Friday, 5 July 2019

All time best Bengali story, Chupkatha

Modern Bengali story or Adhunik Bangla golpo

If you want to read a good quality of modern bengali story then must read this Story Chupkatha. It's my request for you; not suggest.

Best Bengali story

চুপকথা
বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়


বেকার নামের একটা লেজ আছে আমার। আর সেই লেজটা নিয়ে অল্প হলেও গর্ব আছে। কারণ আমি শিক্ষিত বেকার। আর শিক্ষিত বলেই আমার লেজের চুলগুলো একটু বেশিই নরম। তাই আমার বেশকিছু লেজারু বন্ধু পেটের টানে মাঠের কাজে গেলেও আমি তা পারিনি। আমার শিক্ষিত লেজটা শুকিয়ে যাচ্ছে দেখে পাড়ার লাল্টুদা একবার বলেছিল, ‘দিনকাল সুবিধের নয়রে ভাই এবার যেমন করেই হোক পছন্দ মতো ফুল ধরে ঝুলে পড়।’ আমি বলেছিলাম, ‘ধুর ওসব রাজনীতি-টাজনীতি আমার পোষাবে না।’ তবে আনন্দের খবর, এই বসন্তে দেখছি আমার লেজে নতুন চুল গজাচ্ছে।

এখন আমি একটা পোল্ট্রি ফার্ম খুলেছি। মায়ের গয়না বিক্রি করে পাঁচ কাঠা জমির উপর ফার্মটা বানিয়েছি। কোম্পানি থেকেই পোল্ট্রির বাচ্চা, খাবার, ওষুধ সব দিয়ে গেছে। আমাকে শুধু দেখভাল করতে হয়। এই যেমন, সময়ে শোধন করে জল দেওয়া। পরিমাণ মতো খাবার দেওয়া। সন্ধায় লাইট জ্বালিয়ে দেওয়া। কাছাকাছি শেয়াল কুকুর এলে তাড়িয়ে দেওয়া। আরামেই আছি। প্রথম প্রথম মুর্গীর গন্ধে ঘুম আসত না। এখন দিব্বি আসে। দড়ির খাটে শরীর এলিয়ে মোবাইলে গান শুনতে থাকি, ‘তোমার খাইট্টা সরাও হে বিয়াই টিপিক টিপিক জল পড়িছে...’ নিজের কাজের সাথে এইসব গানগুলোর কোথায় যেন একটা অদ্ভুত মিল খুঁজে পাই।

Best Bengali Story for modern readers


আজকে কেন জানি না সন্ধা থেকেই মনটা ভার-ভার লাগছিল। তাই হালকা হিমের হাওয়ায় কখন যে চোখের পাতা লেগেছিল বুঝতে পারিনি। হঠাৎ খেয়াল করলাম ফার্মের বাইরে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। সাদা ধুতি পাঞ্জাবীর ভেতরকার মানুষটি যে বেশ লম্বা সেটা কিন্তু ভ্যাপসা অন্ধকারেও বুঝতে পারলাম। 

দেখলাম ভদ্রলোক হাতের ইশারায় আমাকে বাইরে ডাকছেন। আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। চারদিকটা থোকা-থোকা অন্ধকারে ভরে আছে। অনেক চেষ্টা করেও ভদ্রলোকের মুখটা দেখা গেল না। উনি আমার মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করে বললেন, ‘আর যাই করো লেখা-লেখিটা ছেড়ে দিও না। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।’ কথাগুলো বলেই ভদ্রলোক অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি পিছন থেকে ডাকার চেষ্টা করলাম কিন্তু মুখ থেকে টু-শব্দও বার হল না। এমন সময় কাছেপিঠে কোথাও শেয়াল ডেকে উঠতেই আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। খেয়াল করলাম আমার সারা শরীর ঘামে ভিজে আছে। শিমূল তুলোর মতো বাচ্চাগুলো তখনো সমানে খাবার খেয়ে যাচ্ছে। ওদের চোখে ঘুম নেই। ওরা স্বপ্নও দেখে না। ওদের লেজটাও নাম মাত্র। আমি সাবধানে পা ফেলে ফার্মটা একবার ঘুরে দেখলাম। কোথাও সন্দেহ জনক কিছুই নেই। মোবাইলে গান চালিয়ে আবার শুয়ে পড়লাম।

