Monday, 15 July 2019

Bengali novel, Fire asar din [part 6]

Bengali novel - Fire asar din. Written by - Bappaditya Mukhopadhyay


Bengali novel - jodi search korchen tahole ei Bangla novelta porun. Sob paben, Bangla love story to bangla politics. Sob dik diyei Fire asar din best bengali novel.

(শারদীয় উপন্যাস ১৪২৬, ফিরে আসার দিন) 


এই কয়েকদিনে বেশ কয়েকবার ওই অপিরিচিত নম্বরটা থেকে কল এসেছে। নম্বরটা রিজেক্ট লিস্টে ফেলে দেওয়ার পরেও অন্তু নিজের কৌতূহলটা দমিয়ে রাখতে পারেনি। মেসেজ পাঠিয়েছে, ‘নাম না বললে কল করবেন না প্লিজ।’ ‘কথা বলার না থাকলে কল করবেন না প্লিজ।’ কিছুতেই কিছু হয়নি। এখনো নম্বরটা স্ক্রিনে ভেসেই মিলিয়ে যায়। কোনও সাড়াশব্দ হয় না। অন্তু বুঝতে পারে কলার কল করার চেষ্টা করেই চলেছে। কে হতে পারে ভাবতে গিয়ে অনেকের কথা মনে এসেছে, কিন্তু কলারকে সঠিক চিহ্নিতকরণ করতে এখনো পারেনি ও। একহাতে চা এর কাপ নিয়ে আরেক হাতে মোবাইলটা নাড়াচাড়া করতে করতে মনের ভেতরকার মরচে পড়া মুখগুলোকে হাতড়াচ্ছিল অন্তু। কিছুক্ষণ আগেই ছুটি দিয়েছে স্টুডেন্টদেরকে। এই অচেনা নম্বরটার জ্বালায় স্টুডেন্টদের প্রতিও মন দিতে পারছিল না কদিন থেকেই। 
‘কে ? কে হতে পারে ? তিতলি ?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে অন্তু। মনের স্ক্রিনে তিতলির মুখটা ভেসে উঠে। সেইসব দিনের ছবিগুলো ভেসে উঠে। মাথাটাকে বেশ কয়েকবার ঝাঁকিয়ে নিজেকে বাস্তবে ফেরায় অন্তু। অতীত সাগরে ডুব দিয়ে দিয়ে বিষ পান করতে আজ আর ওর ভাললাগে না। অতীতনগর থেকে কষ্ট ছাড়া আর কিছুই তো পাবারও নেই। এদিকে বর্তমানটাও জটলা পাকিয়ে যাচ্ছে। নার্সিং হোমে দাদাকে নিয়ে ছটফট করছে শিল্পী। সময়ে না খাওয়া না ঘুমের ছাপ পড়েছে ওর চোখেমুখে।
‘খাবার ঢাক দিয়া রইল, সমুয়ে খায়্যে লিবি...’ বলে বেরিয়ে যায় অন্তুর মা। সেন্টারের সময় হয়ে গেছে। রোজ আড়াই তিন কিমি পথ হেঁটেই যাওয়া আসা করতে হয়। তাই সকালের খাবার বানিয়েই ওর মা রোজ বেরিয়ে পড়ে। তারপর সেন্টার থেকে ফিরে দুপুরের খাবার বানায়। কোনও কোনও দিন খাবার বানাতে অবেলা হয়ে যায়। 
চা এর কাপটা নামিয়ে মোবাইলটা চেয়ারের উপর রেখে উঠে দাঁড়ায় অন্তু। কুয়োর পাড় থেকে জলের বালতিটা নিয়ে ফুলের গাছগুলোতে জল দেয়। পিতৃরক্ত থেকেই এটুকু পাওয়া। জল দিতে দিতে উঠোনের কোনায় গিয়ে দাঁড়ায়। অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকে মাধবীলতা গাছটার দিকে। এই কদিন আগেই লাগিয়েছে নতুন চারাটা। এরমধ্যেই মাথা তুলে পেয়ারা গাছটাকে জড়িয়ে উপরে উঠতে শুরু করেছে। অকারণে মায়ের মুখটা ভেসে উঠে চোখের পাতায়। এই বয়েসেও মাকে ছাড়া ওর দিন চলে না। টিউশন পড়িয়ে যে কটা টাকা আসে তার প্রায় পুরোটাই খরচ হয় সিগারেট আর শিল্পীর পিছনে। শিল্পীর পিছনে বলতে শিল্পীকে টাকা দেওয়া বা শিল্পীর সঙ্গে রেস্টুরেন্টে গিয়ে দামি খাবার খাওয়া নয়। এ খরচ ওর কোনওদিনই নেই। খরচ হয় মোবাইলে ব্যালেন্স ভরে। রিলায়েন্স সি-ডি-এমে তেও ফ্রি করাতে একশ নিরানব্বই টাকা লাগে। ভোডাফোন ইন্টারনেটে দু’শ একান্ন। এখন আর টু’জি কাজ করে না। বাধ্য হয়েই থ্রি’জি রিচার্জ করতে হয়। এর উপর পার্কের টিকিট। বেড়াতে গেলে গাড়ি ভাড়া। সিগারেট। টাকা আর থাকে কোথায়। আর চাকরি ? সে কথা না বলাই ভাল। এখনকার দিনে চাকরি পেতে হলে টেবিলের তলা দিয়ে গলতে হয়। একহাতে দাও আরেক হাতে নাও। নেতা মন্ত্রিদেরেই বা দোষ কী ? ভোটে জেতার আগে কেঁচোর মতো মাটি গিলেছে। ভোটে জিতলে জোঁকের মতো রক্ত চুষবে এটাই তো স্বাভাবিক। একটা সময় পর্যন্ত মাস্টারি করার স্বপ্ন অন্তুও দেখত। এখন সেই স্বপ্নগুলোও শুকিয়ে গেছে।
জলের বালতিটাকে কুয়োর পাড়ে রেখে চেয়ার থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে শিল্পীকে একটা কল করে অন্তু।
‘হ্যাঁ বলো।’ ওপার থেকে সাড়া দেয় শিল্পী।
‘শানু কেমন আছে এখন ?’
‘দাদা আজকে অনেকটাই ভাল আছে। খাবার খেয়েছে আজকে।’
‘কী খাবার ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।
‘জলে ভেজানো বিস্কুট। ডাক্তার বলেছে দুপুরে ভাত খাওয়াতে।’
‘স্যালাইন চলছে ?’
‘হ্যাঁ ওটা আজ-কাল দুদিন চলবে বলেছে।’
‘ছুটি কবে দেবে কিছু বলেছে ?’
‘পরশু।’
‘তাহলে তো ভালই। দেখি যদি পারি আজকে বিকেলে একবার যাব ভাবছি।’
‘না না আজকে নয় এলে কালকে এসো।’
‘কেন কালকে কেন ?’ 
‘কালকে সকালে মা একবার বাড়ি যাবে। ছুটির দরখাস্তটাও তো করার সময় পায়নি। মা না থাকলে একা একা আমার একটু নার্ভাস লাগবে। তাই তুমি এলে ভাল হয়, এই আরকি।’
