Bengali novel, Fire asar din [part 3]

Bengali novel - Fire asar din. Written by - Bappaditya Mukhopadhyay


Bengali novel - jodi search korchen tahole ei Bangla novelta porun. Sob paben, Bangla love story to bangla politics. Sob dik diyei Fire asar din best bengali novel.

শারদীয় উপন্যাস ১৪২৬ 


 বিকেলের দিকে ফেসবুকে শিল্পীকে কয়েকটা মেসেজ করেছিল অন্তু। উত্তর আসেনি দেখে হোয়াটসঅ্যাপও করেছিল। উত্তর আসেনি। এখনো মোবাইল বেজে যাচ্ছে কিন্তু রিসিভ করছে না শিল্পী। হয়তো অভিমান হয়েছে ওর। হওয়াটা স্বাভাবিক, কালকে রাতের থেকে অন্তুকে কতবার মেসেজ করেছে ফোন করেছে কিন্তু কোনও উত্তর দেয়নি অন্তু। উত্তর কি দেওয়া যেত না ? নিশ্চয় যেত। ইচ্ছে করেই উত্তর দেয়নি। না, উত্তর দেয়নি ঠিক তা নয়, উত্তর দিতে ইচ্ছে করেনি। কিন্তু এমনটা যদি শিল্পী করত ?
সেবার প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়েছিল অন্তু। শিল্পীর ফোন বন্ধ, ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপেও অফলাইন। সারারাত মোবাইল হাতে কল করেই গিয়েছিল অন্তু। সকাল নটার পর ফোন ধরেছিল শিল্পী। কোনও কথা না শুনেই কী গালাগালিটাই না সেদিন করেছিল। কিছুই বলতে বাকি রাখেনি। এমনকি শিল্পী নিজের শরীর খারাপের কথা বললেও বিশ্বাস করেনি অন্তু। ‘তুই সিম পাল্টে অন্যকারুর সঙ্গে কথা বলছিলি ওসব শরীরখারাপ-টরীরখারাপ বাহানা। আমি কি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি ? তোদের মতো মেয়েদের স্বভাব আমার জানা আছে।’ গড়গড় করে কথাগুলো বলারপর ফোনটা কেটে সুইচ-অফ করে দিয়েছিল অন্তু। সারাদিন নদী-পারে বসে মদ গিলেছিল। চোখের জল ফেলেছিল। রাগে অভিমানে চোখের পাতা বারবার ভিজে গিয়েছিল অন্তুর। পরে রাজা খবর দিয়েছিল শিল্পীর খুব শরীর খারাপ। জীবনসুরক্ষা নার্সিং হোমে এডমিট। কয়েকটা আমড়া চুষে নেশা কাটিয়ে বাঁকুড়া ছুটেছিল অন্তু। ক্ষমা চেয়েছিল শিল্পীর কাছে। ‘আমাকে বলিসনি কেন ? তোর কিছু হয়ে গেলে...’ শিল্পীকে হাতদুটো ধরে কেঁদে ফেলেছিল অন্তু। বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল শিল্পীর মা। অন্তুর প্রশ্নের কোনও উত্তর দেয়নি শিল্পী। একবুক অভিমান নিয়ে বলেছিল, ‘খুব সহজেই তুমি আমাকে পরের করে দাও। এরপর যদি আর কোনওদিন...’ কথাটা শেষ করতে দেয়নি অন্তু। চোখের জলে ভেজা ঠোঁট দিয়ে শিল্পীর ঠোঁট বন্ধ করে দিয়েছিল।
‘কী জন্য বারবার কল করছ ?’ নদীর মেসেজটা ভেসে উঠল অন্তুর ইনবক্সে।
‘সরি’ লিখে একটা স্টিকার পাঠাল অন্তু।
‘সরি ? কেন সরি কেন ?’
‘বললাম তো সরি। প্লিজ প্লিজ রাগ করে থাকিস না।’
‘আমার যে রাগ হতেও পারে সেই বোধটুকু যে তোমার আছে এটাই তো যথেষ্ট।’
‘দেখ তুই তো সবেই শুনেছিস এমন একটা ঘটনা যে ঘটে যাবে সেটা তো কল্পনাও করিনি।’
‘আমি সেটার জন্য তো কিছুই বলছি না। কিন্তু কোথায় আছো ? কী করছ ? সেটুকুও জানানো যেত না ?’
‘ভুল হয়েছে। আর হবে না। প্লিজ রাগ করে থাকিস না।’
বেশ কিছুক্ষণ শিল্পী কোনও রিপ্লাই না দিলে অন্তু আবার ইনবক্স করে, ‘শুশুনিয়া যাবি ?’
‘না’
‘চল না ভাল লাগবে।’
‘বাড়িতে প্রবলেম হবে। আমি যেতে পারব না।’
‘তোর কলেজ টাইমে যাব বিকেলে ফিরে আসব।’
‘না আমার ইচ্ছে করছে না।’
‘ওকে’
একটা লাইক দেয় শিল্পী।
‘পরে কথা হবে। বাই।’ ফেসবুক বন্ধ করে ডাটাকার্ড অফ করে দেয় অন্তু। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোবাইলটা বিছানায় ছুড়ে দিয়ে ছাদে এসে দাঁড়ায়। সিগারেট ধরায় একটা।
‘শালা প্রত্যেক কটা মেয়ের এই এক রোগ। একবার যদি বুঝেছে আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না ব্যাস অমনি বাঁশ দেওয়া শুরু। এই জন্যই তিতলি...’ কথাটা বিড়বিড় করে বলতে বলতেও নিজের জিবটাকে সামলে নেয় অন্তু। কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে...
তখন কলেজ জীবন। একলা ভাড়া বাড়িতে থাকা। টুক করে উড়ে এসে হৃদয়ে জুড়ে বসেছিল তিতলি। সকাল বেলায় মাছ কিনতে গিয়ে ভিড়ের চাপে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ভিড় কমার অপেক্ষা করছিল অন্তু। পাশে আরেকজন ভদ্রমহিলা। ‘তুমি সুবিমলদার বাড়িতে ভাড়া থাকো তাই না ?’ জিজ্ঞেস করেছিলেন ভদ্রমহিলা।
‘হ্যাঁ। কেন বলুন তো ?’ প্রথমটায় একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল অন্তু।
‘বাংলা অনার্স ?’
‘হ্যাঁ বাংলা।’
‘না মানে আমার মেয়েটার জন্য বাংলা টিউশন পাচ্ছি না তাই ভাবছিলাম যদি সপ্তাহে কটা দিন করে একটু...’
‘কোন ক্লাস ?’ জিজ্ঞেস করেছিল অন্তু।
‘এই তো এবার উচ্চমাধ্যমিক দেবে।’
রাজি হয়ে গিয়েছিল অন্তু। পাঁচশ টাকার চুক্তিতে সপ্তাহে তিনদিন করে পড়ানো। প্রথমদিন পড়াতে গিয়েই অন্তু  তিতিলির ডানায় প্রেমের রঙ দেখেছিল। ওকে দেখেই তিতলির চোখদুটো যে আনন্দে চকচক করে উঠেছিল সেটা অন্তুর চোখ এড়িয়ে যায়নি। মুগ্ধ ভাবে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে অন্তু নিজেই নিজেকে বলেছিল, ‘সত্যিই তিতলি।’ টুকটুকে ফর্সা মুখের উপর কাজল আঁকা টানাটানা চোখ। নেশা ধরিয়ে দেওয়ার মতো গোলাপি ঠোঁট। চিবুকের নীচে ছোট্ট তিল। টিশার্টে মাথা উঁচিয়ে থাকা অপরিনিত বুক আর লেগিন্সের আভিজাত্যে মোড়া মায়াবী পায়ের গঠন। ঠিক যেন বার্বিডল। একজন কলেজ পড়ুয়া ছেলের বুকে শেল মারার জন্য এর বেশি মনে হয় আর কিছু প্রয়োজন হয় না। 
তিতলিরা ছিল দুইবোন। তিতলি ছোট। দিদির বিয়ে হয়েগেছে। বাবা শিক্ষক। শনিবার সন্ধায় ফেরে সোমবার সকালে আবার কর্মস্থল। বাড়িতে প্রাণী বলতে ওই তিতলি আর ওর মা। না, ভুল বললাম। আরেকটা প্রাণী ছিল অবশ্য। কুট্টুস। তিতিলির পোষা কুকুর।
সন্ধা হলেই তিতলির মা সিরিয়েলে ডুবে যেতেন। সিরিয়েলের করুণ কান্না ঠেকাতে তিতলিকে দরজা বন্ধ করে পড়তে বসতে হত। তারপর বন্ধ ঘরে যা হয় আরকি। এক মাস পার হতে না হতেই প্রথম চুম্বন। তারপর তিতলিকে কোলে নিয়ে কবিতা পাঠ। তারপর ফেনের বাতাসে কবিতা গল্পগুলো নিজেরাই পতপত করে সরবপাঠ করত আর তিতলির বুকে মুখগুঁজে নীরবপাঠে মগ্ন হত অন্তু।
তিতলির শরীরের প্রতিটা শিরায় শিরায় সেক্স ছড়িয়ে যখন অন্তু বলত, ‘আজকে কনডম ছাড়া একবার...’
‘না না আমার ভয় করে। যদি কিছু হয়ে যায়।’ 
‘আমি তো আছি।’
‘সেটা তো জানি কিন্তু মা যদি...’
‘কিছু হবে না। প্লিজ লক্ষ্মীটি একবার ওরিজিনাল স্বাদটা নিতে দাও।’
তিতলির নরম গলার প্রতিরোধ অন্তুকে বেশিদিন ঠেকাতে পারেনি। আসলে তিতলিও চাইত অন্যকিছুর স্বাদ পেতে। শেষ পর্যন্ত লাজুক ভয়ে মেয়েটা একদিন বলেই ফেলল, ‘ঠিক আছে, কিন্তু এই একবারই।’ 
আরেকটা সিগারেট ধরায় অন্তু। শরীরের বাইরেটার মতো ভেতরটাও ঘামছে এখন। সন্ধা নেমেছে। তিতলির হাসিটা মনে পড়ে অন্তুর। সত্যিই খুব মিষ্টি দেখতে ছিল মেয়েটা। শরীরী খেলার শেষে একদিন হঠাৎ বিছানার থেকে নগ্নদেহে নীচে নেমে তিতিলি অন্তুকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আমার বুক দুটো আরও একটু বড় হলে বেশি ভাললাগত তাই না ?’ কথাটা বলেই শরীরের চারপাশটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অন্তুকে দেখাতে দেখাতে আবার বলেছিল, ‘কোথাও মেদ নেই দেখো।’ 
উত্তর না দিয়ে তিতলির নগ্ন শরীরটার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়েছিল অন্তু। আবার কাছে টেনে নিয়েছিল তিতলিকে। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিয়েছিল তিতলির শরীরটা। বন্ধ দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে সেদিন হয়তো তিতলির মা কিছু শুনে ফেলেছিলেন।

