Bengali novel, Fire asar din [part 2]

Bengali novel - Fire asar din. Written by - Bappaditya Mukhopadhyay


Bengali novel - jodi search korchen tahole ei Bangla novelta porun. Sob paben, Bangla love story to bangla politics. Sob dik diyei Fire asar din best bengali novel

বাংলা উপন্যাস, ফিরে আসার দিন (দ্বিতীয় অংশ) 

নদীটার চারদিকে গুড়ি-গুড়ি ছাই উড়ছে এখন। বাতাসে মাংস পোড়ার গন্ধ। কৌশিকের শরীরটা পুড়তে পুড়তে প্রায় শেষ। এখনো বৈষ্ণবগুলো ‘বোল হরি, হরি বোল...’ সুরে খোল বাজিয়ে যাচ্ছে। এটা বিদায়ী সুর। তলপেট আর নাভিমন্ডল পুড়লেই দাহ কমপ্লিট। জ্বলন্ত চিতার থেকে বেশ কিছুটা দূরত্ব রেখে বসে আছে রাজা আর অন্তু। বন্ধুকে পুড়তে দেখার মতো সাহস ওদের নেই।
‘একটা জীবনের সব গল্পই শেষ হয়ে গেল বল। আর কারুর প্রতি ওর অভিযোগ নেই। দায় নেই। এখন থেকে কৌশিক ছিল-র দলে চলে গেল। আচ্ছা রাজা পুলিশ এসে কোনও চিঠি বা কাগজ কিছু পায়নি ?’
‘পুলিশ ?’ পুলিশ শব্দটা উচ্চারণ করে ব্যাঙ্গের হাসি হাসে রাজা। বলে, ‘পুলিশ কিছু খোঁজার চেষ্টাই করেনি। আত্মহত্যাটাকে সাধারণ মৃত্যুর পর্যায়ে লিখে কিছু টাকা নিয়ে কেটে পড়ছে। আরে ভাই আজকের দিনে কেউ ঝামেলায় পড়তে চায় না।’
‘কেন কৌশিক আত্মহত্যা করেছিল, সেটা তাহলে জানার কোনও উপায় রইল না।’
‘জেনেই আর কী হবে বল। ও তো আর ফিরবে না কোনওদিন।’
‘আত্মহত্যাটা মুখের কথা নয় রাজা। মানুষ শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করে। ভাবতে পারছিস একটা মানুষ কতটা যন্ত্রণা পেলে নিজেকে মিটিয়ে ফেলার কথা ভাবে ?’
‘আজকে থাক পরে এই নিয়ে আলোচনা করব। আজকে ওকে ভালভাবে বিদায় জানাই।’
নাভির মাংসটা বাঁশের লাঠি দিয়ে খোঁচা মেরে মেরে পুড়িয়ে দিল ওরা। ওরাও কৌশিকের আপনজন। কেউ কাকা কেউ মামা কেউ দাদা। কৌশিকের বাবাও এসেছে। অনেক দূরে বসে চুপচাপ পুড়তে দেখছে ছেলেকে। উনার চোখে কোনও জল নেই। পঁচিশ ছাব্বিশটা বছরের ভালবাসা মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়েছে কৌশিক। একজন মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে-সঙ্গে আরও যে কত ইচ্ছে কত স্বপ্নের মৃত্যু হয় সেটার তালিকা বানানো যাবে না। অন্তু তাকিয়ে থাকে কৌশিকের বাবার দিকে। সত্যিই কাঁদছে না লোকটা। পাথরের মতো দুটো চোখ দিয়ে যেন গিলছে ছেলের শেষ যন্ত্রণাটুকু। 
দাহ যখন শেষ হল তখন পূবের আকাশ লাল হয়ে আসছে। জল ঢেলে ঢেলে নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে চিতাটা। শেষ আগুন বিন্দুটুকু নিভে যাওয়ার পর চিতার উপরে মানুষের একটা রেখাচিত্র এঁকে প্রতিটা অঙ্গের থেকে হাড় কুড়িয়েছে কৌশিকের বাবা। ছেলের হাড়। এটাই এখানের নিয়ম। বাবা না থাকলে জ্যাঠা কাকা কিংবা দাদা যাকে হোক কুড়োতে হয়। ওই হাড়গুলো ত্রিবেণীতে ভাসিয়ে দিয়ে শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করলেই সব শেষ।
এবার সবাই ফিরছে। সবার আগে বৈষ্ণবের দল হরিনাম করে করে চলেছে। সবার শেষে অন্তু আর রাজা। হরিনামের সুরে আবার ছলছল করছে অন্তুর চোখ দুটো। মনে পড়ছে কৌশিকের মুখটা বারবার। মনে পড়ছে কৌশিকের বলা কত কথা। বুকের ভেতর অবিরাম একটা কথা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, ‘কৌশিক আর নেই... কৌশিক আর নেই...।’
বাড়ি ফেরার পথে নদীর তীরে বসে দুজনে। সিগারেট ধরায়। এখন ঘরে ফিরতেও ইচ্ছে করছে না অন্তুর। শিল্পী কয়েকটা মেসেজ করেছে অন্তুকে, সঙ্গে বার তিনেক ফোনও করেছে। ফোনটা ধরেনি অন্তু। মেসেজগুলোর উত্তর দিতেও ইচ্ছে করছে না। শিল্পীও হয়তো কৌশিকের ঘটনাটা শুনে থাকবে। অন্য পাড়া হলেও গ্রাম তো একটাই। সিগারেটে একটা বিষণ্ণ টান দিয়ে অন্তু রাজাকে জিজ্ঞেস করে, ‘তোদের ঝামেলাটা মিটেছে ?’
‘ধুর ওগুলো মেটার নয়। আগে আগে ভাবতাম এখন আর ভাবতেও ইচ্ছে করে না।’
‘তাহলে কী করবি ঠিক করলি ?’
‘কী আবার কিছুই না।’
‘দেখ হয় ঝামেলাটা মিটিয়ে নে নয় পুরোপুরি সরে পড়। কোনও কিছু ঝুলিয়ে রাখিস না।’
‘চিত্রা বিয়ে করতে চায়। বাট... আচ্ছা তুই তো জানিস আমার বাড়ির পরিস্থিতি। যে মেয়েটা সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছে সে পারবে পাছা পোড়া হাঁড়ির সেদ্দ ভাত হজম করতে ? এখন আবেগে বলছে, সব পারব। আমি জানি নেশাটা কাটতে সময় লাগবে না।’
‘সব যখন জানিস তখন পুরোপুরি সরে যা।’
‘সরে যা কথাটাতেও তো একটা যা শব্দ আছে, কিন্তু কোথায় যাই বলত ? কী বলব চিত্রাকে ? ভুলে যা। ফোন করিস না। যোগাযোগ রাখিস না। তুই বলত বলা সম্ভব ?’
