Bengali novel, Fire asar din [part 5]

Bengali novel - Fire asar din. Written by - Bappaditya Mukhopadhyay


Bengali novel - jodi search korchen tahole ei Bangla novelta porun. Sob paben, Bangla love story to bangla politics. Sob dik diyei Fire asar din best bengali novel.

(শারদীয় উপন্যাস ১৪২৬, ফিরে আসার দিন) 


জানালার ওপারে দুটো খেজুর গাছের ফাঁক দিয়ে টকটকে লাল সূর্য উঠছে। প্রতিদিন এভাবেই হয়তো সূর্যটা উঠে। তবুও কাবেরীর চোখে নতুন লাগে সূর্যটাকে। ঠিক যেমন ছোটবেলায় দেখে আসা পরিচিত সূর্যটা। ঘরের কপাট খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে কাবেরী। গোয়ালঘরের ভেতর ঢুকে ছাগলটাকে দেখে। একটা বাচ্চা মায়ের পাশে বসে আছে, আরেকটা দুধ খাচ্ছে মনের আনন্দে। কাবেরীর মুখে একটা হাসির রেখা ফুটে ওঠে। সব কেমন যেন নতুন লাগছে। অথচ কোনও কিছুই আজকের নতুন দেখা নয়। মায়ের পাশে বসে থাকা বাচ্চাটাকে কোলে নেয় কাবেরী। বাচ্চাটার মাথায় গাল বুলিয়ে আদর করে। তারপর বাচ্চাটাকে নিয়ে গোয়ালঘর থেকে বাইরে আসে। উঠোনে পেতে রাখা খাটে এসে বসে। চুমু খায় বাচ্চাটার মাথায়। বুকদুটো টনটন করে। মা হতে না পারার যন্ত্রণাটা যেন জেগে উঠতে চায়।
‘তুই মা হবি কাবেরী ?’ ঠিক এই কথাটাই গতকাল ভোররাতে জিজ্ঞেস করেছে মহিম। একবার নয় দু’দুবার জিজ্ঞেস করেছে। হাঁ না কিছুই বলতে পারেনি কাবেরী। ডাগর চোখে মহিমের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। হঠাৎ মহিম কেন এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছে সেটা জানে না কাবেরী। জানতেও চায় না। স্বপ্ন দেখতে ওর ভয় করে। তাছাড়া বিধবাকে স্বপ্ন দেখার অধিকার বিদ্যাসাগর দিলেও বিধাতা যে দেয়নি এটুকু বোঝার ক্ষমতা কাবেরীর আছে। 
গ্রামের অঙ্গনওয়াড়ি দিদিমুনি কাবেরীকে একবার বলেছিল, ‘তুই আবার বিয়্যা কর কাবেরী। একটা বাচ্চাকাচ্চা হৈলে সব ভুইল্যে জীবনটা লতুন কইর‍্যে শুরু কত্ত্যে পারবি। এখন তো কত কত বিধবার বিয়্যা হৈচ্ছে। বিধবার বিয়্যা আইন সম্মত বঠে...’ আরও কত কিছুই না বলেছিল দিদিমুনি। সেদিন সেসব কথাগুলো শুনতেও ভাল লেগেছিল কাবেরীর। কিন্তু বিয়ে আর হল কোথায় ? নিজে গিয়ে তো নিজের জন্য পাত্র খোঁজা সম্ভব ছিল না। বাধ্য হয়েই পরিমলের ঘরে পতিতা হয়ে পড়ে রইতে হয়েছে। যে পেরেছে শরীরটা খুবলে খেয়েছে। কেউ বিয়ের কথাই বলেনি তার মা হওয়া। এই প্রথমবার কেউ মা হওয়ার মন্ত্র শুনিয়েছে ওকে। সেটা শোনার পর থেকেই শরীর জুড়ে কেমন যেন একটা নেশা ধরেছে।
ছাগলের বাচ্চাটাকে নিয়ে শুয়ে পড়েছে কাবেরী। শাড়ির আঁচলটা সরিয়ে বুকের বোঁটায় মুখ লাগিয়ে দিয়েছে বাচ্চাটার। বেশ কয়েকবার চাটাচাটি করারপর বোঁটাটায় টান দেয় বাচ্চাটা। কিছুই পায় না। মুখে করে বার দুয়েক গুঁতিয়ে আবার টান দেয়। থরথর করে কেঁপে উঠে কাবেরীর শরীরটা। বুকে ব্যথা লাগে। বাচ্চাটাকে নামিয়ে দিয়ে নিজের মনেই খিলখিল করে হাসে কাবেরী। বাচ্চাটা দৌড়ে ওর মায়ের কাছে যায়। চুক-চুক শব্দে বাঁটগুলো টানতে শুরু করে।
ঘরের কোনায় জমা করে রাখা পাতপালা দিয়ে উনুনটা ধরায় কাবেরী। তারপর টিনের বাটিতে চা-চিনি-জল একসঙ্গে চাপিয়ে দিয়ে বাবলা দাঁতনে দাঁত ঘষতে থাকে। চা এর জল ফুটতে শুরু করলে মুখটা ধুয়ে নেয়। আজকে ওকে একবার মহিমের ঘরে যেতে হবে। কী জন্য যেন যেতে বলেছে মহিম। গরম চা-এ বাসি রুটি ডুবিয়ে খেতে খেতে ভাবনার ভিড়ে ডুবছে আর উঠছে কাবেরী। মাঝে-মাঝে কুয়াশা জমছে চোখের পাতায়। আবার কল্পিত সুখের ইশারায় সেই কুয়াশা কেটেও যাচ্ছে। তবুও একটা ভয় বুকের ভেতর ঘুরঘুরে পোকার মতো ঘুরঘুর ঘুরঘুর করেই চলেছে। পোকাটাকে দূরে তাড়ানোর চেষ্টা করেছে কাবেরী কিন্তু বেয়াড়া পোকাটা ঘুরেফিরে আসছে আবার। পোকাটাকে পা’দিয়ে মাড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। নিশপিশ করছে পা’দুটো, কিন্তু নাগালের ভেতরে থেকেও ধরা দিচ্চে না পোকাটা।
চা-রুটি খাওয়ার পরেও আরও কিছুক্ষণ বসে রইল কাবেরী। ভাবনার ভেতর ছোটবেলার দিনগুলো ঘুরছে এখন। মায়ের মুখটা মনে পড়ছে। আর সেই পোকাটা ? হাঁ সেটা আছেই। যখনি ভেতর থেকে কাবেরীর মনটা কাবেরীকে জিজ্ঞেস করছে, ‘তুই মা হবি কাবেরী ?’ ঠিক তখনই পোকাটা ঘুরেফিরে আসছে। ঘরদোর এখনো ঝাঁট দেওয়া হয়নি ভেবেই উঠতে যাচ্ছিল কাবেরী ঠিক সেই সময় বাইরের দরজায় টুকটুক করে টোকা পড়ল।
‘কাবেরী একবার দরজাটা খুল দরকার আছ্যে...’ তপনার গলা। বুকের ভেতরটা রাগে রিরি করে উঠল কাবেরীর। ঘরের কোনায় দাঁড় করিয়ে রাখা বঁটিটার দিকে একবার চেয়ে নিল। সদ্য শানদেওয়া বঁটিটা চকচক করছে। 
এর আগেও বহুবার কাবেরীকে বহু জায়গায় নিয়েগিয়ে লাপাতা হয়েছে তপনা। কিন্তু কাবেরীর এমন রাগ হয়নি কোনওদিন। তবে কি মহিমকে বুকের ভেতর পেয়ে ধামাচাপা দেওয়া রাগটা ফুঁপিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে ? হবে হয়তো। তপনার মুখের উপর দরজাটা খুলে দাঁড়াল কাবেরী। তপনা ঘরের ভিতর ঢুকতে যাচ্ছিল। কাবেরী দুহাত দিয়ে দরজা আগলে বলল, ‘যা বলবি বাইর‍্যে দাঁড়্যাই বল।’
‘ক্যেন্যে ভিত্রে ঢুইকল্যে কী হব্যেক ?’
‘অনেক কিচুই হব্যেক।’
‘দেকি ত কী হয়।’ কাবেরীর হাত সরিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে তপনা।
‘এই শালা তপনা...’ তপনার গলাটা চেপে ধরে কাবেরী। খকখক করে কেশে উঠে তপনা।
নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘মাগী নতুন মরদের বল পাইছ্যিস লয় ? তাহলে হিমানী ঠিক্যেই দেক্যেছে মহিম শালা আইচিল। তর বিষদাঁত আমি ভাইঙ্গে দিব, আমার নামও তপনা বঠে।’ কথাটা বলার পর আরও কিছুক্ষণ খকখক করে তপনা।
‘আমি আমার শরীদের উপর কাকে শুয়াব সেটা আমি ভাইব্য। খবুড়দার আমার দরজায় পা দিবি মাঁমেগুয়া। নইলে যেটার লাইগ্যে আসিস সেট্যাই কাইট্যে কুকুরক্যে খাঁওয়াই দিব। তখন মুতার লাইগ্যে ঝাঁপাই মরবি।’
‘দাঁড়া মাগী দাঁড়া তর দিন আইসছ্যে। সেদিন ক্যেন্যে তুই বাউল শুন্যার লাইগ্যে অত লাফাচ্চিলি সেটা বুজ্যেছি...’
আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল তপনা কাবেরী ওর মুখের কথা কাড়িয়ে নিয়ে বলে, ‘যা বুজ্যেছিস বুজ্যেছিস। ইবার যদি দেখ্যি আমার ঘর দুয়্যারে আইছিস খালভর‍্যা, তাহল্যে তুই যা বুজবি সেটা ইয়ার আগুতে তকে কেউ বুজায় নাই। ইবার ইখ্যান ছাইড়্যে দূর-হ...’
‘আমিও দ্যেইখব লো মাগী এই রসের ব্যাইড় তর কতদিন থাকে।’
‘দূর-হ খালভর‍্যা আমার দুয়ার থ্যেইক্যে।’ বলেই তপনার মুখের উপর দরজাটা বন্ধ করে দেয় কাবেরী।
তপনা গজগজ করতে করতে চলে যাওয়ার পর ঘরেঢুকে শুয়ে পড়ে কাবেরী। বালিশে মুখ চাপাদিয়ে কাঁদতে থাকে। ও নিজেও জানে এর পরিণাম কী হতে পারে। আজকেই হয়তো...। ‘যা হবার হোক...’ মুহূর্তের ভেতর নিজের শক্তিটাকে ফিরে পেয়ে চোখের জল মুছে উঠে বসে কাবেরী। ‘অনেক হইচ্যে আর লয়...’ দিনদিন শেয়াল কুকুরের সংখ্যা বাড়ছে। এবার ফোঁস করতে না পারলে মরা ছাড়া ওর আর রাস্তা রইবে না।
ঘরের জানলা কপাট বন্ধ করে রাস্তায় বেরিয়ে আসে কাবেরী। চোখ পড়ে পলাশ গাছগুলোর উপর। কচিকচি পলাশ পাতা থেকে ভুরভুর করে গন্ধ বেরিয়ে আসছে। আর কদিন পরেই শিবের গাজন। মেলা বসবে নদীর পারে। চড়কমেলা। হাঁটতে হাঁটতে মেলার দিনটা ভাবতে থাকে কাবেরী। মনের ভেতরকার রাগটা থিতিয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। এখন পথের ধারে, কপাট-জানালার ফাঁকে কত কৌতূহলী চোখ চেয়ে আছে ওর দিকে। ওরা জানতে চায় কাবেরী কোথায় যাবে। কাবেরী দেখেও দেখে না। নিজের মনে হাঁটতে থাকে। ও জানে ওদেরকে পাত্তা দিলেই পেয়ে বসবে ওরা। প্রশ্নের পাহাড় বানিয়ে পথ আগলাবে। ওরা সবাই মানুষের মতোই দুমুখো। এক মুখে সমবেদনা জানিয়ে আরেক মুখে কামড়ায়। ওরা সব জেনেও কিছুই জানে না কিংবা উল্টোটা কিছুই না জেনেও সব জানে ওরা।

