Sunday, 14 July 2019

Bengali novel, Fire asar din [part 1]

Bengali Novel - Fire asar din written by Bappaditya Mukhopadhyay

উপন্যাস ফিরে আসার দিন

Bangla novel


Bengali novel - jodi search korchen tahole ei Bangla novelta porun. Sob paben, Bangla love story to bangla politics. Sob dik diyei Fire asar din best bengali novel.
Bangla novel

শারদীয় উপন্যাস ১৪২৬ ফিরে আসার দিন


বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়


সাইকেলটায় জোর ব্রেক কষে দাঁড়ায় অন্তু। ঘড়ির কাঁটায় চারটা বাজতে এখনো মিনিট কুড়ি। মহিমের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ঠোঁটের কোনে হাসির রেখা টেনে বলে, ‘ভাল আছ মহিম কাকা ? কাকিমা এখন কেমন আছে?’
অন্যমনস্ক মহিম প্রথমটায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘আগুর মতই আছে। আশা নাইর‍্যে বাপ। তা তুই এই ভর দুপর‍্যে সাইক্যেল লিয়্যে কুতায় যাবি ?’
‘বিবড়দা। চিন্তা করো না কাকা সব ঠিক হয়ে যাবে।’ অন্তু আর দাঁড়ায় না। সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিয়ে ছুটতে থাকে।
মহিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গলায় পেঁচানো গামছাটায় মুখ মোছে। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে ওর। দূরের খাঁ-খাঁ মাঠগুলো পেরিয়ে মহিমের দৃষ্টি ছুটতে থাকে। ও জানে কিছুই ঠিক হবে না। এই রোগে একবার ধরলে আর ছাড়ে না রুগীকে। ভাদু মহিমকে বলে, ‘মুকখানা শুকনা কইর‍্যে ক্যেন্যে থাকিস ? কেউ চিরদিন থাকার লাইগ্যে আসে নাই।’ হ্যাঁ কেউই চিরদিন থাকে না। তাই বলে অবেলায় কেন চলে যেতে হয় ? ভাদুর বয়স পঁইত্রিশের বেশি হবে না। এক-দু’বছর কম হলেও হতে পারে। এটা কারুর যাওয়ার সময় হতে পারে না। মেয়েরা এই বয়সে সংসারে দানাবাধে। ছেলেপিলের জন্ম দেয়। স্বামীর ঘরটাকে নিজের ভাবতে শেখে। আর ভাদু..., নিজের অজান্তেই আরেকটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে মহিমের।
প্রথম চৈত্রের রোদেই চারদিকটা হু-হু করছে। সুমুকপাহাড়ির হাটে হালের বলদ দুটোকে বেচতে গিয়েছিল মহিম। মাত্র আঠার হাজারে ছাড়তে হয়েছে বলদ দুটোকে। হাটের পাইকাররা চোখ দেখলেই টের পেয়ে যায় পেটের গোপন কথাগুলো। তখন যা খুশি দাম হাঁকতে থাকে। মহিম ভাল মতোই জানে আজকের বাজারে ওই বলদ দুটোর দাম কম হলেও তিরিশ বত্রিশের কম হবে না। তবু ওকে আঠারতে ছাড়তে হয়েছে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে এলে মানুষ নিজেকেও আধা দামে বেঁচে দেয়। এত নিছক দুটো বলদ।

