশ কয়েক মিনিট পরানই মুখ দিয়ে শুধুমাত্র সাঁই-সাঁই এই একটা শব্দই বেরিয়েছিল। কোনও কথা বার হয়নি। ভয়ে জড়সড় হয়ে কাঁপছিল পরান। মহিম যে এমনটাও করতে পারে এই ধারনা ছিল না পরানের। শুধু পরান কেন তপনা বা সত্যবানেরও ছিল না। ঘাড়ে কামড় দেওয়া আর চুল টেনে ধরার জন্য তপনা-সত্যবানও গাল ভর্তি চড় খেয়েছে। প্রতিবাদ করেনি ওরা। চুপচাপ হজম করে নিয়েছে।
তবুও রাগটা কমেনি মহিমের। আর কমেনি বলেই কিছুতেই ওর ঘুম আসছিল না। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গরমটা কমে এলেও একটা ভ্যাপসা ভাব কিন্তু আছেই। হয়তো তাই ঘরের বাইরে গিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে মহিমের মন্দ লাগছিল না। ‘আচ্চা ওই কুকুরগুইল্যা আইজক্যে রাইত্যে আবার কাবেরীর ঘরে যাই নাই ত?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে মহিম। প্রশ্নটার উত্তর হিসেবে মহিমের পা দুটো চলতে শুরু করে কাবেরীর ঘরের দিকে।
ঝিঁঝিঁ ডাকা আঁধারে ডুবে আছে কাবেরীর ঘরটা। কারুর কোনও সাড়াশব্দ নেই। কাবেরীর ঘরের সামনে শুয়ে থাকা কুকুরটাও একবার মুখ তুলে আবার চোখ নামিয়ে নিয়েছে। এই গরমে অযথা ঘেউ-ঘেউ করার ইচ্ছে হয়তো ওরও নেই। দরজার সামনে দাঁড়িয়েই কাবেরীর নাম ধরে ডাকে মহিম। খানিক বাদে আবার ডাকে... আবার...
কয়েক মিনিট পর দরজা খুলে কাবেরী দেখে মহিম দাঁড়িয়ে রয়েছে। মহিমকে ভেতরে ঢুকতে বলে দরজাটা বন্ধ করে দেয় কাবেরী। ঘরময় ছাগল আর ছাগলের পেচ্ছাবের উগ্রগন্ধ। উঠোনে বিছিয়ে রাখা খাটিয়াটাও ছাগলের গন্ধে মম করছে। খাটিয়ার নীচে ঢুকে হয়তো গাঁ-ঘষা দিয়েছে কাবেরীর ধাড়ি ছাগলটা। মহিম বসতে গিয়েও উঠে দাঁড়ালে কাবেরী বলে, ‘উখানে ক্যেন্যে ভিত্রে আয়।’
এতরাতে মহিম হঠাৎ কেন ওর ঘরে এসেছে সেকথা জিজ্ঞেস করে না কাবেরী। হালকা হলেও পরানের ঘরে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা কাবেরীর কানে এসেছে। সত্যবানের বউ কলতলায় কাকে যেন বলছিল। কাবেরীকে দেখে চুপ করে গিয়েছিল।
কাবেরীর বিছানায় বসে মহিম কাবেরীকে জিজ্ঞেস করে, ‘পাতি তামুক আচে ?’
‘আচে কিন্তু ভাজা নাই কাঁচা।’
‘কাঁচাতেই হব্যেক। টুকু আনত। চুনটা বেশি দিবি।’
পাশের অন্ধকার ঘরটা থেকে চুন-তামাক নিয়ে এসে কাবেরী জিজ্ঞেস করে, ‘পরাইন্যার সাতে তর গন্ডগোল ক্যেন্যে হৈল ?’
মহিম হাতের তালুতে তামাক রেখে সেটাকে চুন দিয়ে রগড়াতে রগড়াতে বলে, ‘এমনি। তা তুই শুনলি কুতায় ?’
‘শুনাবার লোকের অভাব নাই শুনার কান থাইকল্যেই হব্যেক। কলের পাড়ে সত্ত্যবানের বউ মেজকিকে বইলছিল।’
‘কী বইলছিল ?’ জিজ্ঞেস করে মহিম।
‘বইলছিল খুড়ার সাতে মহিমের আইজ হৈচে ওই মাগীটার লাইগ্যে। আমাকে দেইখ্যে চুপ মাইর‍্যেদিল। দেক মহিম উয়ার হাতে পাটির লকের ক্ষেমতা আচে। তুই খামকা খেদাইড়্যে টিকটিকি নিজের গায়ে তুলিস না।’ শান্ত গলাতেই কথাগুলো বলে কাবেরী।
‘তর লাইগ্যে কনুই ঝগড়া হয় নাই। হইচ্যে ভাদুর লাইগ্যে।’
‘ভাদুর লাইগ্যেই বা কেমন কইর‍্যে হৈল ?’