‘কিন্তু এভাবে কতদিন টানবি ?’
‘টানছি না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়েছি। হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছি নিজেকে। আমার কথা ছাড় তোর কী খবর ?’
‘যেমন চলছিল তেমনই চলছে। সেই ফোন। ফেসবুক। পার্ক। মাঝে মাঝে মনে হয় কী হবে এই সব করে। পরে আবার ভাবি বেঁচে থাকার জন্যও তো আধার লাগে। কৌশিকটাকে দেখ নিরাশ্রয় হয়েছিল বলেই চলে গেল।’
‘আমি একটা কথা তোকে বলব কি বলব না বুঝতে পারছি না...’
‘বল না কী বলবি ?’ রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করে অন্তু।
‘তুই কৌশিকের ব্যপারে ঠিক কী জানতিস ?’
‘তেমন কিছুই না। কৌশিক কণিকাকে ভালবাসত, কনিকাও বাসত। পরে কণিকা ওর দিদির দেওরের সঙ্গে...’
‘এই জন্য কেউ আত্মহত্যা করে ? তোর কী মনে হয় ?’
‘খটকা যে একটা লাগছে না তা নয় কিন্তু আমি এর বাইরে তেমন কিছুই জানি না।’
‘কৌশিককে দাহ করতে বিশেষ কেউ আসেনি খেয়াল করেছিস নিশ্চয় ?’
‘হ্যাঁ। তো ?’
‘তোকে বললেও হয়তো তুই বিশ্বাস করবি না।’
‘তুই বল না বিশ্বাস অবিশ্বাস আমার ব্যপার।’
‘কৌশিকদের পাড়ার দোয়েলকে মনে আছে তোর ?’ প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েই আরেকটা সিগারেট ধরায় রাজা।
‘ওই কলকাতা থেকে আসা মেয়েটা ? সাপকেটে মারা গেল তো কয়েক মাস আগে।’
‘হ্যাঁ। মেয়েটা কৌশিকের খুড়তুতো বোন। কৌশিকের দাদুরা তিন ভাই, জানিস হয়তো।’
‘না জানতাম না।’
‘যাই হোক দোয়েল কৌশিকের...’
‘ওই তিন ভাই এর একজনের নাতনি তাই তো ?’
‘ঠিক তাই। দোয়েলের বাবা বরাবর কলকাতায়। ফলে দোয়েলের জন্ম থেকে লেখাপড়া সব ওখানেই।’
‘তারপর ?’
‘তিনজন ছেলে মিলে ধর্ষণ করেছিল দোয়েলকে।’
‘হোয়াট ?’
‘এখনো আশ্চর্য হওয়ার মতো কিছুই হয়নি। পুরোটা শুনে তারপর বলিস।’
‘ওই ঘটনাটার পর স্বাভাবিক ভাবেই দোয়েলের পক্ষে ওখানে থাকা সম্ভব ছিল না। ওরা সবাই গ্রামে চলে এলো। ব্যবসায় লস হচ্ছে, গ্রামে ফিরে এটাই বলেছিল দোয়েলের বাবা। কিন্তু আজকের দিনে কোনও কিছুই গোপন থাকে না, আর এ-তো ধর্ষণ। মুখরোচক খাবার। দু’চারজন করে সবাই জেনে গেল। এবার কী করবে দোয়েল ?’
‘তুই বলতে চাইছিস কৌশিক সাহারা দিয়েছিল দোয়েলকে ?’
‘সাহারা নয় দিশেহারা করেছিল দোয়েলকে। কণিকার বিষয়টা গোপন করে দোয়েলকে আপন করেছিল। তারপর যা হয়। দোয়েল নিজেকে ভার্জিন প্রমাণ করতে গিয়ে প্রেগন্যান্ট...। এবার সাপকাটা ছাড়া দ্বিতীয় কোনও রাস্তা খোলা ছিল না ওর জন্য। এবার তুই বল বিষ খাবে না তো কী করবে মেয়েটা ? ’
অন্তু এক্কেবারে চুপ হয়ে গেছে দেখে রাজা আবার বলে, ‘এর চেয়েও আশ্চর্যের বিষয় কী জানিস ? কৌশিক নিজের মুখে সব বলেছিল আমাকে।’
‘এর পরেও তুই ওকে দাহ করতে...’
‘আমি জানতাম এটাই বলবি। কারণটা আর কিছুই না। কৌশিক কণিকা-দোয়েল দুজনকে ভালবেসে ছিল। কেউ না জানুক আমি জানি। আমি ওকে কাঁদতে দেখেছি। আমি জানতাম কৌশিক একদিন এমনটা করবে। ওর খবরটা পেয়ে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল কিন্তু আমি অবাক হইনি।’     
এরপর অন্তু কী বলবে খুঁজে না পেয়ে চুপচাপ বসেছিল। ভেবেছিল একটা গল্পের পিছনে ঠিক আরও কতগুলো গল্প থাকতে পারে। রাজা না বললে কণিকা চিরদিন অন্তুর চোখে অপরাধি হয়েই থেকে যেত। এখন অন্তুর মনে হচ্ছে কণিকা নির্দোষ না হলেও ওর দোষটা কৌশিকের তুলনায় কম। কিন্তু একটা বিষয় অন্তুর মাথায় কিছুতেই ঢুকছিল না, দোয়েল তো জানত ওকে তিনজনে মিলে খুবলে খেয়েছে তার পরেও ও নিজেকে ভার্জিন প্রমাণ করতে গেল কেন ? এটার পিছনে ঠিক কী গল্প থাকতে পারে সেটা আন্দাজ করতে পারল না অন্ত। তাছাড়া আরেকটা প্রশ্ন, দোয়েল তো মরেছে বেশ কয়েক মাস আগে। হঠাৎ এতদিন পর কৌশিক...। ভাবনাটা থামাতে হল অন্তুকে। চোখ পড়ল দুটো লোকের উপর। ওরা মনে হয় ঝগড়া করছে। ঠিক যেখানটায় কৌশিককে পড়ানো হয়েছে সেখানে দাঁড়িয়েই ঝগড়া করছে লোকদুটো। দূরের থেকে কাউকেই চিনতে পারল না অন্তু।

। ৫।
নদীটার এপারে বুড়ো শিবের মন্দির। না, ঠিক মন্দির নয় শালগাছের নীচে বাবার বাস। লোকে মন্দির বলে। বড় বড় শালগাছগুলোর নীচে পোড়ামাটির হাতি-ঘোড়া-ষাঁড়গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। হাতি ঘোড়াগুলো শিবের জন্য দেওয়া হয়নি। গ্রামের কুলদেবী বাসুলীর জন্য দেওয়া হয়েছে। ওরা ষাঁড়ের সঙ্গে মিলেমিশে আছে বহুকাল। গাছগুলোকে দেখলেই বোঝা যায় ওরা কত বছরের ইতিহাস জানে। হাতি-ঘোড়া-ষাঁড়গুলোও বেশ পুরানো। কোনও কোনটার পা ভেঙেছে ঝড় বৃষ্টিতে। একসময় শুধুই শিবের পূজা হত এখানে। পরে বাসুলীও এখানেই জমি পায়। তবে জায়গাটাকে সবাই শিবমন্দিরই বলে। 
জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রতি মঙ্গলবার এখানেই আবার বাসুলীর নামে মঙ্গলাচন্ডীর পূজা হয়। নদীর দুপারের দুটো গ্রাম থেকেই মেয়ে বউরা আসে পূজা দিতে। জ্যৈষ্ঠ মাসে ছোটখাটো হাতি-ঘোড়া-ষাঁড়গুলোকে দেখা যায় না। ওরা কাঁঠাল পাতায় ঢাকা পড়ে যায়। এই সময়টুকু খুব ভিড় হয়। জ্যৈষ্ঠ মাস পেরিয়ে গেলে মানত ছাড়া কেউ ফিরেও তাকায় না এদিকে। এক সময় চৈত্রসংক্রান্তিতে এখানে খুব বড় মেলা বসত। লোকে বলত শিবের গাজন। চড়ক মেলা। যাত্রাপালা হত। ঝুমুরগান হত। এখন মেলা বসলেও আর ধুমধাম করে বসে না। যাত্রাও হয় না। লোকের আর আগের মতো সময় কোথায় ? তাছাড়া দুগ্রামের যারা টাকা পয়সা খরচ করে যাত্রার দল আনত তারাও প্রায় সকলেই শহর মুখি। এখন ধুঁকতে ধুঁকতে কোনক্রমে মেলাটা বেঁচে আছে। 
ভোররাতে পুকুর পাড় থেকে ফিরে এসে শুয়ে পড়েছিল মহিম। ঘুম আসেনি আর। পাশের ঘর থেকে ভাদুর যন্ত্রণাকাতর শব্দগুলো ভেসে এসে মহিমের কানে ধাক্কা মারছিল। খুব কষ্ট পাচ্ছে ভাদু। শরীরটা শুকিয়ে শুকিয়ে এখন হাড়-কঙ্কালটুকু পড়ে আছে। আরও কদিন পরেই রেডিও থ্যেরাপির জন্য নিয়ে যেতে হবে। মহিম দেখেছে রেডিও থ্যেরাপির পর ভাদুর শরীর আরও দুর্বল হয়। মাঝে মাঝে কাউকে চিনতে পারে না। সব গুলিয়ে ফেলে। এমনকি নিজেকেও চিনতে পারে না কখনো কখনো। ওষুধ গুলোরও খুব দাম। কিন্তু ডাক্তার বলেছে ওগুলো না খেলে দু-এক মাসের ভেতরেই শেষ হয়ে যাবে ভাদু। ভাদুকে হারানোর ভয়টা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় মহিমকে। ভাদু চলে গেলে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়বে মহিম। হয়তো পূর্ণিমার বিয়েও দিতে পারবে না ও। 
এই সব সাতপাঁচ ভাবনায় ভয়ে সকাল সকাল স্নান সেরে  শিবমন্দিরে এসেছিল মহিম। নিজেই কিছু বেলপাতা তুলে এনেছিল। বাবার পায়ের তলায় দিয়েছে সেগুলো। মনে মনে ভাদুর সুস্থতার জন্য মানত করেছে। মন্দিরের শান্ত পরিবেশটা ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করেনি ওর। 
একটা শাল গাছের তলায় বসে গত রাতের ঘটনাগুলো মনে করছিল মহিম। বারবার কাবেরীর উলঙ্গ ঊরু দুটো ভেসে উঠছে চোখের পাতায়। এর আগে এমন উরু কখনই দেখেনি ও। হাঁড়িয়ার চেয়েও বেশি নেশা। জ্যোৎস্নার চেয়েও সাদা। বামুন পুকুর পেরিয়ে খালের ধারের শ্যাওড়া গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে মহিম অপলক ভাবে কাবেরীর দুটো ঊরু চেটেছিল কাল রাতে। কাবেরীর নিটোল সাদা শরীরটার উপর তপনার লিকলিকে কালো শরীরটা বেমানান লাগছিল ওর চোখে। কালো জোঁকের মতো তপনাকে কীভাবে ওই সাদা তুলতুলে হাত দুটো দিয়ে কাবেরী জড়িয়ে ধরেছিল সেটাই বুঝতে পারছিল না মহিম। ওর ইচ্ছে করছিল তপনাকে তুলে পুকুরের জলে ছুড়ে দিয়ে কাবেরীর শরীর সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়তে। পারেনি। কে যেন ভেতর থেকে বারণ করছিল বারবার। নিজের ভেতরকার ভাল মানুষটার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে মাথা নামিয়ে নিতে হয়েছিল আদিম যৌন দেবতাকে। তবে ওখান থেকে ফেরার আগে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল মহিম। চরম উত্তেজনার মুহূর্তে কাবেরী আর তপনার শরীরদুটো ছাড়তে পারেনি একে অপরকে। কাবেরীর মুখের দিকে তাকিয়ে মহিম বলেই ফেলেছিল, ‘ওই সাদা গাটতে গু মাখিস না কাবেরী। উটা গু মাখার গা লয়।’
হঠাৎ মহিম এসে পড়ায় ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল ওরা দুজন। এমন সময় কেউ আসতেও পারে সেই ধারনা ছিল না ওদের। তপন কর্মরত অবস্থাতেই বলেছিল, ‘টুকু দাঁড়ার‍্যে মহিম। এমন সাদ কুতাও পাবি নাই।’ পাছে মহিম গ্রামের সবাইকে গিয়ে বলে, সেই ভয়েই কথাগুলো বলেছিল তপন। কাবেরী কিছুই বলেনি। তপনার পিঠে জড়িয়ে রাখা হাত দুটোকে সরিয়ে নিয়েছিল শুধু।
