Bengali novel, Fire asar din [part 4]

Bengali novel - Fire asar din. Written by - Bappaditya Mukhopadhyay


Bengali novel - jodi search korchen tahole ei Bangla novelta porun. Sob paben, Bangla love story to bangla politics. Sob dik diyei Fire asar din best bengali নভেল

ফিরে আসার দিন চতুর্থ অংশ  


‘তুই এমন মরদের সঙ্গে ক্যেন্যে আইচিস যে নিজের খেয়াল র‍্যাইকতে পারে নাই...’
কাবেরী জানত ওকে এই প্রশ্নটার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। জানত বললে ভুল বলা হবে। কাবেরী ভেতর ভেতর অপেক্ষা করছিল কতক্ষণে মহিম ওকে এই প্রশ্নটা করে। উত্তর তৈরিই আছে কাবেরীর। তবুও সময় নেয়। ভাবখানা এমন যেন কিছু একটা গভীর ভাবে ভাবছে। মাথার উপর তারা জেগে আছে এখন। ঝোপঝাড়ের ভেতর শরীর লুকিয়ে অনর্গল চিৎকার করছে রাতের ঝিঁঝিঁপোকা। বাউলগান ভেসে আসছে গুমোট বাতাসে। ভেতরে ইচ্ছে ছিল ঠিকই তবে খানিকটা হলেও পাতামের চাপেই কাবেরীর সঙ্গে বাউল ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে মহিম।
বাউল শুনতে শুনতেই উঠে এসেছিল কাবেরী। বলেছিল, ‘আমার শরীদ ভাল লাইগছ্যে নাই। আমাকে ঘরে দিয়্যে আসবি চ।’
‘তপনাকে বলবি যা। উসব আমার দারা হব্যেক নাই।’ নেশার ঘোরে নেশার জোরে কথাটা বললেও শেষ পর্যন্ত মহিমকে কাবেরীর সঙ্গে আসতেই হয়েছে। 
তপনার সঙ্গে কাবেরীর মেলামেশা নিয়ে মহিমের যে জ্বলন সেটাকে রাগ না বলে ঈর্ষা বললেই মনে হয় যুক্তি সংগত হবে। কাবেরীকে কাছে পাওয়ার ইচ্ছে যে মহিমের ছিল না এমনটা তো নয়। ভাদুর ভালবাসাকে ডিঙিয়ে কাবেরীর প্রেমে পা দেওয়ার মতো শক্তি ছিল না মহিমের। কাবেরীর দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া কিংবা কাবেরীকে গালাগালি দেওয়া সবেই তো কাবেরীর থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকার দুর্বল কৌশল ছিল মাত্র। মহিম নিজেও ভাল মতোই জানত কাবেরী ডাক দিলে এই বেড়া একদিন ভেঙে যাবে। তবে হাঁ ভাদু অসুস্থ না হলে সহজে মহিমের পা ফসকাত না। ভাদুর অসুস্থতা কিছুটা হলেও মহিমকে কাবেরী মুখি করেছে।   
‘কী হৈল চুপ মাইর‍্যে রইলি যে ?’
‘ত কী বইলব ?’
‘অমন মরদের সাতে কী জন্যে আইচিস ? সাতে কইর‍্যে মেয়্যা আইন্যে কুতায় মদ মাইর‍্যে পইড়্যে আচে।’
‘তা কেমন মরদের সাতে আইসব ? আমার পারা মেয়্যার লাইগ্যে তোদের মত মরদদের সমুই কুতায়?’
মহিম কী বলবে বুঝতে না পেরে একটা বিড়ি ধরায়। দেশলাই এর আলোয় মেঠো রাস্তাটা মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে ডুব মারে। বিড়িতে ফোঁস-ফোঁস করে কয়েকটা টান দিতেই ঝিমিয়ে পড়া হাঁড়িয়ার নেশাটা আবার চেগে ওঠে। ঠিক এমন সময় কাছাকাছি ঝোপে লুকিয়ে থাকা কয়েকটা শেয়াল হুক্কা হুয়া করে ডেকে উঠতেই মহিমের হাতটা ধরে ফেলে কাবেরী। শিরায় শিরায় শিহরণ খেলে যায় মহিমের।
‘এত রাত্যে শিয়ালগুলা মানুষের গলা পাইছ্যে তাই ডাইকছ্যে।’
‘শিয়াল ডাইকল্যে আমার ডর লাগ্যে।’
‘শিয়ালকে আবার ডরটা কীসের ? শিয়াল কী কইরব্যেক ?’
‘ক্যেন্যে সাবির বিটিটাকে ত শিয়ালেই খাইছিল।’
‘রাত্যের বেলিতে সাত মাসের ছানাকে ঘরের ফাঁকে শুয়াই রাইখল্যে শিয়ালে ক্যেন্যে বিড়ালেও খাব্যেক।’
মহিম অভয় দিলেও কাবেরী মহিমের হাত ধরেই হাঁটতে থাকে। একটা চাপা অস্বস্তি হয় মহিমের। ভাদুর শরীর খারাপের পর মহিমের শারীরিক ইচ্ছেগুলো ঘুমিয়ে পড়েছিল। ওদের ঘুম ভাঙার শব্দটুকুও এখন অনুভব করতে পারছে মহিম। কাবেরীর শরীর ছুঁয়ে যে বাতাসটা মহিমের নাকে এসে লাগছে তাতেও যেন কামনার গন্ধ মিশে আছে। মনটাকে আনমনা করার জন্যেই হয়তো বিড়িটায় আরও কয়েকটা জোরে জোরে টান দেয় মহিম।
‘কী হৈল চুপ মাইর‍্যে গেলি যে ?’ জিজ্ঞেস করে মহিম।
‘না মানে...। কিচু লয়।’
‘কী কিচু লয় ?’
‘কিচু লয় ঘর চ। ভোর হৈচ্চে।’
‘ভোর হৈত্যে ঢের দেরি এখন। আবার কী ডর লাইগচ্যে নকি ?’
‘না।’
‘তাহল্যে ?’