‘ওই শালা হারামি ভাদুক্যে লিয়ে যা খুশি বইলছিল। তপনা আর সত্ত্যবান না থাইকল্যে আইজ্যেই শালাকে ফুট্যাই দিতম।’
কাবেরী এতক্ষণ পর্যন্ত এটাই জানত যে মহিম পরানের সঙ্গে ঝগড়া করেছে ওর জন্য। কিন্তু যে মুহূর্তে শুনল যে ওর জন্য নয় ভাদুর জন্য সেই মুহূর্তেই যাবতীয় ভাললাগাটা কেমন যেন বিস্বাদ ঠেকল বুকের ভেতর। তবুও ভেতরের ভাবনাটাকে ভেতর ঘরে দমিয়ে রেখেই কাবেরী বলল, ‘বউকে লিয়ে বল্ল্যে সবারই গায়ে লাগে। যতই হক বউ এর টানটা ভিত্রের টান।’
কাবেরীর কথাটা ধরতে পারে মহিম। আর ধরতে পারে বলেই কাবেরীকে কাছে টেনে কোলের উপর বসিয়ে বলে, ‘আর ইটা কি শুদুই শরীদের টান ? ভিত্রের টান লয় ?’
‘উটা আমার চায়্যেও তুই নিজে ভাল জানবি।’
‘ইটা মনের টানলো সখী মনের। মনটা টানে বলেই ত থাইকত্যে লারি। তবে শরীদটাও বড টনটনায়।’ কথাটা বলতে বলতেই কাবেরীর ব্লাউজের ভেতর হাত ঢোকায় মহিম। আঙুল দিয়ে ঘষা দেয় কিচমিচ দানা দুটোয়। ডানাভাঙা পায়রার মতো ঝটপট করে উঠে কাবেরী। মহিম আরও জোরে ঝাপটে ধরে ওকে। পাশবিক শক্তিতে চটকায় ওর বুকদুটো। কাবেরীর ভেতরেও আগুন জ্বলে। আর সেই আগুনে ওর নিজের শাড়ি-সায়া-ব্লাউজ এমনকি মহিমের লুঙ্গি-গেঞ্জি সব পুড়ে ছাই হয় ধীরে ধীরে। তারপর দুটো শরীর বেয়ে বৃষ্টি নামে। ভোর হয়...

।২০।
নার্সিং হোমে ঢুকে শান্তনুকে যে রুমটায় রাখা হয়েছে সেটার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ায় অন্তু। অন্তুর দেখাদেখি রাজাও। শান্তনুর রুমটার বাইরে দাঁড়িয়ে একটা ছেলে ফিসফিস করে কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলছে। ছেলেটাকে চেনা-চেনা মনে হল অন্তুর। আরও কয়েক পা এগিয়ে যেতেই চিনতে পারল। অনির্বাণ। হ্যাঁ অনির্বাণেই তো, অন্তুর সঙ্গে এক কলেজেই পড়েছে। কিন্তু ও এখানে কী করছে বুঝতে পারল না অন্তু। তাই আরও কয়েক পা এগিয়ে গেল। এবার অনির্বাণও অন্তুকে দেখতে পেয়েছে। অন্তুকে দেখতে পেয়ে সাততাড়াতাড়ি এগিয়ে এলো অনির্বাণ।
‘তুই এখানে ?’ জিজ্ঞেস করল অন্তু।
‘আরে শানু তো আমার মামার ছেলে। জানতিস না ?’