আর পিছু ফিরে তাকায়নি মহিম। হনহন করে বাড়ির পথে পা বাড়িয়েছিল। মহিম ওই কথাটা বলে কাবেরীকে কী বোঝাতে চেয়েছিল মহিম নিজেও জানে না। কেন যে ওর মুখ থেকে ওই কথাটা বেরিয়ে গিয়েছিল কে জানে। তপনাও ধরা পড়ার ভয়ে খেয়াল করেনি মহিমের কথাটা। আর কাবেরী ? হ্যাঁ একমাত্র কাবেরীর কানেই বেজেছিল মহিমের কথাটা। মহিম কী বলে গেল কেবেরি ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। কাবেরী এটাও বুঝতে পেরেছিল গাঁয়ে ফিরে মহিম কাউকে কিছুই বলবে না।
মহিম বলব বলব করেও কাউকে কিছুই বলতে পারেনি। বলতে না পারার জন্য নিজে-নিজেই বিরক্ত হয়েছে তবুও পারেনি বলতে। হয়তো মহিমের ভেতরকার সুপ্ত বাসনাগুলো কিছু বলতে দেয়নি ওকে। নয়তো কাবেরীর উর্বর ঊরুদুটো মহিমের মুখ সেলাই করে দিয়েছে। মহিম চাইলেই ওই নরম সাদা শরীরটার মালিক হতে পারে। কাবেরীর ঊরুদুটো বারবার চোখে ভাসছে মহিমের। আদিম ইচ্ছেগুলোর ঘুম যেন ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু ভাদু ? ওই ভাদু নামের শব্দটাকে কিছুতেই টপকে যেতে পারে না মহিম। যাবতীয় শারীরিক উত্তেজনা ওই এক শব্দে এসে থিতিয়ে পড়ে।
একটা শাল গাছের নীচে বসেই আকাশ পাতাল ভাবছিল মহিম। হঠাৎ চোখ পড়ল একটা লোকের উপর। লোকটা নদীর চরে দাঁড়িয়ে বস্তার ভেতর কয়লা কুড়োচ্ছে। মড়া পড়ানোর কয়লা। ‘ক্যে মইর‍্যেচে ?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্নটা করেও কোনও উত্তর পেলো না। তবে মহিমের আবছা মনে পড়ল কালকে রাতে কারা যেন ‘বোল হরি হরি বোল...’ করতে করতে নদীর দিকে আসছিল। সোনাপুরের কেউ হবে হয়তো। ঠিক এমন সময় ভাদুর মুখটা ঝপ করে মনে পড়ল মহিমের। আর তো কয়েক মাস, তারপর ? তারপর তো ভাদুকেও এখানেই...। ভাদুকে পোড়ানো কয়লাগুলোও কি কেউ এভাবেই কুড়িয়ে নিয়ে যাবে ? শেষ চিহ্নটুকুও রাখবে না নদীর পারে ? মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল মহিমের। ভয়ংকর রাগ হল লোকটার উপর। ‘দাঁড়া শালা তকে...’ অস্ফুট শব্দে কথাটা উচ্চারণ করে উঠে দাঁড়াল মহিম। শিবমন্দিরটা পেরিয়ে হড়হড় করে নামতে লাগল নদীর পাড় বেয়ে। লোকটা এখনো আপন মনে পোড়া কয়লাগুলো বস্তায় ভরছে।
‘এই শালা মড়া পুড়ানর কয়লাগুল্যাইন ক্যেন্যে চুরি কচ্চিস ?’
হঠাৎ মহিমের প্রশ্নে হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল লোকটা। মহিম দেখল লোকটার বয়স ওর মতোই হবে। চুল-দাড়িতে সবে পাক ধরতে শুরু করেছে। তবে লোকটা মুসলমান। লোকটা যে মুসলমান সেটা চেহারা দেখেই বুঝতে পারল মহিম। সেটা বুঝতে পারায় মাথাটা আরও বিগড়ে গেল, ‘হারামি হিঁদ্দুর চিতাতে মুছলমান হয়্যে কন আক্কেলে হাত দিলি তুই ?’
লোকটা কী উত্তর দেবে খুঁজে না পেয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। টুঁশব্দটুকুও বের করল না মুখ দিয়ে। এতে আরও বেশি সাহস পেয়ে গেল মহিম, ‘কয়লাগুল্যাইন যেখ্যানটায় ছিল রাক শালা সেখ্যানটাতে।’
‘ই গুল্যাইন তো পানিতে ভ্যাইসে যাব্যেক।’
‘তাতে শালা তর বাপের কী ?’
‘আমাক্যে বইলছ আমাক্যেই বল, বাপকে টাইনছ ক্যেন্যে ?’
‘কায়দা না কইর‍্যে কয়লাগুল্যাইন রাক। শালা ফুল্যের মালা জামা কাপড় সব কুড়্যাইছে।’ লোকটার আরেকটা বস্তা ঘেঁটে ঘেঁটে দেখতে থাকতে মহিম।
‘র‍্যাইখব নাই। কী কইরব্যে ?’
‘দেখবি শালা কী ক্যইরব...’ লোকটার কয়লা বস্তায় সজোরে একটা লাথি মারে মহিম।
‘এই শালা...’ এবার লোকটাও রেগে গিয়ে মহিমকে সজোরে একটা ধাক্কা দেয়। মহিম পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নেয়।
আরও কয়েক মিনিট গালাগালি করার পর দুজন দুজনের গলা চেপে ধরে। লোকটার পাশবিক ক্ষমতা হাড়ে হাড়ে টের পায় মহিম। ও আরও জোরে লোকটার গলা চেপে ধরে। দুজনে লুটিয়ে পড়ে নদীর বালির উপর। কেউ কাউকে ছাড়তে চাইছে না। ঠিক এমন সময় অন্তু আর রাজা এসে দুজনকে ছাড়ায়। টেনে তোলে।
‘কী ব্যপার মহিম কাকা ?’ মহিমকে জিজ্ঞেস করে অন্তু।
‘আর‍্যে দ্যেক ত, শালাকে মড়া পুড়ানর কয়লাগুল্যাইন লিতে বারন কচ্চি তবুও...’
লোকটা এবার একটু ভয় পেয়েছে। এরা এখন তিনজন। ও একা। অন্তু লোকটাকে জিজ্ঞেস করে, ‘মড়া পড়ানোর কয়লা দিয়ে কী করবে চাচা ?’
‘ইট ভাঁটায় বিক্কি ক্যইরতম।’ অন্তু লোকটাকে চাচা বলায় মনে হয় একটু ভরসা পেয়েছে।
‘ভাঁটায় পোড়া কয়লা কেনে ?’ রাজা জিজ্ঞেস করে।
‘হঁ। কিনে বইকি। এক বস্তা দিলে পঞ্চাইশ টাকা।’
অন্তু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘শ্মশানে শ্মশানে সারাদিন কয়লা কুড়িয়ে মাত্র পঞ্চাশ টাকা ? এতে সংসার চলে?’
লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, ‘ওই ফুলের মালা আর জামা কাপড়গুল্যাইন বিকে আরও তিরিশ চল্লিশ হব্যেক...’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আরও বলে, ‘নিজের জন্যে লয় ছা-গুল্যানের জন্যে সব কত্ত্যে হয়। নইল্যে করিমপুর থেইক্যা ইখানে আসি কি ?’
‘করিমপু...র থেকে সাইকেলে, বাপরে! তা কটা ছেলে মেয়ে তোমার ?’
‘দুইটা। একটা বিটি একটা ব্যাটা।’
‘বাঃ।’
‘তা মহিম কাকা তুমি ঝগড়া করছিলে কেন উনার সঙ্গে ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।
‘মুছলমান হয়্যে আমাদের শ্মশানে...’
‘তুমিও না। পোড়া কয়লাগুলো নিয়ে কারু যদি একটা দিন চলে তা ক্ষতি কী ?’
‘মানুইষটা মরার পর ওটুকুই তো পইড়্যে থাকের‍্যে বাপ। চোকের জল ফ্যেলানের লাগ্যেও তো কিচু একটা চাই ?’
অন্তু মহিমের মনের অবস্থাটা এতক্ষণে বুঝতে পারে। সমস্ত সমস্যার কারণটাও ওর চোখে পরিষ্কার হয়। অন্তু মহিমকে ঠিক কী বলবে খুঁজে পায় না। মহিম শিব মন্দিরের দিকে হাঁটতে থাকে। অন্তু লোকটার হাতে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে বলে, ‘চাচা কয়লাগুলো পড়েই থাক। ফুল-মালা, জামাকাপড়, বিছানা-বালিশ ওগুলো তুমি নিয়ে যাও।’
অন্তুর কথা শুনে লোকটা কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করে। তারপর অন্তুর দেওয়া পঞ্চাশ টাকাটা ওকে ফিরিয়ে দিয়ে পড়ে থাকা কয়লার বস্তাটা চিতার উপরে ঢেলে দেয়। ফুল-মালা, জামা-কাপড়ের বস্তাটা সাইকেলে চাপিয়ে উদাসীন ভাবে হাঁটতে থাকে।
‘বিষয়টা বোধগম্য হল না!’ রাজা বলে।
‘বিষয়টা আর কিছুই নয়। মহিম কাকার বৌয়ের ব্রেইন ক্যানসার। খুব বেশি দিন হয়তো বাঁচবে না। আমাদের গ্রামের শ্মশানও তো এটাই। মনে মনে নিজের বৌয়ের চিতাটা...’
‘এবার বুঝতে পেরেছি। ওর খারাপ লাগাটা স্বাভাবিক। লোকটাকে তেমন ভাবে না চিনলেও দেখেছি। আমাদের গ্রামে জমি আছে মনে হয়।’
‘ছিল। বিক্রি করে দিয়েছে।’
‘ও। জানতাম না।’
দুজনে গল্প করতে করতে ব্রিজটার দিকে হাঁটতে থাকে। নদীর বুকে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে এখন। লোকটা সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে যাচ্ছে সোনাপুরের কাঁচা রাস্তার দিকে। মহিমকে আর দেখা যাচ্ছে না। শালগাছের আড়ালে হারিয়ে গেছে ও। হাঁটতে হাঁটতেই অন্তুর ফোনটা বাজতে শুরু করে। শিল্পী কল করছে হয়তো। পকেট থেকে ফোনটা বের করে অন্তু। না, শিল্পী নয়। অন্তুর মা কল করছে। মাকে কিছুই বলে আসেনি অন্তু। ফোনটা রিসিভ করে, ‘হ্যালো মা...

মন্দিরটা পেরিয়ে গিয়ে একটা পাথরের উপরের বসে মহিম। টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলো ভিড় করে আসে চোখের পাতায়। ‘ভাদু কী আর...?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে মহিম। উত্তর হিসেবে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে নাকমুখ দিয়ে।
‘আমাকে মাজে মাজে ইখানট্যায় লিয়ে আইসবে ত। খুব সুন্দর জায়গাটা। কত বাতাস ইখানে।’ ভাদুর কথাটা ঝুপ করে মনে পড়ে যায় মহিমের। তখন পূর্ণিমা তিনমাস পেটে। দুপুরের দিকে ভীষণ গরমছিল সেদিন। টিনের ঘরে টেকা দায় হয়ে পড়ছিল। মহিম ভাদুর হাতধরে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে এসেছিল নদীটার দিকে। মহিমের ঘরটা পেরিয়ে ধানের জমি। ধান জমির আল ধরে মিনিট পাঁচেক হাঁটলে ছোট্ট পলাশের জঙ্গল। সেটা পেরিয়ে গেলেই ডাংরা নদীটা পড়ে। নদীটার দুপার জুড়ে প্রাচীন শালগাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে। একটা সময় শাল জঙ্গলেই ভরাছিল গ্রাম দুটো। এখন নদীর দুই পারে ছাড়া কোথায় তেমন চোখে পড়ে না।
নদীর জলে পা ডুবিয়ে সেদিন বেশ কিছুক্ষণ বসেছিল দুজনে। গরমের সময় নদীটাতে তেমন জল থাকে না। কোমর-ভাঙা বুড়ির মতো ধীর গতিতে চলে তখন। আবার বর্ষায় ডাংরা পূর্ণগর্ভা। দূর-দূর থেকে নদীটার চলার শব্দ পাওয়া যায়। ছোটছোট ডিঙা ভাসিয়ে কত লোক মাছ ধরে। মহিমের কাঁধে মাথা রেখে সেদিন বসেছিল ভাদু। সংসারের ছোটখাটো সুখ দুঃখের গল্প করতে করতে নদীর পাড় থেকে উঠে এসে বসেছিল শিবমন্দিরের সামনে। বাবাকে মানত করে ভাদু বলেছিল, ‘আমাকে বিটিই দিবে বুড়াবাবা।’ ইচ্ছে পূরণ হয়েছিল ভাদুর।