‘বইলব কি বইলব নাই সেটাই ভাবচি।’
‘বলার মত হৈল্যে বল।’
‘আমার গাইদ্যে জোরে মুতা লাইগ্যেছে।’
‘ত রাস্তা থেক্যে নাইম্যে ওই দিকটায় যায়্যে মুত। ইটা এত লুকাবার কী আচে।’
‘তুই ইখানেই দাঁড়া।’
কিছুটা দূরে গিয়ে শাড়ি-সায়া কোমর পর্যন্ত তুলে পেচ্ছাব করতে বসে কাবেরী। মহিম অন্ধকারের বুকচিরে এক দৃষ্টিতে কাবেরীর সাদা পাছাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। কাবেরীর পেচ্ছাবের শব্দ মহিমের শরীরে আরও তীব্র জ্বালা ধরিয়ে দেয়। নিঃশব্দে কয়েকপা এগিয়ে এসে কাবেরীর পিছনে দাঁড়ায় মহিম। ওর পেচ্ছাবের শব্দটুকুকে দুকান ভরে শুনতে থাকে। পেচ্ছাব শেষে কাবেরী উঠে দাঁড়াতেই মহিম পিছন থেকে আবার কাবেরীর শাড়ি-সায়া তুলে ধরে। হাত বোলায় কাবেরীর পাছায়। কাবেরী বাধা না দিলে মহিমের অবাধ্য ঠোঁট কাবেরীর পাছায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। পেচ্ছাবের ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে লাগে। তাতে আরও নেশা ধরে মহিমের। শিহরণে কেঁপে কেঁপে উঠে কাবেরীর শরীরটা। একটা সময় কাবেরীকে উলঙ্গ করে ফেলে মহিম। নিজেও উলঙ্গ হয়। তারপর মরা ঘাসের বিছানায় গড়িয়ে পড়ে শরীর দুটো। দু’হাত-পা দিয়ে নাগিনীর মতো মহিমকে পেঁচিয়ে ধরে কাবেরী। অপার্থিব আনন্দে মুহুর্মুহু কুঁকড়ে ওঠে ওর শরীরটা। মহিমের শারীরিক প্রতাপ কাবেরীর শরীরটাকে পাগল করে তোলে। 
বজ্রবিদ্যুতের পর এক সময় দুটো শরীর বেয়ে ক্লান্তি নামে। কাবেরীর ঘামে ভেজা বুকে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে মহিম। পূবের আকাশে লালচে রেখা ফুটে উঠছে এবার। আর কিছুক্ষণ পর ভোর হবে। কাবেরী আলতো করে মহিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। এখন নিবিড় শান্তি বিরাজ করছে দুটো রনক্লান্ত শরীরে।      

। ১১।

‘আমাকে তোমার পছন্দ হয়নি তাই না ?’
‘হঠাৎ এমন অদ্ভুত প্রশ্ন ?’
‘হটাৎ নয়। আমি জানি তবুও তোমার মুখ থেকেই শুনতে ইচ্ছে হল।’
‘মাঝে মাঝে তোর কী হয় বলত ?’ কথটা বলে গম্ভীর ভাবে শিল্পীর দিকে তাকায় অন্তু। একটা সিগারেট ধরায়। শাল গাছের ফাঁক দিয়ে এক টুকরো রোদ এসে শিল্পীর মুখে পড়ছে। বিন্দু-বিন্দু ঘাম জমেছে শিল্পীর কপালে। গলায়। থমথম করছে শিল্পীর মুখটা।
‘বাসে আমাকে পেঁচামুখি কেন বললে ? আগেও বলেছ কয়েকবার। পছন্দ না হলেই ইয়ার্কিচ্ছেলে মানুষের মুখ দিয়ে এমন কথা বেরিয়ে আসে।’ চোখ দুটো ছলছল করছে শিল্পীর।
‘আমি মোটেই তোকে পেঁচামুখি বলিনি।’
‘মিথ্যে বোলো না। বলেছ তুমি।’ গলাটাও ভারী হয়ে এসছে শিল্পীর। এবার বৃষ্টি হবে হয়তো।
‘আমি মোটেই মিথ্যে বলচি না। আমি পেঁচামুখি বলিনি। পেঁচিমুখি বলেছি।’ কথাটা বলতে বলতেই খিক্-খিক্ করে হেসে ফেলে অন্তু।
‘দেখো ভাল হবে না কিন্তু...’ চোখের জল আর আটকে রাখতে পারে না শিল্পী। অন্তু শিল্পীকে কাছে টেনে নিয়ে কোলের উপর বসায়। দুহাত দিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে বলে, ‘বড্ড অভিমানী তুই।’
শিল্পী কিছু বলে না। অন্তুর বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। পাহাড়ের গা বেয়ে অনেকটা সরে এসেছে ওরা। কয়েকটা বড় মাপের শাল গাছের নীচে পাতার বিছানা পেতে বসেছে। টুপটাপ করে পাতা ঝরে পড়ছে এখন। শাল গাছগুলোর গা বেয়ে ঝুলছে নাম না জানা অর্কিড। তারেই গন্ধ বাতাসে। শিল্পীর খোঁপাতেও কয়েকটা হলদে রঙের বুনো-ফুল। অন্তুই গুঁজে দিয়েছে ওগুলো। ‘কীরে ওলের মতো মুখ করে মাথা গুঁজেই পড়ে থাকবি বুঝি।’
‘তোমার মুখটা বেগুনের মতো।’ অন্তুর বুকে মুখ গুঁজেই উত্তর দেয় শিল্পী। গলায় এখনো কান্নার ঘড়ঘড়ানি।
‘তাও ভাল। বেগুনের একটা চকচকে ভাব আছে।’ খিল-খিল করে হাসে অন্তু।
‘তোমার চেয়ে আমার মুখটা বেশি সুন্দর বুঝলে...’ দুহাত দিয়ে অন্তুর পিঠ খামচে ধরে শিল্পী। অন্তুও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শিল্পীকে। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর অন্তু শিল্পীকে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা হঠাৎ করে হোয়াটসঅ্যাপে অমন ছবি দিলি যে ?’
‘ইচ্ছে হয়েছে তাই দিয়েছি। কেন ভাল লাগেনি ?’
‘সারারাত ঘুমোতে পারিনি।’
‘না ঘুমিয়ে কী করেছো ?’