‘ও আচ্ছা। তবে তাই যাব। আর হ্যাঁ তোর মা আর কান্নাকাটি করেনি তো ?’
‘করেনি আবার ? সুযোগ পেলেই কাঁদছে। মা দাদাকে কী সামলাবে দাদাই মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। একটা ভাল খবর আছে...’
‘কী খবর ?’
‘আগে বলো কী খাওয়াবে ?’
‘আগে খবরটা তো শুনি।’
‘না আগে বলো কী খাওয়াবে তবেই বলব।’
‘আচ্ছা পাঁচটা চুমু খাওয়াব।’
‘ধুর... তোমার সবেতেই ইয়ার্কি। চকোবার খাওয়াবে ? তবে বলব।’
‘আচ্ছা খাওয়াব বল।’
‘কবিতা কলম পত্রিকায় আমার কবিতা বেরিয়েছে।’
‘তাই ?’ অন্তুর চোখমুখ আনন্দে চকচক করে উঠে।
‘ইয়েস।’
‘কোন কবিতাটা ? কে জানালো তোকে ?’
‘ওদের দপ্তর থেকে কল করেছিল। বলল পত্রিকা আর সাম্মানিক পাঠাবে। কবিতাটা তোমাকে ফেসবুকে দিয়েছি।’
‘সাম্মানিক কত দেবে কিছু বলেছে ?’
‘না না ওসব কিছু বলেনি। আমিও জিজ্ঞেস করিনি। একটা অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছে জানো ?’
‘হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাহলে জাতে উঠে গেলি বল ?’
‘ধুর তুমিও না...’
‘নারে পত্রিকাটা শুনেছি আজেবাজে লেখা ছাপে না...’ পত্রিকাটার নামেই শুনেনি অন্তু তবুও শিল্পীর খুশিতে মিথ্যে কথাটা বলতে কোথাও আটকায় না ওর। ‘আচ্ছা বিবড়দায় পাবো পত্রিকাটা ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।
‘হ্যাঁ মাধবী বুকস্টলে পাবে।’
‘তাহলে বিকেলে গিয়ে নিয়ে আসব...’
‘এই এখন রাখছি। ডাক্তার রাউন্ডে আসছেন। পরে কথা হবে, বাই...’ ফোনটা কেটে দেয় শিল্পী।
অন্তু মোবাইলটা পকেটে রাখতে গিয়ে খেয়াল করে অপরিচিত সেই নম্বরটা থেকে দুটো মিসকল এসেছে। রিজেক্ট লিস্টে ফেলা আছে বলে কোনও সাড়াশব্দ হয়নি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোবাইলটা আবার চেয়ারের উপর নামিয়ে দিয়েই ঘরে ঢোকে অন্তু। ঢাকা দেওয়া খাবারের থালাটা হাতে তুলে নেয়। গুড়-পরোটা আর আলুভাজা করে দিয়ে গেছে ওর মা। অন্তুর চিরদিনের পছন্দের খাবার। পরোটার টুকরোর ভেতর গুড় ঢুকিয়ে সেটায় কামড় দিতে গিয়েও অপরিচিত নম্বরটা সম্পর্কে ভাবতে থাকে ও। একবার ভেবেছিল শিল্পীকে কথাটা বলবে, কিন্তু পারেনি। আসলে শান্তনুর এমন অবস্থায় শিল্পীকে আর চাপ দিতে ইচ্ছে করেনি। খাবারের থালাটা নামিয়ে রেখে উঠোনে এসে চেয়ার থেকে মোবাইলটা তুলে নিয়েই নম্বরটায় কল করে অন্তু। 
কলারটোন বাজছে, ‘একদিন আপ মুঝে মিল যায়েঙ্গে, ফুল হি ফুল...’ কদিন আগেও কোনও কলারটোন ছিল না। নতুন নিয়েছে মনে হয়। গানটা বেশ কিছুক্ষণ বাজার পর রিসিভ হয় কলটা। ওপারের মানুষটি হয়তো চাইছিল অন্তু গানটা শুনুক। গানটা শোনার পর অন্তুর সন্দেহটাও দ্বিগুণ মজবুত হয়। ওপারে ফোনটা ধরতে না ধরতেই অন্তু বলল, ‘তিতলি এসব করেও আর কিছুই হবে না। তুমি যদি মনে করো আবার সব আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে তাহলে ভুল ভাবছ কিন্তু...’
ওপার থেকে এবারেও কোনও সাড়াশব্দ নেই। হয়তো দীর্ঘশ্বাস পড়ছে। হয়তো কান্নার আওয়াজ। হ্যাঁ কান্নাই হবে হয়তো। আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটা কেটে দেয় অন্তু।
জলখাবার খেয়ে অন্তু খামারবাড়ির দিকে বেরিয়ে এসে একটা সিগারেট ধরায়। নদীটার দিকে তাকিয়ে দেখে। নদীপাড়ের শালগাছগুলো চোখে পড়ে। শাল-পলাশ গাছগুলো সবুজ হচ্ছে নতুন পাতার আনন্দে। আরও কিছুটা এগিয়ে আসে অন্তু। এবার চোখে পড়ে বেশ কিছু লোক ত্রিপল টাঙাচ্ছে। তারমানে দুএকদিনেই সংক্রান্তি। শিবের গাজন। নীলপূজা। চড়ক। অন্তুর দুচোখে অনন্দের ঢেউ খেলে যায়। দিনটার কথা মনেই ছিল না। মুহূর্তে সেই অচেনা নম্বরটা মনের ভেতর তলিয়ে গিয়ে মনের ভেতরকার তলিয়ে থাকা শৈশবের স্মৃতিগুলো বুদ্বুদের মতো ভেসে আসে।     
যাত্রাপালা পেরিয়ে যাওয়ার পরের দিন গ্রামের ছেলে মেয়েগুলো নদীর পাড়ে পড়ে থাকা মুচ-দাঁড়ি, ছেঁড়া চুল, রঙিন ফিতে কুড়িয়ে এনে যাত্রা যাত্রা খেলত। অন্তুর এখনো মনে আছে সেই খেলায় ও একবার কর্ণ হয়েছিল। মিতালির ফ্রকটা পরে ওকে মানিয়েও ছিল বেশ। মিতালি হয়েছিল কুন্তি। ওর পোশাক ছিল ওরই দিদির স্কুল যাওয়ার সাদা চুড়িদার। অর্জুন হয়েছিল বুবাই। সেই দিনগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে নিজের মনেই হাসতে থাকে অন্তু। সেই বুবাই এখন আসানসোলে বাসের কন্ডাক্টর। অর্থের অভাবে এইট পাশ করেই বাগালিতে ঢুকেছিল। বয়স বাড়তেই বাড়ি ছেড়ে একদিন পালিয়ে গেল। মিতালিও বিয়ে করে একটার পর একটা বাচ্চার জন্ম দিয়েই চলেছে। এখন ওটাই হয়তো ওর জীবনের একমাত্র এম্বিশান। মনে মনে মিতালির মেয়ে বেলার মুখটা মনে করার চেষ্টা অন্তু। সেই ঝাঁকড়া চুল, ফোলা ফোলা গাল, গালের টোল, গজদন্ত হাসি... 