        সেদিনের পর আরও বেশ কয়েকবার এসেছে দুজনে। এই প্রাচীন শালগাছগুলো যেন নদীটার দুই পারে শান্তি বিছিয়ে রেখেছে। মনে হাজার দুশ্চিন্তা নিয়ে এলেও মনটা শান্ত হয়ে পড়ে। পূর্ণিমা জন্মানোর সময় ভাদুর স্বাদ পূরণ করার জন্য মহিম নার্সিং হোমে ভর্তি করেছিল ভাদুকে। সিজার করতে হয়েছিল। কুড়ি হাজারের মতো বাড়তি খরচ হয়েছিল তাতে। বেশ কয়েক বিঘা ধানিজমি বন্ধক দিতে হয়েছিল মহিমকে। সেই জমি আজও ছাড়াতে পারেনি মহিম। বাড়ি ফেরার পর ভাদু যখন শুনেছিল কত টাকা খরচ হয়েছে। কোন কোন জমিগুলো বন্ধকে গেছে। খুব কেঁদেছিল ভাদু। কিছু জমিছিল মহিমের ঠাকুরদার আমলের। কিছু ঠাকুরদার বাপ কাকার আমলের। সোনাপুরেও জমিছিল প্রচুর। কয়েক বিঘা মহিমের বাপ বিক্রি করে মাটির ঘরটা ভেঙে টিনের ঘর তুলেছিল। বিঘা দুয়েক জরিমানা দিয়েছিল। বাকি কয়েক বিঘা ভাদুর চিকিৎসায় গেছে। পূর্ণিমা জন্মানোর পর প্রায় নিয়ম করেই এখানে আসত দুজনে। মহিম ছেলেবেলার গল্প শোনাত ভাদুকে। মহিম যখন ছোট তখন নদীটার পশ্চিম পাড়ে একটা লেদা পলাশের গাছছিল। দুগ্রামের ছেলেরাই আসত গাছটার উপর থেকে নদীর জলে ঝাঁপ দিতে। গাছটা বেশ কয়েক বছর আগে বাণে ভেসে গেছে। ভাদু পূর্ণিমাকে কোলে নিয়ে চুপচাপ মহিমের গল্প শুনত।
আজকে চোখের পাতায় সেই দিনগুলো ভেসে উঠছে। ঘরের কোনায় বসে চোখের জল ফেলার তেমন সুযোগ হয় না। হয়তো তাই মহিম এই একাকীত্বটুকু খুঁজছিল ভেতরে ভেতরে। পূজা দেওয়ার অজুহাতে নিজের ভেতরটাকে খোঁচানোর জন্যই এখানে আসা। এবার বাড়ি ফিরতে হবে। ভাদুর ভালমন্দ কিছু হলে পূর্ণিমা সামলাতে পারবে না। এখন ভাদুর পেচ্ছাব পায়খানাও মহিমকেই পরিষ্কার করতে হয়। ঘরের বাইরে গিয়ে ওগুলো করার মতো ক্ষমতাও হারিয়েছে ভাদু। পূর্ণিমা অনেক করে কিন্তু ওই ছোট্টহাত দিয়ে কাঁথা-কাপড় কাচার ক্ষমতা ওর নেই। প্রথম প্রথম মহিমের একটু গা ঘিনঘিন করত। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে।
একটা বিড়ি ধরিয়ে পলাশ জঙ্গলটার দিকে হাঁটতে থাকে মহিম। বাড়ি ফিরেই একবার বাজারে যেতে হবে। রান্না করার মতো কিছুই নেই বাড়িতে। ভাদুর ওষুধ গুলোও শেষ হয়ে এসেছে। বড় বড় পা ফেলে হাঁটতে থাকে মহিম। পলাশ গাছের ফাঁক-ফোঁক দিয়ে রোদ এসে পড়ছে ওর গায়ে। গুড়ি-গুড়ি ঘাম জমা হচ্ছে শরীরে।

। ৬।
‘খানকির বিটি বলে কি-না ডাইনি। পর‍্যের মরদ খায়। একশবার খাব মাগী। ইব্যার তর মরদটাক্যে খাব। ডাইনি, ডাইনি লয়? মাগী নিজে যেমন কত ভদ্দর মেয়্যা বঠে। আমার বুক দুইট্যা দেখার লাইগ্যে তোর মরদটারও চোক লকলকায়। আমার মরদটার না হয় উটা মুতার জন্যেই ছিল, তোর মরদটার তো করার জন্যে ? কই তুই পাচ্ছিস ভাতারের ভোক মিট্যাতে? দেখবি পোকাব্যেক মাগী তোর ইয়াটা। বলে কিনা ডাইনি।’ নিজের মনেই কথাগুলো বিড়বিড় করে বলতে থাকে কাবেরী। কিছুক্ষণ হল উনুনে ঘুঁটে দিয়েছে। গোটা ঘর মম করছে ধোঁয়ায়। আজকে সকালে পুকুর ঘাট থেকে ফেরার সময় সত্যবানের বৌ কাবেরীকে শুনিয়ে শুনিয়ে কথাগুলো বলছিল পারুলের মাকে। কথাগুলো না শোনার ভান করলেও সবগুলোই শুনেছিল কাবেরী। ডাইনি কথাটা ওর হজম হয়নি।
ছোটবেলা থেকেই একটার পর একটা স্বপ্ন ভেঙেছে কাবেরীর। মাতাল বাপের ঘরে জন্মানোর অপরাধে লেখাপড়া শিখতে চেয়েও শিখতে পারেনি। বছর পনেরো হতে না হতেই গ্রামের নির্মল মাস্টারের প্রেমে পড়েছিল। পাড়ায় পাড়ায় টিউশনি পড়াত নির্মল। কাবেরীকে ভাললেগেছিল বলেই হয়তো বিনে পয়সায় পড়াত ওকে। কিন্তু প্রেমটা পাতা মেলার আগেই কাবেরীর বাবা পাতা খাওয়া পোকার মতো কেটে দিয়েছিল মেয়ের স্বপ্নগুলোকে। মদের ধার মেটাতে না পেরে পরিমলের কাছে টাকা নিয়ে কাবেরীর গলাতেই গছিয়ে দিয়েছিল পরিমলকে। দিনরাত নেশায় ডুবে থাকত পরিমল। প্রায় প্রতিদিনেই বাড়ির উঠোনে বসত মদের আসর। মদের চাট বানাতে হত কাবেরীকে। হাতে হাতে গ্লাস ধরিয়ে দিতে হত। কাবেরীর নরম হাত ধরে টানাটানি করত পরিমলের বন্ধুরা। নেশার ঘোরে মজা পেত পরিমল। কাবেরীকে শারীরিক সুখ দেওয়ার মতো ক্ষমতাও ছিল না পরিমলের। মিলন শুরুর আগেই বিচ্ছেদের সানাই বেজে উঠত পরিমলের বাঁশিতে। বিয়ের এক বছর পার হতে না হতেই কাবেরী এটা বুঝে গিয়েছিল, ওর খিদে মেটানোর ক্ষমতা পরিমলের নেই। ওই মাতাল দলের ভেতর থেকেই কাবেরী খুঁজে বের করেছিল তপনাকে। তপনার কিছু থাক না থাক শরীরী খেলায় ও লম্বা রেসের ঘোড়া।