‘অন্তু...উ তোর ফোন এসেছে...এ।’ নীচের থেকে ডাক দেয় অন্তুর মা। নীচে নেমে এসে অন্তু দেখে সি-ডি-এম-এ মোবাইলটায় শিল্পীর দুটো মিসকল। কলব্যাক করে অন্তু
‘কোথায় ছিলে ?’
‘ছাদে’
‘সিগারেট ?’
‘হুম।’
‘ওটা কমাও নতুবা পরে শরীরের ভীষণ ক্ষতি হবে।’
‘আমি তো ছেড়ে দিতে চাইছি। কিন্তু ওটাই আমাকে ছাড়তে চাইছে না।
‘ওসব ফালতু কথা বলে লাভ নেই।’
‘আচ্ছা পরে ওটা নিয়ে ভাবব।’
‘ওকে। একটা কবিতা শুনবে ?’
‘অবশ্যই শুনব। কবিতা লিখতে পারি না বলে কবিতা পড়ি না তা তো আর নয়।’
‘আচ্ছা শোনো-
মাথার উপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁটছে রাত
ভেবেছিলাম নতুন জন্ম। পরে দেখি ঘুম ভেঙেছে চোখের পাতায়।
ঘণ্টা খানেক আগে যেটা বুকের থেকে দলা পাকিয়ে গলা দিয়ে বেরিয়ে ছিল!
আত্মা ছিল না ওটা ?