। ১।
সাইকেলটাকে রাস্তা ধারের বট গাছটার তলায় দাঁড় করিয়ে একটা সিগারেট ধরায় অন্তু। গরমে গলগল করে ঘামছে সারা শরীর। চুল দিয়ে ফোঁটা-ফোঁটা ঘাম ঝরছে। সিগারেট টানতে টানতে বারবার সারদামাতা কলেজটার দিকে তাকায় অন্তু। কয়েকটা মেয়ে চুকচুক করে গেটের বাইরে ঘুরছে। অন্তু ভাল মতোই জানে ওগুলো বেশ চালুমাল। একটু পরেই এক একটা ছেলের সাইকেলে ঝুপ-ঝাপ চেপে ইকোপার্কের দিকে ছুটবে। ‘শালা ভাবখানা সব এমন যে দাদার অপেক্ষা করছে। দাদা এলেই বাড়ি ফিরবে। পাক্কা হারামি এক একটা...’ নিজের মনেই কথাগুলো বিড়বিড় করে অন্তু। সিগারেটটায় বেশ জোরে আরও কয়েকটা টান দিয়ে রাস্তার উপর ছুড়ে ফেলে। বাতাসে সিগারেটের টুকরোটা ছুটতে ছুটতে ঘাসের গাদায় গিয়ে হারিয়ে যায়। ওই যে মেয়েটা এদিকে এগিয়ে আসছে ? ওর নাম পলি। ওর নাড়ি নক্ষত্র জানা হয়ে গিয়েছে অন্তুর। কবে ও রোহিতের সঙ্গে গিয়ে সপ্তপর্নায় ঠুকিয়ে এসেছে সেটাও অন্তুর জানা। মেয়েটাও মনে হয় জানে যে ওর ব্যপারে অন্তু সব জানে। তাই অন্তুকে অনিচ্ছাতেও সমীহ করে চলে।
পলি মুচকি হেসে পেরিয়ে যায়। ওর হিরো এসে গেছে। এবার রাসলীলা চলবে কাজুবাদামের জঙ্গলে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে অন্তু, চারটা বেজে পঁচিশ। আবার একটা সিগারেট ধরায়। এতক্ষণে বেশ অস্থির অস্থির দেখাচ্ছে ওকে। এই অপেক্ষা করার সময়টা বেশ বিরক্তিকর। সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে পেরিয়ে যায়। এটা এক্কেবারে পছন্দ হয় না ওর। কিন্তু উপায় তো নেই। শিল্পী তো ওকে আসতে বলে না। উল্টে বারণ করে। অন্তুই বরং শোনে না।
আরও মিনিট দশেক পর যখন শিল্পী কলেজ থেকে বেরিয়ে এলো তখন রাগে বিরক্তিতে অন্তুর চোখ-মুখে আগুন জ্বলছে। ‘কোন স্যারের সঙ্গে এতক্ষণ ইয়ে করছিলি শুনি। জানিস না আমি একলা একলা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব শা...’ শেষের গালিটা খানিকটা জোর করেই গিলে নেয় অন্তু। সবাই তাকিয়ে দেখছে।
বেশ আড়ষ্ট ভাবেই অন্তুর সাইকেলে চেপে বসে শিল্পী। অন্তু বুঝতে পারে শিল্পীর ঠিক কিছু একটা হয়েছে। নতুবা চুপ করে বসে থাকার মেয়ে শিল্পী নয়। ‘কী রে গুম হয়ে বসে আছিস যে ? বাড়িতে আবার...’ ঘাড় নেড়ে শিল্পী জানায় বাড়িতে কিছু হয়নি। ‘তাহলে কী হয়েছে সেটা বলবি তো ?’
‘আজকে চয়নিকা বলছিল..., তুমি ওকে আবার কিছু বলবে না তো ?’
‘না কিছু বলব না বল।’
‘চয়নিকা বলছিল তুমি নাকি আগে সুইটিকে ভালবাসতে।’
‘ওই পদ্দার দের রোগা মালটা ? শালা আমি লাইন মারব ওই যমের অরুচিটাকে। তোর বান্ধবীকে বলিস ওদের মতো চামড়া ছাড়া শকুন গুলোর ইয়েতে অন্তু রায় পেচ্ছাব করতেও যাবে না। ওই টিকটিকটা আমার পিছনে ঘুরঘুর করত। সন্দীপের দোকানে গেলেই শালা ঠিক দরজার বাইরে এসে দাঁতের দোকান ওপেন করে দাঁড়িয়ে থাকত। শালা তোকেও বলিহারি লেবেলটা অন্তত উঁচুর দিকে রাখ। ওর মাকে নিয়ে বললেও না হয়...’ কথাটা শেষ করার আগেই অন্তুর হাতে আলতো করে একটা চড় মারে শিল্পী। চলন্ত সাইকেলটা মৃদু টাল খায়। সামলে নেয় অন্তু। এতক্ষণে শিল্পীর মুখে হাসি ফুটেছে।