যদি ভ্রমণ ভালবাসেন তাহলে পড়ুন Travel Bengali story, Mukutmanipur

কিন্তু শুয়ে পড়লেও এবার আর ঘুম এলো না। মাথার ভেতর ইউনিভার্সিটির দিনগুলো কিলবিল করতে লাগলো। তখন কিন্তু আর পাঁচজনের মতোই আমারও লেজ ছিল না। সেই সময় রবি ঠাকুরের গানে ঘুম আসত। কানে ভাসত স্যারদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা মৃতসঞ্জীবনী মন্ত্রগুলো। এখন লেজের ভরে আর ভারে উনাদের  মন্ত্রগুলো মুর্গীর খাবার হয়ে গেছে। এখন আমি বানর পুচ্ছ ধারি তুচ্ছ নর মাত্র। যার সব স্বপ্নগুলো মুর্গীতেই সীমাবদ্ধ। কথায় বলে না, গরীবের মুর্গীটাই ভগবান। 

।।২।।

আজকে রাত্রিতে কোম্পানির ট্রাক আসার কথা আছে। আমার ফার্মে অন্যান্যদের তুলনায় মৃতের সংখ্যাও অনেক কম। ওজনটাও ভালই হয়েছে। খাবারের পরিমাণ ঠিকঠাক হলে হাজার কুড়ি নিশ্চিত। 
রাত্রি একটা নাগাদ কোম্পানির লোক ওজন করে সব মাল তুলে নিয়ে গেল। বাড়িতে খাবার জন্য আমি কয়েকটা আগাম সরিয়ে রেখেছিলাম। ওগুলো মৃতের তালিকায় গেছে।
বেশ কয়েকটা ‘লট’ ভাল সাইজের মুর্গী দিয়েছি বলেই আমার ফার্মে মুর্গীর সংখ্যা বাড়িয়ে দিল কোম্পানি। প্রথম চারটা লটে আমাকে মুর্গীর বাচ্চা দিয়েছিল দুহাজার করে। পাঁচ নম্বর লটে আরও চারশো বাড়ল। দিন দিন আমার লেজটা যে ছোটো হয়ে আসছে সেটা এখন ভাল মতোই বুঝতে পারছি। এমন ভাবে চলতে থাকলে একটা সময় বেকার নামের লেজটা আর থাকবে না।

আজকে অনেকদিন পর আবার গল্প লিখতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করছে আবার সুনীল সাগরে ডুবে যেতে। কিন্তু এমনটা তো হবার কথা নয়। তবে কি গল্প কবিতার পোকাগুলো এখনো মাথার ভেতরেই রয়ে গেছে ? হবে হয়তো। একটা সময় নিয়ম করে গল্প-কবিতা লিখতাম। পাঠাতাম। ছাপাও হত কোনও কোনও পত্রিকায়। তারপর কবে যেন সব এলোমেলো হয়ে গেছে।  

আজকে কাগজ কলম নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলাম কিন্তু কিছুই লিখতে পারলাম না। একটা সময় ছিল যখন শব্দের জন্য অন্ধকার হাতড়ে বেড়াতে হত না। একটার পর একটা শব্দ নেমে আসত সাদা পাতায়। একে একে দাঁড়িয়ে পড়ত চরিত্রগুলো। আজকে কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও দুটো লাইন লিখতে পারলাম না।

এখন মাঝরাতের অন্ধকারে ডুবে আছে গ্রামটা। হলদেটে আলোয় পালক ডুবিয়ে দানা খেয়ে যাচ্ছে মুর্গীগুলো। কোনও কোনওটা আবার জলের পাত্রে মুখ ডুবিয়ে আছে। ফার্মটার বাইরে কারা যেন ঠাণ্ডা কুয়াশার মশারি ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে। আমি সাদা পাতায় কলম ডুবিয়ে গল্পটাকে ধরার চেষ্টা করছি...