‘না কই জানতাম না তো। তা শানু এখন কেমন আছে ?’ জিজ্ঞেস করল অন্তু।
অন্তুর প্রশ্নে অনির্বাণের মুখটা কালো মেঘে ঢাকা পড়ল এক নিমেষে।
‘কীরে কেমন আছে শানু ?’ এবার প্রশ্নটা এল রাজার মুখ থেকে। ওরা তিন জনই এক কলেজের ছাত্র। অনির্বাণের সঙ্গে খুবভাল বন্ধুত্ব না থাকলেও বন্ধুত্ব ছিল ঠিকই।
‘শানু আর নেই-রে ভাই। ঘণ্টা খানেক আগেই...’ কান্নাটাকে কোনও রকমে গিলে নিল অনির্বাণ। চোখদুটো ছলছল করে আসছে ওর। নাকটা সশব্দে কয়েকবার টেনে অনির্বাণ আবার বলল, ‘মামি যখন গেল তখনো ভালই ছিল। তারপর হঠাৎ যে কী হল! বলল বুকটা নাকি বাজছে, খুব বাজছে। শিল্পী সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে এলো। উনারা কী বুঝলেন কী জানি ইসিজি করেই আবার আই-সি-ইউ। তার একঘণ্টার ভেতরেই...’ আবার গলাটা ভারী হয়ে এলো অনির্বাণের।
বাইকে আসতে আসতে ঠিক এমন কিছুই একটা ভাবছিল অন্তু। কেন এমন মনে হচ্ছিল ও নিজেও জানে না। তবুও ওর বারবার মনে হচ্ছিল শানু আর নেই। অনির্বাণের মুখ থেকে তাই শান্তনুর চলে যাওয়াটা শুনেও খুব একটা অবাক হল না অন্তু। সেদিন কৌশিকের চলে যাওয়াটা অন্তুকে খুব কষ্ট দিয়েছিল, খুব। তারপর যখন কৌশিকের জীবনের ইতিহাস শুনল ও ? তখন কেমন যেন উদাসীন হয়ে পড়েছিল। একরকম ভাবে ভুলেই গিয়েছিল কৌশিকের যাওয়াটা। আজকে আবার শান্তনু...। যদিও শান্তনু কোনওদিনই অন্তুর বন্ধু ছিল না। তবুও ফুটবল মাঠের সেই চিরপরিচিত মুখটাকে আর দেখা যাবে না ভেবেই অন্তুর ভেতরটা মুচড়ে উঠল বারবার। এই মুচড়ে ওঠা পর্যন্তই মানুষের প্রতি মানুষের টান। বাকিটা স্বাভাবিক ঘটনা বলেই মনে হয় আজকাল। কত মানুষ আসছে যাচ্ছে কে তার হিসেব রাখে ? বুকটা মাঝে মাঝে মুচড়ে মুচড়ে ওঠে এটুকুই যা।
‘আমার মনে হয় পা বাদ চলে যাওয়াটাই মেনে নিতে পারল না শানু। শুনেছি দিনরাত শুধু ওই কথাটায় বলত। এই জন্যেই হয়তো হার্টফেল করেছে। আসলে যারা মন প্রান দিয়ে খেলাটাকে ভালবাসে তাদের পা চলে যাওয়াটাই মৃত্যু। ও জাতীয় দলের প্লেয়ার হয়তো ছিল না কিন্তু খেলত তো ভেতর থেকেই। ওই খেলাটাই তো একমাত্র স্বপ্নছিল ওর...’ নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছে অনির্বাণ। হয়তো শান্তনুর এই অসময়ে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছে না বলেই নিজের ভেতর জোড়াতালি দিয়ে ওর যাওয়াটার কারণ খুঁজছে।
অনির্বাণের একটা কথাও কানে ঢুকছিল না অন্তুর। ও শুধু ভাবছে কীভাবে সামলাবে শিল্পীকে। শিল্পীর কাছে ওর দাদার চলে যাওয়াটা তো কোনও সাধারণ ঘটনা হতে পারে না। বাবার মৃত্যুর পর শান্তনুই তো ছিল ওর আদরের অভিভাবক। আর শিল্পীর মা ? ভাবতে পারে না অন্তু। ভাবতে গিয়ে ভয় হয় ওর। স্বামীর মৃত্যুকে মাথায় নিয়ে ছেলে মেয়ে দুটোকে মানুষ করার পরেও যদি অসময়ে...
‘তুই একবার ভেতরে যা অন্তু। শিল্পী একা আছে।’ অন্তুর কাঁধে হাত রেখে কথাটা বলে রাজা। অন্তুর ভেতরের ভাবনাগুলো ও হয়তো বুঝতে পারছে।
অন্তু ভেতরে গেলে রাজা অনির্বাণকে জিজ্ঞেস করে, ‘হ্যাঁরে কাকিমাকে জানিয়েছিস ?’
‘মাথা খারাপ হয়েছে তোর, হঠাৎ এমন খবর দিলে উনারও কিছু হয়ে যেতে পারে।’
‘কিন্তু শানুর বডিটা তো বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে। তখন তো উনি...’ রাজার জিবও আড়ষ্ট হয়ে আসছে। জল জমা হচ্ছে চোখের পাতায়। খুব ইচ্ছে করছে শানুর মুখটা একবার দেখার কিন্তু সেই সাহস ওর নেই। শান্তনু ওর গ্রামের ছেলে। পাড়ার ছেলে। এক সঙ্গেই বড় হয়েছে ওরা...