দুপাসারি কাজুবাদামের জঙ্গলে মোড়া রাস্তা। আর কিছুদিন পরেই পাকতে শুরু হবে কাজুবাদাম। সূর্যের তেজ খানিকটা কমেছে এতক্ষণে। শরীরে বাতাস লাগছে এবার। ফুরফুরে হাওয়ায় ছুটছে সাইকেলটা। শিল্পীর চুলগুলো মাঝে মাঝেই উড়ে এসে অন্তুর মুখে পড়ছে। শ্যাম্পুর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। শিল্পীর ঘাড়ের কাছাকাছি নাকটা এনে গন্ধটাকে ধরার চেষ্টা করে অন্তু। গন্ধটা নাকের ভেতর দিয়ে ঢুকে বুকের উপর দিয়ে ছুটতে থাকে। পুরুষ পুরুষ শিহরণ জাগে শরীরে। এই অনুভূতিটুকু নিয়েই অন্তু প্রতিদিন বিছানায় যায়। ফেসবুকে এগুলোই ইনবক্স করে।
পার্কটা এখনো বেশ নিরিবিলি আছে। একটু পরেই প্রজাপতি মৌমাছি সব ঝাঁকে ঝাঁকে আসবে। বোলতা যে আসবে না তা নয়। বোলতাগুলোও তাদের বিষাক্ত হুল নিয়ে ছুটে আসবে। ওদের অত্যাচারে কোথাও কেউ শান্তিতে বসতে পর্যন্ত পায় না। অন্তু শিল্পীর হাতটা ধরে ঝিলের দিকে এগিয়ে যায়। পা ঝুলিয়ে বসে। শিল্পী যে আজ চোখে কাজল দিয়ে এসেছে এতক্ষণ খেয়াল করেনি অন্তু। চোখে পড়তেই বলে, ‘কাজল পরলে তোকে তো বেশ লাগে। পরিস না কেন ?’
‘ধুর সাজতে আমার ভালই লাগে না।’
‘এই বয়সে সাজবি না তো সাজবি কখন বুড়ি হলে ?’
‘তুমি ভালবাসলেই হবে। আমি তো আর পাঁচজনকে রূপ দেখাতে আসি না।’
‘ও তাই বুঝি। তাহলে বিয়ে বাড়িতে এত ঘটা করে সাজুগুজু করিস যে ?’
‘মায়ের অত্যাচারে সাজতে হয় মশায়। সাধে কি মাঝে মাঝে ঝগড়া লাগে...’
এই একটা জায়গাতেই ওরা এসে বসে। ঝিলের মাছগুলোর দিকে তাকিয়ে স্বপ্নভেজা গল্প করে। দেখতে দেখতে তিন-তিনটা বছর পেরিয়ে গেল দুজনে প্রেম করছে। অন্তু আর শিল্পীর মধ্যে দুটো অদ্ভুত মিল আছে। ওদের বাবা নেই। তবে শিল্পীর মনে আছে বাবার মুখটা, অন্তুর সেটাও মনে পড়ে না। অন্তুর বাবা যখন মারা যায় তখন অন্তু সবে হামা টানতে শিখেছে। শিল্পীর তো তা নয়, ওর বাবা মারা যাওয়ার সময় ও ক্লাস ফোর। দ্বিতীয় মিলটা হল ওদের দুজনের মা-ই অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী। সেই সূত্রে দুই মায়ে পরিচয় আছে। একে অপরের বাড়ি আসা যাওয়া করে। দুজনের যন্ত্রণার কেন্দ্রবিন্দু যখন এক তখন ভাব জমতেও বিশেষ সময় লাগেনি। সেই যন্ত্রণার রেশ ধরেই ভাব জমেছিল অন্তু আর শিল্পীর ভেতরেও। প্রথম প্রথম বাবাকে নিয়েই গল্প চলত দুজনের।
বিজয়াদশমীর বিকেল ছিল সেদিন। শিল্পীর মা শিল্পীকে সঙ্গে করে প্রথমবার এসেছিল অন্তুদের বাড়ি। মা মেয়েতে ঘুরে-ঘুরে দেখেছিল বাড়িটা। বেশ সাজানো গোছানো শৌখিন বাড়ি। এক চিলতে উঠোনে নানান ফুলের পাঠশালা। একমাথা পেয়ারা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মাঝারি মাপের পেয়ারা গাছ। একটা বাতাবি গাছ। লাইন দিয়ে সাজানো টবগুলোতে রংবেরঙের পাতাবাহার। নাম না জানা কত রকমের সব অর্কিড। পরিবেশ বিদ্যার শিক্ষক ছিলেন অন্তুর বাবা। বাড়িটার আনাচে কানাচে তার ছাপ। অন্তুদের বাড়িতে প্রথমবার এসেই শিল্পীর মনে হয়েছিল, এই বাড়িতে অনায়াসে কয়েক জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে ও।