। ১৪।
ফোনের রিংটোন বাজছে। ‘বাজুক শালা ধরবই না ফোনটা...’ পকেটে হাতটা ঢোকাতে গিয়েও হাতটা বেরকরে নিল অন্তু। সকাল থেকে স্নান খওয়া চুলোয় গেছে। কালকে বিকেল-সন্ধায় ঘরে ফেরার পর থেকে শিল্পীর কোনও খবর নেই। না মেসেজ না ফোন। ফেসবুক হোয়াটস্অ্যাপেও অনলাইন আসেনি একবারও। কালকে সারারাত দুশ্চিন্তায় ঘুম আসেনি ওর। একবার বিছানা একবার ছাদ করে করেই রাত গছে। রাত নটা-দশটা পর্যন্ত যখন কল আসেনি তখন ভয় হয়েছে অন্তুর। সম্ভাব্য বিপদগুলোর কল্পনায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছিল মনটা। বারবার শিল্পীকে হারিয়ে ফেলার ভয় হচ্ছিল। এভাবেই তো একদিন হারিয়েছিল তিতলি। আবার রিং হচ্ছে মোবাইলে। এবার বেশ বিরক্ত হয়েই ফোনটা পকেট থেকে বের করল অন্তু। না শিল্পীর কল নয় রাজা কল করছে। রাগটা আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল এতে। রিসিভ করব কি করব না করতে করতেই কেটে গেল কলটা। অন্তু দেখল মোবাইলের স্ক্রিনে রাজারেই দুটো কল এসেছে। মানে আগের কলটাও শিল্পীর ছিল না। আবার কল আসছে...
‘হ্যালো...’ অন্তু এমন ভাবেই হ্যালো করল যেন নম্বরটা সেভ নেই ওর।
‘শালা ফোনটা ধরতে কি ফাটছিল নাকি ?’ রাজার গলায় বিরক্তির ভাবটা পরিষ্কার।
‘না মানে একটু...’
‘থাক থাক আর মানে শুনে কাজ নেই তাড়াতাড়ি স্পন্দন নার্সিং হোমে চলে যা।’
‘কেন বলত ?’ ভয়ে ভেতরটা ছলাৎ করে উঠল অন্তুর।
‘তুই জানিস না কিছু ?’
‘নারে ভাই। বল তো কী ব্যপার ?’ এবার কথাগুলোও লাটিয়ে গেছে অন্তুর। নিশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।
‘আরে গতকাল দুপুরে শানুর এক্সিডেন্ট হয়েছে তো। সিরিয়াস অবস্থা শুনলাম ভাই। পারলে একবার ঘুরে আয়। দরকার হলে আমার বাইকটা নিয়ে যা।’
‘তুইও চল না আমার সঙ্গে। একা একা...’
‘আরে আমি তো কালকে থেকেই বিষ্ণুপুরে আছি। শানুর ব্যাপারটা রঞ্জনের কাছে শুনলাম। আর হাঁ তোকে একটা ভাল খবর দেওয়া হয়নি।’
‘কী খবর ?’
‘বড়দির ছেলে হয়েছে বুঝলি। বাড়ি গিয়ে পার্টি হবে।’
‘মামা হয়ে গেলি তো তাহলে ?’
‘হুম। আচ্ছা শোন এই নিয়ে পরে কথা হবে। আমাই ঘরেই মোটর সাইকেলটা আছে। মাকে গিয়ে বলবি গাড়ির চাবিটা লাফিং বুদ্ধর নীচে রাখা আছে। বললেই চাবিটা দিয়ে দেবে।  তাছাড়া এক কাজ কর, তুই সাইকেল নিয়ে আমার বাড়ি চলে যা। আমি মাকে ফোন করে বলে দিচ্ছি।’
‘সেটাই বরং ভাল। আর হাঁ ভাগ্নের একটা ছবি মনে করে হোয়াটস্অ্যাপ করিস।’
‘সিওর। সিওর।’
ফোনটা কাটার পর একটা সিগারেট ধরাল অন্তু। আজকে বিকেলের টিউশনটা হয়তো হবে না। মোবাইলটা নিয়ে ফটাফট একটা মেসেজ লিখল, ‘আজকে আসিস না। বিশেষ দরকারে বাইরে যাচ্ছি। বরং কালকে চলে আসিস। সবাইকে জানিয়ে দিস মনে করে।’ বিপুল নামের একটা ছাত্রকে সেন্ড করল মেসেজটা। এদিক দিয়ে অন্তুর নিশ্চিন্ত জীবন। সপ্তাহে যে কোনও তিনদিন পড়িয়ে দিলেই হল। শুধু সবার সময়ের সঙ্গে সময় মিলিয়ে নিতে হবে।
সিগারেটটা শেষ করে সবে স্নানে ঢুকেছে, আবার ফোন বাজতে শুরু। বাধ্য হয়েই বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসতে হল অন্তুকে। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে আননোন নম্বর। বিপুল কিংবা শিল্পী হতে পারে ভেবেই ফোনটা রিসিভ করে অন্তু, ‘হ্যালো কে ? হ্যালো...’ ওপার থেকে টিভির আওয়াজ আসছে কিন্তু মুখে কোনও সাড়াশব্দ নেই। ‘হ্যালো কে?’ আবার জিজ্ঞেস করে অন্তু। এবারেও কলার নীরব শ্রোতা। ফোনটা কেটে কলব্যাক করে অন্তু। রিং হতে না হতেই রিসিভ হয় ফোনটা। কিন্তু এবারেও ওই টিভির শব্দটুকুই যা কানে আসে। ‘শালা কথা বলার নেই তো কল করিস কেন হারামজাদা ?’ বলে ফোনটা কেটে দেয় অন্তু। একরাশ বিরক্তি নিয়ে আবার বাথরুমে ঢোকে। ঢুকেই জলের কলটা খুলে দেয়। হদহদ শব্দে বালতিটা ভরতে থাকে। এই বালতিটুকু ভরে যাওয়ার ফাঁকে আননোন কলটা কে করতে পারে একবার ভেবে নেয়। নিশ্চিত ভাবে কারুর নাম মাথায় আসে না। বালতিটা ভরে বাইরে জল পড়ছে এবার...
জামা-প্যান্টটা পরেই মাকে একটা কল করে অন্তু। মাকে না জানিয়ে গেলে চিন্তায় চিন্তায় মাথা খারাপ করে বসে থাকবে। হয়তো সেন্টার থেকে ফিরে কিছু খাবারও খাবে না, এটা ভালমতো জানে অন্তু। আগেও এমনটা হয়েছে। রিং হচ্ছে মোবাইলে। অথচ সেই রিংটোনের শব্দ অন্তু নিজেও শুনতে পাচ্ছে। রান্না ঘরের ভেতর বাজছে মোবাইল। রান্নাঘরে ঢুকে অন্তু দেখে সব্জির ঝুড়িতে মোবাইল। মুচকি হেসে একটা চিরকুট লিখে খাবার টেবিলের উপর মোবাইলটা চাপা দিয়ে দেয়।