অনেক রাতে যখন গল্পটা ধীরে-ধীরে নেমে আসছে সাদা পাতার উপর, তখন হঠাৎ খেয়াল করলাম একটা মুর্গী কেমন করে যেন দু’ফুটের নেটের বেড়া ডিঙিয়ে আমার খাটের নিচে এসে বসেছে। আমি পায়ে করে ওকে তাড়িয়ে দেবার চেষ্টা করলেও ও কিন্তু যাবার কোনও লক্ষণ দেখাল না। আমার পায়ের ঠেলা পেয়ে সামান্য নড়ে বসল শুধু। আমি বেশ কিছুক্ষণ ধরে ওকে দেখছিলাম। খাটের তলাতেও প্রচুর খাবারের দানা পড়ে আছে। ও তবুও খাচ্ছে না। চুপটি করে বসে আছে। শেষ পর্যন্ত খাটের থেকে নেমে ওকে বেড়ার ওপারে রেখে এলাম। আবার বসলাম গল্পটা নিয়ে। সবে কয়েকটা লাইন লিখেছি, এমন সময় আবার খেয়াল করলাম মুর্গীটা আমার খাটের নিচেই বসে আছে। ও যে আবার কখন এসেছে এবারেও খেয়াল করতে পারিনি। লেখাটা থামিয়ে ওকে আবার রেখে এলাম। এবার ওকে রেখে এসেও গল্পটায় আর মন দিতে পারলাম না। বারবার চোখদুটো ওর দিকেই চলে যাচ্ছিল।

।।৩।।

এই কয়েকটা দিনে মুর্গীটার সঙ্গে একটা অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে আমার। এখন ফার্মে ঢোকার পর আমার চোখ দুটো প্রথমে ওকে খোঁজে। এমনকি আমার অপ্রকাশিত গল্প-কবিতাগুলোর একমাত্র শ্রোতা এখন ওই। আমি মনে মনে ওর একটা নাম দিয়েছি, চুপকথা। কারণ ও তো আর কথা বলতে পারে না। শুধু চুপটি করে শোনে।

তবে চুপকথা চুপ থেকেই যে সব কথা বলে আমি সেগুলো অনুভব করতে পারি। ওর সাদা নরম পালকের ভেতর আঙুল ডুবিয়ে মাঝে-মাঝে আমার সন্ন্যাসী শরীরেও কেমন যেন অপরিচিত শিহরণ খেলে যায়। মাঝে-মাঝে ওকে ফার্মের বাইরেও বার করি। ও ঘোরাফেরা না করলেও দুচোখ মেলে বাইরেটা দেখতে থাকে। অন্য মুর্গীগুলোর সঙ্গে চুপকথার একটা পার্থক্য আছে। ওর লেজটা একটু বেশিই বড়।

এখন ফার্মের ভেতরে সময় কাটাতে আমার বেশ ভালই লাগে। চুপকথার সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথাটা ভাবলে নিজেরই হাসি পায়। তবুও ওকে কোলে নিয়ে ওর পালকের ভেতরকার তুলতুলে গরম শরীরে আঙুল বোলাতে-বোলাতে কোনও কোনওদিন হারিয়ে যাই ইউনিভার্সিটির দিনগুলোতে। দুম করেই একদিন প্রথম প্রেম এসেছিল আমার জীবনে। আর পাঁচ জনের মতোই আঙুলের ভেতর আঙুল ডুবিয়ে কলুর বলদের মতো আমিও ঘুরেছিলাম তরল অন্ধকার গলি পথে। কত স্বপ্নের মুক্তা কুড়িয়ে এনেছিলাম দুটো ঝিনুক চোখের ভেতর থেকে। সেই দিনগুলোতে আমার একবারও মনে পড়েনি আমাদের হাভাতে ঘরের মাটির উনুনটাকে কিংবা ভেজা কাঠের থেকে বেরিয়ে আসা ধোঁয়ার গন্ধটাকে। 

বেশ পয়সাওলা বাড়ির মেয়ে ছিল কুহু। ও জানত ওর বাড়িতে আমাদের সম্পর্ক মেনে নেবে না। আমিও জানতাম আমাদেরকে পালিয়ে বিয়ে করতে হবে। তখন তো আর বেকার নামের কোনও লেজ ছিল না। জীবনটার মতোই স্বপ্নগুলোও ছিল লাগাম ছাড়া। মাস্টার ডিগ্রি কমপ্লিট হবার আগেই কুহু পালিয়ে গেল। ওদের এলাকার এক ডাক্তারের সঙ্গে। সেদিন আমার খুব কষ্ট হয়েছিল ঠিকই কিন্তু দুঃখ হয়নি। পরে জেনেছিলাম ওদের প্রেম কাহিনি। এরপর আর কোনও মেয়ের সাথেই ঘনিষ্ঠ হবার ইচ্ছে হয়নি আমার। তবে মনের ভেতর আর আঙুলের ফাঁকে মাঝে মাঝে একটা উষ্ণ-নরম ছোঁয়া পেতে খুব ইচ্ছে করত। এখন চুপকথা সেই অভাব টুকু সাধ্য মতো পূরণ করে।