‘সবাই যা করে তাই করেছি।’
‘কী করে জানি না তো। বলো না কী করেছো ?’ হাসতে থাকে শিল্পী। অন্তু শিল্পীর মাথায় আলতো করে একটা টোকা দিয়ে বলে, ‘তিনবার জানিস ?’
‘তাই ?’
‘হুম।’
‘আচ্ছা সত্যি করে বলো ছবিটা পছন্দ হয়েছে না হয়নি ?’ অন্তুর কোল থেকে নেমে উঠে দাঁড়ায় শিল্পী। চোখে চোখ রেখে কথাটা জিজ্ঞেস করে। অন্তু উত্তর না দিয়ে দূরের দিকে আঙুল বাড়িয়ে কিছু একটা দেখায়। শিল্পী পিছন ফিরে দেখে পাহাড়ের আরেকটা ঢাল দিয়ে একটা মেয়ে একটা ছেলের হাত ধরে উপরে উঠছে। ওরাও হয়তো নিরিবিলি জায়গা খুঁজছে শান্তিতে প্রেমালাপ করার জন্য। অন্তু কিছু বলতে যাচ্ছিল শিল্পী নিজের ঠোঁটে আঙুল চেপে চুপ করতে বলে অন্তুকে।
কারা যেন উপরে উঠে আসছে। পাহাড়ের গায়ে পড়ে থাকা শুকনো পাতায় তাদের পায়ের শব্দ শুনতে পায় অন্তু। শিল্পী অন্তুর কাছে এসে গাঘেঁষে বসে। একটা চাপা উত্তেজনায় কলকল করে ঘামতে থাকে দুজন। অন্তু ভাল মতোই জানে পাহাড়ের এমন জায়গায় বাজে লোকের হাতে পড়লে শিল্পীর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ওর একার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব হবে না। কাছাকাছি ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা পাথরকে নিঃশব্দে কুড়িয়ে রাখে অন্তু। শিল্পী ভয়ে ওর বাঁহাতের বাহু শক্ত করে ধরেছে।
‘চিন্তা করিস না আমি তো আছি...’ ফিসফিস করে শিল্পীর কানের কাছে মুখ এনে কথাগুলো বলে অন্তু।
‘খুব ভয় করছে আমার। যদি ওরা কোনও...’
‘চুপ কর শুনতে পাবে।’
পায়ের শব্দগুলো আরও কাছাকাছি আসতেই অন্তু দুহাতে দুটো পাথরকে শক্ত করে তুলে ধরে। ওরা চুপচাপ এগিয়ে আসছে। কেউ কারুর সঙ্গে একটাও কথা বলছে না। হঠাৎ আক্রমণের আতঙ্কে অন্তুর কানের পাশ দিয়ে গরম ঘাম গড়িয়ে পড়ছে এখন। ঘামে শিল্পীর চুড়িদারের বগল থেকে পিঠ পর্যন্ত স্যাঁতস্যাঁত করছে।
বেশ কিছুক্ষণ সব শান্ত। সব অসম্ভব রকম থমথমে। পায়ের শব্দগুলোও কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে। এতক্ষণে কিছু একটা দেখতে পায় শিল্পী। সেটা অন্তুকে আঙুল বাড়িয়ে দেখানোর চেষ্টা করে। ঝোপঝাড়ের ফাঁক দিয়ে পরিষ্কার দেখা যায় না। উঠে দাঁড়ায় অন্তু। কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে দুহাতের পাথর দুটো ফেলে দিয়ে হাসতে হাসতে বলে, ‘হনুমান।’
‘কৈ দেখি...’ উঠে দাঁড়ায় শিল্পী। হনুমানগুলোও অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে। ওদের এলাকায় মানুষ দেখে ওরাও হয়তো একটু অবাক হয়েছে। অন্তু শিল্পীর হাতটা ধরে বলে, ‘বসে পড়। ওদেরকে পাত্তা দিস না। একটু পরেই ওরা পালিয়ে যাবে।’ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বসে পড়ে শিল্পী।
হনুমানগুলো চলে যাওয়ার পর অন্তু বলে, ‘শালারা মুডটার বারটা বাজিয়ে দিল। ভাবলাম একটু রোমান্স করব... ধুর ভাল্লাগে না।’
‘ওগুলো মানুষ হলে কী হত শুনি ?’
‘কেলিয়ে...’
অন্তুর মুখের কথা কাড়িয়ে শিল্পী বলে, ‘থাক আর কেলিয়ে কাজ নেই। আর একটু হলেই প্যান্ট ভিজে...’
‘সেদিন পার্কে মনে আছে কাদের প্যান্ট ভিজে ছিল। তবে হ্যাঁ আজকে একটু চাপচাপ লাগছিল। দশবার জন হলে হয়তো বাজে কিছু একটা হতেই পারত...’
‘হুম। সর্বনাশ হত আমার।’
‘ওটা তো এবার হবে...’ বলেই শিল্পীকে আবার কোলে তুলে নেয় অন্তু। তারপর ওর ঠোঁট শিল্পীর ঘামে ভেজা গলার পথ ধরে ঘাড় হয়ে শিল্পীর ঠোঁটে গিয়ে মেশে। শিল্পীর ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে কিছুক্ষণ সাঁতার দেওয়ার পর অন্তু জিজ্ঞেস করে, ‘ছবির প্যান্টিটা পরে আছিস ?’
‘জানি না। নিজে দেখে নাও...’ কথাটা বলেই শিল্পী অন্তুর ঠোঁটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। অন্তু হয়তো ভেতর ভেতর এই উত্তরটারই অপেক্ষা করছিল। মুহূর্তের মধ্যে ওর হাত শিল্পীর ব্রায়ের ভেতর আত্মগোপন করে। সীৎকার করে ওঠে শিল্পী।


এখনো ব্লিড করছে শিল্পী। তবে পরিমাণ কমে এসেছে। শিল্পীর নগ্ন শরীরটার দিকে তাকিয়ে আরও একবার ইচ্ছে করছে অন্তুর। যদিও সেটা আর সম্ভব নয়। এখনো যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে শিল্পী। ওর ব্রা-প্যান্টি-চুড়িদার সব ছড়িয়ে আছে এদিক সেদিক। নিজের জামা প্যান্ট পরার পর অন্তু শিল্পীর পাশে গিয়ে বসে। পা দুটোকে সরিয়ে ব্লিডের পরিমাণটা দেখার চেষ্টা করে। তারপর শিল্পীর কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘খুব ব্যথা করছে?’