স্পন্দন নার্সিং হোমের সামনে গিয়ে অন্তু যখন দাঁড়ায় তখন ঘড়ির কাঁটা পৌনে-পাঁচের ঘরে। রাজার মাকে সাতকাণ্ড রামায়ণ শোনাতে গিয়েই এত দেরি। ‘কে ভত্তি ?’ ‘ওমা তাই ?’ ‘তা কখন হৈল ?’ ‘কী কইরে?’ ‘না দেইক্যে সাইক্যেল চালাচ্চ্যিল নাকি ?’ ‘টাকের ড্রাইভার কি মদ খায়্যে ছিল ?’ ‘তা ভত্তি কুতায় কইর‍্যেছে?’ প্রশ্নের মেশিনগান রেডি করেই বসেছিলেন মনে হয়। একটা উত্তর দেওয়ার আগেই দুটো প্রশ্ন।
নার্সিং হোমের বাইরে যেমন ভিড় ভেতরেও তেমন। আরেকবার শিল্পীর মোবাইলে কল করে অন্তু। এবার সুইচ অফ। অন্তু চারদিকটা ভাল করে তাকিয়ে দেখে পরিচিত কেউ আছে কি না। কাউকে দেখতে না পেয়ে অনুসন্ধানে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা শান্তনু ব্যানার্জ্জী কত নম্বর রুমে আছে ?’
‘শান্তনুউউউ... ব্যানার্জ্জী , হাঁ ১২১ নং রুম। তিন তলায় উঠে ডান দিকে।’ মিষ্টি দেখতে মেয়েটি মিষ্টি ভাবেই উত্তর দিল অন্তুকে। অন্তু ততোধিক মিষ্টি সুরে ‘ধন্যবাদ’ জানিয়ে ছুটল উপরে।
১২১ নং রুমের সামনে এসে অন্তু দেখে রুমের দরজা খোলা। ভেতরে শিল্পীর মা একা বসে আছে। যে বেডে শান্তনুর থাকার কথা সেটা শূন্য। শিল্পীও নেই রুমের ভেতর। দরজার বাইরে জুতা খুলে ভেতরে ঢোকে অন্তু। শিল্পীর মাকে জিজ্ঞেস করে, ‘এখন শান্তনু কেমন আছে কাকিমা ?’
‘ক্যে ?’ পিছন ঘুরে অন্তুকে দেখে বলে, ‘ও তুই আইচিস। আমি ভাইবলম...। এখনো-আইসি-ইউ থেকে ছাড়্যে নাই। বইল্যেচে বাহাত্তর ঘণ্টা পার না হৈলে কিচুই বলা সম্বব হবে নাই।’
‘চিন্তা করো না কাকিমা। সব ঠিক হয়ে যাবে।’ 
‘কী কইর‍্যে যে কী হব্যেক সেটাই তো বুইজত্যে পাচ্চি নাই। হ্যাঁরে বাবা শানু ভাল হব্যেক ত ?’
‘কেন হবে না, নিশ্চয় হবে।’
‘কাইল ভাত খায়্যে ক্যেন্যে যে আবার বের‍্যাইল... কপাল কপাল। কিন্তু আমি ত কারুর কনদিন খতি করি নাই তাহল্যে শানুটার এমন ক্যেন্যে হৈল ?’ বলে নিজের কপাল চাপড়ায় শিল্পীর মা। অন্তু পাশে এসে বসে। বাঁহাতটা শক্ত করে ধরে বলে, ‘এখন আপনাকে শক্ত হতে হবে কাকিমা। এখন এমন করলে চলে ? সব ঠিক হয়ে যাবে।’
‘ডাক্তার বইল্যেচে মাথায় চোট লাইগ্যেছে...’
‘ও কিছু না অল্প আঘাত লেগেছে হয়তো, আপনি চিন্তা করবেন না...’ অন্তুর মোবাইলটা বাজতে শুরু করে। আবার সেই নম্বরটা। ফোনটা কেটে সুইচ অফ করে দেয় অন্তু। ‘আচ্ছা শিল্পী কোথায় ? ওকি বাড়ি গেছে ?’
‘না না খাবার আইনত্যে গেচ্যে। সারাদিন কিচুই খায় নাই।’
‘আচ্ছা আপনি বসুন আমি এখুনি আসছি। আর হাঁ চিন্তা বাঁ কান্নাকাটি একদম করবেন না। তখন আপনার শরীর খারাপ হয়ে যাবে।’ বলে রুম থেকে বেরিয়ে আসে অন্তু। নীচে নেমে নার্সিং হোমের বাইরে বেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। একটা সিগারেট ধরায়। শিল্পীর সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত শান্তনুর ব্যপারে কিছুই জানা সম্ভব নয়।
খানিকক্ষণ এদিক সেদিক খোঁজার পর শিল্পীকে দেখতে পায় অন্তু। নার্সিং হোম থেকে অল্পদূরের ছোট্ট একটা কালী মন্দিরের সামনে জোড়হাতে বসে রয়েছে শিল্পী। পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় অন্তু। মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকে, ‘শিল্পী এই শিল্পী ?’
মন্দির থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে শিল্পী জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কখন এলে ?’
‘এই তো কিছুক্ষণ হল।’ অন্তু শিল্পীর মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারে এখনো মুখে কিছু দেয়নি ও। একদিনে চোখমুখ শুকিয়ে গেছে। ওকে যে কী বলে সান্ত্বনা দেবে বুঝতে পারে না অন্তু। পাশে থাকার অনুভবটুকু জানাতে নীরবে একটা হাত ধরে। কারু মুখে কোনও কথা নেই। অন্তুর চোখ ঝাপসা। শিল্পীর চোখে জোয়ার আসছে।
একটা হোটেলের সামনে এসে দাঁড়ায় ওরা। অন্তু জিজ্ঞেস করে, ‘মাছভাত হবে ?’
‘না বাবু এই অবেলায়... কিন্তু বলেন তো রুটি তড়কা কিংবা ডিমের অমলেট বানিয়ে দিতে পারি।’ দোকানের কর্মচারী জানায়।
‘আমার খিদে নেই। কিছু খেলেই বমি হয়ে যাবে। তুমি কিছু খাবে তো খাও।’ শিল্পী বলে।
‘বমি হবে না। কিছু না খেলে শরীর খারাপ করবে।’
‘সত্যিই আমি কিছুই খেতে পারব না...’
‘প্লিজ শিল্পী...’ অন্তুর গলাটা ভারী হয়ে আসে। শিল্পী কিছু বলে না আর। অন্তুর হাতটা আরও শক্ত করে ধরে।
খাবার টেবিলে পাশাপাশি বসে শিল্পীকে নিজের হাতেই খায়িয়ে দেয় অন্তু। ডিমের অমলেট দিয়েই দুটো রুটি খায় শিল্পী। একটা রুটি অন্তুকেও খেতে হয়। 

রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টের ঘোলাটে আলোগুলো জ্বলছে এখন। নার্সিং হোমের সামনের তেতুল গাছটার মাথায় জোনাকির ভিড়। চারদিক জুড়ে ওষুধের উগ্রগন্ধ ছড়িয়ে আছে। শিল্পীর হাত ধরেই নার্সিং হোম পেরিয়ে হাঁটতে থাকে অন্তু। ভ্যাপসা গরমে সন্ধার বাতাসটা বেশ ভাল লাগছে এখন।
‘তোর মায়ের কাছে শুনলাম শান্তনুর মাথায় লেগেছে। কিন্তু ডাক্তার ঠিক কী বলছে বল তো ?’
‘মাথায় তো লেগেইছে কিন্তু...’ বলে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে শিল্পী। যেন কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছে কিন্তু খুঁজে পাচ্ছে না কিছুতেই।
‘কিন্তু কী ?’
‘সমস্যা মাথা নিয়ে নয়।’
‘তাহলে ?’ অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করে অন্তু।
‘ট্রাকের চাকায় দাদার ডান পা-টাই গুড়িয়ে গেছে। বাদ দিতে হয়েছে হাঁটুর উপর পর্যন্ত।’
‘হোয়াট ?
‘শুধু তাই নয় সাইকেলের ডান দিকের ব্রেকটা পেটে ঢুকেছিল বাজে ভাবে। প্রচুর রক্ত বেরিয়ে গেছে। রক্ত দিতেও হয়েছে প্রচুর। এখন ঈশ্বর ছাড়া...’ কাঁদতে গিয়েও কান্নাটাকে কোনও রকমে গিলে নেওয়ার চেষ্টা করে শিল্পী। কান্নাটা মাছের কাটার মতো গলায় বিঁধে থাকে। নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে বলে, ‘ফুটবল খেলার ভয়ংকর নেশার জন্য মা খুব বকাবকি করত দাদাকে জানো... দাদা বেঁচে বাড়ি ফিরলেও আর কোনওদিন...। আচ্ছা মা নিজেকে নিজের কাছে কী জবাব দেবে ? মায়ের তো কোনও দোষ ছিল না। মা তো দাদার ভালই চেয়ে এসেছে।’
‘এমন ভাবে কেন ভাবছিস। এমন ভেবে মিছিমিছি কষ্ট পাচ্ছিস।’
“কদিন আগেই মা দাদাকে বলেছিল, ‘সারাদিন ফুটবল আর ফুটবল তুই পা ভাইঙ্গে বাড়িত্যেই পইড়্যে থ্যাইকল্যে আমার বুক জুড়ায়’ দাদা সেদিন ‘তথাস্তু’ বলে বেরিয়ে গিয়েছিল জানো। আজকে দেখো...’ ওড়নার চোখের জল মোছে শিল্পী।
‘লক্ষ্মীটি কাঁদিস না। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।’
শিল্পী জানে অন্তুর শুকনো সান্ত্বনাতে কিছুই ঠিক হবে না। তাই কিছু না বলে চুপ করে যায়। অন্ধকার নেমে আসছে চোখের পাতায়। ফুটপাতে। এবার ওদেরকে নার্সিং হোমে ফিরতে হবে। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটাই চলে এসেছে ওরা।