।।৪।।

কদিন থেকেই আকাশটা মেঘলা করে আছে। মাঝে মাঝে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। নিম্নচাপ হবে হয়তো। চুপকথা যে মুর্গী বাচ্চাগুলোর সঙ্গে এসেছিল সেগুলো কবেই বড় হয়ে কোম্পানির ঘর থেকে মানুষের পেটে চলে গেছে। চুপকথা থেকে গেছে আমার খাটের তলায়। সবার চোখের আড়ালে। এখন চুপকথা খাবারের ভেতর থেকে ভুট্টার দানাগুলোকে বেছে বেছে খায়। সময় পেলে আমি নিজেও বেছেদি ওকে। যেদিন ওর মেজাজ ফুরফুরে থাকে সেদিন ফার্মের বাইরে বেরিয়ে একটু আধটু হাঁটাচলা করে। ঘাসের ভেতর থেকে কী সব যেন খুঁটে খায়। এই কদিন থেকে খেয়াল করছি আমি যখন চুপকথা বলে ডাকি তখন ও পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে আমাকে। কয়েক মাস পরে যখন চুপকথা আর থাকবে না তখন হয়তো আমার ফার্মটাই শুনশান হয়ে যাবে। দেশি মুর্গীর মতো পোল্ট্রি মুর্গীদের আয়ু দীর্ঘদিন হয় না। চুপকথা থাকবে না ভাবলেই মনের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করে।

রাতের দিকে বৃষ্টিটা যেন আরও বাড়ল। সঙ্গে ঠাণ্ডা বাতাস। বাতাসে মাঝে-মাঝেই নেটের বাইরের প্ল্যাস্টিক ত্রিপলগুলো এমন দুলে-দুলে উঠছে যে মুর্গী বাচ্চাগুলো ভয় পেয়ে এক জায়গায় এসে জড়ো হয়ে পড়ছে বারবার। বাধ্য হয়ে আমাকে উঠতে হচ্ছে টিন পিটিয়ে ওদেরকে আলাদা করার জন্য। প্রথম দশ দিনের ভেতর বাচ্চাগুলোকে একদম জড়ো হতে দেওয়া চলে না। বেশিক্ষণ এক জায়গায় জড়ো হয়ে থাকলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে একসঙ্গে অনেকগুলো করে বাচ্চা মারা পড়ে। এছাড়াও বাদলা রাতে আরেক উপদ্রব আছে। শেয়ালের উপদ্রব। একবার একটা শেয়াল নেটের বাইরে থেকে গর্ত করে ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। সেই রাতে এমন কালঘুম ঘুমিয়ে ছিলাম যে কিছুই জানতে পারিনি। শেয়ালটা ফার্মের ভেতরে বসেই খেয়েছিল দুটো বাচ্চাকে। 

রাত্রি দুটো আড়াইটার দিকে যখন বাতাসটা বন্ধ হল তখন একটু চোখের পাতা এক করার সময় পেলাম। চুপকথা তখনো খাটের তলায় বসে মৃদু সুরে পিঁওক-পিঁওক করছে। বেশ কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করেও ঠিকভাবে ঘুম এলো না কিছুতেই। শেষ পর্যন্ত চুপকথাকেই কোলে তুললাম গল্প করার জন্য। চুপকথাও জানে কুহুর গল্পটা। ও কি কুহুকে হিংসে করে ? জানি না। তবে যখন ওকে কুহুর গল্প শোনাই তখন ও কেন যেন কুঁকড়ে যায়। এটা আমার মনের ভুলও হতে পারে। কিন্তু আমি দেখেছি ও কুঁকড়ে যায়। কেউ বিশ্বাস করবে না হয়তো। আমিও হয়তো বিশ্বাস করি না। তবুও মনে হয় চুপকথা কুহুকে হিংসে করে। ভীষণ রকম হিংসে করে। 