বাড়ির উঠোনে বসে সবাই যখন নেশায় বুঁদ হয়ে নিজেদের শৌর্য-বীর্যের গল্প শোনাত, তপনা তখন সাঁতার কাটতো কাবেরীর নরম শরীরে। ধীরে ধীরে ব্যাপারটা লোক জানাজানি হল। পরিমল মরার পর সবাই জেনেছিল। এমনকি তপনার বৌ পর্যন্ত। কাবেরীর সঙ্গে বেশ কয়েকবার লেগেছিল তপনার বৌয়ের। কিন্তু কিছুই হয়নি তাতে। যখন তপনের বৌ বুঝতে পারল বেশি বাড়াবাড়ি করলে তপন পিছনে লাথ মেরে বাপেরবাড়ি পাঠিয়ে দেবে, তখন থেকে আর কিছু বলেনি।
সব ঠিকঠাক চলছিল। এই কিছুদিন হল কাবেরী ভেতর ঘরে উঁকি দিয়ে খেয়াল করেছে, ওর মন এখন অন্যকিছু চায়। প্রথম প্রথম এই অন্যকিছুটা যে কী সেটা নিজেও বুঝতে পারত না। এখন বুঝতে পারে। ও মা হতে চায়। একটা বাচ্চার জন্যে ওর ডাগর বুক দুটো এতো টনটন করে। তপনাকে বলেছিল কাবেরী। লাভ হয়নি। বিধবার মা হওয়াটা মুখের কথা নয়। গ্রামছাড়া করবে লোকে। এমনিতেই যারা কাবেরীর শরীরটা ঠিকঠাক ভোগ করতে পায়নি তাদের একটা রাগ আছে ভেতরে ভেতরে। পরিমল মরার পর অনেকেই এসেছিল কাবেরীর শরীরী গন্ধে। দু-তিনজন ছাড়া কেউ কিছুই পায়নি। পরিমল মরার পর যখন কাবেরী পায়খানা করতে যেত ? গ্রামের কত জনের যে সেই সময় পায়খানার বেগ চাপত সেটা কাবেরীর অজানা নয়। 
একমাত্র মহিম কখনো খারাপ চোখে দেখেনি কাবেরীকে। পুকুর ঘাটে কিংবা নদীর ঘাটে কখনো যদি মহিম দেখত কাবেরী স্নান করছে, ঘাটে নামত না মহিম। এতদিন কাবেরী ভাবত মহিম ওকে ঘেন্না করে বলেই কাছে আসে না। কালকে রাতে কাবেরী প্রথম বুঝতে পেরেছে মহিম ওকে আর যাই ভাবুক ঘেন্না করে না। মহিমের চোখে ধরা পড়াটাকে কিছুতেই মানতে পারছিল না কাবেরী। মহিমের কথাটার মানে বুঝতে না পারলেও কাবেরী এটুকু বুঝতে পেরেছে তপনাকে শরীর দেওয়াটা মহিমের ভাললাগে না। কাবেরীর কোথায় যেন একটা বিশ্বাস ছিল মহিম কাউকে কিছু বলবে না। সেই বিশ্বাসটার জোরেই আজকে সকালে ভাদুকে দেখার অজুহাতে মহিমের ঘরে গিয়েছিল কাবেরী। মহিম বাড়িতে ছিল না। মহিমের ফেরার অপেক্ষা না করেই ফিরে এসেছিল কাবেরী। আসার সময় মহিমের মেয়েকে ঘরে আসার জন্য বলে এসেছিল।

ভাত নামিয়ে ফ্যান গড়ানোর সময় হাজির হল পূর্ণিমা। হাতের ইশারায় কাছে ডাকল কাবেরী। ভাতের ফ্যান গড়ানো হলে দড়ির খাটিয়াটা পেতে কোলের কাছে বসাল পূর্ণিমাকে। বিয়ের পর এই প্রথম কোনও বাচ্চা ওর কোল ঘেঁষে বসেছে। কেমন যেন একটা অচেনা অনুভূতি। ভেতর থেকে একটা অচেনা সুর বেরিয়ে আসতে চাইছে। পূর্ণিমাকে আরও একটু কাছে টেনে কাবেরী জিজ্ঞেস করল, ‘তর বাপ ফির‍্যেচে ?’
খাটিয়ায় বসে পা দোলাতে দোলাতে পূর্ণিমা ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ উত্তর দিল।
‘কুতায় গ্যেইছিল তর বাপ ?’
কিছুক্ষণ ভেবে ফুলছোড়া আর প্রনাম করার ভঙ্গিতে পূর্ণিমা বোঝানোর চেষ্টা করল। 
মহিম যে পূজাদিতে গিয়েছিল সেটা বুঝতে পারল কাবেরী। পূর্ণিমার তুলতুলে দুগালে দুটো চুমু খেয়ে ঘরের ভেতর থেকে গোটা চারেক বিস্কুট এনে হাতে দিল ওর। মহিমের ঘর থেকে ফেরার পথেই কিনেছিল বিস্কুটের প্যাকেটটা। জিজ্ঞেস করল, ‘আর লিবি ?’
মাথা নেড়ে, না উত্তর দিল পূর্ণিমা। উত্তরটা দেওয়ার সময় পূর্ণিমার চোখ পড়ল কাবেরীর গোয়াল ঘরের দিকে। একটা পাঁঠিছাগল দুটো বাচ্চাকে নিয়ে বসে আছে। দু’একদিনের কচি বাচ্চা। পূর্ণিমা দৌড়ে গিয়ে বসল বাচ্চাগুলোর কাছে। বাচ্চা দুটোর মুখের সামনে একটুকরো বিস্কুট তুলে ধরল। ওরা খেলো না যখন তখন নিজের মুখেই পাচার করল টুকরোটা।
প্রায় আধ ঘণ্টার মতো ছাগলছানা দুটোর সামনেই বসে রইল পূর্ণিমা। কাবেরী দূরথেকে দাঁড়িয়ে পূর্ণিমার ভেতর এতক্ষণ নিজের মেয়েবেলাটাকে খুঁজছিল। স্মৃতিতে স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে আসছিল চোখের পাতা। খেলা সেরে পূর্ণিমা কাছে এলে ওকে বুকে না জড়িয়ে পারেনি কাবেরী। কিন্তু পূর্ণিমাকে বুকে জড়াতে গিয়েই একটা ভয় হল ওর। মহিম কিংবা পাড়ার অন্যকেউ কিছু বলবে না তো আবার ? 