। ১৫।
এখন নদীটার গতিতে কোনও সুর নেই। যাবতীয় সুর লেগে আছে শালগাছের মাথায় বসে থাকা টিয়া পাখিগুলোর ঠোঁটে। গাছের কোটরে ছানাপোনা নিয়ে ওদের সংসার। বেশ কিছুক্ষণ ধরে মহিম তাকিয়ে ছিল উঁচু শালগাছটার দিকে। টিয়াগুলো জটলা পাকিয়ে কিছু একটা আলোচনা করছে বলে মনে হয় মহিমের। ওদের দিকে তাকিয়েই মহিম বিড়বিড় করে বলে, ‘শালা কাহুক্যে বিশ্বাইস কল্ল্যেই বাঁশ। পরান খুড়া... !’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহিম। তারপর আবার বলে, ‘পার‍্যে পার‍্যে মানুইষ সব পার‍্যে। না পাল্ল্যেই বিপদ।’
‘কিন্তু আমি আর পাইরব নাই। ইবার যা বিপদ হবার হক।’
‘আমি উ পারাটার কতা বলচি নাই ত...’
‘তবে কন পারাটার কতা বলচিস ?’
‘আমি বলচি আইজক্যের দিনে মন্দর সাতে মন্দ না হল্যেই বিপদ। তর মত বিধবা মেয়্যার ত না দিয়ে উপায় নাই। কাকে আটকাবি... ?’ নিজেকেই প্রশ্ন করার ভঙ্গি করে মহিম ‘...একলোক ওঝা-কৈবর‍্যাজ আরেক লোক গাঁমের মেম্বার।’
‘আর লয়। অনেক হইচ্যে, অনেক। আইজ সকালে তপনা আইচিল, বিষদাঁত ভাইঙ্যে দিয়্যেছি। নেনা নাই সাপের কুলার পারা ফেনা। আমি কার সাতে শুব সেটা কি ওই আঁটকুড়ার বেটা গুল্যাইন ঠিক কইরব্যেক ? ইবার আসুক ত... কাইট্যে হাতে ধরাই দিব।
‘তর যদি এতই মুরাদ তাহৈল্যে এতদিন দিলি ক্যেন্যে ?
‘বুকে বল পাব্যার লাইগ্যে পাশে ত একটা মরদ লাগে, নইল্যে কার ভরসাট্যায় দাঁড়াব ? হয় ডাইনি বইল্যে গাঁছাড়া কইরব্যেক নাহৈল্যে বেশ্যা বইল্যে তাড়াব্যেক। আমার কতা শুনার লোক কুতায় ?’
‘ক্যনে তোর তপনা ছিল যে ?’ চিমটি কাটে মহিম।
‘উটা ত মাগীর অধম। যে খাচ্চ্যে খাক উয়ার তাতে কিছুই নাই, উ নিজে পাল্যেই হৈল। শালা হারামি সব জান্যেও এমন ভাব দেক্যাইত যেমন কিচুই জানে নাই। খালভরা কুতাকার...’
‘থাক মন্দিরে বইস্যে আর মুকখালি কৈত্ত্যে হব্যেক নাই।

