Monday, 15 July 2019

Bengali novel, Fire asar din [last part]

Bengali novel - Fire asar din. Written by - Bappaditya Mukhopadhyay


Bengali novel - jodi search korchen tahole ei Bangla novelta porun. Sob paben, Bangla love story to bangla politics. Sob dik diyei Fire asar din best bengali novel.

ষষ্ঠ অংশ,  সপ্তম অংশ

নবম অংশ

(শারদীয় উপন্যাস ১৪২৬, ফিরে আসার দিন) 

‘তুই মাকে কেমন করে বললি ? তোর না কবে যে বুদ্ধি হবে ভগবান জানে, আর তিতলির কথাটাও বলে দিয়েছিস ?’ শিল্পীর মাথায় ছোট্ট করে একটা গাট্টা মারে অন্তু। শিল্পী কিছু না বলে মিচকে শয়তানের মতো মিটিমিটি হাসতে থাকে।
মায়ের কাছ থেকে গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে বিকেলেই অন্তু চলে এসেছিল শিল্পীদের বাড়ি। আজকে তেমন কেউ নেই। আত্মীয়স্বজন যারা এসেছিল তারা বিদেয় হয়েছে সকাল সকাল। এরপর সবাই আবার আসবে ঘাটের দিন। কেউ কেউ শ্রাদ্ধের দিন। শিল্পীদের বাড়িতে ঢুকেই মনটা কেমন যেন খাঁ-খাঁ করে উঠেছিল অন্তুর। বাড়িটার আনাচে কানাচে শোকের ছায়া। অপরিচিত কেউ এসে বাড়িতে ঢুকলেও বুঝতে পারবে কিছু একটা হয়েছে। শিল্পী নিজের ঘরে একা। শিল্পীর মা শান্তনুর ছোটবেলার একটা ছবিকে আঁকড়ে অপলক ভাবে বসে রয়েছে। বাড়িটায় ঢুকে শিল্পীর মাকে দেখার পর কেমন যেন থতমত খেয়ে গিয়েছিল অন্তু। শিল্পী বলেছে, ‘মা সময় নিচ্ছে নিজেকে সামলাতে। মায়ের কয়েকটা মাস সময় লাগবে জীবনের স্বাভাবিক গতিটা ধরতে।’ অন্তু ভালমতোই জানে শিল্পী নিজেও স্বাভাবিক হতে পারেনি। ওর মায়ের অস্বাভাবিক আচরণই ওকে স্বাভাবিক হওয়ার নাটক করতে শিখিয়ে দিয়েছে। আসলে এমন একটা কল্পনাতীত ঘটনা ঘটার কয়েকদিনের ভেতর কেউই পারে না স্বাভাবিক হতে। সময় মানুষকে স্মৃতি ভুলতে সাহায্য করে। স্বাভাবিক হতে সাহায্য করে। এই সময়টা যতই নিষ্ঠুর নির্মম হোক না কেন সময়ের সঙ্গে পা মিলিয়েই চলতে হয়।
শিল্পীর মায়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শিল্পীর ঘরে গিয়ে ঢুকেছিল অন্তু। কাবেরী-মহিমের আলোচনা দিয়ে আলাপ শুরু হলেও আলোচনা এসে থেমেছিল তিতলির কাছে। তারপর শিল্পীর অভিমান ভাঙাতে ভাঙাতেই সন্ধা। এখন ওরা চলেছে মেলার পথে। ফুরফুরে বাতাসে ছুটছে অন্তুর সাইকেলটা। শিল্পী সামনে বসে টর্চ ধরে আছে। ও কিছুতেই আসতে চাইছিল না। কিন্ত শেষ পর্যন্ত অন্তুর ‘চল না মনটা ফ্রেস হবে...’ ‘চল না মনটা ফ্রেস হবে...’ কথাটা কাটতে পারেনি।