‘সে দেখা যাবে। কিন্তু এখন জানলে বিপদের সম্ভাবনা অনেক বেশি।’
‘আমার কিন্তু বেশ চাপ লাগছে অনি। কাকিমা নিজেকে আদৌ সামলাতে পারবেন তো ? অমল কাকু মারা যাওয়ার পর থেকে ওই শানুই তো কাকিমার বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয় ছিল বল। শিল্পী তো একদিন বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে কিন্তু কাকিমা থাকবে কী নিয়ে সেটাই তো বুঝতে পারছি না।’
‘তুই তো তাও অতদূর ভাবছিস আমি সেটাও তো ভাবতে পারছি না। এই খবরটা শোনার পর মামিরই না...।’ কথাটা ইচ্ছে করেই শেষ করল না অনির্বাণ। কিছু কথা শেষ না করেই মানুষ বেশি শান্তি পায়। নিজের কাছে নিজের মন ভোলানো সান্ত্বনা থাকে একটা।

সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা রয়েছে শান্তনুর মুখটা। শিল্পী শান্তনুর বেডের নীচে বসে বেডের একটা পায়ায় মাথা হেলান দিয়ে আছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে ঘুমিয়ে পড়েছে। কোনও নড়নচড়ন নেই শরীরে। মাঝেমাঝে মাথাটা দুলছে। নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে বলেই হয়তো দুলছে মাথাটা। শিল্পীর ঠিক পিছনে গিয়ে দাঁড়ায় অন্তু, কিন্তু কী দিয়ে শুরু করবে সেটা বুঝে উঠতে পারে না। মুখে কোনও শব্দের যোগান আসছে না যে। শেষ পর্যন্ত শিল্পীর মাথায় হাত রাখে অন্তু। ঠোঁটে ঠোঁট চাপা দিয়ে কান্নাটাকে গিলে ফেললেও চোখের জল আটকে রাখতে পারে না শিল্পী। অন্তুকে দেখার পর যেন কান্নার একটা আশ্রয় খুঁজে পায়। উঠে দাঁড়ায় শিল্পী।
‘দাদা আর নেই...’ বলেই অন্তুর বুকে মাথা রেখে হো-হো করে কাঁদে ফেলে। 
শিল্পীকে বলার মতো কোনও সান্ত্বনা বাক্য খুঁজে পায় না অন্তু। যদিও কোনও মৃত্যুরই কোনও সান্ত্বনা থাকে না। তবুও তো কিছু একটা বলতে হয়। কাঁদিস না, কী আর করবি জন্মমৃত্যুতে তো কারুর হাত নেই... এমন কিছু একটা। কিন্তু বলতে পারে না অন্তু। কোনও মূল্য নেই এমন সব কথার। 
‘জানো সকালে নিজের হাতে ছানারুটি খেয়েছিল দাদা...’ কথাটা বলতে গিয়ে শিল্পীর চোখ বেয়ে আরও কয়েক ফোঁটা জল অন্তুর বুকে গড়িয়ে পড়ে। তবুও অন্তু অসাড়ের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। এতোটা নিস্পন্দ থাকার কথাও তো ছিল না অন্তুর! তবে কী ধীরে ধীরে আত্মগত হয়ে পড়ছে ও ? কমছে অন্যের প্রতি ফিলিংসগুলো ? নাকি বারবার তিতলির ফোন আর মেসেজ অন্তুকে অতীতে টানছে ?