এই গরমের রাতে ঘাম জেগে থাকে শরীরে। মনে।
মনে ?
মাঝে মাঝে ভাবি মন বলে সত্যিই কোনও বস্তু হয় !
নাকি এটা শরীরের ভুল ? মায়া ? প্রাচীন সংস্কার সংশয় ?

ওরা শুধু ডাকে ইশারায়
বলে, ‘এসো এসো শ্মশানে-কবরে, ভাঙাবুক দেওয়ালে
তুমিও তো দৃষ্টিহীন চোখে পৃথিবী আপন দেখেছিলে।’
যেতে হবে জানি, না যাওয়ার মতো এখানে কোনও সম্পর্ক রাখিনি
কে কার মা ? কার বাবা ? কার স্বামী ? প্রেমিকা-ই বা কার ?
সবকিছু মৃত শরীরের শবে রক্তের হাহাকার, এটুকু আজ জেনে গেছি।

তবে কেন যেতে গিয়েও বারবার পিছু ফিরে চাই ?
কেন বারবার মনে হয় আরও আরও আরও দুদণ্ড এখানে দাঁড়াই ?
কেমন লাগল ?’
‘খুব খুব খুব সুন্দর কবিতা।’
‘তুমি তো দেখছি ফেসবুকের কমন কমেন্ট কারিদের মতো। দুঃখের বার্তা লিখলেও না পড়েই বলে ভাল হয়েছে। এমন লেখা আবার লিখুন। খুব অসহায় লাগে তখন।’
‘ভাললাগাটা জানালাম। এবার সহায় লাগুক আসহায় লাগুক আমি কী করতে পারি ?’
‘কবিতাটা পড়ে তোমার কিছু মনে হল না ?’
‘কবিতার ভেতর কবির জীবনকে খুঁজলে অনেক কিছুই হয়তো চোখে পড়ে কিন্তু আমার মনে হয় কবিতায় কবিকে না খোঁজাই ভাল।’
‘আমি নিজেও জানি না কেন এমন কবিতা লিখলাম।’
‘হবে হয়তো।’ কথাটা বলেই চুপ করে যায় অন্তু। দূরের কোনও গাছে বসে পিউ কাঁহা পাখি ডাকছে।
‘কী হল চুপ করে গেলে যে ?’
‘কিছু না এমনি। বল...’
‘হোয়াটসঅ্যাপটা খোলো একবার।’
‘কেন ?’
‘আরেই খুলেই দেখো না।’
মোবাইলের ডাটাকার্ড অন করে অন্তু। হোয়াটসঅ্যাপ খোলে...

। ৮।
একটুকরো রুটি ভাদুর মুখের দিকে এগিয়ে দিয়ে মহিম বলে, ‘খালি প্যেটে ওষুদ খাইল্যে শরীদ খারাব কইরব্যেক। আর একটা রুটি খা।’
মহিমের কথায় ভাদু কিছু একটা বলার চেষ্টা করে। বলতে পারে না। শুকনো ঠোঁট দুটো কয়েকবার কেঁপে থেমে যায়।
‘কিচু বলবি ?’
ঘাড় নেড়ে ‘না’ উত্তর দেয় ভাদু। হয়তো ওর অনেক কিছুই বলার আছে কিন্তু সেগুলো না বলাই থেকে যাবে। কখনো কখনো আবার ভুলভাল নিজের মনেই বকতে থাকে। যারা বহুকাল আগে মরে ফুরিয়ে গেছে তাদের সঙ্গে গল্প করে। তখন মহিম বা পূর্ণিমা কাউকেই চিনতে পারে না। এমনকি নিজেকেও না। কষ্ট হয় মহিমের। খুব কষ্ট হয়। পূর্ণিমার চোখ লুকিয়ে নিজের চোখের জল ফেলে আসতে হয় ওকে। মেয়েটা এখন ঘুমিয়েছে। পিছন ফিরে মহিম তাকায় পূর্ণিমার দিকে। ঘরের মেঝেতে মাদুর পেতে ঘুমিয়ে পড়েছে মেয়েটা। খাবার খেয়েছে কি খায়নি সেটাও জানে না মহিম।
ভাদুকে দুধ-রুটি-ওষুধ খওয়ানো হলে বাইরে বেরিয়ে আসে মহিম। আজকে আকাশটা তারায় ভরে আছে। শিমূলগাছের মাথায় জোনাকির ভিড়। গতবছর এমন সময় বাড়ির উঠোনে পাশাপাশি খাট পেতে ভাদুর সঙ্গে শুয়ে থাকত মহিম। গল্প করত মাঝরাত পর্যন্ত। ভোরের দিকে রান্না ঘরে ঢুকে শরীরে শরীর ঘষে আগুন জ্বালাত। তারপর শোবার ঘরে গিয়ে পূর্ণিমার পাশে শুয়ে পড়ত দুজনে। এই বোবা মেয়েটাকে ঘিরেই তো ওদের চোখের পাতায় ঘুম নেমে আসত।
‘আরেকটা ছেইল্যা লিবে ?’ বছর কয়েক আগে মহিমকে একবার জিজ্ঞেস করেছিল ভাদু।
‘লিল্যে হৈত। ছ্যেলার মুক থ্যেইক্যে বাপ-মা ডাকটা শুইনত্যে না পাইল্যে ভিতরটা ঠিক ভরে নাই বল ?’
‘হ্যেঁগ পুনিটা আমাদের কোনওদিনই রা-কাইড়ব্যেক নাই ?’
‘ডাক্তর ত তাই বইল্যেচে। ইবার যদি ভগবান বলায় ত বইলব্যেক।’
‘লিব্যে আরেকটা ছেইল্যা ?’
আরেকটা মেয়ে হয়েছিল ওদের। কিন্তু এক বছর হতে না হতেই ফিরে গেল মেয়েটা। ডাক্তার কবিরাজ ওঝা কোনটা বাকি ছিল না। তবুও বাঁচল না মেয়েটা...