‘মাকে বলে অবশ্য ভালই করেছিস নতুবা আমাকে বলতে হত।’
‘মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে তোমার যে কত দম সেটা আমার ভালমতোই জানা আছে। বাইরেই তোমার যত দাদাগিরি জেঠিমার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা বেড়াল হয়ে যাও।’
‘দেখবি দম দেখবি...’ বলে চলন্ত সাইকেলটায় ঝাঁকুনি দেয় অন্তু।
‘বেশি কায়দা না দেখিয়ে ঠিকঠাক চালাও পড়লে আমি একা পড়ব না তুমিও পড়বে।’      
        ডাংরা নদীর ব্রিজ দিয়ে যেতে যেতেই মেলার আলোগুলো দেখা যাচ্ছে। হরেকরকম শব্দ কানে আসছে। আবার মাঝে মাঝেই শালগাছের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে আলোগুলো। তখন শান্তনুর কথা ভিড় করে আসছে শিল্পীর মাথায়। আনমনা হয়ে পড়ছে শিল্পী। অন্তু শিল্পীর মনের অবস্থাটা বুঝতে পেরে বলে, ‘এখানে খুব সুন্দর বাতাস বইছে চল এখানেই বসি কিছুক্ষণ।’
সাইকেলটাকে বিজ্রের ধারে দাঁড় করিয়ে ব্রিজটার উপরেই বসে পড়ে দুজনে। মৃদুমন্দ বাতাসে ফুরফুর করে উড়ছে শিল্পীর চুলগুলো। এখান থেকে মেলার আলগুলোকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে মনে হবে কে বা কারা যেন নদীটার ধারে আলোর মোটা রেখা টেনে দিয়েছে। নদীটার আধমরা স্রোতে আলোর দানাগুলো ঝিলমিল ঝিলমিল করছে এখন।
‘জলটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখ মনে হবে যেন আলোগুলো নাচ করছে।’ 
‘ওটাই তো দেখছি।’ অন্তুর কাঁধে মাথাটা হেলান দেয় শিল্পী। ভাললাগে অন্তুর। 
‘মাকে নিয়ে খুব চিন্তা হচ্ছে জানো। আমিই পারছি না তা মা পারবে তো এই শোকটা কাটিয়ে উঠতে।’
‘সময় সব ঠিক করে দেয়। স্বামীর শোক কাটিয়ে ওঠার পর উনি যখন তোদেরকে মানুষ করেছেন তখন এটাও উনি ঠিক কাটিয়ে উঠবেন। তোর দাদার কাজগুলো পেরিয়ে গেলে দেখবি অনেকটাই স্বাভাবিক হবে কাকিমা।’
‘হলেই ভাল। আচ্ছা বিয়ের পর তুমি আমার মাকে দেখবে তো ? মায়ের কিন্তু আর কেউ রইল না।’
‘এতদিনে এটুকু তুই নিশ্চয় আমাকে চিনেছিস। চিন্তা করিস না আমি দুই মায়ে ভেদাভেদ করব না। দুজনকেই সমান ভাবে দেখব।’
‘আমিও।’ বলে অন্তুকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে শিল্পী।
‘এই মা বলেছে বৈশাখে ভাল দিন থাকলে বৈশাখেই বিয়ে দিয়ে দেবে...’
‘না দিলে চলবে কেন মশায়...’ অন্তুকে দেখিয়ে দেখিয়ে তলপেটটায় হাত বোলায় শিল্পী।
‘তোর ডেট পেরিয়ে গেছে ?’
‘যায়নি তবে পেরিয়ে যাবে আমি জানি...’
‘কী করে জানলি ?’
‘আমার মন বলছে তাই। আচ্ছা হলে কি তোমার সমস্যা হবে ?’
‘না আর সমস্যা হবে না। আসলে বিয়ে হওয়ার আগেই...। আমি কেন যেন ঠিক মেনে নিতে পারি না।’
‘বৈশাখে বিয়েটা হলে কোনও সমস্যা থাকবে না।’
‘হ্যাঁ তাহলে নো প্রবলেম।’
‘প্রবলেম নেই মানে ? এবার তো একটা চাকরি দেখো নইলে আমার বাচ্চা কী খাবে ?’
‘এটা খাবে...’ শিল্পীর বুকে হাত দিয়ে দেখিয়ে দেয় অন্তু।
‘ধ্যাত তুমি না যাতা একটা।’
আরও বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর উঠে দাঁড়ায় দুজনে। অন্তু জড়িয়ে ধরে শিল্পীকে। চুমু খায়। তারপর সাইকেলটার দিকে এগিয়ে যায়। মেলায় গান শুরু হয়েছে এতক্ষণে...
‘কতক্ষণ থাকবে মেলায় ? এখানেই তো অনেক দেরি হয়ে গেল।’ সাইকেলে চড়তে গিয়ে জিজ্ঞেস করে শিল্পী।
‘মেলায় ভাল লাগলে ঘণ্টা খানেকের মতো আর ভাল না লাগলে বেশিক্ষণ না।’
‘মা একা ঘরে আছে তাই জিজ্ঞেস করলাম। যদিও রানু কাকিমা আসবে বলেছে কিন্তু কতক্ষণ থাকে...’
‘কে রানু কাকিমা ?’
‘তুমি চিনবে না আমাদের গ্রামের ভেতর দিকে ওদের বাড়ি।’
‘ও, তুই বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত তাহলে থাকবে। তাছাড়া একবার কল করেনিবি।’
‘মা কল ধরলে তো ভালই হত...’
‘মা নয় তোর ওই কাকিমাকে।’
‘উনার ফোন নেই...’