‘মাকে কী বলব আমি ? হ্যাঁ মাকে বলবটা কী ? মা তো দাদার পা বাদ চলে যাওয়াটাই মানতে পারছিল না। এবার ? এবার কী বলব আমি। তুমি দেখো মাও এবার... হ্যাঁ মা সহ্য করতে পারবে না। একা হয়ে যাব আমি, সম্পূর্ণ একা। যে যার তালে আছে, সুযোগ পেলেই পালিয়ে যাচ্ছে। বাবা-দাদা কারুরই কিন্তু যাওয়ার কথা ছিল না। দাদা বলেছিল, তোর বিয়েতে কোটপ্যান্ট করাব আমি। পুরো ব্ল্যাক। দাদা চলে গেল। আমার কষ্ট হচ্ছে, খুব কষ্ট হচ্ছে... আচ্ছা কেন এমন হল ? দাদা কার ক্ষতি করেছিল ?’ শিল্পীর কাঁধ দুটোকে ঝাঁকিয়ে অন্তু ওকে শান্ত হতে বলে। মুহূর্তের ভেতর চুপ করে যায় শিল্পী। এই মৃত্যু এই কান্না কোনটাই কেন যেন ভাল লাগছে না অন্তুর। 
রাজা ভেতরে ঢোকে। শিল্পীকে জিজ্ঞেস করে, ‘শানুর দেহটা নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কী বলছে নার্সিং হোম ? পোষ্ট মর্টেম হবে-টবে এসব কিছু বলেছে ?’ কথাটা বলার পর শান্তনুর ঢেকে রাখা মুখটার দিকে একবার তাকায় রাজা। সঙ্গে সঙ্গে দমকা কান্নার একটা স্রোত উগরে বেরিয়ে আসতে চায়। কোনও রকমে নিজেকে সামলে নেয় রাজা।
‘না ওসব কিছুই বলেনি। আমি জিজ্ঞেসও করিনি। শুধু বলেছে টাকাটা জমা করলেই...। মা আজকে টাকার জোগাড় করতেই বাড়ি গেছে।’
‘কেমন কি লাগবে কিছু বলেছে ?’ এতক্ষণে পরিষ্কার ভাবে মুখ খোলে অন্তু।
‘বিরাশি হাজার।’
‘বিরাশি হাজার ?’ শব্দ দুটো নিজের অজান্তেই অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে আসে অন্তুর গলা দিয়ে।
‘ত্রিশ হাজার আগেই লেগেছে।’
‘কিন্তু এতোটা টাকা কাকিমা পাবে কোথায় ?’ জিজ্ঞেস করে রাজা।
‘মা বিরাশি জানে না মা জানে হাজার ষাট লাগবে। শেষবার আই-সি-ইউ নিয়ে যাওয়ার জন্য যে খরচাটা হয়েছে সেটা তো মা জানে না...’ কোনক্রমে চাপা দেওয়া কান্নাগুলো আবার বেরিয়ে আসতে চাইছে।
‘কিন্তু ষাট হাজার টাকাই বা পাবে কোথায় ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।
‘আমি সেটা জানি না। তবে শুনেছি আমার বিয়ের জন্য জমানো কিছু টাকা আর কিছু গয়না আছে।’
‘দেখ আমার মনে হয় এবার কাকিমাকে খবরটা দেওয়া দরকার...’ রাজা বলে।
‘না না মাকে বোলো না মা শুনলে...’
‘কিন্তু না শুনলে তো শানুর শরীরটা এখানে এভাবেই পড়ে থাকবে। আমাদের কারুর তো অতটা টাকা নেই, যে জমা দিয়ে শানুর বডিটা নিয়ে যাব...’

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুটাকেও মানিয়ে নিচ্চে মনগুলো। ওরা সামলে উঠছে ভেতরে ভেতরে। এখন ভেঙে পড়ার সময় নয়। এখন টাকা জমা করে শান্তনুর লাশটা নিয়ে যাওয়ার সময়। লাশ ? হ্যাঁ লাশই তো। মানুষ মরলেই তো লাশ হয়ে যায়। তখন তাকে মড়া বলেই ডাকা হয়। লোকে কোনও নামকে পোড়াতে শ্মশানে যায় না, যায় মড়া পোড়াতে। যায় একটা লাশের দাহ করতে। এটাই নিয়ম এটাই নিয়তি।         

।২১।

‘খুশি দিনের অলস কোনে
অতীত যেদিন পড়বে মনে
সেদিন যদি আমার কথা
নাইবা মনে রয়
স্মৃতিটুকু দেবে আমার
ছোট্ট পরিচয়।’
-মোবাইলের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে মেসেজটা। শান্তনুকে দাহ করে আসার পর অন্তুর যখন ঘুম এলো তখন ভোর হব-হব। সারা দিনরাতের ক্লান্তিতে শুতে না শুতেই চোখের পাতা ঘুমে জড়িয়ে এসেছিল। বেলা দশটা নাগাদ যখন ঘুম ভাঙল তখন জানালা দিয়ে রোদ ঢুকছে। অন্তুর মুখে রোদ পড়ছিল বলেই ঘুমটা ভেঙেছে ওর। সময় দেখার জন্য মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখে একটা মেসেজ এসেছে। তিতলির মেসেজ। সকাল সকাল মেজাজটা বিগড়ে গেল অন্তুর। অন্তত এই সময়টুকু শিল্পীকে ছাড়া অন্যকিছু ও নিজেও ভাবতে চায় না। শানুর চলে যাওয়াটা মা-মেয়ে কেউই মেনে নিতে পারছে না। আর মেনে নেবেই বা কেমন করে ?                     