আচ্ছা কুহুর শরীরটা কি চুপকথার চেয়েও নরম ছিল ? আর মনটা ? চুপকথার নরম পালকের ভেতর আঙুল বোলাতে বোলাতে এমন কত যে উদ্ভট প্রশ্ন মাথায় আসে তার ঠিক নেই। এক একটা সময় আমার শরীরটা উষ্ণতার চরম সীমায় পৌঁছে যায়। তখন কেমন যেন পাশবিক ইচ্ছে জাগে মনের ভেতর। ইচ্ছে করে চুপকথার শরীরটাকে নিগড়ে নিজের শরীরে মিশিয়ে ফেলি। আজকের বাদলা রাতেও ইচ্ছে করছে পাশবিক প্রবৃত্তিতে চুপকথার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে। ইচ্ছে করছে চুপকথার পালকের অন্তর্বাস খুলে ভেতর থেকে কোনও এক কুহুকে বেরকরে আনতে। আর তারপর...। কিন্তু পারি না কিছুতেই পারি না।

একটা সময়ছিল যখন আমার মোবাইলের স্কিনেও ভেসে উঠত ডানাকাটা নগ্ন পরীর নগ্নতার চরম সীমায় পৌঁছে যাবার চলমান চিত্র। আমি সেই সব পরীদের শরীর দিয়ে কুহুর শরীরটাকে মেলানোর চেষ্টা করতাম। এখন ওসব দেখতে ভয় হয়। চুপকথার জন্য ভয় হয়। কোথাও না কোথাও আমি বিশ্বাস করি আমি পশু হয়ে যাইনি।                

।।৫।।

দিন দিন চুপকথার সাথে আমার সম্পর্কটা নিবিড় হয়ে পড়ছে। এখন ও আমার হাতে ছাড়া খাবার খায় না। ওর শরীরে হাত না বুলিয়ে আমিও থাকতে পারি না। এখন যখন ওর শরীরে হাত বোলাই ও চোখ বন্ধ করে থাকে। আমার ছোঁয়াটাকে গভীর ভাবে অনুভব করতে শিখেছে এখন। আমিও ওকে এখন অনেকটা গভীর ভাবে বুঝতে শিখেছি। এখন প্রায়শই দেখি ওর শরীরে বেশ কিছুক্ষণ হাত বোলানোর পর একটা সময় ওর শরীরটা থরথর করে কেঁপে ওঠে। আমি চোখ বন্ধকরে ওকে অনুভব করি। আমার শরীরটাও কেঁপে ওঠে। আমি খেয়াল করে দেখেছি শরীরটা কেঁপে ওঠার পর চুপকথা আর আমার কোলে থাকতে চায় না। আমার কোল থেকে নেমে চুপটি করে গিয়ে বসে ফার্মের কোনায়। আমি এটাও খেয়াল করে দেখেছি যেদিন কোলে নেবার পরেও চুপকথার লেজের পালক পেখমের মতো দাঁড়ায় না সেদিন ওর শরীরে কিছুতেই কম্পন জাগে না। চুপকথা কোনও মেয়ে হলে হয়তো ওকে এত গভীর ভাবে চিনতে পারতাম না। ঠিক যেমন চিনতে পারিনি কুহুকে।

এই কয়েক দিনে আমি বেশ কয়েকজন পশু-পাখির ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছি। উনারা সকলেই বলেছেন পোল্ট্রি মুর্গীর আয়ু বেশি দিন হয় না ঠিকই কিন্তু প্রতিমাসে দুবার করে ক্যালসিয়াম ভ্যাক্সিন করলে আরও কয়েকমাস বেশি বাঁচানো যেতে পারে। আমি তাতেও রাজি। একদিন ছিল যখন কুহুর সঙ্গে দেখা করতে গেলেই কয়েকশো করে টাকা খরচা হত। কুহুর মতো মেয়ের জন্য যখন অভাবের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েও এতটা খরচা করতে পারতাম তখন আজকে চুপকথাকে কয়েকমাস বেশি বাঁচানোর জন্য আমি এটুকু করতেই পারি।