‘খুব মানে খুব ব্যথা করছে। মনে হচ্ছে পাহাড় থেকে নামতেই পারব না। আচ্ছা মা বুঝতে পারবে না তো ? আমার ভীষণ ভয় হচ্ছে কিন্তু।’
‘ধুর কেউ কিছুই জানতে পারবে না।’
‘তুমি জানো না আমার মা সব বুঝতে পারে।’
‘এটা পারবে না। আর পারলে পারবে...’
‘বাঃ পারলে পারবে ? ভয় হচ্ছে না তোমার ?’
‘কীসের ভয় ? জানতে পারলে দুজনের বিয়ে দিয়ে দেবে তাই তো ? ভালই হবে। তখন রোজ রাতে যেমন করে খুশি...’
‘থাক আর বিবরণ দিতে হবে না। আমার সব তো এদিক সেদিক ছুঁড়ে দিয়েছ, ওগুলো এবার এনে দাও।’
‘আরও কিছুক্ষণ এভাবেই থাক। দুচোখ ভরে দেখি তোর শরীরটাকে।’
‘আর দেখে কাজ নেই। আগে একটা চাকরির জোগাড় করো। টিউশন করে তো আজকের দিনে সংসার চলবে না বলো। তারপর আমার মাকে বলে একটা ভাল দিন দেখে আমাকে নিয়ে যাও। ঘরে বসে যখন খুশি যতবার খুশি দেখো। এবার আনো ওগুলো। হঠাৎ কেউ এসে পড়লে...’
‘ধুর এখানে কেউ আসবে না। আর চাকরি ? তুই তো ভাল মতোই জানিস ওটা আমাদের জন্য নয়...’
‘সেটা বললে চলবে বলো ? চেষ্টা করতে হবে না ?’
‘হুমম হবে...’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্তু। চাকরির চেষ্টা তো আর কম করেনি। চাকরি কিন্তু অধরা রয়ে গেছে। না আছে কয়েক লাখ টাকা। না আছে বিক্রি করার মতো জমি। এস-টি এস-সি ও-বি-সি ওরাই পাচ্ছে না তার আবার আমরা। কে দেবে চাকরি ? লক্ষ লক্ষ বেকার হাহাকার করছে দপ্তরের দরজায় দরজায়। একটা চিনির জন্য যেখানে হাজার হাজার পিঁপড়ের ছোটাছুটি, স্বাভাবিক ভাবেই চিনিটা সেখানে বিক্রিই হবে। চাকরিগুলোও বিক্রি হচ্ছে। যার কেনার টাকা নেই তার ওসব নিয়ে ভাবাটা সময় নষ্ট মাত্র। ভাগ্যিস টিউশনগুলো আছে।    
শিল্পী আর অপেক্ষা না করে নিজেই উঠে যায়। ব্রা-পরে প্যান্টিতে পা গলাতে গলাতে অন্তুর দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটে। অন্তু চাতকের মতো চেয়ে থাকে শিল্পীর দিকে। একটা একটা করে সব পরা হলে শিল্পী অন্তুর পাশে এসে বসে। বলে, ‘হাঁটতে খুব সমস্যা হচ্ছে। নামতে পারব তো ?’
‘না পারলে আমি তো আছি। কোলে নিয়ে নামিয়ে দেবো।’
শিল্পী কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু হঠাৎ ওর মোবাইলে ভায়োলিন বেজে উঠতেই চুপ করে যায়। ব্যাগের ভেতর থেকে বেরকরে মোবাইলটা। মোবাইলের স্ক্রিনে, ‘মা কলিং’ ভাসছে। এমন সময় শিল্পীর ক্লাসে থাকার কথা। ওর মা তো সেটা জানে, তারপরেও কল! 
‘এখন মা কল করছে কেন ?’ শিল্পীর গলায় আতঙ্কটা পরিষ্কার।
‘কোন দরকার থাকতেই পারে...’
‘কিন্তু এখন তো আমার ক্লাসের সময়।’
‘বিশেষ দরকার হতে পারে। ফোনটা ধরে বলবি স্যার মা ফোন করেছে আমি কয়েক মিনিটের জন্য বাইরে যাচ্চি। নতুবা সন্দেহ হতে পারে। কথাটা বলার পর লাউড স্পিকার দিবি।’
‘আচ্ছা। কিন্তু কিছু হবে না...’ শিল্পী কথাটা বলতে বলতেই কলটা কেটে যায়। কয়েক সেকেন্ড পর আবার কলটা আসে। কলটা রিসিভ করেই শিল্পী বলে, ‘স্যার মায়ের কল। আমি একটু বাইরে যাচ্ছি...’
‘আচ্ছা যাও।’ গম্ভীর গলাতেই শব্দ দুটো বলে অন্তু। তারপর আঙুলের ইশারায় লাউড স্পিকার দিতে বলে।
লাউড স্পিকার দিয়ে, ‘হ্যাঁ মা এখন কল করছ যে ? আমি ক্লাসে ছিলাম। বলো...’
‘তুই বাড়িতে আয়।’ শিল্পীর মায়ের গলা বেশ নার্ভাস শোনায়।
‘এখন ? কিন্তু কেন ?’
‘বাড়িতে এলেই জানতে পারবি। দেরি করিস না।’
‘আমার তো ক্লাস...’ টঁক টঁক করছে মোবাইল। মনে হয় শিল্পীর মা নিজেই ফোন কেটে দিয়েছে। ‘কেটে গেছে। আমার ভীষণ ভয় করছে। এবার কী হবে ?’