অন্ধকার রাস্তার বুকে টর্চের আলো ফেলে ছুটছে সাইকেলটা। আর কিছুটা গিয়ে জয়নগর ঢোকার মুখে ডান দিকে বাঁক নিলেই মেলাটা যেখানে হচ্ছে সেখানে পৌঁছে যাবে ওরা। মেলার পরিচিত সুরগুলোও এতক্ষণে কানে ভেসে আসছে। শিল্পীর মাথায় চিবুক নামিয়ে হেলতে দুলতে সাইকেলটা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অন্তু। মনের ভেতর থেকে বিয়ে নামক একটা মিষ্টি গন্ধ বেরিয়ে আসছে ভুরভুর করে। নিজের বরবেশ আর শিল্পীর কনে সাজটা মনে মনে একবার কল্পনা করে অন্তু। হাসি পেয়ে যায় ওর...
‘এই দাঁড়াও দাঁড়াও...’
‘কেন ?’
‘কোথায় যেন খুব ঝগড়া হচ্ছে।’ ঝগড়া কথাটা শুনে দাঁড়িয়ে পড়ে অন্তু। ঠিক কোত্থেকে গলার আওয়াজগুলো ভেসে আসছে শোনার চেষ্টা করে। মেলার হাজার রকম শব্দের ভেতরেও অন্তু এটা বুঝতে পারে যে গ্রামের ভেতর কোথাও একটা জোর ঝামেলা হচ্ছে। ‘চল জলদি চাপ। গ্রামে কিছু হয়েছে মনে হয়। কালকের ঘটনাটাকে নিয়ে মহিম কাকার সঙ্গে ঝগড়া বাঁধতে পারে...’
‘আমার কিন্তু খুব ভয় করছে। তুমি তো বললে তুমি কালকে পঞ্চায়েত প্রধানকে পিটিয়েছ। ওরা তোমার কোনও ক্ষতি করবে না তো ?’
‘ওদের সেই সাহস থাকলে সেটা কালকেই করতে পারত। আমি তো ভেবেছিলাম পুলিশে জানাবে মনে হয়, পঁদে ভয় আছে বলে সেটাও করেনি। ওরাও ভাল মতোই জানে কালকে দোষটা কারা করেছিল।’
‘আচ্ছা ওই বিধবা বউটা তো পুলিশে জানাতে পারত...’
‘তাতেও কিছুই হত না। উল্টে থানাতেও ওকে কাপড় খুলতে হত। এটাই আমাদের দেশের আইন। ধর্ষণটা কীভাবে হয়েছে সেটা দেখানোর জন্য মেয়েটাকে আরও একবার ধর্ষিত হতে হয়। আর কেস আদালতে গেলে তো ধর্ষণের বিবরণ দিতে দিতে আরও কয়েকশবার ধর্ষণ...’