‘কইর‍্যে মহিম হৈল তর। আর একটু পর‍্যেই শুরু হয়্যে যাব্যেক ত।’
‘আয়র‍্যে ভিত্রে আয় পাতমা।’ পাতামের গলা শুনেই মহিমের মনে পড়ে ওর আজকে রাধানগর যাওয়ার কথা। দুপুরেই পাতামের সঙ্গে কথা হয়েছে। রাধানগরে বাউল আছে আজ।
‘তুই তাড়াতাড়ি বের‍্যা ত। বাউল যাবার আগে টুকু ঢুকত্যে হব্যেক হঁ।’
মহিম আর কথা না বাড়িয়ে ঘরের ভেতর ঢোকে। লুঙ্গিটা পাল্টে কাচা লুঙ্গি পরে। ভাদু ঘুমিয়ে পড়েছে এখন। শরীর খুব খারাপ না হলে সকালের আগে ঘুম ভাঙবে না ওর। ঘুমের ওষুধ খেয়েছে। কলমগায় রাখা কৌটোর ভেতর থেকে দুটো একশ টাকার নোট লুঙ্গির কড়ছে গুঁজে বেরিয়ে আসে মহিম।
‘মেয়্যা-লোকের মত বড দেরি করিস তুই।’
‘আর বলিস না, আমার মনেই ছিল নাই।’
‘সেটা ত বুজত্যেই পাচ্চি। চ এখন।’

খেজুর পাতায় ছাওয়া ছোট্ট কুঁড়ে ঘরটার সামনে এসে দাঁড়ায় দুজনে। ঘরটার বাইরে কিছুলোক গোল করে বসে হাঁড়িয়া খাচ্ছে। ভেতরেও বসে আছে জনা কয়েক। পাকা কুলের মতো টক গন্ধ ছড়িয়ে আছে এলাকাটায়। রাধানগরের ফুটবল খেলার মাঠ থেকে হ্যালোজেনের আলো ভেসে আসছে। ওখানেই বসেছে বাউলের আসর।
‘তুই ইখ্যানেই দাঁড়া আমি এক ভাঁড় আনছি। দুপাট কইর‍্যে খ্যাই ত, পরে দেক্যা যাব্যেক।’ কথাটা বলেই পাতাম ভেতরে ঢোকে।
মহিম খেয়াল করে দেখে যারা বাইরে বসেছে ওদের হাতে কল্কে আছে। গাঁজা খাচ্ছে ওরা। সম্ভবত হরিরামপুরের হবে। কেউ চেনা মুখ নয়। একটা গাছের নীচে কয়েকটা গরু বাঁধা আছে। এদেরেই কারু হবে। শামুকমারির হাট থেকে সোজা এখানে এসেছে। বাউল শুনে বাড়ি ফিরবে। গরুগুলোর দিকে তাকিয়ে ভোলা-শঙ্করের কথা মনে পড়ে মহিমের। সুমুকপাহাড়ির হাটে ওদেরকে বিক্রি করেছে মহিম। একবার ভাবে ওদেরকে জিজ্ঞেস করবে কত করে দাম পড়ল। পরে আবার ভাবে জিজ্ঞেস করেই আর কী হবে ? 
‘ইদিকটায় আয়র‍্যে...’ ডাকে পাতাম
লোকগুলোর থেকে দূরত্ব বজায় রেখে বসে দুজনে। পাতাম স্টিলের গ্লাসে ঢালতে ঢালতে বলে, ‘হাঁইড়্যার গ্যাইদে গন্দ মামাগ। আইজকে দিল-সে নাই।’
‘আইজকে থাইকব্যেক ক্যেন্যে-র‍্যে ? ভিড় কম হব্যেক ভাবচিস ?’
‘বাউল বল্যেই, নাহল্যে দিল-সে না পাল্যেও সিক্সটি ডেলি পাবি।’
‘আমি ত ইদিকে আসিও নাই। হপনের কাছে খাই।’
পাতাম গ্লাসটা খালি করে বলে, ‘হপনা শালা জল মিসায়। মদ খাচ্চি না মাড় খাচ্ছি ক্যেলা বুজত্যেই পারি নাই।’
‘ডেলি মিশায় নাই। ওই মাজে মাজে... এই মালটা বেশ কড়া আছে বল ?’
‘ইটা অরিজিলান মাল। দ্যেখ গলা ছুইল্যে দিচ্চ্যে।’ মুখে চানাচুর মুড়ি ফেলে লঙ্কাটায় কামড় দেয় পাতাম।
‘আচ্ছা হ্যেঁরে পাতমা ওই আশ্শমের ফকির বাবা কেন্সার সারাত্যে পার‍্যে ?’ গ্লাসে এক চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করে মহিম।
‘আমার এই ক্যেলাটা পারে। ওই মাগীগুলা রোগ সারাত্যে লয় প্যেট কর‍্যাতে যায়...’ আঙুলের অশ্লীল ইঙ্গিত করে পাতাম। আবার বলে, ‘খকনার ইয়াতে এত দম নাই যে ছেইল্যা কইরব্যেক। উয়ার বউয়েরটা ওই মামাগ ফইকর‍্যা বাবাই ফুট্যাইছে। ভুল কইর‍্যেও তোর বউকে লিয়ে য্যাইস না, নইলে...’
পাতামের মুখ থেকে কথা কাড়িয়ে নিয়ে মহিম বলে, ‘মাথাটা আমার খারাপ হয় নাই যে ওই শালার কাচকে যাব। শালার মুকটা দেখবি...’
‘মুরগির পঁদের পারা।’ গ্লাসটা শব্দ করে নামায় পাতাম।
‘ঠিক্যেই বইল্যেছিস...’ কথাটা বলতে বলতেই হেসে ফেলে মহিম।
পাতাম আরেক চুমুক দেওয়ার পর নিজেই নিজের কথাটা মনে করে হাসতে থাকে।

টলতে টলতে দুজনে রাধানগরের মাঠটার কাছে এসে দাঁড়ায়। লাল গেরুয়া পরে একতারা উঁচিয়ে এক বাউল এখন গাইছে, 
গান গাই গান প্রাণেরে বুঝাই
বুকের নদী পাগল পারা
হাল দিয়েছি বুকের মাঝে
ফলবে ফসল হৃদয় ভরা

গানের বুকে প্রেমকে পাতি
গান দিয়ে গান গানেতে মাতি
সুখের আশে বুক বাঁধি না রে ভাই
পাইলে সুখ যাব মারা

গান গাই গান প্রাণেরে বুঝাই
বুকের নদী পাগল পারা

গান আমার গলার মালা
গান দিয়ে খুলি প্রেমের তালা
প্রেমের মালিক চিকন কালা
কানের ভিতর শুনি মোহন বাঁশির সুরা