গতকাল বিকেলে শিল্পীদের বাড়িতে গিয়ে রাজাই শিল্পীর মাকে সব বলেছিল। বলেছিল নয় বলতে বাধ্য হয়েছিল। এত বড় একটা খবর শোনার পরেও একফোঁটা চোখের জল ফেলেনি শিবানী। শান্তনুকে আনার পরেও কাছে যায়নি ওর। পাথর হয়েছে মায়ের বুক। এই ভয়টাই তো পাচ্ছিল সবাই। অন্তু পাশে গিয়ে বসেছিল অনেকক্ষণ, কিন্তু একটাও কথা বলেতে পারেনি। শুধু ঘামছিল দরদর করে। শ্মশান থেকে মাঝ রাতে অন্তু শিল্পীকে ফোন করে জানতে পেরেছিল, এখন ঘুমোচ্ছে তবে একবারও কথা বলেনি কারুর সঙ্গে।

আর বিছানায় ভাল লাগছে না। ঘাম দিচ্ছে খুব। বিছানা থেকে উঠে খালি গায়েই বাইরে বেরিয়ে আসে অন্তু। মা ঘরে নেই। খাবার ঢাকা দেওয়া আছে। ঘুম জড়ানো চোখেই বাড়ির পিছন দিকের দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ায় অন্তু। সূর্যের আলোয় চোখ জ্বালা করছে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে রিং করে তিতলির নতুর নম্বরে। রিং হচ্ছে ওপারে।
‘এই ফোনটা ধরে চুপচাপ থাকবে না একদম। কী বলতে চাও সেটা বলো।’ অন্তুর গলায় ঘুম জড়িয়ে রইলেও গলাটা বেশ ঝাঁঝাল শোনাচ্ছে। বিরক্তিটাও পরিষ্কার।
‘কেমন আছো ?’ খুব মৃদু শব্দে ওপার থেকে ভেসে এলো প্রশ্নটা। অন্তু খেয়াল করে তিতলির গলায় কোনও পরিবর্তন আসেনি। সেই মিষ্টতাও কমেনি একবিন্দু। অন্তুর চোখের পাতায় ভেসে উঠল সেই হাসি হাসি মুখটা।
‘ভাল আছি। তুমি কেমন আছো ?’ এবার অন্তুর গলাও বেশ নরম। সেই হারানো সুর এখন অন্তুর গলাতেও। 
‘ওই চলছে।’ এবার তিতিলির গলায় বিরক্তি। ঠিক বিরক্তি নয় ক্লান্তি কিংবা অন্যকিছু। ‘তুমি কি এই ঘুম থেকে উঠলে ?’ জিজ্ঞেস করে তিতলি।
‘হ্যাঁ এই উঠলাম।’
‘এত অবেলায় ?’
‘আসলে গতকাল রাতে এক বন্ধুকে দাহ করতে শ্মশানে গিয়েছিলাম, তাই...’
‘কোন বন্ধু ? কী হয়েছিল ?’
‘পাশের গ্রামের। ট্রাক এক্সিডেন্ট।’
খুব মৃদু শব্দে মুখ দিয়ে চুক-চুক করে তিতলি। ‘মন খারাপ কোরো না। কী আর করবে করারও তো কিছু নেই।’
‘ওই মন খারাপটাই তো করার আছে তাই ওটাই করছি। ছাড়ো বাদ দাও বাকি সব খবর কেমন ?’
‘বাকি সব বলতে ?’
‘ওই তোমার মা কেমন আছে ? কী করছ এখন ?’
‘মা ? মা বিন্দাস আছে। আর আ...মি, আমি এখন শুকনো সংসার করছি ?’
‘সংসার করছ ? বাঃ। তা বিয়ে করলে কখন ?’ অকারণে এবার অন্তুর গলাটা ভারী হয়ে আসে। না ঠিক অকারন নয় গলাটা ভারী হওয়ার কারণ তো একটা আছেই।
‘বিয়ে ?’ হাসতে থাকে তিতলি। ‘একটা পুরুষের হাত থেকে অনিচ্ছায় সিঁদুর পরাটাকে কি বিয়ে বলে ? বলে না তাই না ? তাই সেই পুরুষের সঙ্গে এক বিছানায় শুয়ে থাকাটাকেও সংসার করা বলে না নিশ্চয় ?’