‘কিন্তু তোর মায়ের তো জানার কথা নয়।’
‘আজকে সকাল থেকেই আমার মনটা কু-গাইছিল। সত্যিই যদি মা জেনেছে আমি কলেজ ফাঁকি দিয়ে...। খুব বাজে ব্যপার হবে।’
‘চিন্তা করিস না, চল। বাড়িতে না গেলে তো কিছুই বুঝতে পারবি না।’                                 
দুজনে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে আসতে থাকে। সময়ে গাড়ি পাওয়া গেলেও বাড়ি পৌঁছাতে ঘণ্টা দুই আড়াই তো লেগেই যাবে। নীচে নামতে নামতে অন্তু খেয়াল করে শিল্পীর কষ্ট হচ্ছে নামতে। হয়তো ব্লিডিং হচ্ছে এখনো। ‘আচ্ছা সত্যিই যদি শিল্পীর মা সব জেনে গিয়ে থাকে ?’ ‘যদি শুশুনিয়া আসতে কেউ দেখেছে ?’ ‘মায়ের চাপে শিল্পী সব সত্যি বলে ফেলবে না তো ?’ বারবার প্রশ্নগুলো ঘুরে-ফিরে এসে দাঁড়াচ্ছে অন্তুর মনের ভেতর। মাথাটা ভার হয়ে আসছে। কৌশিক মারা যাওয়ার রাত থেকে ভাল করে ঘুম হয়নি ওর। আবার বাজে কিছু ঘটবে না তো ? তিতলির মুখটা চোখের পাতায় ভেসে উঠে। মাথাটা ঝাঁকিয়ে মনটাকে অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করে অন্তু। মনটা শুনছে না, আরও বেশি বেশি মনে পড়ছে তিতলির মুখটা। কদিন যেন একটু বেশি বেশি করেই তিতলির মুখটা মনে আসছে। কেন হচ্ছে এমন ? এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই অন্তুর।
‘আচ্ছা এখন বাস পাবো ?’ জিজ্ঞেস করে শিল্পী।
‘পৌনে দুটোর সময় একটা মিনি বাস আছে। পেয়ে যাব মনে হয়। তোর কি নামতে খুব কষ্ট হচ্ছে ?’
‘তা একটু হচ্ছে তবে খুব নয়। ওই বাসটা পেলেই বেশি ভাল হয়।’
‘সাবধানে পা চালিয়ে নাম। হড়বড় করতে গিয়ে শুকনো পাতায় পা ফসকে গেলেই বিপদ। এখনো মিনিট কুড়ি সময় আছে।’ বলে একটা সিগারেট ধরায় অন্তু। গাছের ফাঁক দিয়ে মাথার উপর ছেঁড়াফাটা রোদ এসে পড়ছে। ঝিমঝিম করছে মাথাটা।

। ১২।
পড়ন্ত বিকেলের রোদ এসে পড়ছে টিনের চালাটার উপর। কয়েকটা পায়রা চালায় বসে দিনের শেষ খুনসুটিতে ব্যস্ত। কয়েকটা বসে আছে দেওয়ালের গায়ে ঝুলে থাকা মাটির হাঁড়িগুলোতে। মহিম এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পায়রাগুলোর দিকে। এখন কিছুই ভাললাগছে না ওর। যুক্তি-তর্কের দরবারে এসে মনটা বারবার হোঁচট খাচ্ছে। সকাল থেকে একবারের জন্যেও কথা বলেনি ভাদু। ও কি কিছু বুঝতে পেরেছে ? কিন্তু সেটাই বা কেমন করে সম্ভব! পূর্ণিমা সেই যে বাসন নিয়ে ডোবায় গেছে ফেরার নাম নেই।
‘মহিম ঘরে আচিসর‍্যে ? মহি...ম ?’ কথা বলতে বলতেই ঘরে ঢোকে পরান।
‘খুড়া না কে-ব ?’ হকচকিয়ে জিজ্ঞেস করে মহিম। অন্যকেউ হলে হয়তো বিরক্ত হত কিন্তু পরানকে ভেতর ভেতর কোথায় যেন শ্রদ্ধা হয় মহিমের। মহিমের বাপ মরার সময় এই পরানই একমাত্র পাশে দাঁড়িয়েছিল। খাটটাকে সামনের দিকে অল্প টেনে মহিম বলে, ‘বৈস খুড়া। তা বড মনে কইর‍্যে যে-ব ?’
‘নার‍্যে টুকু দরক্যার ছিল বল্যেই আইসত্যে হৈল। বেশিক্ষণ বৈসব নাই। ফুলকি আবার ঘরে একল্যা আছে। বুজত্যেই ত পাচ্চিস সাঁঝের বেলা একা-একা ডরাব্যেক।’
‘ফুলকি আইচ্যে ?’
‘ওই গাঁয়ে শ্বশুর ঘর হৈল্যে যা হয়...।’
‘হঁ ইটা ঠিক্যেই বল্যেছ। তাহল্যে আইজক্যে আর আটকাব নাই। মেয়্যালোকের ডরটা টুকু বেশিই বঠে। এই ত কাইলক্যে রাত্যেই...’ কথাটা বলতে গিয়েও চুপ করে যায় মহিম। আর একটু হলেই মুখ ফসকে বেরিয়েই যাচ্ছিল।
‘কী হইছিল কাইলক্যে রাইত্যে ?’ পরানের চোখে মুখেও প্রশ্ন চিহ্ন ফুটে ওঠে।
‘ওই যে কাইল বাউল ছিল, ভাইব্যেছিলম যাব কিন্তুক...’ এত বড় মথ্যে কথাটা বলতে গিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই কয়েকবার হোঁচট খায় মহিম।
‘না না যাইস নাই ভাল্যই কইর‍্যেছিস। ঘরে রুগী রাইখ্যে যাওয়াটা ঠিক লয়।’ 
‘হঁ সেই লাগ্যেই ত আর...’