গান গাই গান প্রাণেরে বুঝাই
বুকের নদী পাগল পারা

‘গান গাই গান প্রাণেরে বুঝাই/বুকের নদী পাগল পারা- দারুণ বইল্যেচে মাইরি বল ?’ মহিমকে জিজ্ঞেস করে পাতাম।
‘মনটাকে ভর‍্যাই দিল সত্তি। তর মনে আছে তুই আমি ন্যাপলা কবিলাল সবাই মিল্যে বামুনডিঙ্গার মাঠে বাউল শুইনত্যে কবিগান শুইনত্যে য্যাইতম ?’
‘উগুল্যান কি ভুলার বঠে-রে ? শালা বার মাইল হাঁট্যেই মাইর‍্যে দিতম। ডর ভয় কিচুই ছিল নাই তকন। ন্যাপলা মত্তেই সব ফুর‍্যাইল। মাঝে মাঝে ন্যাপলাটাকে বড মনে পড়ে। সারাদিন কাঁড়া চর‍্যাই চুবি কাট্যেও বামুনডিঙ্গার পত এক দম্যে মাইর‍্যে দিত। এই শালা বিয়্যা কইর‍্যেই যত কাল হৈল।’
‘ঠিকেই বল্যেছিস। তকন শালা কারুর বাপকে ডর‍্যাতম নাই। বনের গাচ কাট্যে বিক্কি করাই বল আর বাঁধে খিয়া দিয়্যে মাছ ধরাই বল...। কন শালা ফাতর ছুড়ছিস-র‍্যে ?’ পিছন ঘুরে জিজ্ঞেস করে মহিম।
‘কন শালা-র‍্যে ?’ পাতামও হুঙ্কার দেয়।
পিছন থেকে হাতের ইশারায় কয়েকটা ছেলে ওদেরকে বসতে বলে। ওদের দেখতে অসুবিধা হচ্ছে মনে হয়। এতক্ষণে আরও একটা গান শুরু হয়েছে। একটা বাচ্চা মেয়ে গাইছে,-
বুকের ভেতর তোতা পাখি
প্রেমের গান গায়
পুষব বলে দেয় না ধরা
এখন কী করি উপায়

চোখের জলে পাখির পালক
নৌকা হয়ে ভাসে
পাখিটারে ধরবে বলে
কী জানি কখন বিড়াল আসে

বুকের ভেতর তোতা পাখি
প্রেমের গান গায়
ঘুম আসে না পাখির গানে
এখন কী করি উপায়।।

আশা ছিল নরম মনে
বানাবো বাসা বুকের কোনে
আমার আশার মুখে ছাই।।
আমায় ছেড়ে পাখি কেন
পুরুষ পানে চায়

বুকের ভেতর তোতা পাখি
প্রেমের গান গায়

‘গান গাইচ্যে পাখি, গান গাইচ্যে উদিকে ভাল্...’ মহিমকে ঠেলা দেয় পাতাম।
‘পইড়্যে যাব ধাক্কা মাচ্চিস ক্যেন্যে ? যেমনি গলা তেমনি গাইল মাইরি...’
‘গাইল লয়র‍্যে পাখি এখনো গাইচ্যে। উই দিকটায় ভাল্।’ 
এতক্ষণে মহিমের চোখে পড়ে। কাবেরী ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। হাসছে ? হবে হয়তো। দূরের থেকে বোঝা যাচ্ছে না।
‘উয়ার মরদটা কুতায় ? একা আইসব্যেক নাই।’
‘কে তপনা ?’ জিজ্ঞেস করে পাতাম।
‘তা লয় ত আবার কে ?’
‘উ শালা মাল মাইর‍্যে কুতায় পইড়্যে আচে কে জানে। বিধবা মাগী আবার হলুদ শাড়ি পইর‍্যে আইচ্যে। শালির সক কম লয়। দেক দেক কেমন শুকনির পারা ভাইলচ্যে। যা ন শালির ইয়াটা আইজক্যে ফুট্যাই দে। মাইরি বলচি তুই একবার বল্ল্যেই দিব্যেক।’
‘অমন খানকি মাগীর ইয়াতে মুতি আমি।’ পাশ ফিরে থুতু ফেলে মহিম। তারপর আবার বলে, ‘চল উদিকটায় বসি। ইখানটতে বৈসল্যে নেশা কাইট্যে যাব্যেক।’
‘তোর বইল্যেচে নাই শালা... একন ফুরত্তি করবি নাই তো বুড়াল্যে করবি ? সাপ আর এইটা...’ দুহাতের আঙুলকে বরফি বানিয়ে দেখায় পাতাম, ‘পাল্যেই মাইর‍্যে দিবি। জীবন একটা, আইজ আছিস কাইল শ্মশান।’
‘তোর ইচ্ছা হচ্ছে তুই যা...’
‘আমার মত মরদকে দিব্যেক নাই। তাছাড়া কবে ফাটাই দিতম...’ মহিমকে আবার একবার ঠেলা দেয় পাতাম, ‘এই ভাল্ ভাল্ তোকে ডাইকচ্যে।’
‘ডাকুক। গান শুনবি ত শুন না হল্যে ঘর চ।’
‘মামাগ বলচি ভাল্ ডাইকচ্যে তোকে। কিচু দরকারটাও ত থাইকত্যে পারে...’
‘আমার সাতে কনুই দরকার নাই। তকে ডাইকচ্যে তুই যা।’
‘মাইরি বলচি...’
‘বকিস না ন ক্যেলা। মন দিয়্যে গানটা শুন।’
মৌমাছি লো সই
আজ মনের কথা কই
বুকেতে বাজে মধুর বাঁশি
কেমন করি একলা রাতে রই

সকাল বেলায় সিনান ঘাটে
সখা কাপড় ধরে সাঁতার কাটে
সাঁঝের বেলা বাজায় বাঁশি
সুরেতে বাহির হই