‘আচ্ছা তুই একটা কতার উত্তর দিবি ?’ মহিমের চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করে কাবেরী।
খানিকটা হকচকিয়ে মহিম বলে, ‘বল কী বলবি ?’
‘তুই কি শাঙা করবি আমাক্যে ?’ মহিম উত্তর দিতে সময় নিলে কাবেরী আবার বলে, ‘মা হবার কতা বলছিলি যে?’ সাবলীল ভাবেই জিজ্ঞেস করে কাবেরী।    
মহিমের মুখটা ফিউজ বাল্বের মতো দুম করে অন্ধকার হয়ে পড়ে। কী উত্তর দেবে খুঁজে পায় না। সত্যিই তো কী উত্তর দেবে ও ? বাড়িতে ভাদু মৃত্যুর দিন গুনছে। এমন সময় এই প্রশ্নের কী উত্তর হতে পারে মহিমের জানা নেই। কিন্তু ও নিজেই তো ভোরেরবেলা কাবেরীকে মাতৃত্বের মন্ত্র শুনিয়েছিল। শালগাছের ফাঁকে ফাঁকে উত্তর খুঁজতে থাকে মহিম। অঙ্গুল দিয়ে শক্ত মাটিতে আঁচড় কাটে।
‘চুপ কইর‍্যে রইলি যে ?’ আবার জিজ্ঞেস করে কাবেরী।
‘না মানে ভাদু...’
‘তোর বউকে লিইয়্যে আমার কনু সমুস্যা নাই। তর বিটিকে নিজের ভাইবত্যেও সমুস্যা নাই। ইবার তর কী সমুস্যা বল?’
‘সমুস্যা কিচু নাই। কিন্তু ভাদু যৎদিন আছে তৎদিন আমি পাইরব নাই।’
‘সেটা ত আমি বলচি নাই। উ অধম্মের কতা আমি ভাবিও নাই। কিন্তু তর বউ যদি সার‍্যেও যায় তাতেও আমার সমুস্যা নাই, ইটাই বলচি।’
‘ই-রোগটা সারার রোগ লয়। ইটা মরার রোগ। তাও যৎদিন বাঁচে...’ মহিমের গলাটা ভারী হয়ে আসে। জিবের আড়ষ্টতা কাটিয়ে নিতে একটা বিড়ি ধরায়। উড়োস্মৃতিগুলো চোখের পাতায় ভিড় করে আসে। কত চেনা চেনা ছবি চেনা কথা। আর নিজেকে সামলাতে পারে না মহিম। দুচোখ বেয়ে স্মৃতি গড়িয়ে পড়তে থাকে। ঠোঁটে ঠোঁট চাপা দিয়ে কাবেরীও নিজের কান্নাটাকে আগলে রাখে। শক্ত করে মহিমের হাতটা ধরে বলে, ‘আর আগ্যের পারা ঝুমুর গাইস না?’
‘না...’ বিড়ির ধোঁয়ায় মিশে মহিমের মুখের বাতাসে ‘না’ শব্দটা বেরিয়ে আসে।
‘তুই ঝুমুর গাবার সমুয় কাঁদতিস মনে আচে ?’
‘কাইদঁতম নাই আপনি চোক ভিজত। এই ত আবার কদিন বাদেই মেলা। ইবছর শুনছি ঝুমুরের বদলি রসের গান হব্যেক। বিজয় পাল না কে আইসব্যেক বইলছিল।’
‘ঝুমুর হব্যেক নাই ইবার ?’ কথাটা যেন বিশ্বাস হয় না কাবেরীর। বড়বড় চোখে প্রশ্ন এঁকে তাকায় মহিমের দিকে।
‘সেটায় ত শুইনলম। আইজ-কাইলকার ছেল্যা-ছকরা উসব ঝুমুর-টুমুর শুইনব্যেক নাই। কে লিবি আমার পাকা পাকা আম, আমার গাড়ির টেঙ্কিতে পাইপ ঢুক্যাই ভইর‍্যে দিলি তেল...’
মহিমকে আটকে দিয়ে কাবেরী বলে, ‘ইগুল্যাইন গান ? শুইনল্যেই মনে হয়...’ কথাটা শেষ করে না কাবেরী, মুখের ভেতর একদলা থুতু পাকিয়ে সশব্দে সেটা ছুঁড়ে রাগ প্রকাশ করে।
‘উদিন বাউল দেইকত্যে কজন গ্যেইছিল ?’ বুড়ো আঙুল নাড়ে মহিম, ‘সব আপন আপন ধান্দায়।’
‘আমি কিন্তুক বাউল শুনার লাগ্যেই তপনাকে লিয়ে গ্যেইছলম...’
‘আমি তর কতা ত বলচি নাই...’
‘না আমি এমনি বলচি, আমার বাউল ঝুমুর ইসব ছোটর থেক্যেই ভাল্ল্যাগে।’
বিড়িতে শেষ টান দিয়ে মহিম গেয়ে উঠে,-
‘সকাল থেইক্যা টিপিক টিপিক পড়ছ্যে মেঘের জল
ও পুঁটির মা-লো, ও ননর মা-লো এখন নদীর পাড় ফাঁকা আচে
এখন বনের ধার ফাঁকা আচে
টুকু পিরিত কইর‍্যে আসি চল।

এই চৈত্ত মাসের ভ্যাপসা হাওয়া
ওই ডেবকা চৈখ্যের ফুড়ুৎ চাওয়া
গরমে থাকি কেমন্যে বল ?
ও পুঁটির মা-লো, ও ননর মা-লো এখন নদীর পাড় ফাঁকা আচে
এখন বনের ধার ফাঁকা আচে
টুকু পিরিত কইর‍্যে আসি চল।