শিল্পীকে দেওয়া কথার ভিত্তিতেই বিকেল বেলায় বিবড়দা গিয়ে ‘কবিতা কলম’ পত্রিকাটা কিনে নিয়ে আসে অন্তু। বেশ চকচকে পত্রিকা। অদ্ভুত অদ্ভুত কবিতাগুলোতে অদ্ভুত সব ছবি আঁকা। ছবিগুলোর উপর আঙুল বুলিয়ে কবিতাগুলো অনুভব করার চেষ্টা করে অন্তু। কবিতাগুলো ধরা দেয় না। মাথার উপর দিয়ে রাতচরা পাখির মতো উড়ে যায়। সুচিপত্র দেখে অন্তু শিল্পীর কবিতার পাতাটা বের করে,-
খেয়া ঘাটের মাঝি
শিল্পী ব্যানার্জ্জী
আর কয়েক পা পেরিয়ে গেলে নতুন জীবন
আর একটা হৃদয় পেলে জুড়ে যাবে ভেঙে যাওয়া মন

আমি বর্ষায় পুড়তে থাকা শানবাঁধানো শ্মশানের ঘাটে
এক-দুই-তিন... কর গুনে-গুনে মৃত্যু লিখে রাখি
আমি তো খেয়া মাঝি। শুধু এপার হতে ওপার
তোমার এক জীবন বিশ্রাম নেওয়া শেষ ?
অবশিষ্ট কাজটুকু আমার পড়ে থাকে।
কে আর মনে রাখে ? আমি রোজ রাতে দেখি
ধোঁয়ার কুণ্ডলী বেয়ে উড়ে যায় অচিন পাখি আরেক শরীরে।
শৈশব-কৈশোর-যৌবনের বনে মুধু শেষ হলে
শরীরের দেয়ালে হামা দিয়ে বার্ধক্য নামে
তারপর...? আমি বাকি পথটুকু পার করে দিয়ে আসি।

যে ছেলেটি গোলাপ হাতে এসে বলেছিল, ‘ভালবাসি, তোমাকেই ভালবাসি’
একদিন নাকে তুলো গুঁজে ধূপের গন্ধ মেখে সারা শরীর ফুলে ঢেকে
ওপারে গেছে। হয়তো উপরে গেছে।
আমি অপেক্ষায় থাকি
যেদিন শ্মশানে আঁতুড়ে মিলন হবে ?
সেদিন আবার শিস দেবে অচিন পাখি।

কবিতাটা পড়ার পর চুপচাপ ছাদের উপরে এসে বসে অন্তু। অকারণ মনকেমন। পশ্চিমের আকাশ লালচে রঙ আঁকড়ে গুম মেরে আছে। যখন তখন বৃষ্টি ঝাঁপিয়ে পড়বে। ঠিক সেদিন পার্কে যেমন...। পার্কের বিকেলটা মনে করতে গিয়ে শুশুনিয়ার দুপুরটা দুম করেই মাথায় আসে ওর। সেদিন শুশুনিয়া থেকে ফিরেই শিল্পীকে নার্সিং হোম ছুটতে হয়েছে কিন্তু সেদিন তো ওদের শারীরিক..., আর ভাবতে পারে না অন্তু। একটা অপরিচিত ভয় ওর ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে।
নীচে নেমেই বিছানা থেকে মোবাইলটা তুলে নিয়ে শিল্পীর নম্বরটা ডায়েল করে অন্তু। ফোঁটা-ফোঁটা করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে বাইরে। মোবাইলের ওপার থেকে ভেসে আসে যান্ত্রিক নারী কণ্ঠ, ‘আপনি যে নম্বরে ডায়েল করেছেন সেটির সঙ্গে এই মুহূর্তে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করুণ। আপনে জিস নম্বর পে...’ কলটা কেটে দিয়ে আবার ডায়েল করে অন্তু। এবারেও সেই একই কণ্ঠের প্যানপ্যানানি। পরপর বেশ কয়েকবার চেষ্টা করার পরেও শিল্পীর নম্বরে কল ঢোকে না। পেটটা এবার কেমন যেন কনকন করে মোচড় দিয়ে ওঠে...