জয়নগরের দিকে সাইকেলটা বাঁক নিতেই অন্তু-শিল্পী দুজনেই দেখতে পায় রাস্তায় প্রচুর লোক ছোটাছুটি করছে। সবাই ছুটছে মহিমের ঘর যেদিকে সেদিকেই। আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেয় অন্তু। কোনরকমে ভিড়টাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে আসে। অন্তুর সাইকেলের সামনে পাশের গ্রামের একটা মেয়ে চেপে রয়েছে, তবু যেন কেউ দেখেও দেখছে না। সবাই হনহন করে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। মহিমের ঘর যাওয়ার গলিটার দিকে সাইকেল ঘোরাতেই অন্তু দেখতে পায় ভিড়টা জমেছে হাবলুর ঘরের সামনে।
সাইকেল আর শিল্পীকে রাস্তার একপাশে দাঁড় করিয়ে লম্বা পা ফেলে অন্তু এগিয়ে যায় হাবলুর ঘরের দিকে। ভিড় ঠেলে কোনক্রমে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখকেই বিশ্বাস হয় না ওর। বঁটি হাতে পরানের গলায় একটা পা-দিয়ে উন্মাদিনীর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে কাবেরী। পরান আদৌ বেঁচে আছে কি না সেটাও বুঝতে পারে না অন্তু। তপনার অবস্থা ততধিক খারাপ। কাঁধের কাছাকাছি বঁটির বেশ কয়েকটা কোপ পড়েছে। দরজার কাছেই রক্তে লাল হয়ে পড়ে আছে তপনা। সত্যবান আর কার্তিক হাবলুকে আঁকড়ে ঘরের চালাটার নীচে বসে রয়েছে। ওদের শরীরেও ক্ষতচিহ্ন। ঠেলাঠেলি করে কয়েকজনকে সরিয়ে ভেতরে ঢোকে অন্তু। এর পরই ওর চোখ পড়ে হাবলুর বউ এর উপর। সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় উঠোনের কোনার বসে কাঁপছে বউটা। মনে হয় পিছন দিকে ঘুরিয়ে বাধা আছে ওর হাতদুটো।
‘আইজক্যের পত্তে আর কন বউ কন মেয়্যার দিকে ভাইলত্যে লারবি তরা...’ পরানের পেটে লাথি মারতে থাকে কাবেরী।
অন্তুও বুঝে উঠতে পারে না এখন কাবেরীর কাছে যাওয়াটা কতটা নিরাপদ। কিন্তু কাবেরীকে থামাতে না পারলে পরানের মৃত্যু নিশ্চিত, যদি ও এখনো বেঁচে আছে তো। বারেক্কে ভিড় বাড়ছে, কিন্তু সবাই দর্শক। ওরা নিজেদের ভেতর আলোচনা সমালোচনা করছে মাত্র। কাবেরীকে শান্ত করার লক্ষণ ওদের শরীরী ভাষাতে নেই। শেষ পর্যন্ত কাবেরীর দিকে অন্তু নিজেই কয়েক-পা এগিয়ে যায়। কেউ কেউ অন্তুকে কাবেরীর কাছে যেতে নিষেধ করে। অন্তু নিজেও জানে এমন মুহুর্তে যে কোনও পুরুষের ঘাড়েই কোপ বসিয়ে দিতে পারে কাবেরী। ভাল মন্দের বিচার করার ক্ষমতা এখন ওর নেই।
আরও কয়েক-পা সামনে যেতেই অন্তুর দিকে রক্তচক্ষুতে তাকায় কাবেরী। আর পা নড়ে না অন্তুর। ভয় যেন গ্রাস করে পা-দুটোকে। ঠিক এমন সময় হাবলুর ঘরে ঢোকে মহিম। ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে মেলা থেকে ফিরছে ও। পুরো উঠোনটায় একবার চোখ বুলিয়েই যা বোঝার বুঝে নেই মহিম। দ্রুত কাবেরীর দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু মহিমের দিকেও বঁটি উঁচিয়ে ধরে কাবেরী। মহিম পাত্তা দেয় না। কাবেরীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ওর হাত থেকে কাড়িয়ে নেয় বঁটিটা। এক ঝটকায় ওকে টেনে নেয় পরানের কাছ থেকে। কয়েক সেকেন্ডের ভেতরেই জ্ঞান হারায় কাবেরী। মহিমের বুকের উপর লুটিয়ে পড়ে।                
         