বুকের ভিতর রাখে না আমায়
বুকের উপর রাখে
ঠোঁটের সুরে ডাকে না সখা
বাঁশির সুরে ডাকে

মৌমাছি লো সই
আজ মনের কথা কই
এখন শরীর জুড়ে শরীর খেলা
কেমন করি একলা রাতে রই


। ৯।
না এখন শুশুনিয়া যাওয়ার মতো কোনও বাস নেই। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। এই তো সবে আটটা কুড়ি, নটা দশে বাস। অন্তু আর শিল্পী বাসস্ট্যান্ডেই একটা বটগাছের নীচে গিয়ে বসে। বেশ শান্ত নিরিবিলি। কেউ ‘খাতড়া খাতড়া...’ করে হাঁকছে। কেউ আবার ‘দুর্গাপুর দুর্গাপুর দুর্গাপুর...’ কারুর সুর শালতোড়া কিংবা পুরুলিয়া মুখি। শিল্পী আনমনে তাকিয়ে আছে অচেনা লোকগুলোর দিকে। কত বাস স্ট্যান্ডের ভেতরে ঢুকছে কত বেরিয়ে যাচ্ছে। কত লোক উঠছে-নামছে।
‘এই কী ভাবছিস ?’ শিল্পীর হাতে ঝাঁকা দিয়ে জিজ্ঞেস করে অন্তু।
‘কই কিছু না তো। দেখছি মানুষগুলোকে। সবাই নিজের ভাবনার জীবন নিয়ে ব্যস্ত। এমন ভাবেই ছুটছে যেন পৃথিবীর গতি অতিক্রম করে বাইরে কোথাও যাবে। ঠিক ট্রেনের ছুটন্ত হকারের মতো। এটাই জীবন তাই না ?’
‘এই গতিটাই তো জীবন। এটা থেমে গেলেই সব শেষ।’ কথাটা বলতে বলতে একটা সিগারেট ধরায় অন্তু।
‘হুম। আনমনে এইসব দেখতে দেখতে কেন জানি না অচেনা অজানা মানুষের জন্যেও মনটা হু-হু করে ওঠে। তারপর বাবার কথা মনে পড়ে। আচ্ছা কেন এমন হয় ?’
‘ধুর পাগলী। অকারণ মনকেমন করা বারণ।’
শিল্পী ছোট্ট করে, ‘হুম’ বলে অন্তুর বাহু জড়িয়ে মাথাটা হেলান দেয়। হালকা হাওয়ায় ওর চুলগুলো অন্তুর চোখে মুখে উড়ে এসে পড়ে। শিল্পীর মাথায় মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে অন্তু।
বাসটা এসে দাঁড়াতেই উঠে পড়ল দুজন। মিনিট কয়েক পরে হেলতে দুলতে চলতে শুরু করল বাসটা। জানালার ধারে বসেছে শিল্পী। রোদের আঁচ এসে লাগছে মুখে। যতদূর দৃষ্টি যায় খাঁ-খাঁ জমি। দীর্ঘদিন আবাদ না হয়ে পড়ে আছে। জমিগুলোর বুকচিরে মাথা তুলেছে পলাশ গাছ। জমিগুলোর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে মন কেমন করা স্বাভাবিক। শিল্পী তাকিয়ে আছে বহুদূরে চরতে থাকা গরুর পালটার দিকে।
‘কীরে আবার আনমনা ? কী হয়েছে বল তো ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।
‘কিছু না।’ জানালার ওপারে মুখ রেখেই উত্তর দেয় শিল্পী।
‘কিছু তো একটা হয়েছে। কিন্তু ঠিক ধরতে পারছি না।’
‘সত্যিই কিছু হয়নি।’
‘আচ্ছা মানলাম। আমার দিকে তাকা একবার।’
ঠোঁটে ঠোঁট চাপা দিয়ে অন্তুর দিকে তাকায় শিল্পী। ওর দু’চোখের পাতায় শিশিরের মতো জল জমা হয়েছে। শিল্পীর হাত দুটোকে নিজের কোলে টেনে নিয়ে অন্তু বলে, ‘কাঁদছিস কেন পাগলী ?’
‘আমার না কেমন যেন ভয় করছে।’
‘কীসের ভয় ?’
‘জানি না। একটা অচেনা ভয় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে আমাকে।’
‘শুশুনিয়া যাচ্ছিস, সেই ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় ?’ 
‘না।’
‘তাহলে ?’
‘কেন জানি না বারবার মনে হচ্ছে তোমাকে হয়তো হারিয়ে ফেলব। তোমাকে হারিয়ে ফেললে আমি থাকতে পারব না সত্যি।’ আর কান্নাটাকে চেপে রাখতে পারে না শিল্পী। অন্তুর হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ওড়না দিয়ে চোখের জল মোছে।
‘সত্যিই পাগলী তুই।’ অন্তুরও গলটা ভারী হয়ে এসেছে।
নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বাইরের দিকে তাকায় শিল্পী। অন্তু খেয়াল করে ওদের সিটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা ওদের দিকেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। বাসটা এসে দাঁড়িয়েছে ছাতনায়। বেশ কয়েকটা ছেলে মেয়ে ঝুপঝাপ চেপে পড়ে। 
‘কোথায় নামবেন ?’ অন্তুকে জিজ্ঞেস করে একটা মেয়ে। উত্তরে শুশুনিয়া শুনে সরে দাঁড়ায়। 
এবার শালতোড়া রোড ছেড়ে শুশুনিয়ার দিকে ঘুরবে বাসটা। এর আগেও বন্ধুদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার পিকনিক করতে শুশুনিয়ায় এসেছে অন্তু। রাস্তাটা মোটামুটি ওর পরিচিত। ছেলে মেয়েগুলো কিছু একটা প্রশ্ন নিয়ে কোলাহল করছে। বিভিন্ন জনের বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা। প্রশ্নের আলোচনা করতে করতেই আড়চোখে শিল্পী আর অন্তুকে দেখছে ওরা। চিমটি কেটে ফিসফিস করছে। ইচ্ছে করেই শিল্পীর একটা হাত নিজের কোলের উপরে তুলে নেয় অন্তু।