। ১৭।
ঘরের ভেতরটা আঁশটে গন্ধে ভরে আছে। পায়খানার গন্ধ। পায়খানার আঁশটে গন্ধ ? ঠিক তাই। অন্তত আজকে মহিমের সেটাই মনে হচ্ছে। মাছ ধরা রাতের পর সকালে পুকুর ঘাটের কাছ থেকে যেমন আঁশটে গন্ধ ভেসে আসে এই গন্ধটাও ঠিক যেন সেরকম। নাকেমুখে গামছা চাপা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে মহিম। পূর্ণিমাও বাড়িতে নেই যে ওকে বলবে পরিষ্কার করে দিতে। ও এখন সকাল হলেই দে’ছুট। সোজা কাবেরীর ঘরে। ওখানে গিয়ে প্রথমে ছাগল বাচ্চাগুলকে আদর  করে। তারপর চা, কোনও কোনও দিন চা বিস্কুট কিংবা রুটি। পূর্ণিমার জন্যেই কাবেরীর সকালটাও ভাল কাটে। যে পৃথিবীতে নিজের মনের মতো গল্প করার লোক জোটে না সেখানে নির্বাক অসম বয়সীর সঙ্গেও অনায়াসে গল্প করা যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মায়ের অসুস্থতার জন্যে পূর্ণিমার দিনগুলোও থমকে গিয়েছিল। সেই থমকে থাকা দিনগুলো কাবেরীকে পেয়ে আবার চলতে শুরু করেছে। বোবা মেয়েটা অপলক ভাবে কাবেরীর মুখের দিকে তাকিয়ে গল্প শোনে। কাবেরীর ছোটবেলার গল্প। সেই গল্পগুলোর সঙ্গে নিজের গল্পগুলো মিলিয়ে দেখতে খুব ভাললাগে ওর। একদিন মহিম খেয়াল করেছিল পূর্ণিমা কোলের উপর কাঠের একটা পাটা চাপিয়ে নিজের খেয়ালে হাত নাড়ছে। হাসছে। নীরব ভাষায় গল্প করছে। মনে মনে সেদিন হেসেছিল মহিম। বড় হচ্ছে মেয়েটা...
‘মহিম ঘরে আচিস র‍্যে ?’ বাইরের থেকে তপনার ডাক ভেসে আসে।
সচরাচর মহিমের ঘরে তপন আসে না। তপন কেন তেমন কেউই আসে না। আজকে হঠাৎ তপনার গলার আওয়াজ পেয়ে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে মহিম। তাহলে কী তপন কাবেরীর ব্যপারে...
‘মহি...ম...’ দরজার বাইরে থেকে আবার ডাক দেয় তপনা।
‘আয় র‍্যে ভিত্রে আয়।’
বাইরে থেকে কয়েকবার কেশে হাসি হাসি মুখে ভেতরে ঢোকে তপনা। বলে, ‘হারুর কাছে চুইল কাইটত্যে গেইছলম। ত ভাইবলম টুকু তর বউ এর খবুরটা লিয়ে যাই। তা কেমন আচে একন ?’ কথাটা বলতে বলতেই ভেতর ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায় তপন। দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এসে বাড়ির উঠোনেই একদলা থুতু ফেলে বলে, ‘বাপর‍্যে বাপ এত গন্দ ? ঘর ভিতর‍্যে থাকিস কেমন কইর‍্যে ?’
‘কী কইরব ? এমনি কইর‍্যেই থাইকত্যে হচ্চ্যে। বউটাত আর ফেইল্যে দিবার লয়...’
‘ঘরটা ত পরিষ্কার কত্ত্যে পারিস। নিজে না পাল্ল্যে বিটিটাকে বল্যেই ত করাত্যে পারিস। কাবেরীকে বল্ল্যেও কইর‍্যে দিব্যেক। দিব্যেক নাই ?’
ঠিক এমন একটা প্রশ্ন যে আসতে পারে সেটা মহিম নিজেও ভাল মতোই জানত। এই জন্যেই তো তপনার আগমন। তবে প্রশ্নের সম্ভাবনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকার পরেও মহিম সেটার উত্তর তৈরি করে রাখেনি। তাই তপনার প্রশ্নের কী উত্তর দেবে খুঁজে না পেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মহিমকে চুপচাপ থাকতে দেখে তপনা আবার বলে, ‘তর বিটিটাও ত একন সারাদিন উখেন্যেই থাকে। ভালই বঠে তর ঘরের দিনবেলির ভাতটা ত বাঁচে। কিন্তু...’ কিন্তু বলেই চুপ করে যায় তপন। হয়তো কিছু ভাবে, নয়তো ভাবার অভিনয় করে। মহিমের ভেতরে ভেতরে রাগ হলেও ও চুপচাপ তপনার পরবর্তী কথাটার অপেক্ষা করে। ‘একটা বিড়ি দ্যে ত...’ মহিমের কাছ থেকে বিড়িটা চেয়ে নিয়ে সেটাকে রগড়াতে থাকে তপন। হয়তো পরিবেশটাকে আরও গম্ভীর করতে চায়। তারপর বিড়িটা ধরিয়ে আনমনা একটা ভাব নিয়ে উঠোনে পেতে রাখা খাটিয়াটায় গিয়ে বসে। মহিম শুধুমাত্র তপনার হাবভাব গুলো লক্ষ্য করে। বিড়িটায় বেশ কয়েকটা টান দেওয়ার পর মুখ খুলে তপনা, ‘সেদিন খুড়া বইলছিল তর নকি দিনদিন কাবেরীর সাতে মিলামিশা বাইড়ছ্যে। সেটা যদিও তর নিজের বেপার...’ আরও কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে তপনা বলে, ‘দ্যেক দিনবেলিতে পরের বিধবা লিয়ে ইখ্যান উখ্যান ঘুইরল্ল্যে পাড়ার লোকে কতা বইলব্যেক বাপু।’
‘ত কে কার মুখ চাইপ্যে রাইখ্যেছে। যে শালা যা বইলচ্যে বলুক আমিও দেইখব কে আমার কটা ছিঁড়ত্যে পারে। গাঁয়ের কন মিয়্যা মরদটা কত ভাল সেটা ত আমার জানত্যে বাকি নাই। সব শালা শালির পঁদে গু আচে।’
বিড়িটায় ফোঁস-ফোঁস করে কয়েকটা টান দিয়ে সেটাকে মাটিতে ফেলে সাত তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায় তপনা। চপ্পল দিয়ে বিড়ির টুকরোটা নিভিয়ে বলে, ‘তকে ত খাত্যে বারণ কচ্চি নাই। খা কিন্তু দিনবেলিতে লয়, লোকের লজরে লয়। আমিও ত খাইচি কিন্তু রাইত্যের বেলিতে। দিনবেলিতে লোকের চইখ্যে পইড়ল্যে...’