আকাশে ভোরের আলো ফুটে উঠছে এখন। রাত যত বেড়েছে হাবলুর ঘরের সামনে ভিড় ততই বেড়েছে। মেলার পুরো ভিড়টাই হামলে পড়েছিল এক সময়। মিনিট চল্লিশ হল পুলিশ এসেছে ইঁন্দপুর থানা থেকে। ভিড়টা তাই তুলনামূলক কম। পরান আর তপনাকে গবিন্দনগর হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে এসেছে গ্রামের কয়েকটা ছেলে মিলে। ডাক্তার তপনাকে বিপদমুক্ত জানালেও বাহাত্তর ঘণ্টার আগে পরানের ব্যাপারে কিছু বলতে পারবে না জানিয়েছে। এটা তো গেল নিছক সাধারণ ঘটনা। কিন্তু এর পরের ঘটনাটাই অবিশ্বাস্য...
থানা থেকে পুলিশ এসে কাবেরীকে এরেস্ট করতে গেলে প্রথম বাধা আসে অন্তুর মা লতিকার কাছ থেকে। লতিকার দেখাদেখি বাধা দেয় শিল্পী সঙ্গে আরও পাঁচটা মেয়ে বউ। তারপর পাঁচটা-দশটা করে সেই সংখ্যা বাড়তেই থাকে। কুড়ুল হাতে সবাইকে অবাক করে চূড়ান্ত বাধাটা দেয় তপনার বউ, ‘হাত কাইট্যে ফাঁক কইর‍্যে দিব যদি উয়ার গায়ে হাত দিস...।’ তপনার বউ কোনওদিন কাবেরীর পক্ষ নিয়ে দাঁড়াবে সেটা সত্যিই সবার কল্পনার অতীত ছিল। তপনার বউ কুড়ুল হাতে কাবেরীর পাশে দাঁড়াতেই মেলা দেখতে আসা মেয়ে-বউগুলো কীভাবে যেন লড়াইটাকে মেয়েলি লড়াই বানিয়ে তোলে। আর এতেই পিছু হাঁটতে হয় পুলিশকে।
এই পরান, সত্যবান, তপনা, কার্তিক এদেরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে জয়নগরের মেয়ে-বউদের মনের ভেতর যে কালবৈশাখী দানা বাঁধছিল সেটা কাবেরীর আহ্বানে ঝাঁপিয়ে পড়ল পহেলা বৈশাখের একদিন আগেই। আসলে এটা একদিন হওয়ারই ছিল। কাবেরী শুধুমাত্র দিনটা নির্ধারণ করে দিয়েছে।          