অন্তু কিছু না বলে চুপ করে থাকে। কারন ও এটা ভাল মতোই জানে স্বামী সংসার নিয়ে সুখে থাকা কোনও মেয়েই তার আগের প্রেমিককে ফোন করবে না। ফোন তারাই করে যারা আগের প্রেমিকের কথা নীরবে ভাবতে থাকে। আর ভাবনা তাদেরেই আসে যারা স্বামীকে ভালবাসতে পারে না কিংবা স্বামীর ভালবাসা পায় না। তবে কারু-কারু ক্ষেত্রে আগের প্রেমিককে না ভোলার একটা প্রবণতাও দেখা যায়। তিতলি কোন পর্যায়ের সেটাই ভাবতে থাকে অন্তু।           
‘কী ভাবছ ?’ জিজ্ঞেস করে তিতলি।
‘কী ভাবা উচিৎ আর কী ভাবা উচিৎ নয় সেটাই ভাবছি।’
‘তুমি সেই আগের মতোই আছো কোনও পরিবর্তন হয়নি। এখনো আগের মতোই হেঁয়ালি করে করে কথা বলো।’
‘আগে কেমন ছিলাম সেটাই তো ভুলে গেছি। তাহলে বলি কেমন করে আগের মতো আছি না পাল্টে গেছি? তা তোমার বিয়েটা হয়েছে কোথায় সেটা তো বললে না...’
‘টাউনেই হয়েছে।’
‘পুরুলিয়াতেই ?’
‘হ্যাঁ।’
‘কী করে ছেলে ?’
‘আরও দুএকটা মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে। রাত কাটায়। আর রাত কাটায় মানে অবশ্যই ওটাও করে। তাই না ? মদ খায়। এমন আরও অনেক কিছুই করে। তবে এগুলোর টাকা জোগাড়ের জন্য পুলিশে চাকরিও করে। টুকটাক রাজনীতিও করে। এবার তুমি বলো কী করে না ?’
‘সত্যিই মহাপুরুষ তো দেখছি। আর উনি এই সব করে বলেই তুমি অতীতে অতীতে ঘুরে বেড়াও ?’
‘ঘুরে বেড়াব কেন ? আমি তো অতীতেই আছি। বেশ ভাল আছি। যতদিন বাঁচব ওখানেই বাঁচব। বর্তমান ভবিষ্যৎ আমাকে টানে না।’
‘তাহলে আমাকে কল বা এস-এম-এস করো কেন ? আমি তো বর্তমানে বাঁচি।’
‘বর্তমানে বাঁচ বলেই তো অতীতে ডাকি। আমার একলা অতীত ভাল লাগে না। কেমন যেন ফাঁকা-ফাঁকা, সব খালি মনে হয়...’
‘হুম বুঝলাম।’
‘কী বুঝলে ?’
‘পরে বলব। এখন একটু কাজ আছে। এখন রাখি।’
‘আচ্ছা কখন কল করব বলো ?’
‘করার দরকার নেই আমিই করে নেবো। বাই।’ ফোনটা রাখার পর দূরের মাঠ গুলোর দিকে তাকায় অন্তু। ফসলের স্মৃতি বুকে নিয়ে মাঠগুলো পড়ে আছে। ওরা তিতলির মতো শুধু অতীতের গল্প জানে। ওরাও শূন্য। এই তো কদিন আগে শিল্পী কার যেন একটা কবিতা সেয়ার করেছিল। কবিতাটা খুব ভাললেগেছিল অন্তুর। জীবনকে ছুঁয়ে যাওয়া কবিতা। ভাল লেগেছিল বলেই সেদিন সেভ করেছিল কবিতাটাকে। আজকে অন্তুর মনে হচ্ছে কবিতাটা কোথাও না কোথাও যেন ওর জন্যেই লেখা।
ঘরে ঢুকে বিছানা থেকে স্মার্টফোনটা হাতে নিয়ে কবিতাটা খোঁজে অন্তু। ইমেজে সেভ করা আছে। একটা অন্ধকার ঘরের কালো দেওয়ালে সাদা কালিতে লেখা। কবির নাম নেই। হয়তো শিল্পী যার আইডি থেকে সেয়ার করেছিল তারই কবিতা হবে।

একলা আকাশ
আমার জানালায় একমুঠো 
জীবন্ত একলা আকাশ
ফাঁকা মাঠে চেয়ে দেখি
সাইকেলে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যায় স্মৃতির পাখি 
দূর থেকে সুদূরের অতীত দিগন্তে
মাটির ফাটা-বুক থেকে রোদ 
রোজ যখন সর্পিল ধোঁয়ার মতো রস চুরি করে
আমার একলা ঘরে পরিযায়ী প্রেমিকাদের আত্মা 
ছায়ার শরীরে ভিড় করে দেওয়ালের গায়ে
আমার মনেও রস ছিল বুঝি ?