‘বইল্লমত ছিঁইড়ব্যেক আমার...’ বুড়ো আঙুল দিয়ে অশ্লীল ইঙ্গিত করে মহিম।
‘ক্যেলা ছিঁড়া ছিঁড়ির কথাটা হচ্চ্যে নাই...’
‘তাহল্যে ?’ গলাটা চড়িয়েই জিজ্ঞেস করে মহিম।     
‘এই যে সেদিন রাত্যের বেলিতে তুই আমাদের দুজনকে দেকলি। তবেই ত সাহস পালি। আর উ মাগীর ত মরদ পাল্যেই হৈল। ইবার তকে কেউ দেইখব্যেক তকন আবার সেউ...’
তপনার কথা শুনে ভেতরে ভেতরে ভয়ংকর একটা রাগ হয় মহিমের। কিছু বলতে না পেরে নিজের ভেতরের আগুনে নিজেই পুড়তে থাকে। এতদিন মহিম ভাবত তপন হয়তো কোথাও না কোথাও ভেতর থেকে কাবেরীকে চায়, বাড়িতে বউ আছে বলেই ঘরে তুলতে পারে না। কিন্তু আজকে ওর কথা শুনে মনে হচ্ছে এই খেলায় চাওয়ার কোনও জায়গা নেই পুরোটাই পাওয়ার হিসেব।
হাতের তালুতে তালু ঘষতে ঘষতে তপনা বলতে থাকে, ‘...দ্যেক যে মাগীর কেউ নাই সে মাগীকে খাল্যেও কুনই দোষ নাই, বারণ করারও কেউ নাই। কিন্তু মিল্যে মিশ্যে খাল্যে অনন্দটা বেশি। ইবার তুই যদি ভাবিস ভুল্যাই ফুইসল্যাই এক্যাই খাবি...’ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, ‘এই কদিন মাগী কাখুক্যেই দিত্যে চাইচ্যে নাই। তাই তকে বলছি উহাকে বুজা, বল যে গাঁয়ে থাইকত্যে হৈল্যে...’
‘এত্তদিন যা কইর‍্যেছিস ভাল কইর‍্যেছিস ইবার থেইক্যে উসব আর চইলব্যেক নাই। উদিকে আর পা বাড়্যাইস না।’
‘তুই আমাকে ধমকাচ্ছিস নকি ?’
‘না ভালভাবে বুজাচ্চি। তদের জোর জুলুমটা আর চইলব্যেক নাই বুঝলি। যত্তদিন উ নিজের থেইক্যে দিয়েছে তত্তদিন যা পাইর‍্যেছিস কইর‍্যেছিস একন যকন দিব নাই বইলচ্যে তকন আর তদের কিচুই করার নাই।’
‘দিব নাইটা ত বইলচ্যে তর জন্যে। সেটা তুই বুজা উয়াকে।’
‘যদি তর বউয়েরটা কেউ খুজে আর তকে বুঝাইত্যে বলে তুই বুঝাবি ?’
‘আজেবাজে কতা বলিস না। ওই শালি কন তর বউ বঠে ?’
তপনার প্রশ্নে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে মহিম তারপর বলে, ‘সেটা আমি বুইঝব।’
‘তকে এই লাইন্যের গবুরপকা ভাইবত্যম। তুই ত শালা ভিতরে ভিরতে বিশাল পেলেন কইর‍্যেচিস। খুড়া তাহল্যে ঠিক্যেই বইলছিল তর শাঁঙা করার মতলব আছে। ইদিকে তর বউত কদিন বাদ্যেই... ভালই বঠে। কিন্তু একটা কতা শুইন্যে রাক...’
‘আমার কন কতা শুন্যার দরকার নাই। কতা গুল্যাইন ওই শালাদেরকেই শুনাবি যা।’
‘দ্যেক তুই কিন্তু বিরাট উড়ছিস। ভাবিস না বেশিদিন তর ওই ডানা থাইকব্যেক। পরান খুড়া বল্যেই দিয়েচে সজা আঙুল্যে ঘি না উটল্যে আঙুইলটা বাঁকাত্যে হব্যেক...’ কথাগুলো বলতে বলতেই বাইরের দরজার দিকে এগিয়ে যায় তপনা। তারপর বলে, ‘তুই ভুগবি গাইদ্যে ভুগবি...’ মহিমের ঘর থেকে বেরিয়ে যায় তপনা।
মহিম কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ করে যায়। সদর দরজার দিকে একদলা থুতু ছুঁড়ে উঠোনের খাটের উপর এসে বসে। একটা বিড়ি ধরায়। ভেতরকার রাগটা দাউ-দাউ করে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ইচ্ছে করছে ঘরের সব কিছু ভেঙে তছনছ করে ফেলতে। আজ নয় কাল যাব করে করে ভাদুর ক্যামোথেরাপিটাও করানো হয়নি। কবেই ডেট পেরিয়ে গেছে। এদিকে ভোলা-শঙ্করকে বিক্রি করার টাকাটাও অনেকটাই খরচ হয়ে গেছে। উদাসীন ভাবে বিড়িতে একটা টান দিয়ে শূন্য গোয়াল ঘরটার দিকে তাকায় মহিম। বুকের ভেতরটা চিনচিন করে। দিনদিন সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। চেনা মানুষগুলোও অচেনা বলে মনে হয় আজকাল। কাউকেই বিশ্বাস হয় না। সবাই যেন মানুষের মুখোশ পরা শেয়াল। কাবেরীর মুখে পরান খুড়ার চরিত্র সম্পর্কে জানার পর থেকেই যেন সব হিসেব গোলমাল হয়ে গেছে। আজীবন সম্মান করে আসা বাপের বয়সী মানুষটাও যে এমন হতে পারে সেটা কিছুতেই বিশ্বাস হয় না মহিমের। অথচ কথাবার্তা শুনলে কে বলবে এই লোকটা রাতের অন্ধকারে...
‘জ...ল, জ...ল...’ ঘরের ভেতর থেকে ভাদুর অস্ফুট স্বর ভেসে আসে। বিড়িটা ফেলে দিয়ে ঘরের ভেতর গিয়ে ঢোকে মহিম। চোখ বন্ধ করেই পড়ে আছে ভাদু। দিনদিন শরীরটা শুকিয়ে শুকিয়ে দড়ির মতো হয়েচে। মাথার চুলগুলো রোমে পরিনত। অথচ সেই স্বপ্নের রাতগুলোতে ভাদুর চুলে আঙুল ঢুকিয়ে কত রাত মহিম গেয়ে উঠেছে, 
‘সই তর চুল্যের পতে পা পিছল্যে আর পেমে পইড়ব কত        
ঠাকুরও বুজি পিছল্যে ছিল রাধার চুল্যে ঠিক আমার‍্যেই মত
আইজকে টুকু দাঁড়াল সই তর চুল্যের পতে আর কিচুদূর চলি
যে কতা-গুল্যাইন বইলত্যে বাকি আইজকে পরান খুল্যে বলি।’