‘ছাড়ো ওরা দেখছে।’ হাতটা ছাড়িয়ে নেয় শিল্পী।
‘দেখছে বলেই না...’
‘তুমি না খুব ইয়ে...’
‘কীসের কীয়ে ?’ আবার শিল্পীর হাতটা কোলে তোলে অন্তু।
‘এমন পিরিতি কভু নাহি দেখি শুনি।’ টোন কাটে একটা ছেলে। 
হাসি পায় অন্তুর। শিল্পীও জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে মুচকি মুচকি হাসে। অন্তু-শিল্পীকে হাসতে দেখে লজ্জায় ওই ছেলেটাও হেসে ফেলে। বাসটা চলতে শুরু করলে আবার টোন কাটে ছেলেটা, ‘আমার টুনি কথা শোনে না।’ এবার নিশানা অন্যদিকে।
‘কেউ টুনিরে বোঝাও ভাই।’ ওই ছেলেটার পাশের ছেলেটা ফোঁড়ন কাটে।
‘ভাই তোর টুনির জন্য একবার গানটা হয়ে যাক।’ এবার বাসের পিছন থেকে অন্য ছেলে।
‘টুনি আমার খুনি আসামী।’ এবার সবাই হেসে ফেলে। হাসি থামলে সমবেত কণ্ঠে গানের আবদার। ঠেলাঠেলি। শেষ পর্যন্ত ছেলেটাকে শুরু করতে হয়,-
‘ও টুনির মা তোমার টুনি কথা শোনে না
যার তার লগে ডেটিং মারে, আমায় চেনে না
ওহ টুনির মা তুমি টুনিরে বুঝাও ন
ফোন করা তো দূরের কথা মিসকলও মারে না...’ এবার অন্তু শিল্পী দুজনেই হেসে ফেলে।
পিছনের সেই ছেলেটা ফোঁড়ন কাটে, ‘পয়সা নাই ভাই গরীব গরীব।’
‘গলটা বেশ তাই না ?’ শিল্পীকে জিজ্ঞেস করে অন্তু।
‘হুম। কিন্তু টুনি কোনটা ?’
‘এখানেই থাকার কথা।’
‘আরে আছে নইলে গাইত না।’
ছেলেটা নিজের খেয়ালে গেয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে অন্যান্যরাও সুর মেলাচ্ছে।
‘টুনির মুখে মিষ্টি হাসি দেখতে চমৎকার
টুনির মতো একটি মেয়ে আমারও দরকার
টুনি পাশে থাকবো, টুনি ভালবাসবো
সুখে-দুখে একই সাথে দিন কাটাবো
ও টুনির মা তোমার টুনি...’ 
এবার সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় অন্তু। ছেলেটির উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করে, ‘ভাই টুনি কি এখানেই আছে ?’
সমবেত কণ্ঠে উত্তর আসে, ‘আছে। আছে। বাসেই আছে।’
অন্তু এবার মেয়ের ঝাঁকটা লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমাদের ভেতর কে-গো টুনি ?’
‘আমার নাম টুনি নয় বুঝেছেন।’ একটি ফর্সা ছিপছিপে মেয়ে ফোঁস করে ওঠে।
এবার হো হো করেই হেসে ফেলে অন্তু। অন্তুকে হাসতে দেখে সবাই হাসতে শুরু করে। এমনকি মেয়েটাও।
‘হেসেছে। হেসেছে।’ পিছনের ছেলেটা চিৎকার করে।
‘সব মেয়ে হাসলেই ফাঁসে না বুঝলি ব্যাঙ। তোর বন্ধুকে বলিস আমার বেয়াড়া বাঁদর পছন্দ নয়।’ আবার ফোঁস করে ওঠে টুনি।
ব্যাঙ ল্যাং খেয়ে চুপচাপ বসে পড়ে।
কিছুক্ষণের জন্য সবাই শান্ত হয়ে পড়ে। অন্তুও। বাসটা এখন একটা পলাশ জঙ্গল পার হচ্ছে। শিল্পী অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে মেয়েটার মুখের দিকে। মেয়েটা তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে। ভিড় সরিয়ে মেয়েটার সামনে এগিয়ে আসে ছেলেটা। বলে, ‘এই সবাই শুনলি তো পাপিয়া দেবীর বেয়াড়া বাঁদর পছন্দ নয়। এবার এটাও শুনে রাখ আজ থেকে এই মুখে ওই নাম আর উচ্চারণও হবে না। তোরাও আমার সামনে ওর নাম নিবি না। খুশি তো পাপিয়া দেবী ? চিন্তা নেই আমি আজকেই টিউশন ছেড়ে দিলাম। গুড বাই। এই বাস থামাও নামব...’
কয়েক মিনিটের ভেতর সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। সবাই চুপ। বাসটা থামতেই খালাসীর হাতে পয়সা দিয়ে নেমে পড়ল ছেলেটা। এখন জানালার ওপারে দেখা যাচ্ছে শুশুনিয়া পাহাড়টাকে। নীলাভ সবুজ পাহাড়।
‘এই দেখো মেয়েটার চোখ ছলছল করছে। বাস থেকে নেমেই কেঁদে ফেলবে।’ শিল্পী অন্তুর হাতটা নিজের কোলে নিয়ে কথাগুলো বলে।
‘মেয়েদের দৌড় ওটুকুই।’
‘মোটেই না। তোমাকে প্রপোজ কিন্তু আমিই করেছিলাম। তোমার সেই সাহসটুকুও ছিল না।’
‘অমন পেঁচিমুখি মেয়েকে কে প্রপোজ করত ?’
কথাটা ইচ্ছে করেই ভেতরে মেখে নেয় শিল্পী। মুহূর্তের ভেতর চোখ টলমল। একেই হয়তো বলে হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানো। সত্যিই কষ্ট পাওয়ার অধিকার থাকলে কখনো কখনো মানুষের মন নিখুঁত আর্ট হয়ে অভিমান ঝরায়।