।২৮।
অন্তু শিল্পীর সঙ্গে কাবেরীকেও নিজের ঘরেই নিয়ে গিয়েছিল লতিকা। না নিয়ে গিয়ে উপায় ছিল না। বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল কাবেরীর। সেটা কাবেরীর নিজের ঘরে বা মহিমের ঘরে সম্ভব ছিল না কিছুতেই। শরীরখেকো শয়তানগুলোর বিরুদ্ধে কাবেরীর এই প্রতিবাদ জয়নগরের পাশাপাশি গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়তেও সময় লাগেনি। কে এই কাবেরী ? এটা জানতেই মেলা দেখতে আসা মানুষগুলো ভিড় করছিল কাবেরীর ঘরে। মহিমের ঘরে। কাবেরী নিজেও ভাবেনি ওর এই প্রতিবাদটা গ্রামের অন্ধকারে থাকা প্রত্যেকটা মেয়ে-বউ এর মনে ভোর এনে দেবে।
বিকেলের দিকে লতিকা কাবেরীকে সঙ্গে নিয়েই মহিমের ঘরে আসে। ওদের পিছু পিছু অন্তু আর শিল্পী। সবাই মিলেই মেলায় যাবে আজ। লতিকাকে সঙ্গে নিয়ে ভাদুর ঘরে ঢোকে কাবেরী। আজকে ভাদুকেও বেশ ভাল লাগছে। ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করে লতিকা, ‘চিনত্যে পাচ্চিস আমাক্যে ?’
ভাদু ঘাড় নেড়ে বলে, ‘দিদিমুনির মুক ভুইল্ল্যে উপরবালাও মাপ কইরব্যেক নাই।’
ভাদুর কথা শুনে কাবেরীর মুখের দিকে তাকিয়ে লতিকা বলে, ‘শোন মেয়্যার কতা। তা আমার মুকটা কী এমন গুড় লাগা শুনি ?’
ভাদু এই কথার উত্তরে কিছু বলে না। শুধু ইশারায় দুজনকেই বসতে বলে। তারপর মাথার কাছে রাখা গোলাপি রঙের একটা শাড়ি কাবেরীর হাতে দিয়ে বলে, ‘আইজ এইট্যা পইর‍্যে মেল্যায় যাবি। পুনিকে দিয়ে বার কর‍্যাই রাইক্যেচি।’
কাবেরী কাপড়টা হাতে নিয়ে একবার লতিকার মুখের দিকে একবার ভাদুর মুখের দিকে তাকায়। বুঝে উঠতে পারে না ঠিক কী বলবে।
‘এই কাপইড়ট্যা বিয়া বচরে পুনির বাপ দিয়্যেচিল। আমার খুব ইচ্চ্যা এইট্যা পল্ল্যে তকে কেমন লাইগচ্যে সেটা দেকার। আমি যাবার আগুত্যেই পুনিকে একটা মায়্যের পারা মা দিয়্যে যাত্যে চাই। ওই বোবা মিয়্যাট্যার জন্যে আমার বড চিন্ত্যা হয়। উয়াকে দেকিস, তাহৈল্যেই হব্যেক।’
লতিকা আর কাবেরী নির্বাক ভাবে ভাদুর অসহায় মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘পুনি হওয়ার আগুত্যে ওই মন্দির‍্যেই ত মানত কইর‍্যেছিলম...’ ভাদু নিজের খেয়ালে এক একটা গল্প শুনিয়ে যায়। অনেক অনেক গল্প বলার আছে ওর। ওর হাতে অত সময় নেই। তাই খুব কম সময়েই অনেক বেশি বেশি গল্প বলতে হবে ওকে...