সেই সব রাতগুলোর কথা মনে পড়তেই চোখ দুটো ঝাপসা আসে মহিমের। এক একটা দিনের রেশ ধরে আরও কত দিনের কথায় না মনে পড়ে যায়। ভাদুর মুখে কয়েক ঢোক জল দিয়ে ওর পাশেই বসে মহিম। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। মাথায় মহিমের হাতের ছোঁয়া পেতেই চোখ মেলে তাকায় ভাদু। আজকে অনেকদিন পর মহিম ভাদুর মাথায় হাত রেখেছে বলেই হয়তো মুহূর্তের ভেতর ওর চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। আস্তে আস্তে ডান হাতটা কোনরকমে তুলে মহিমের হাতটা চেপে ধরে। হাতটা ধরার পরেই মৃদু হাসার চেষ্টা করে ভাদু। সেই হাসিতেও নিখাদ যন্ত্রণার ছাপ ফুটে ওঠে। মহিমের হাতটা নিয়ে নিজের গালে ঘষা দেয়। ভাদুর গালে গড়িয়ে পড়া চোখের জল মহিমের হাতে লাগে। এবার মহিমের চোখদুটোও জলে ভরে আসে। টপ-টপ করে ঝরে পড়ে কয়েক ফোঁটা। সেটা ভাদুর দৃষ্টি এড়ায় না। মৃত্যু পথযাত্রি মানুষের কাছে এর চেয়ে বড় উপহার আর কী হতে পারে। প্রতিটা মানুষ চায় তার শেষ দিনগুলোতে চোখের জল ফেলার জন্য যেন কেউ একজন অন্তত থাকে। এমন মুহূর্তে চোখের জল ফেলা মানুষটার দিকে তাকিয়ে মনে হয়, আমার আসাটা বেকার যায়নি।
মহিমের হাতটা শক্ত করে ধরে কিছু একটা বলার চেষ্টা করে ভাদু। পারে না। কিছুতেই পারে না। তীব্র একটা যন্ত্রণায় ওর ঠোঁট দুটো কাঁপতে থাকে। তিরতির করে কাঁপতে থাকে...