‘তা শুন যে লাইগ্যে আইল্যম, কাইল ঝাড়ফুঁক কত্ত্যে পলাশকলি গ্যেইছলম বুঝলি। ওই বাদলার বিটিটার উপর‍্যা বাতাস লাইগ্যেছিল সেই লাইগ্যে। ত ফিরার পতে কালাচাঁদের সাতে দেক্যা। কতায় কতায় তর কতা জিজ্ঞ্যাইস কচ্চিল আমি ত সবেই বল্ল্যইম। সব শুনার পত্তে তোদের পুনির কতা জিজ্ঞ্যাইস কচ্চিল। আমি অবশ্যি বয়্যেস কম সে কতাটা বইল্যেছি। তাও বলি তকে একবার বলাটা দরকার। সেই লাগ্যেই আইল্যম আরকি।’
‘তুমিও ন খুড়া। এখন উয়ার বিহাঁ দিব্যার বয়সটা হৈল্যই নাই। তারউপর বউটার এমন শরীদ খারাব।’
‘হঁ বঠে ত। ইটা ত আমিও জানি। আসলে কালাচাঁদের ব্যেটার বয়সটাও ত গুটেক লয়। ওই কুড়ি-বাইশ হব্যেক। জমি-জমাও ঢের। কমেঝমে চুক্যে য্যাইত...’ পরান কথাটা শেষ করার আগেই পূর্ণিমা থালা-বাসন নিয়ে ঘরে ঢোকে। পরান জুলজুলে দৃষ্টিতে তাকায় পূর্ণিমার দিকে। পূর্ণিমার থালা বাসল রাখা হলে পরান হাতের ইশারায় ডাকে ওকে। জিজ্ঞেস করে, ‘পড়াশুন্যা কচ্চিস ত ? দিন র‍্যাইত থাল ধুল্যেই হব্যেক নাই।’
পূর্ণিমা হাসি হাসি মুখে ঘাড় নেড়ে জানায় পড়াশুনা ঠিকঠাক করছে বলে। পরান পূর্ণিমা মাথায় হাত বুলিয়ে ওর হাতে একটা পাঁচ টাকার কয়েন দিয়ে বলে, ‘যা দকান থেইক্যে দুটা কিচু কিইন্যে খাবি যা।’ টাকাটা নিয়ে পূর্ণিমা একবার মহিমের মুখের দিকে তাকায়। তারপর ছুটে বাইরে বেরিয়ে যায়। পূর্ণিমা বেরিয়ে গেলে পরান আবার বলে, ‘হঁ যেটা বইলছিলম আরকি। তর মেয়্যাটা ত কতা বইলত্যে পারে নাই সেই লাইগ্যেই ভ্যাইবলম যে ছেইল্যা ভাল যদি লাইগ্যে যায় ত...... এই আরকি। তা তুই যকন বইলছিস যে একন দিবি নাই তকন আর...’ কথাটা শেষ না করেই লম্বা একটা শ্বাস ছাড়ে পরান।
‘কদিন আগুতে তারাপুর থেক্যেও দুলোক আইচিল। কিন্তু ওই যে বইল্লম, আমার বত্তমান যা অবস্তা তাতে কইর‍্যে আর সাহস হয় নাই। তারউপর পুনির বয়সটাও ত একটা কতা বঠে।’
‘দ্যেক যেটা ভাল বুজিস কর। তুই ত বাপ বঠিস আইজ হোক কাইল হোক বিটিকে ত বিহাঁ দিত্যেই হব্যেক। তোর বউটাও দেইখ্যে যাইতে পাইত্ত।’ কথাটা বলে উপরের দিকে তাকায় পরান। তারপর বলে, ‘না আইজ উঠি। ফুলকি একল্যা একল্যা কী কচ্চ্যে কে জানে। তবে আমার কতাটা তুই টুকু ভাইব্যে দেকিস...’


পাশাপাশি ঘরগুলোর শাঁখের আওয়াজ মিলিয়ে যেতেই অন্ধকার যেন মহিমের ভেতর জমাট হয়ে বসে। কিছুক্ষণ আগেই পূর্ণিমা তুলসী তলায় সন্ধা প্রদীপ নামিয়ে দিয়ে গেছে। তারই আলো ছড়িয়ে আছে উঠোনে। প্রদীপটার দিকে তাকিয়ে আকাশ কুসুম ভাবে মহিম। প্রশ্নের পোকাগুলো মাথার ভেতর কুটকুট করে চলেছে। একটা সময় ছিল যখন দশ বছরের ভেতরেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত। মহিমের মা ঠাকুমার বিয়েও অনেক কম বয়সে হয়েছে। তাই বলে আজকের দিনে...। ভাবতেই পারে না মহিম। এখন দিন পাল্টেছে। আইন কানুন সব পাল্টেছে। আগে পুলিশের ভয় ছিল না। এখন খবর পেলেই ঘাড়ে ধরে হাজতে পুরে দেবে। এই পুলিশ-টুলিশকেই বেশি ভয় মহিমের। তাছাড়া কম বয়সে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য কতদিকে কত রকমের ঘটনা ঘটছে। ঘরে টভি না থাকলেও লোকের মুখে-মুখে সবই তো কানে আসে।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই ঘর ভেতরে ঢোকে মহিম। ভাদু দেওয়ালের দিকে পাশ ফিরে শুয়ে আছে এখন। গলা দিয়ে ঘড়-ঘড় ঘড়-ঘড় একটা শব্দ বার হচ্ছে। ভাদুর মাথার বালিশটা একটু সরিয়ে বসে মহিম। মাথায় হাত বোলায়। ভাদু পাশ ফিরে তাকায় একবার। মহিম জিজ্ঞেস করে, ‘একন টুকু ভাললাইগচ্যে ?’