কোনও এক আম বকুল গন্ধ ভেজা দুপুরে ? 
তারপর ডাহুক ডাহুকী মিলে
পালকের মতো নরম সন্ধার চাদর মেলে দেয় 
গাছের পাতায় পাতায়।
আমি দেখি কারা যেন খিল-খিল করে হেঁটে চলে যায় 
আমার চোখে ধারালো নখে জলের আঁচড় কেটে 
ফেলে আসা মেঠো মনের রাস্তায়।
-কবিতাটা পড়ার পর মনে মনে হাসে অন্তু। বড্ড ম্লান সে হাসি। একটা সময়ছিল যখন সকাল-সন্ধা তিতলির স্মৃতি ভিড় করে আসত মনের পাতায়। চোখের পাতা ছাপিয়ে জল গড়িয়ে পড়ত। কী ভীষণ একা লাগত সেদিন নিজেকে। মনে হত এই দুঃখ এই যন্ত্রণা কোনওদিন কমবে না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতি ম্লান হয়ে এসেছে। চোখের পাতাও শিখে গেছে জল লুকিয়ে ফেলতে। এর পরেই তো নদীর রূপে শিল্পী এসে ধরা দিয়েছে। আরেক নতুন জীবন। নতুন স্বপ্ন। তিতলি তো অতীতের কাছেও অতীত বলে মনে হত এতকাল। কিন্তু আজ এতদিন পর তিতলির সঙ্গে কথা বলে অন্তুর শুধুই মনে হচ্ছে ধুলো ধরা গিটারটায় কে যেন টোকা দিয়ে যাচ্ছে। কান বন্ধ করলেও শোনা যাবে সেই সুর। 


এদিকটায় খুব একটা আসা হয় না শিল্পীর। এদিকেই শ্মশানটা। দিনের বেলাতেও কেমন যেন গাঁ ছমছম করে। এদিকের নদীর পাড় জুড়ে ভাবরি আর শেয়াকুল কাঁটায় ভর্তি। নদীর দুপারের দুটো গ্রামের মানুষই এখানে দাহ করতে আসে । সারা বছর কমবেশি জল পাওয়া যায় এখানটাতেই। শিল্পী একটা পলাশ ঝোপের আড়ালে চুপচাপ বসে। নদীর কোনও পার থেকেই ওকে আর দেখা যাবে না। কিন্তু শিল্পী দেখতে পায়, নদীর একটা জায়গায় পড়া কয়লা ছড়িয়ে রয়েছে। তার পাশেই কাঁথা বিছানা বালিশের স্তূপ। কত রকমের ফুলের তড়া, ফুলের মালা। শান্তনুকে পোড়ান হয়েছে ওখানেই। আর ওই ফুলগুলো দিয়ে গেছে নবারুণ ক্লাবের ছেলেরা। ওদের হয়েই তো খেলত শান্তনু। গত দু’বার যুবউৎসব ফুটবল প্রতিযোগিতায় ম্যান-অফ-দ্যা-সিরিজ ছিল শান্তনু। শান্তনুর চিতাটার থেকে কিছুটা দূরে আরও একটা চিতা। পড়া কয়লার জমা করা স্তূপ ওখানেও। ওটা কৌশিকের। এক মাসের ভেতর এক গ্রামের দু’দুটো লাশ পেয়েছে নদীটা। 
শান্তনুর চিতাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই চুড়িদারের হাতা দিয়ে চোখের জল মোছে শিল্পী। শান্তনুর চলে যাওয়াটা কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না ওর। ‘ঝিলপি ওই ঝিলপি তোর কোনও সুন্দরী বান্ধবী থাকলে…’ এই কথাটা মাঝে মাঝেই বলত শান্তনু। বিরক্ত হত শিল্পী। খুব বিরক্ত হত। আর এই কথাটা বলবে না শান্তনু, কোনওদিন বলবে না। শান্তনুর এক একটা কথা যত মনে পড়ছে কান্নাটা ততই গাঢ় হচ্ছে শিল্পীর। ভাইবোন মিলে দাবা খেলা থেকে শুরু করে কিৎকিৎ ক্রিকেট সব ভিড় করে আসছে আজ চোখের পাতায়। ওড়নাটাকে মুখে চাপা দিয়ে নদীর এপারে বসে কাঁদতে থাকে শিল্পী। ওপারে বাঁশ বাঁধাবাঁধি চলছে। ষ্টেজ বানানো হচ্ছে। ঠিক যেন নতুন জীবনের আয়োজন।


Previous
Next Post »

Bigrock domain latest offer