।১৮।
বাজছে মোবাইলটা। আবার বাজছে, না ঠিক বাজছে নয় যেন চিৎকার করছে। দুহাত দিয়ে কান দুটোকে চাপা দেয় অন্তু। মোবাইলটাও চুপ করে যায়। কিছুক্ষণ সব শান্ত। কানের পাশ থেকে হাত সরিয়ে নেয় অন্তু। মিনিট কয়েক পরে আবার বাজতে শুরু করে মোবাইল। অন্তু জানে ফোনটা আসছে আরেকটা আননোন নম্বর থেকে। না নম্বরটা আর আননোনও নয় এখন। অন্তু জেনে গেছে নম্বরটা তিতলির। মেসেজ করে তিতলি নিজেই জানিয়েছে অন্তুকে। অন্তুও বুঝতেই পারছিল নম্বরটা তিতলিরেই হবে। তিতিলি ছাড়া আর কারুর হওয়ার কথাও তো ছিল না। তবুও অন্তু নিজের ভেতরের ভয়টাকে অন্যপথে চালানোর জন্যই হয়তো আরও পাঁচটা মুখ কল্পনা করছিল। 

কিন্তু আজ এতদিন পর তিতলি অন্তুর কাছে কী চায় ? কী চাইতে পারে তিতলি ? জানালার ওপারের বৃষ্টির শব্দ শুনতে-শুনতে সারাটা রাত কেটেছে। তবুও কোনও কূলকিনারা খুঁজে পায়নি। ভয় পেয়েছে অন্তু। সব হারিয়ে ফেলার ভয়। শরীরী স্মৃতির ইতিহাস শিল্পীর সামনে চলে আসার ভয়। আবার বাজছে মোবাইলটা। ‘বাজুক শালা যত বাজছে বাজুক। কিছুতেই ধরব না...’ নিজের মনেই বিড়বিড় করে অন্তু।
‘অন্তু এই অ...ন...তু কে ফোন কইরছ্যে দ্যেক। কখন থ্যেইকে ফোনটা বাইজচ্যে ত বাইজচ্যেই...’ দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে করতেই কথাগুলো বলে লতিকা। 
বাধ্য হয়েই বিছানা থেকে উঠে ফোনটা হাতে নিয়ে সাইলেন্ট করে দেয় অন্তু। এগারোটা মিসড কল। তার ভেতর নটা তিতলির। দুটো শিল্পীর। লাস্ট দুটো শিল্পীর। মোবাইলটা নাড়াচাড়া করতে করতেই গত রাতের কথাগুলো মনে করতে থাকে অন্তু। শিল্পী ওষুধ খেতেই চায় না। সে কথা পরিষ্কার জানিয়েই দিয়েছে অন্তুকে। যদিও আজ এতদিন পর ওষুধ খেলেও কাজ হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা বিষয়টা মাথায় ছিল শিল্পীর। ইচ্ছে করেই ওষুধ কেনেনি। অন্তু ওষুধ খাওয়ার কথা বলতেই শিল্পী পরিষ্কার বলে দিয়েছে, ‘না ওষুধ আমি খাব না। কিছুতেই খাব না, তাতে যা হওয়ার হবে।’ কেন খেতে চায় না সেকথা জানতে চাইলে শিল্পী বলেছে, ‘সে তুমি বুঝবে না। তোমার বোঝার কথাও নয়। তুমি মেয়ে হলে হয়তো...।’ সত্যিই বুঝতে পারেনি অন্তু। এতে ছেলে-মেয়ের ব্যাপার আসছে কোথা থেকে সেটাও বুঝতে পারেনি।
গত রাতে যখন শিল্পীর ফোনটা লাগল তখন ঘড়ির কাঁটা একটার ঘর পেরিয়ে গেছে। ঝমঝম বৃষ্টি ছাড়িয়ে টিপটিপ শব্দ। এদিকে তিতলি মেসেজ করে নিজের পরিচয় জানিয়েছে বলেই হয়তো অন্তুর ঘুম আসছিল না। একটার পর ফোন লাগল শিল্পীর। শিল্পীর গলায় রাতজাগা ক্লান্তির ছোঁয়া থাকলেও ঘুম ছিল না। তাই প্রতিটা উত্তর ছিল পরিষ্কার। ঘুমের ঘোরে কোনও কথাই যে শিল্পী বলেনি সেটা ভাল মতোই জানে অন্তু। একদিক থেকে তিতলির ফিরে আসার পদধ্বনি আরেক দিকে কুমারী গর্ভ হতে শিশু-কান্না শোনার ভয়। সারারাত কান দুটোকে চাপা দিয়েই জানালার এপারে বসেছিল অন্তু। মাঝে মাঝে জানালার পথে বিদ্যুতের ঝিলিক এসে ঘরটা আলোকিত করে দিয়ে গেলেও অন্ধকার কিছুতেই কাটছিল না।
এবার ফোনটা ভাইব্রেট হতেই রিসিভ করে অন্তু। ওপার থেকে শিল্পীর গলা ভেসে আসে, ‘ঘুমোচ্ছিলে নাকি?’
‘হ্যাঁ। কিছু বলবি ?’
‘না মানে জিজ্ঞেস করছিলাম কখন আসছ ?’
‘দশটা নাগাদ বের হব। তোর মা কি নার্সিং হোম থেকে বেরিয়ে গেছে ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।
‘না না এখনো যায় নি এই একটু পরেই বেরোবে।’
‘ও আচ্ছা ঠিক আছে...’
‘হ্যালো হ্যালো... আরেকটা কোথা শোনো না...’
‘হ্যাঁ বল কী বলবি...’
‘বলছিলাম কী; কালকে রাতের কথায় রাগ করেছো ?’
‘না না রাগ করতে যাব কেন। তাছাড়া তুই তো যুক্তিসঙ্গত কথাই বলেছিস।’
‘না আসলে কী জানতো...’
‘ওসব কথা থাক। পরে আলোচনা হবে, আমার এখন ওসব আলোচনা করতে ভাল লাগছে না। তাই প্লিজ...’ শিল্পীকে থামিয়ে দিয়েই গড়গড় করে কথাগুলো বলে যায় অন্তু।
শিল্পী খানিকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর বলে, ‘আচ্ছা। আসার আগে একটা কল করে জানিও। বাই।’ কলটা কেটে দেয় শিল্পী। অন্তুর কথা শোনার জন্যে অপেক্ষাও করে না।
মোবাইলটা পকেটে নিয়েই ছাদে এসে দাঁড়ায় অন্তু। মাথাটা ভার লাগছে ওর। সব কেমন যেন এলোমেলো, কেমন যেন অগোছালো। কোনও সূত্রে ফেলেই অঙ্কগুলোকে মেলানো যাচ্ছে না। আকাশের বুকে দাঁত বের করে রোদ হাসছে, তবুও অন্তুর মনে হয় এই ছাদটাই ওর একমাত্র নিরাপদ জায়গা। এখানে দাঁড়িয়েই নিজের সঙ্গে গল্প করা যায়। নিজের ভেতর ডুব দিয়ে স্বপ্ন কুড়িয়ে আনা যায়। 
ছাদের কোনাটায় দাঁড়িয়ে নদী পারের দিকে তাকিয়ে থাকে অন্তু। শাল-পলাশের গায়ে সবুজের মেলা। এই সবুজে আড়াল হয়ে আছে ডাংরা নদীটা। ঘু-ঘু-চু  ঘু-ঘু-চু করে ঘুঘু ডাকছে দূরে কোথাও। দেখা যাচ্ছে না পাখিটাকে। মন উদাসীন করে দেওয়া সুর। এমন সুরে অতীতের অনেক দূর পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। অন্তুর দুচোখের পাতায় তিতলির মুখটা ভেসে উঠে। ঠোঁটের নীচে বাঁদিকে একটা ছোট্ট তিল ছিল তিতলির। তিতলিত ঠোঁটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওই তিলটাও হাসত। টোল পড়ত গালে। ডাগর চোখদুটো ছোট হয়ে আসত।
‘আমার বুক দুটো আরও একটু বড় হলে বেশি ভাললাগত তাই না ?’ এই একই কথা একবার অন্তুকে জিজ্ঞেস করেছিল তিতলি। অন্তু কিছুই বলতে পারেনি। মুগ্ধ চোখে নির্বাক ভাবে তাকিয়েছিল তিতলির তুলতুলে শরীরটার দিকে। সত্যিই অমন মেয়েরই তিতলি নাম মানায়। ‘আচ্ছা তিতলির তো কোনও দোষ ছিল না ?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে অন্তু। উত্তরের পরিবর্তে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে নাকমুখ দিয়ে। এই হারিয়ে ফেলাটাই হয়তো জীবন। তাই কোনও কিছুই চিরদিন থাকে না। কিন্তু হারিয়ে ফেলা সময় যদি বর্তমানের পথ আগলে দাঁড়িয়ে পড়ে?
পকেট থেকে মোবাইলটা বেরকরে রাজাকে রিং করে অন্তু। ‘দর্দ দিলোকে কম হো যাতে মে অর তুম...’ কলার টোন লাগিয়েছে রাজা। গানটা অন্তুর নিজেরও খুব প্রিয় একটা গান। আবার হঠাৎ করেই তিতলির মুখটা চোখের পাতায় ভেসে আসে। অন্তু নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করলে শিল্পীর কল্পিত মুখটা এসে তিতলির মুখটাকে আড়াল করে দাঁড়ায়। আচ্ছা ছবির আড়ালে ছবি লুকিয়ে রেখেও কী বেঁচে থাকা যায় ? হয়তো যায় নতুবা মানুষ বাঁচে কেমন করে। এক মুখ দিয়ে আরেক মুখ ঢেকে রেখেই তো মানুষ অতীতের স্মৃতিপথ থেকে বাস্তবের বর্তমানে ফিরে আসে।
‘হ্যাঁ বল...’ ফোনটা রিসিভ করে রাজা।
‘কোথায় ছিলি এতক্ষণ ধরে রিং বাজছে ?’
‘না না ভাইব্রেট করাছিল বলেই হয়তো বুঝতে পারিনি। বল...’
‘বলছিলাম একবার আসতে পারবি ?’
‘হঠাৎ এখন ? কোনও বিশেষ কিছু...’
‘না না তেমন কিছু নয়। আসলে একটা সমস্যায় পড়েছি বুঝলি...’
‘কী আবার হল। শানু তো শুনলাম ভালই আছে। শিল্পীর সঙ্গে কী কিছু...?’
‘আরে না না কারুর সঙ্গেই কিছু হয়নি। এত প্রশ্ন না করে শালা একবার আসতে বলছি আয়।’
‘আচ্ছা যাচ্ছি কিন্তু একটু দেরি হবে, বাজারে সব্জি কিনতে এসেছি...’
‘বেশি লেট করিস না আমাকে আবার বাঁকুড়া যেতে হবে।’
‘এক কাজকর মিনিট দশেক পরে তুই একবারেই রেডি হয়ে নদী পারের দিকে চলে আয় আমিও তাহলে ওখানেই আসছি। ওখান থেকেই তোকে আমি বাইকে করে বিবড়দায় পোঁছে দেবো। তুই বাঁকুড়া চলে যাস। কী বলিস ?’
‘আচ্ছা সেটাই বরং ভাল। আমি রেডি হয়েই বের হচ্ছি। বাই...’ ফোনটা কেটে দেয় অন্তু।
একটা সিগারেট ধরিয়ে পলাশ গাছগুলোর দিকে তাকায়। একজন কাউকে সব খুলে না বললে মনটা হালকা হবে না। ‘আচ্ছা শিল্পী কেন এমন সিধান্ত নিতে চাইছে ? তাহলে কী ও আমার উপর ভরসা রাখতে পারছে না ? ভাবছে যদি আমি ওকে...। ভাববে নাই বা কেন আজকালকার দিনে কতরকম তো হচ্ছে...। তাছাড়া তিতলির সঙ্গেও...’ প্রশ্নের পাকে পাক খেতে খেতে ঘামতে থাকে অন্তু। চোলাই মদ গেঁজিয়ে ওঠার মতো অন্তুর মনের ভেতরেও হাজার রকমের প্রশ্ন গেঁজিয়ে উঠছে এখন।