ভাদু হ্যাঁ-না কোনও উত্তর না দিলে মহিম আবার বলে, ‘ইবার যে অসুদ গুল্যাইন আইনলম সব দামি অসুদ। ইগুল্যানে ভাল কাজ হব্যেক।’
এবার কথা বলে ভাদু, ‘অসুদের দাম দিয়্যে ইরোগ সারব্যেক নাই। যে কটা দিন আছি যন্তনা কম হৈল্যেই হৈল। ভোলা-শঙ্করকে বিকে দামি অসুদ না আনল্যেও পাইত্তে। মুছলমানের হাতে পইড়ল্যে কাইট্যে...’ কথাটা অসম্পূর্ণ রেখেই ভাদু বলে, ‘উপর‍্যে যায়্যে আমি কী বইলব ? আমার লাইগ্যে গরু দুইট্যার জীবন...’ কান্নার চোটে কথাটা আর বলতে পারে না ভাদু। বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। মহিম ভাদুর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ওর চোখের কোনাতেও জল জমা হয়। পূর্ণিমা ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে। কোনও কিছুই ওর অজানা নয়। কিন্তু নিয়তির নির্মম বিচারে কান্নাটুকু ছাড়া ওর গলা দিয়ে কোনও কিছুই পরিষ্কার ভাবে বার হয় না।
কিছুতেই ঘুম আসছিল না মহিমের। কড়িকাঠের দিতে তাকিয়ে আকাশকুসুম ভাবছিল। ছেলেবেলার কথা। প্রাইমারি স্কুলের কথা। বাবা মায়ের কথা। বিয়ের কথা। পূর্ণিমার জন্মের কথা। ভাদুর ক্যান্সার ধরা পড়ার দিনটার কথা। এমনকি পরানের কথার রেশ ধরে পূর্ণিমার বিয়ে দেওয়ার কথাও। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাদুর গোঁগানিও যেন বাড়ে। তবুও ঘুমিয়ে আছে ভাদু। ঘুমের ওষুধের জোরেই হয়তো ঘুমোচ্ছে। ঘুমোতে ঘুমোতেই এপাশ ওপাশ করছে পূর্ণিমা। গরমে ঘামছে মেয়েটা। মহিম উঠে গিয়ে ভাদুর ঢাকাটা টেনে একটু সরিয়ে দেয়।
ঘরের উঠোনে খাট পেতে বসে মহিম। চারদিকটা অন্ধকারে ভরে আছে। রাত ডাকছে নিজের সুরে। একান্ত আত্মমগ্ন হয়ে না শুনলে রাতের ডাক শোনা যায় না। শূন্য গোয়াল ঘরটার দিকে তাকিয়ে একটা বিড়ি ধরায় মহিম। বিড়িটা টানতে টানতেই কাগজি গাছটার নীচে গিয়ে পেচ্ছাব করে। গায়ে কাঁটা দেয়। শিরশির করে উঠে শরীরটা। হঠাৎ করেই কাবেরীর পাছা দুটো মনে পড়ে। মনে পড়ে গতকালের শেষ রাতটা। এখনো পেচ্ছাবের দ্বার থেকে ভুরভুর করে কাবেরীর যৌনাঙ্গের গন্ধ ভেসে আসছে। এই গন্ধটাতেই নেশা ধরেছিল কাল। বিড়িটা টানতে টানতেই আবার খাটে এসে বসে মহিম। শরীর আবার শরীর চাইছে। ভেতরের অস্বস্তিটাকে চেপে যাওয়ার চেষ্টা করে মহিম। দূরের কোনও গ্রাম থেকে কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। এখনো ভোর হতে অনেক দেরি। 
‘শালা তপনা কাবেরীর ঘর যায় নাই ত ?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে মহিম। হঠাৎ করেই কথাটা মাথায় আসে ওর। রাগে শরীরটা রিরি করে উঠে। ‘না না গ্যেলেও কাবেরী আর দিব্যেক নাই...’ নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে মহিম। ‘কিন্তু তপনা যদি জোর কইর‍্যে...’ বিড়িটায় পর-পর কটা টান মেরে উঠে দাঁড়ায় মহিম। আকাশের দিকে তাকিয়ে রাত্রি কটা হতে পারে অনুমান করার চেষ্টা করে। ঝলমলে তারার ভিড়ে অনুমান করতে পারে না।
ঘরের সদর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে মহিম। চারদিকটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ভরে আছে। মনসা মন্দিরের বাল্বটুকু ছাড়া পুরো গ্রামটাই অন্ধকারের দখলে। ঝপ করে কাবেরীর উলঙ্গ শরীরটার উপর তপনার উলঙ্গ শরীরের ছবিটা চোখে ভেসে উঠে মহিমের। ফোঁস করে আরেকটা বিড়ি ধরিয়ে হাঁটতে শুরু করে মহিম।
অন্ধকারে পাড়ার কুকুরগুলোও মনে হয় মহিমকে চিনতে পারছে না। ঘেউ-ঘেউ করছে কুকুরগুলো। মহিম জিব দিয়ে চুকচুক-চুকচুক শব্দ করতে করতে এগিয়ে যায়। কাবেরীর ঘরটা পাড়ার এক প্রান্তে। ঘরটার চারপাশ জুড়ে পলাশ আর বাবলাগাছগুলো ভিড় করে আছে। ঘরের সামনে ডান হাতে করে মস্ত আমের গাছ। ছোটছোট আম ধরেও আছে প্রচুর। ঘরের পিছন দিকটায় একটা মরা ডোবা। ডোবাটার পাড়ে খেজুরগাছ দুটো অন্ধকারে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। দূরের থেকে দেখলে মনে হয় গাছ দুটো যেন খড়ের চালা ভেদ করে উপরে উঠেছে। নিঃশব্দে এক একটা ঘর পেরিয়ে যায় মহিম। কারুর ঘরে এখন টুঁশব্দটুকুও নেই। এদিকটায় ঝোপঝাড় বেশি বলে সাপের ভয়ে কেউ খাট বা চাটাই পেতে গরমের রাতেও বাইরে ঘুমায় না। 
কাবেরীর ঘরটার সামনে এসে দাঁড়ায় মহিম। বিড়িটায় শেষ টান মেরে সেটাকে পাদিয়ে বেশ কয়েকবার রগড়ে দেয়। কাবেরীর ঘর থেকে কারুর গলার আওয়াজ আসছে কি না শোনার চেষ্টা করে। কিছুই শোনা যায় না। এখন দরজায় টোকা দিলে হয়তো কাবেরীও শুনতে পাবে না। দেওয়াল পাশের কচু গাছগুলোকে পায়ে করে সরিয়ে-সরিয়ে ডোবাটার দিকে সরে আসে মহিম। কাবেরীর ঘরের পিছন দিকটায় একটা জানালা আছে। জানালাটার কাছে এসে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ চিন্তা করে জানালায় টোকা দেয়। ভেতর থেকে সাড়া না পেয়ে আবার টোকা দেয়। আবার টোকা দেয়। এতক্ষণে ভেতর থেকে গলার আওয়াজ ভেসে আসে, ‘ক্যে... ?’
‘আমি।’
‘আমিটা ক্যে ?’