আইজ্যেই আইসব্যেক বিটি জামাই
কাইল আইসব্যেক শাউড়ি শ্বশুর
এই পরবের কটাদিন কুতায় শুবি বল ?
তাই ত বলি...
ও পুঁটির মা-লো, ও ননর মা-লো এখন নদীর পাড় ফাঁকা আচে
এখন বনের ধার ফাঁকা আচে
টুকু পিরিত কইর‍্যে আসি চল।’

গানটা শেষ হলে উঠে দাঁড়ায় মহিম। উদাসীন ভাবে তাকায় আধমরা নদীটার দিকে। এই নদীর চরে বসে একদিন একলা একলাই গান বাঁধত মহিম। সুর দিত নিজের খেয়াল-খুশি মতো। এখন পাতা হলুদ হয়েছে বলেই গাছ থেকে ঝরে পড়েছে, সবুজ স্মৃতি মনে করা ছাড়া অবশিষ্ট কিছুই নেই তার। গুমোট গরমে যখন ঘুম আসত না ? ঘরের থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে উঠোনে খাট পেতে আপন মনে সুর তুলত মহিম। ঘুম ভাঙা চোখে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ভাদু তাকিয়ে থাকত ওর দিকে। মহিম দেখেও দেখতে পেত না। ও গেয়ে যেত। বাড়ির বাইরে ছড়িয়ে থাকা অন্ধকার থেকে ডাহুক কিংবা পিউকাঁহা মাঝে মাঝেই সুর মেলাত মহিমের সুরে। এখন ঝিঁঝিঁ ডাকছে। টিয়াগুলো উড়ে গেছে একটু আগেই।
‘কী ভাবিস ?’ জিজ্ঞেস করে কাবেরী।
চমক ভাঙে মহিমের। স্মৃতির বারান্দা থেকে এক ঝটকায় ফিরে আসে নদীর পারে। বলে, ‘কিচুই ভাবি নাই। গান গাইল্যে সেই সব দিন গুল্যাইন মনে পড়ে। কষ্ট হয়। কান্না পায়...’ আবার গলাটা ভারী হয়ে আসে মহিমের। একটা অপঠিত দগদগে লু বইছে বুকের ভেতর। স্মৃতির ছেঁড়া-ফাটা টুকরোগুলো ঘুরছে বনবন করে।
‘তুই ভাদুকে দমে ভালবাসিস বল ?’ আবার জিজ্ঞেস করে কাবেরী।
‘অমন মেয়্যাকে ভাল না বাইস্যে কি থাকা যায়। ভাদু ভালবাইসত্যেও জানে বাসাত্যেও জানে।’
‘তর কপ্যালটা ভাল বঠে অমন বউ পাইছিলি। গামের বাকি বউগুল্যাইন ত...’
‘কপ্যালটা আর কুতায় ভাল বঠে ? কপাল ভাল হৈল্যে কি আর অমন রোগট্যায় উয়াকে ধরে ?
‘উগুল্যাইনে ত কারুর হাতের নাই। কী আর করবি। তর ত তাও মনে করার মত কিচু আচে। আমার উটুকুও ত নাই। জীবনের পুরাট্যাই খালি। বাপটাও পুরা মাতাল ছিল, ভাতারটাও তাই। না হৈল ছেল্যা-মেয়্যা না হৈল সংসার। অন্য মিয়্যা হৈল্যে কবেই গলায় দড়ি দিত। আমি বইল্যে শরীদ দিয়্যে দিয়্যে এখনো...’ কাপড়ের আঁচল দিয়ে মুখটা চেপে ধরে কাবেরী। তবুও কান্নাটাকে চাপা দিতে পারে না। নিজেকে সামলানোর জন্য কিছুটা সময় নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। মহিমের হাতটা ধরে নদীটার দিকে কিছুটা এগিয়ে আসে। নদীর চরেও গরম হলকা বইছে এখন। কাবেরীর ব্লাউজের বগলদুটো ঘামে আগেই ভিজেছে। বুক-পিঠ ভিজছে এখন। কাবেরীর হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে লুঙ্গিটাকে হাঁটুর উপর গুটিয়ে পরে মহিম। নদীর পারে একলা দাঁড়িয়ে থাকা বড় শালগাছটার নীচে এসে দাঁড়ায় দুজনে। এখান থেকে দুটো গ্রামের কোনটাকেই ভালভাবে দেখা যায় না। পলাশ জঙ্গলে আড়াল হয়ে পড়ে নদীর দুপারের দুটো গ্রাম।
‘তর ভাত হৈয়্যে গ্যেচে ?’ জিজ্ঞেস করে মহিম।
‘না। আজ ভোগ নাই। একবারেই সন্দ্যাবেলায় খাব।’
‘ক্যেন্যে ভোগ নাই ক্যেন্যে ? সারাদিন না খাইল্যে শরীদের কিচুই থাইকব্যেক নাই।’
‘না থাইকল্যেই ত ভাল। শিয়াল কুকুরে খাউয়া শরীদ থাক্যেই যে কী হব্যেক। একন মনে হয় উ না মইর‍্যে আমি মল্ল্যেই হায় হৈত।’
‘মরা বাঁচাটা কারুর হাতে লয়রে...
‘আমি মইরব বইল্যে আইস্যে ছিলম পুয়াল দড়ি হাতে
আমি মইরব বইল্যে আইস্যে ছিলম ঘুইটঘুইট্যা রাইত্যে
একন গাছের উপর উইঠ্যে দেখি জনাক পকা জ্বলে
মরার গান গায়না পকা, আশার পদীপ জ্বালে।’
‘পুরা গানটা মনে নাই তর ?’ জিজ্ঞেস করে কাবেরী।
‘ধুর, ইগুলা সেই কতকাল আগুকার বাঁধান গান। এদ্দিন পর কী উসব আর মনে থাকে। তকন গাইতম, একটা লাইন গাইল্যেই আরেকটা লাইন নিজের থেইক্যে মনে আইসত।’
‘আমার তকন লতুন বিহাঁ হৈচে যকন তর এই গানটা শুইন্যেছিলম। দুইট্যা লাইন একনো মনে আচে আমার।’
‘কন লাইন দুইট্যা ?’ জিজ্ঞেস করে মহিম।
‘ওই যে,
যারা বাঁচার লাইগ্যে ঘুইর‍্যে মরে স্বপন লিয়ে হাতে
কবেই তারা মইর‍্যে ভূত ঘুইটঘুইট্যা রাইত্যে লো মিশমিইশ্যা রাইত্যে।’