এবছর দোকানের সংখ্যাটা বাড়বে বলেই মনে হল অন্তুর। নদীর পাড় ধরে প্রায় তিনশ মিটার লম্বা লাইন দিয়ে দোকান বসছে এবছর। বেশ কয়েকটা ছোটবড় নাগরদোলাও বসেছে। দোকান গুলোকে বাঁহাতে রেখে শিবমন্দিরটা পেরিয়ে গিয়ে একটা শালগাছের নীচে বসে অন্তু। এদিকটায় লোকজন একেবারেই আসে না। তাই ঝোপঝাড়টাও বেশি মাত্রায়। বিশেষ করে শেয়াকুল ঝোপে ভরে আছে। শালগাছগুলোর ছায়াও বেশ ঘন। একটা শালগাছের গুড়িতে ঝুলে থাকা ছোট একটা ডালকে ভেঙে ওটার উপরেই বসেছে অন্তু। দূরে লোকজনের কোলাহল ভেসে আসছে। ওদের হাতে আর বিশেষ সময় নেই তাই কোলাহল করেই দ্রুত হাত চালাচ্ছে।
এতক্ষণে অন্তু শুনতে পেলো রাজার মোটর বাইকের আওয়াজ। মন্দিরটার সামনেই দাঁড়াল বাইকটা। অন্তু মোবাইলটা হাতে নিয়ে রাজাকে কল করে জানিয়ে দেয় কোনদিকে আছে ও।
‘এদিকটায় এলি যে ? ওদিকেই তো ভালছিল।’ এসেই অন্তুকে জিজ্ঞেস করল রাজা।
রাজার প্রশ্নটাকে এড়িয়ে গিয়ে অন্তু বলল, ‘এখানেই বসে পড়।’
‘তা ব্যাপার কী বলত এত আর্জেন্ট কলিং ?’ মুচকি হেসেই জিজ্ঞেস করল রাজা।
‘হাসিস না তো শালা। আমার বলে পোঁদ ফাটছে আর তর শালা হাসি পাচ্ছে...’
‘আচ্ছা আচ্ছা একটা সিগারেট দে আগে...’ অন্তুর হাত থেকে সিগারেট নিয়ে রাজা আবার জিজ্ঞেস করে, ‘তা হয়েছেটা কী সেটা তো বলবি...’
‘বলব বলেই না ডাকলাম।’
‘আচ্ছা বল।’ সিগারেটটা ধরায় রাজা।
‘সেই পুরুলিয়ার কেসটা তো তুই জানিস ?’
‘ওই প্রজাপতি কেসটা ?’
‘হ্যাঁ যতটুকু বলেছিলি। তা আবার ফোনটোন করছে নাকি ? পরিষ্কার বলে দে তুই বুকিং আছিস। বেশি কেচাল করতে চাইলে আমাকে ওর নম্বরটা দিস তখন আমিই না হয়...’
‘বেশি বকিস না তো বাল...’
‘আচ্ছা আচ্ছা এবার সিরিয়াস নট জোকিং।’
‘কদিন থেকেই একটা আননোন নম্বরের কল আসছিল। বুঝতে পারছিলাম ওই হবে। নম্বরটা রিজেক্ট লিস্টে ফেলতেই...’
‘অন্য আরেকটা নম্বর থেকে কল, তাই তো ?’
‘সেটা পরে। আগে ওই নম্বর থেকেই মেসেজ পরে অন্য নম্বর থেকে কল। কিন্তু সমস্যা হল ফোন করলেও চুপ করেই থাকে...’
‘তাহলে বুঝলি কী করে ওই মেয়েটাই ?’
‘মেসেজ করে জানিয়েছে।’
‘ও আচ্ছা। তারপর ফোনে কথা বলেছিস ?’
‘না না কল রিসিভ করিনি।’
‘ধুর শালা কলটা রিসিভ করে তো জানতে পারতিস কী বলতে চাইছে।’
‘আমি জানি ও কিছুই বলতে চাইছে না। জাস্ট আবার সম্পর্কে ফিরতে চাইছে।’
‘সেটাই বা কেমন করে বুঝলি ?’ অন্তুর চোখে চোখ রেখেই জিজ্ঞেস করে রাজা।
‘সিম্পল, অন্যকোন দরকার হলে সেটা প্রথমবার কল করেই বলত। ফোনে ধরে চুপচাপ থাকত না। তাও আবার একবার নয় বহুবার।’
‘আরে ভাই মেসেজ করে যখন নিজের পরিচয় জানিয়েছে তখন এবার জানিয়ে দে আর সম্ভব নয় তুই অন্যকারুর সঙ্গে...’
‘আরে অতটা সহজ নয়। আমি তিতলিকে ভালমতোই চিনি।’
‘তাহলে কী করবি শুনি, এমনিই চলবে দুদিকে দুই রানি ?
‘তোর না শালা সবেতেই ইয়ার্কি।’
‘ইয়ার্কি কোথায়। তুই যদি তোর ওই তিতলিকে না বলিস তাহলে তো ও তোর পিছনে লেগেই থাকবে।’
‘কিন্তু...’ একটা লম্বা শ্বাস নেয় অন্তু।
‘কিন্তু কী ?’
‘আমি যতদূর জানি তিতলি যদি জানতে পারে তাহলে শিল্পীর কাছে খবরটা পৌঁছাতে সময় লাগবে না
‘তাহলে এক কাজ কর তুই নিজেই আগাম শিল্পীকে সব জানিয়ে দে।’
‘কী বলব শিল্পীকে ? শিল্পীকে বলব যে তোর আগেই একজনের সঙ্গে আমার ফিজিক্যাল সম্পর্ক ছিল ?’
‘ফিজিক্যাল সম্পর্ক ছিল মানে ? একথা তো তুই আমাকে বলিসনি।’ এবার রাজার মুখটাও থমথমে হয়ে আসে।
‘বলিনি নয়। বলতে পারিনি।’
‘হুম বুঝলাম। তাহলে এবার কী করবি ভাবছিস ?’
‘সেটাই তো বুঝে উঠতে পারছি না...’ কথাটা শেষ করার আগেই অন্তুর মোবাইলটা বাজতে শুরু করে। শিল্পী কল করছে। ফোনটা রিসিভ করে অন্তু, ‘হ্যাঁ বল...’
‘তুমি একটু তাড়াতাড়ি এসো প্লিজ...’ মোবাইলের ওপারে থাকলেও শিল্পীর গলাটা যে কাঁপছে সেটা অন্তু পরিষ্কার বুঝতে পারে।
‘কী হয়েছে কী তুই এরকম তত তত করছিস কেন ? শানু ভাল আছে তো ?’
‘দাদা কেমন যেন করছে। কথা বলতে গিয়ে...’ এর পরের কথাগুলো আর বুঝতে পারে না অন্তু। কান্নায় ঘড়ঘড় করছে শিল্পীর গলটা।
‘চিন্তা করিস না আমি আসছি।’ বলেই ফোনটা কেটে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় অন্তু।
‘কী ব্যাপার রে ? শানু ভাল আছে তো ?’
‘আরে সেটাই তো বুঝতে পারছি না। ও যা কাঁদছে তাতে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।’
‘না মানে কিছু হয়নি তো ?’
‘না না কিছু হয়নি মনে হয়...’
‘চল আমিও যাই। বাইক নিয়েই যাব।’ হড়বড় করে উঠে দাঁড়ায় রাজা।
‘তাই বরং চল। তুই গেলে আমিও সাহস পাব...’ দুজনে মন্দিরটার দিকে এগিয়ে যায়। ওখানেই রাজার বাইকটা দাঁড় করানো আছে। বাইকে চড়তে চড়তে মন্দিরের হাতি-ঘোড়া গুলোর দিকে একবার তাকিয়ে দেখে অন্তু। মনে মনে বিড়বিড় করে বলে, ‘হে ভগবান সব ঠিক করে দিও...’

No comments:

Post a Comment