‘মহিম-মহিম দরজা খুল।’
‘ত ইদিকট্যায় কী কচ্চিস ? টুকু দাঁড়া।’
মহিম আবার দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। তপনা যে ঘরে নেই সেটা বুঝতে পেরে ভেতর ভেতর আনন্দ হয় ওর। কিছুক্ষণ পর কাবেরী বাইরের দরজা খুলে দাঁড়ায়। মহিম দেখে কাবেরী একটা শাড়িকে বুক থেকে হাঁটু অবধি জড়িয়ে বাইরে এসেছে। সায়া-ব্লাউজ কিছুই পরে নেই। এতক্ষণ হয়তো গরমের জ্বালায় সব খুলেই শুয়েছিল। 
‘তা তুই এত রাইত্যে ? ভিত্রে আয়।’
ঘরের ভেতর ঢুকতে ঢুকতে মহিম বলে, ‘তকে দেক্যার লাইগ্যে ভিতরটা আঁকুপাঁকু কচ্চিল। তাই চইল্যে আইলম।’
কাবেরী দরজাটা বন্ধ করে বলে, ‘আমাকে দেক্যার লাইগ্যে না আমার সাতে শুয়্যার লাইগ্যে ?’
মহিম কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলে, ‘দুট্যায় বইলত্যে পারিস।’
‘হুম। সেইট্যায় বল। আমার মতন মেয়্যাকে মাঝ রাইত্যে দেক্যার লাইগ্যে কেউ আইসব্যেক নাই। এত পিরিত কারুর নাই। যৎদিন আমার শরীদ আছে তৎদিনেই মন আঁকুপাঁকু কইরব্যেক। শরীদ গ্যেল ত আঁকুপাঁকুয়ানিয় গ্যেল।’ ভেতর ঘরের দরজাটাও বন্ধ করে দেয় কাবেরী। 
‘অমন কইর‍্যে বলিস না। সবাই ত আর তপনার পারা হয় নাই।’
‘উয়ার কতা না হয় ছাড়। তুই নিজের কতাটাই ভাব। যখন ভাদিকে রোগ্যে ধরেনাই তকন কি তুই কনদিন জানত্যেও আইচিস আমি কেমন আচি না আচি। পরিমল মরার পর‍্যেও একবার আসিস নাই। কাইলক্যে রাইত্যে যদি না দিতম আইজক্যেও আসতিস নাই। সব মরদগুল্যাইন এমন পারা। কাকে কি বইলব ? বইলত্যে গেল্যেই পঁদে ঝাল লাইগব্যেক। একন মদ্দা কতা হচ্ছে তোর একটা মেয়্যা লাইব্যেক আর আমার একটা মরদ...’   
মহিম কী বলবে খুঁজে না পেয়ে ফ্যালফ্যাল করে কাবেরীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কাবেরী নিজের মনেই বলে চলেছে। কাবেরীর প্রতিটা কথায় যুক্তি আছে, এটুকু বোঝার ক্ষমতা মহিমের না থাকা নয়। এতদিন আঙুর ফল টক ভেবেই কাবেরীকে বেশ্যামাগী ছাড়া অন্য কোনও ভাষায় সম্বোধন করেনি মহিম। কালকে শরীরের স্বাদ পেতেই আজকে রাতে মেছো বেড়ালের মতো হাজির হয়েছে। এটা মহিম নিজেও জানে। এমনটাও নয় যে কালকের ঘটনাটা নেশার ঘোরে ঘটিয়েছিল মহিম। কালকের ঘটনাটা নিয়ে মহিমের আনন্দ ছিল অনুশোচনা ছিল না। তাই তো আজকে শরীরের খিদে আর মনের ঈর্ষা মেটাতেই ছুটে এসেছে।
‘...আমার বাপটা মাতাল না হৈল্যে আমার ভাল মরদও জুইটত ভাল সংসারও হৈত। কপাল, বুজলি কপাল। আইজকে দেখ শিয়াল কুকুরের পারা যে কেউ আইসছ্যে ঝাপটা ঝাপটি কইর‍্যে ফুত্তি কইচ্চে চইল্যে যাচ্চে। তুই কি ভাবিস তপনা একলা খায় ? মোটেই সেটা লয়। হঁ তপনা বহুদিন ধইর‍্যে খাইচ্চে ইটায় যা। সইন্দ্যা বেলায় কৈবরাইজ আইচিল। বইল্লম শরীদ ভাল নাই। হারামি বইল্ল, নাই থাকুক। আইচি যকন দিত্যেই হব্যেক, নইলে ডাইনি বইল্যে গাঁ ছাড়া কৈরব। শাড়ি-সায়া খুইল্যে সুত্যেই হৈল। ও বাবা কুকুরটা গ্যেল ত শিয়াল হাজির। গাঁয়ের মেম্বার বঠে দিত্যেই হব্যেক। শালারা শিয়াল কুকুর‍্যের পারা আঁচড়্যাই কামড়্যাই খায়।’
‘পরান খুড়াও আসে সৈত্তবানও আসে ?’ পরানের আসাটা শুনেই হকচকিয়ে গিয়েছিল মহিম। সত্যবানের কথা শুনে বিস্ময়ের সীমা রইল না।
‘সব শালা আসে খায় আর যায়। এই মাগীটা কী খায় কেউ জিজ্ঞ্যাইস করে ? তারবেলায় কেউ কইরব্যেক নাই। উয়াদের আর কী ? আমার শরীদ গেল্যে আরও কারুর শরীদ জুট্যাই লিবেক।’ কথাগুলো বলতে বলতেই কাবেরীর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। টিমটিমে আলোতে সেটা মহিমের দৃষ্টি এড়ায় না।
কয়েক মিনিট সব চুপচাপ। কাবেরী হাঁটুতে মুখ গুঁজে নাক টানছে। মহিম কী বলবে বুঝে উঠতে না পেরে উঠে দাঁড়ায়। কাবেরী মুখ তুলে জিজ্ঞেস করে, ‘কুতায় যাচ্চিস ?’
‘না আইজক্যে যাই অন্যদিন...’
‘জানি ইবার তর গা ঘিনঘিন কৈচ্চ্যে ?’
‘না না সেটা লয়...’
‘তাহলে পলাই যাচ্চিস ক্যেন্যে ? ল্যে যে জন্যে আইছিলি কইর‍্যে যা।’ শরীরের থেকে কাপড়টা খুলে নগ্ন হয়ে মহিমের সামনে দাঁড়ায় কাবেরী। আধমরা আলোয় মহিম দেখে, কাবেরীর বুক-পেট-গলায় এমনকি যোনির দুপাশের ঊরুতেও রাক্ষুসে নখের ক্ষতচিহ্ন।   
Previous
Next Post »

Bigrock domain latest offer