শুশুনিয়া এলাকাটা নির্জন না হলেও জনবহুল নয়। দু-একটা দোকান দু’চারজন খদ্দের নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তেমাথার মোড় থেকে যে রাস্তাটা ডানদিকে যাচ্ছে ওটাই পাহাড়ে যাওয়ার রাস্তা। অন্তুর পাশাপাশি হাঁটতে থাকে শিল্পী। পাহাড়ি গরম বাতাস এসে ওদের চোখে মুখে ধাক্কা মারছে। ঘামছে ওরা। রাস্তাটা সোজা চলে গেছে পাহাড়ের পায়ের তলায়। ওখানে দুপাসারি পাথর মূর্তির দোকার। শুশুনিয়ার পাথর শিল্পীরা ওখানে বসে পাথর খোদাই করে। মূর্তি বানায়। বিক্রি করে। কেউ কেউ অবশ্য ঘরে বসেই পাথর খোদাই করে। তবে বেশিরভাগ শিল্পীই পাহাড়ের নীচে নিজের নিজের দোকানে বসে কাজ করতেই ভালবাসে।
পাহাড়টা যেখান থেকে শুরু হয়েছে ঠিক সেখানেই শানবাঁধানো জল নেওয়ার জায়গা। প্রায় পুরো গ্রামটা এখানের জল খায়। এখন কিছু লোক স্নান করছে। শুশুনিয়া পাহাড়ের এই রহস্যময় জলের ধারা দেখতেই বহু-বহু লোক বাইরে থেকে এখানে আসে। পাথরের একটা সিংহ মূর্তির মুখ থেকে পাম্পের মতো জল ঝরছে। ভূগর্ভের ভেতর থেকে ছুটে আসছে এই জলের ধারা। একটা সময় এই জল বোতল বন্দী হয়ে ‘শুশুনিয়া’ নামে কলকাতার বাজারেও বিক্রি হত। পর্যটকদের কথা ভেবে সরকার ওটা বন্ধ করে দিয়েছে এখন।
শিল্পীর ব্যাগ থেকে বোতলটা নিয়ে অন্তু জল ভরে নিয়ে আসে। অল্প উঁচুতে পাহাড়ে চড়ার রাস্তাটার পাশেই একটা আশ্রম। মা দুর্গার মূর্তি দেখা যাচ্ছে আশ্রমের ভেতর।
‘আমি ঘরে ফেরার পথে একটা শিবলিঙ্গ কিনব।’ শিল্পী বলে।
‘এদিক দিয়ে ঘরে ফিরব না। এদিকে চেপে ওপাশে নেমে যাব। এখুনি কিনে নে।’
একটা দোকানে গিয়ে শিবলিঙ্গ-শিবমূর্তি হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখে শিল্পী। নিখুঁত কাজ। প্রতিটা দোকানেই শয়ে শয়ে নানান দেবতার মূর্তি সাজানো আছে। সাজানো আছে পাথরের থালা-বাটি-প্রাদীপ। একটা শিবলিঙ্গ অন্তুর হাতে দিয়ে শিল্পী জিজ্ঞেস করে, ‘এটা কেমন দেখো তো ?’
‘ওটা এখানকার পাথরের। পাথরটায় পালিশ কম কিন্তু নষ্ট হবে না। এই যে এই মূর্তিটা...’ খোদাইকার একটা মূর্তি শিল্পীর হাতে দেয়, ‘এটা রাজস্থানের। পাথর ভাল। কাজ করেও আরাম। দেখুন পালিশটাও বেশি। কিন্তু পাব্লিক বলছে বর্ষার সময় মূর্তিতে জল না পেলেও মূর্তির রঙ চটকে যাচ্ছে।’
‘এমন হচ্ছে কেন ?’ অন্তু জিজ্ঞেস করে।
‘দুনম্বরি দুনিয়া দাদা, এখন পাথরের ডাস্টেও সিমেন্টের কালার ডাস্ট মিশিয়ে নতুন পাথর বানিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে। কাকে কী বলবেন ? কিছু বলতে গেলে পরিষ্কার বলে দিচ্ছে, আপনাকে বেচব না। দিদির বাঁ হাতে যে মূর্তিটা আছে ওটা নিতে পারেন। দামটাও কম পড়বে।’
‘কত দাম ওটার ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।
‘সত্তর টাকা দেবেন।’
‘সত্তর নয় পঞ্চাশ টাকায় হলে দিন...’ শিল্পী বলে।
‘পঞ্চাশে দিলে কিছুই থাকবে না দিদি। এই তো বাজার, সারাদিনে দুটো মূর্তিও বিক্রি নেই। পঁয়ষট্টি দেবেন।’
শিল্পী আরও হয়তো দাম করতেই যাচ্ছিল কিন্তু অন্তু একটা একশ টাকার নোট লোকটার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাকিটা ফেরত দিতে বলে। টাকাটা ফেরত নিয়ে অন্তু একটা গোলদারি দোকানে গিয়ে এক প্যাকেট কেক, এক প্যাকেট বিস্কুট কিনে শিল্পীর হাতে দেয়। অন্তুর দেখাদেখি শিল্পীও একটা স্লাইস কেনে। এরপর দুজনে পাহাড়ে উঠতে থাকে। পাহাড়ি রাস্তাটার দুপাশে ছোটবড় নানান ধরণের গাছ। বড় গাছগুলোর মাথায় হনুমান ঝুলছে।
‘তুমি পঁয়ষট্টি টাকা কেন দিতে গেলে ? ওটা পঞ্চাশে হয়ে যেত না ?’ অন্তুকে জিজ্ঞেস করে শিল্পী।
‘জানি হয়ে যেত।’
‘তাহলে দিলে কেন ?’
‘ওষুধ দোকানে গিয়ে দাম করিস না। সপিংমলে গিয়েও দাম করিস না। স্লাইসটার দরদাম করলি না তাহলে মূর্তিটার বেলায় কেন ? ওরা দিনরাত খেটে মূর্তিগুলো বানায়। ওদের মজুরি মেরে দেওয়াটা পাপ।’
‘কিন্তু...’
‘কোনও কিন্তু নয়, গরীবের দশ-কুড়ি টাকা মেরে দেওয়াতে বাহাদুরি নেই। রিক্সাওয়ালার পয়সা কমিয়ে বাদাম খেতে আমার দাঁতে বাজে। অন্তত আমার সঙ্গে যখন থাকবি তখন ওই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর পকেট মারিস না প্লিজ।’
‘আচ্ছাবাবা সরি। আর হবে না।’
‘সরি বলার কিছু নেই বিষয়টা যুক্তি দিয়ে বোঝা উচিৎ।’
‘বুঝলাম তো।’
‘বুঝলেই ভাল।’
‘হুম।’
আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে অন্তুর পিছনে পিছনে শিল্পী হাঁটতে থাকে। এখন নীচের দিকে তাকালে ঘরবাড়ি গুলোকে দেশলাই বক্স বলে মনে হবে। পিচের রাস্তাটা যেন কালো কালির রেখা। আর উপরে উঠবে না ওরা। এবার পাহাড়ের বাঁদিকে হেঁটে যাবে। যেদিকটা নির্জন। নিরিবিলি। যেদিকে ওদেরকে কেউ বিরক্ত করবে না।

Previous
Next Post »

Bigrock domain latest offer