পড়ন্ত বিকেলে মহিমের ঘরের পিছন দিকের লাল মাটির কাঁচা রাস্তাটা ধরে ডাংরা নদীটার দিকে হাঁটতে থাকে ওরা। সবার আগে আগে প্রজাপতির মতো উড়ে চলেছে পূর্ণিমা। তারপর কাবেরী আর শিল্পী। পশ্চিম আকাশটা আজকে কাবেরীর শাড়িটার মতো লালচে গোলাপি হয়ে আছে। বেশ ফুরফুরে লাগছে শিল্পীকেও। কাবেরীর সাথে সমান তালে তাল মিলিয়ে হাঁটছে শিল্পী। ভোররাতে লতিকার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছে শিল্পীর মা। শিল্পী কল্পনাও করেনি ওর মা ফোন ধরবে। রাতে বাড়ি ফিরতে না পারার জন্য উল্টে ভয় পাচ্ছিল শিল্পী। শিবানী শুধু ফোন ধরেছে তাই নয় শিল্পী আর অন্তুর বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারেও কীসব যেন বলেছে। যদিও ঠিক কী বলেছে সেটা লতিকা শিল্পীকে বলেনি। শিল্পীর মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হেসেছে শুধু।
পথ চলতে চলতেই লতিকা কীসব যেন বলছে মহিমকে। কাবেরীর টেস্টের ব্যাপারে কিছু হবে হয়তো। নিছক কৌতূহল মেটাতেই আজকে দুপুরের দিকে কাবেরীর পেচ্ছাব টেস্ট করেছিল লতিকা। রিপোর্ট পজেটিভ। যদিও সকালের প্রথম পেচ্ছাব হলে বেশি নিশ্চিত হওয়া যায় তবুও উত্তর যখন পজেটিভ তখন সম্ভাবনাই বেশি।
সবার পিছনে হেলতে দুলতে আসছে অন্তু। মা সঙ্গে আছে বলেই শিল্পীর পাশাপাশি হাঁটা সম্ভব নয় ওর পক্ষে। তার উপর সিগারেটের নেশাটা মাথায় চড়ে ডুগডুগি বাজাচ্ছে। তাই ইচ্ছাকৃত ভাবেই পিছিয়ে পড়ছে ও। পলাশগাছ পলাশগাছ ভাবতে ভাবতেই এতক্ষণ এসেছে। কিন্তু সুযোগ আসেনি। এতক্ষণে রাস্তার ধারে মস্ত একটা পলাশের ঝোপ দেখতে পেয়েই ঝুপ করে ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হয় অন্তু। পকেট থেকে সিগারেট আর দেশলাই বের করে নিমেষে ধরিয়ে নেয়। একটা লম্বা টান দিয়ে উপরের দিকে মুখ তুলে সবে পেচ্ছাব করতে যাবে না মোবাইল বাজতে শুরু। ‘এই হয়েছে শালা এক বিরক্তি। সময় জ্ঞান বলে কিছু নেই...’ পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখে তিতলির সেই নতুন নম্বরটা। এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে মোবাইলের কভারটা খুলে ফেলে অন্তু। তারপর ব্যাটারিটা তুলে নখ দিয়ে সিমটা টেনে বের করে। তারপর......, মুত্রে বিসর্জন। পেচ্ছাব আর সিগারেট শেষ হলে আবার রাস্তায় বেরিয়ে আসে অন্তু। এখন আর কোনও স্মৃতির টান নেই, সম্মুখে হেঁটে যাচ্ছে নতুন জীবন। এখন ওর অ-সিম আনন্দ। 
 
আকাশে নানান রঙের হাট বসিয়ে সূর্যটা ডুবছে এখন। বছরের শেষ সূর্য এটা। কালকে পহেলা বৈশাখ। নতুন সকালের একটা গল্প নিয়ে নতুন একটা সূর্য আসবে কাল। হঠাৎ করেই অন্তুর চোখ পড়ে কাবেরীর উপর। সূর্যের শেষ কিরণগুলো এমন ভাবেই কাবেরীর খোলা চুল আর শাড়িতে পড়ছে, মনে হচ্ছে ঠিক যেন কোনও এক আলোকিতা নারী আলোকরশ্মি ছড়িয়ে সামনের দিকে চলেছে। অন্তু বিড়বিড় করে বলে, ‘এই সেই নারী যাকে কত সহজেই সেদিন সবার সামনে নগ্ন হতে হয়েছিল। আবার এই নারীই তো বঁটি হাতে শয়তানের বুকে পা রেখে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সেই নারীটিই এখন শরীরে শীতল সূর্য মেখে নতুন জীবনে ফেরার পথে এগিয়ে চলেছে।’ দুচোখ ভরা শ্রদ্ধা নিয়ে কয়েক মুহূর্ত কাবেরীর চলার পথে তাকিয়ে থাকে অন্তু। তারপর নিজেও চলতে শুরু করে। ওরা সবাই অনেকটা পথ এগিয়ে গেছে এখন অন্তুকেও লম্বা পা ফেলে চলতে হবে।
[সমাপ্ত]


No comments:

Post a Comment