‘শেষের লাইন দুইট্যা এমন পার‍্যাই ছিল মনে হয়।’ মহিম মনে করার চেষ্টা করে। গানের কয়েকটা লাইন নিজের মনে বিড়বিড় করে আবার। ঠিকঠাক মনে পড়ে না।
‘এই লাইন দুইট্যাই ছিল...’
‘হব্যেক হয়ত। তবে তর মনে আচে দেইখ্যে অবাক লাইগচ্যে।’
‘ইটাতে অবাক হবার কিচুই নাই। মনে ধইর‍্যেছিল তাই মনে আচে...’
‘একবার ঝুমুইর দলে আমাকে লিতে চাইয়্যেছিল, বইল্যেছিল থাকা খাওয়া সব দিব...’
‘ক্যেন্যে তুই ত গ্যেইচলি ?’ গলায় প্রশ্ন মাখিয়ে কথাটা বলে কাবেরী।
‘উটাকে কি আর যাওয়া বলে, একটা পালাত্যেও ত যাই নাই। তিন রাইত ছিলম এই যা।
‘তা পলাই আইছিলি ক্যেন্যে ?’ জিজ্ঞেস করে কাবেরী।
‘সাদে কি আর আইচিলম। উয়াদের জীবনের কুনুই ঠিক ছিল নাই। কুনটা যে কার বউ কার বিটি বুজা ভার। যে যার সাতে পাইচ্চ্যে খাইচ্চ্যে যার সাতে পাইচ্চ্যে শুইচ্চ্যে। আসলে কী বলত, উটা ঝুমুইরের দল ছিলই নাই। উটা একটা ভবঘুইর‍্যা দলছিল। যারা ঝুমুইর গায় উয়াদের ঘর-দুয়ার-সংসার সবেই থাকে।বাউল হৈল্যে না হয় আলাদা কতাছিল।
‘কিন্তু উয়ারা ত আমাদের গাঁয়ে তিনদিন ধইর‍্যে ঝুমুইর গাইয়্যেছিল।’
‘ঝুমুইর ত গাইত কিন্তু উয়াদের...। মেয়্যাগুল্যাইন শরীদের ব্যবসা কইত্ত জানিস ?’
‘ইটা কিন্তু আমার মনে হৈইচিল। আমি একদিন রাত্যের বেলায় একটা বউকে সত্যবানের ঘরে ঢুইকত্যে দেইখ্যে ছিলম।’
‘শুদু সত্যবান লয় যে পাইর‍্যেচে কইর‍্যেচে। মুখোইশ পরা ভদ্দরলোক ত গাঁয়ে কম নাই। দিনের বেলিতে নিজের বউ এর সাতে শুত্যেও লজজ্যা লাগে রাত্যের বেলিতে পরের বউ ধইর‍্যে ঘুরে। এই ত আমাক্যেই দেক নিজের বউ ঘরে কোঁকাচ্চ্যে আমি ইদিকে তর সাতে ফুত্তি মাচ্চি। তাও দিনের বেলিতে।’
কাবেরী চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু বলে না। হয়তো নিজের ভেতর ডুব দিয়ে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করে। নয়তো পরিবেশটাকে সরল করতে সময় নেয়। কাবেরীকে চুপ থাকতে দেখে মহিম আবার বলে, ‘সব শালাই হারামি। সুযোগ পাল্যেই...’
মহিমকে কথাটা শেষ করতে না দিয়ে কাবেরী বলে, ‘মেয়্যা-বউগুল্যা যদি পাত্যে বইস্যে থাকে তাতে মরদের আর কী দোষ ? দিচ্চ্যে বল্যেই লিচ্চ্যে। আমি দিচ্চি বল্যেই...’
‘আমাকে বাদে তুই যাদেরকে দিয়্যেচিস উয়াদেরকে না দিয়্যেও তর উপায় ছিল নাই। ইদিকে তপনা তর সাতে শুচ্চ্যে উদিকে কাত্তিক তপনার বউ এর সাতে।’
‘বিটির সাতেও।’
‘উটা আমি জানিনাই। ওই বলে নাই, কন শালিকে বলবি ভাল ? বেগুন লিয়ে হাইগত্যে গেল। যাদেরকে বেশি ভাল ভাব্বি তারাই দেকবি বেশি ঢ্যামনা। শালা পরান খুড়া...’
‘তুই গাইদ্যে সাদাসিধ্যা বঠিস মাইরি...’
‘ক্যেন্যে ?’
‘না, বইল্ল্যে তর আবার রাগ হব্যেক। ওই পরাইন্যা মাম্যেগুয়া আমাকে নিজে বইল্যেচে...’
‘কী বইল্যেচে ?’
‘আগুতে বল মাতা গরম করবি নাই ?’ ভয়ে ভয়েই কথাটা জিজ্ঞেস করে কাবেরী।
‘ফেচ্যের ফেচ্যের না কইর‍্যে কী বলবি বল...’
‘আমাকে একদিন বইল্যেছিল ভাদিকে দেকল্যেই আমার ইয়াটা টনটনায় সেই লাগ্যেই বারবার উয়াদের ঘর যাই..., মাগীকে খাবই বতরে পাল্যে। তর বউ এর রোগ না হৈল্যে পরাইন্যা...’ কাবেরীকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই গলাটা চেপে ধরে মহিম। খকখক করতে করতে কয়েকপা ছিটকে যায় কাবেরী। প্রতিটা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে হাতের শিরাগুলো ফুলে ফুলে উঠছে মহিমের। গশগশ করছে চোখদুটো।
নিজেকে সামলে নিয়ে কাবেরী বলে, ‘আমাকে রাগ দেক্যাই কিচুই হব্যেক নাই। তর পিরিতের ওই পরান খুড়াই নামুপাড়ার লালচাঁদের বউটারও প্যেট কইর‍্যেছিল। শালা সবাই সব জানে শুদু তুই জানিস নাই। তুই কানা বঠিস তাই যারা তর পঁদে বাঁশ দিচ্চ্যে তুই তাদের ইয়াত্যেই ত্যেল দিচ্চিস।’
মহিম আর একটাও কথা বলে না। হাতদুটোকে মুঠো করে নদীটার দিকে তাকিয়ে থাকে। নীরব নদীর পাড়ে ওর গসগসে নিশ্বাসগুলো ছুটে বেড়ায়।

Previous
Next Post »

Bigrock domain latest offer