গত পরশুদিন রাতে ফার্ম খালি হয়েছে। এখন নতুন বাচ্চা নামতে আরও কয়েকদিন লাগবে। ফার্ম খালি হওয়ার পর ফার্মের ভেতরকার তুষ আর পায়খানা পরিষ্কার করে নতুন করে মাটির প্রলেপ দিতে হয়। সেই মাটি শুকিয়ে যাওয়ার পরে বাচ্চা নামে। লোক পাইনি বলে আমার ফার্ম এখনো পরিষ্কার করা হয়নি। সব মিলিয়ে দেখতে গেলে নতুন বাচ্চা নামতে এখনো দিন সাতেকের কম না। এই সাত দিনের ভেতর জল আর খাবারের পাত্রগুলোকেও পরিষ্কার করতে হবে। খড়ের চালার পশ্চিম দিকের কোনায় জল পড়ছে, ওখানে নতুন করে খড় চাপাতে হবে। অনেক কাজ আছে এই কদিনে। পরে আর সময় হবে না। তাই আজকে বিকেলেই চুপকথার জন্য ভ্যাক্সিনটা নিয়ে আসতে পারলে ভালো হয়।

দুপুরে চুপকথাকে গল্প শোনাতে শোনাতে হঠাৎ খেয়াল করলাম ওর ডানদিকের পা’টা সামান্য ফুলেছে। বুঝতে পারছি ওর শরীরের ওজন নিতে ওর পা দুটো অক্ষম হয়ে পড়ছে ধীরে-ধীরে। এখন ও হাঁটা চলাও প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত চুপকথাকে ফার্মের কোনায় বসিয়ে রেখে দরজাটা ভেজিয়ে দিলাম। ওকে বাঁচাতে হলে যত শীঘ্র সম্ভব ওকে ক্যালসিয়াম ভ্যাক্সিন করতেই হবে। জানি না ভ্যাক্সিন করার পরেও চুপকথা কতদিন বাঁচবে...

A world class Bengali story

Bengali story


।।৬।।

বেশ কয়েকটা ঔষধের দোকান ঘোরার পর ওর ভ্যাক্সিনটা পেয়েছি। একটা ভয় একটা উত্তেজনা কাজ করছে ভেতর ভেতর। ভ্যাক্সিনটা হাতে নিয়ে যখন ফার্মের সামনে এসে দাঁড়ালাম তখনো সন্ধা হতে খানিক দেরি আছে। আমাদের পাড়ার কয়েকটা ছেলে নিজেদের ভেতর কথা বলতে বলতে হাসা হাসি করছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। ওরা হয়তো আমাকে দেখেই হাসছে। হয়তো আমার পিছনে বেকার তকমা আঁটা গোপন লেজটা ওরা এখনো দেখতে পাচ্ছে। এমন সময় পশ্চিমের কালো আকাশে একঝাঁক বক উড়তে উড়তে কোথায় মিলিয়ে গেল। এই আমার সাথে সেই আমাকে মেলাতে গিয়ে দেখলাম এই আমি ঐ কালো আকাশটা আর সেই আমি ঐ হারিয়ে যাওয়া সাদা বকগুলো।

ফার্মের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখলাম একটা গুমোট অন্ধকার ছড়িয়ে আছে চারদিকে। প্রথমটায় কিছুই দেখতে পেলাম না। পরে সব পরিষ্কার হয়ে আসতেই চোখ পড়ল চুপকথার উপর। প্রাচীন গাছের গুড়ির মতো পা’দুটোকে টানটান করে মাটি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে চুপকথা। আর ওর দু’ডানায় ভর করে বীরপুরুষের মতো দাঁড়িয়ে আছে একটা দেশি মোরগ। পেখমের মতো মেলে রয়েছে চুপকথা ওর লেজের পালক গুলোকে। আমি জানি আর একটু পরেই চুপকথার শরীরটা থরথর করে কেঁপে উঠবে। 

খুব ইচ্ছে করছে এই হাত দুটো দিয়েই টুকরো টুকরো করে চুপকথার গল্পটা শেষ করে দিতে। কিন্তু তাতেও তো চুপকথা মরবে না। ও তো আমার ভেতর বেঁচেই থাকবে। আসলে কুহু বা চুপকথারা কখনই মরে না। ওরা দলা পাকিয়ে গলার ভেতর কষ্টের গল্প হয়ে যায়। 

এখন মাথার উপর দিয়ে রাত হেঁটে যাচ্ছে ভোরের পথে। আর একটু পরেই সেই ধুতি পাঞ্জাবী পরা ভদ্রলোক এসে আমাকে বলবেন, ‘আর যাই করো লেখা লেখিটা ছেড়ে দিও না। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।’

[সমাপ্ত]


No comments:

Post a Comment