‘যে যা বইলচ্যে বলুক। এমনিতেই ক্যে আর মুকটা বন্দ রাখে ?’ কিছুক্ষণ ভেবে নিজেই নিজেকে উত্তর দেয় কাবেরী। নিজের অগোচরে তাকায় ছাগলটার দিকে। উঠে দাঁড়িয়েছে ছাগলটা। দুধ দিচ্ছে বাচ্চা দুটোকে। আবার বুক দুটো টনটন করে ওঠে। পূর্ণিমা যদি ওর... ? ভাবতে পারে না কাবেরী। ওর কপালে মা হওয়ার সুখ-স্বপ্ন লেখেননি বিধাতা। তাই হয়তো পরের মেয়েকে নিজের ভাবতে গিয়েও কোথাও যেন বাজে।

দুপুরের রোদ এখন কাবেরীর উঠান জুড়ে দাউ দাউ করছে। পূর্ণিমা বাড়ি যাওয়ার পর নিজের ভেতর বিড়বিড় করেছে কাবেরী। স্বামী-সংসার বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে কোন মেয়েটা ঘর করতে চায় না ? কাবেরীও চেয়েছিল। পোড়া কপাল সাথ দিল না। ‘একন কি কিচুই করার নাই ? সব শ্যেষ ?’- এই প্রশ্নটাই কুরে-কুরে খাচ্ছে কাবেরীকে।

‘একন রাঁইধছিস নকি ? তা এখন রাঁইধলে আর খাবিটা কখন শুনি ?’ ভাবনার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে কাবেরী। তপনা এসেছে। কাবেরী ভাল মতোই জানে কেন এসেছে তপনা। আজকে রাতে কাবেরীকে কখন কোথায় যেতে হবে এটাই ও বলতে এসেছে। তপনা চাইলে কাবেরীর ঘরেই ফুর্তি করতে পারে। কিন্তু তপনা জানে এতে ধরা পড়ার ভয় অনেক বেশি।  বাইরে থেকে যে কেউ এসে দরজায় শিকল তুলে দিতে পারে।
বুকের আঁচল বাগিয়ে কাবেরী উত্তর দেয়, ‘তর বউ এর পারা আমি অত এস্পাট লই। তা এখন কী মনে কইর‍্যে?’
‘না না এমনি আইল্যম, বলি টুকু ঘুইর‍্যে আসি দেখি ছোটবউটা কী কইচ্চে।’ পান খাওয়া লালচে দাঁত গুলোকে বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে হাসে তপনা।
কাবেরী ঠোঁট উল্টিয়ে বলে, ‘বউ ভাইবল্যে ত ভাভনাই ছিল নাই। আমিও পাড়ার ম্যেয়া বউয়ের মত প্যেট ফুল্যাই ঘ্যুইরতম। বছরেই একটা কইর‍্যে ছা হত্যক তর ঘরের বউটার পারা।’
‘বড ফালতু বকিস তুই। ছা বিয়াই মা হল্যেই জীবনটা পুরা হব্যেক নাই বুঝলি। কুন্তিও তো মা হইছিল কিন্তু কেউ কন্নকে মাইন্যে লিল ? লিল নাই। লিব্যেক ক্যেন্যে বিধবার ছা কোনওদিন...’ তপনা কাবেরীর মুখ দেখে বুঝতে পারে কিছু একটা ভুল হচ্ছে। হড়বড় করে বলে, ‘ছাড় উসব রামায়ণ মহাভারত তর বুজার কথা লয়। তা সকালে যে মহিমের ঘর গ্যেছলি কিছু বইলছিল নাকি ? শালা রাত্যের বেলায় বাঁধের পাড়্যে একা একা কী কচ্চিল ক্যে জানে। শালার কইরব্যার মুরাদ নাই ধইরব্যার অস্তাদ। তবে উ শালা কাহুকে কিছু বইলব্যেক নাই। জানে তপনার পঁদে লাইগল্যে উয়ার পিচনেও দুব্বাঘাস গজা করাব।’
‘কারু পঁদে লাগা উয়ার স্বভাব লয়। আমি যখন উয়ার ঘর গ্যেছলম তখন ঘরে ছিল নাই।’
‘হ্যাঁরে উয়ার বউটা কি হাগা মুতাও বিছানাতেই করে ?’
‘তা কুত্যায় কইরব্যেক ? হাড়মাস কিছুই তো নাই। বড মায়া লাগে।’
‘তুই তো দ্যেখিস নাই বিহাঁর পরপর পাছা লাচাই লাচাই জলক্যে য্যাইত। কত লোকের নজর, উ শরীরে আর মাংস থাকে ? তবে মহিমকে সব্বশান্ত কইর‍্যে তবে যাব্যেক।’
‘সব্বশান্ত হবার আর বাকিটা কী আছে ? সবেই ত গ্যেল। কষ্ট হয় উয়াদের বিটিটার লাইগ্যে। অমন রানীর পারা বিটি...’
কাবেরীর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে তপনা বলে, ‘ইটা ঠিক্যেই বইল্যেছিস। মেয়্যাটা ববা হোক তবে সুন্দরি বঠে। এখুনি দ্যেইখেছিস ছোট ছোট লেবুর পারা হইছ্যে। ভাব পরে কী জিনিশ হব্যেক।’
হঠাৎ মাথাটা গরম হয়ে যায় কাবেরীর। ওই ছোট একটা বাচ্চা আর...  কাবেরী বলে, ‘তর বিটিটারও লেবুর পারা হইছ্যে। কদিন পরেই লাউয়ের পারা হব্যেক। লোকের বিটি বউয়ের বুকের দিকে না দেইখ্যে তো নিজের ঘরের গুল্যাইন দেখত্যে পারিস। কিছু না হক সাইজ গুল্যাই মনে থ্যাইকব্যেক।’
থতমত খেয়ে যায় তপনা। কী বলবে খুঁজে না পেয়ে বলে, ‘না মানে আমি আরকি বইলছিলম যে এই বয়সেই ডাগর হইছ্যে বিটিটা।’
‘আমিও আরকি উটাই বইলছিলম তর বিটিটাও ডাগর হইচ্যে। আর হঁ পাছা দুলানতে তর বউ এর আগে কেউ নাই। কলতলায় মরদ লোক থ্যাইকল্যে আবার বেশি-বেশি দুলে।’
রাগে লজ্জায় চোখমুখ লাল হয়ে উঠে তপনার। বলে, ‘তুই তো মাগী আমার বৌবিটিদের পঁদে ল্যাইগতে পাইল্যে আর কিছুই চ্যাইস নাই।’ কথাটা বলেই বেরিয়ে যাচ্ছিল তপনা। ফিরে এসে আবার বলে, ‘আইজ সন্দ্যায় নদী ঘাটের দিকে যাবি। ওই সেদিনের জায়গাটতে।’ কথাটা কোনও রকমে বলেই বেরিয়ে যায় তপনা।
ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে কাবেরী। এই কথাগুলো কোনও দিনেই বলতে পারেনি। আজকে যেন কী একটা শক্তি কাজ করছে ভেতর ভেতর।


Previous
Next Post »

Bigrock domain latest offer