রাত্রি নটা পর্যন্ত আড্ডা চলেছিল সেদিন। সুখ দুঃখের অনেক স্মৃতিকথা বলেছিল অন্তুর মা লতিকা শিল্পীর মা শিবানীকে। সেদিন থেকেই শুরু। তারপর আসা যাওয়া বন্ধ হয়নি আর। লতিকা হয়তো তেমন কিছু বুঝতে পারে না কিন্তু শিবানী মেয়ের মনের কথা ঠিক পড়ে ফেলেছে। শিল্পী একা একা অন্তুর বাড়ি না এলেও অন্তু কাকিমার খোঁজ খবর নিতে মাঝে মাঝেই শিল্পীর বাড়ি হানা দেয়। কখনো কখনো দুপুরের খাবার খেয়ে আসে। শিল্পীদের বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে দুজনে কত রকমের গল্প করে। ওই গল্পগুলোর কোনও নাম হয় না। ওগুলো শুধুই গল্প।
‘শালা রোজ এখানেই এসে বসে যেন বাপের বানানো জায়গা...’ কথাটা শুনেই দপ করে আগুন ধরে যায় অন্তুর মাথায়। বোলতাগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে ঢুকছে এবার। একে-ওকে হুল ফোঁটানো ছাড়া ওদের আর কোনও কাজ নেই। সারা পার্ক উড়ে উড়ে বেড়ায়। কে কোথায় কী করছে, কী বলছে এই নিয়েই টোন কাটতে থাকে। শিল্পী শক্ত করে অন্তুর হাতটা ধরে। অন্তুর পেশিবহুল হাতের শিরাগুলো টান-টান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। বাবা তুলে কথা বললে এক্কেবারে সহ্য হয় না ওর। রক্তচক্ষু নিয়েই পিছন ফিরে তাকায় অন্তু। ছেলে দুটো এখনো যায়নি ওখান ঠেকে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। রাগটাকে গিলে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে অন্তু।
‘৩৪-২৮-৩৪ এক্কেবারে ঝাক্কাস মাইরি। যদি পেতাম না...’ কথাটা শেষ হওয়ার আগেই শিল্পীর হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায় অন্তু। কোনও কথাবার্তা কিচ্ছু নেই, সোজা গিয়ে একটা ছেলের গলাটিপে শূন্যে তুলে ধরে। পার্কের আর সবাই শিল্পীর মতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। 
‘আরে আরে কী হল কী হল’-করে কয়েকজন ছুটে আসে। অন্তুর মুখে কোনও সাড়াশব্দ নেই। এখনো রাগে কাঁপছে অন্তু। ছেলেটা হাত পা ছুঁড়ছে যন্ত্রণায়। অথচ পাশের ছেলেটা কিচ্ছু বলছে না। অন্তুর হাবভাব দেখে কয়েক ফুট পিছিয়ে দাঁড়িয়েছে। গলটা ধরেই এবার ছেলেটাকে মাটিতে আছড়ে দেয় অন্তু। মাটিতে পড়ে খক্-খক্ করে কাশতে থাকে ছেলেটা। অন্তু এবার ওর একটা পা ধরে ঘষড়ে নিয়ে আসে শিল্পীর কাছে। পেটটায় এক লাথি মেরে বলে, ‘বল কী বলছিলি এবার বল। না বললে শালা তোকে এখানেই শেষ করে দেব।’ আরও একটা লাথি মারে অন্তু। ছেলেটার কথা বলার মতো শক্তি নেই এখন।
পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছেলেমেয়ে গুলো মজা দেখছে। কেউ কেউ বলছে, ‘মারুক কুকুরটাকে মারুক, বড্ড আজেবাজে কথা বলে।’ কেউ কেউ আবার বলে, ‘ছেড়ে দিন দাদা এবার ছেড়ে দিন।’ অন্তু কারু কথা শোনার মুডে নেই ও আরেকটাকে খুঁজছে। ওই তো চোখে পড়েছে..., ভিড়ের মাঝে নিজেকে চালান করে দিয়ে কাঁপছে ছেলেটা। চুলের মুঠি ধরে ভিড়ের ভেতর থেকে ওকে বের করে অন্তু। ‘আমি কিছু বলি...’ অন্তুর প্রথম চড়েই মুখটা বন্ধ হয়ে যায় ছেলেটার। তারপর আরও একটা চড় আরও একটা আরও...। এতক্ষণে পার্কের গার্ড দুটো ছুটে এসেছে। অন্তুকে লক্ষ্য করেই কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল হয়তো। কিন্তু এসেই দেখল একটা মাতব্বর ধূলায় খেলা করছে। আরেকটার নাকমুখ রক্তে মিলেমিশে একাকার। তাই অন্তুকে কিছু না বলে বোলতা দুটোকে সঙ্গে নিয়ে কেটে পড়ে। একটাও উচ্চবাচ্য করল না।
সার্কাস শেষে অন্তু আবার শিল্পীর পাশে এসে বসে। শিল্পী এখনো ভয়ে সিটিয়ে আছে। সময়ে ফোন না ধরলে, না করলে, রেগে যায় অন্তু। চিৎকার করে। কিন্তু তাই বলে...
‘কিরে ভয় পেয়েছিস ? এটা কী দেখলি, এটা তো কিছুই না। আজকে ঠিক করেই এসেছিলাম বুঝলি। মাইরি বলছি শালা কদিন থেকেই ভাবছিলাম দেবো-দেবো আজকে দিয়েই দিলাম।’
শিল্পী হাঁ করে তাকিয়ে থাকে অন্তুর দিকে। মনে মনে বলে, ‘ঠিক করেই এসেছিল আজকে...’ অন্তু শিল্পীর কানটা ধরে নাড়া দেয়। অন্তুর হাতটা আবার শক্ত করে ধরে শিল্পী। অকারণে চোখ দুটো ছল-ছল করে আসে। শিল্পী জানে, না ঠিক জানে নয় অনুভব করতে পারে অন্তু ওকে কতটা ভালবাসে। আর পাঁচটা মেয়ের মতোই শিল্পীরও ভয় হয়। হারিয়ে ফেলার ভয়। আচ্ছা সত্যি সত্যি যদি অন্তু কখনো..., না ভাবতে পারে না শিল্পী। এটা ভাবতে গেলেই ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে একাকার হয়ে যায়।
‘ওই পাগলী কোথায় ডুবে আছিস ? আরে ওদেরকে না মারলে ওরা পেয়ে বসছিল। শুনছিলি না ওরা তোকে নিয়ে কীসব আজে বাজে কমেন্ট করছিল।’
‘তুমি আমাকে সারাজীবন এভাবেই আগলে আগলে রাখবে তো অন্তুদা ? আমার খুব ভয় করে জানো ?’ শিল্পীর চোখের পাতা জলে ভরে আসে। ঠোঁট দুটো ফুলে-ফুলে ওঠে। নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে শিল্পী।
অন্তু কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারে না। শিল্পীর মাথাটা নিজের বুকে জড়িয়ে কিছু একটা অনুভব করার চেষ্টা করে।

পশ্চিম কোনে মেঘ জমছে। মাঝে মাঝে বেয়াড়া বিদ্যুৎগুলো ঝিলিক মারছে মাঘের বুকে। বৃষ্টি নামবে মনে হয়। অন্তু শিল্পীর মাথায় চিবুক রেখে জিজ্ঞেস করে, ‘বাড়ি ফিরতে হবে তো ? পশ্চিম দিকে তাকিয়ে দেখ মেঘ আসছে। ঝড় উঠবে মনে হয়।’
শিল্পী অন্তুর বুকে মাথা রেখেই উত্তর দেয়, ‘তুমি তো আছো। আসুকগে ঝড়। আমি এখন বাড়ি যাব না।’
অন্তু আর কিছুই বলতে পারে না। বুকের মাঝে আরও জোরে জড়িয়ে ধরে শিল্পীর মাথাটা। 
আকাশ কালো করে মেঘের দল এগিয়ে আসে। গাছের মাথাগুলো দামাল বাতাসে নাচতে শুরু করে। মাঝে মাঝে কড়-কড় শব্দ। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। খানিক বাদে ফোঁটা-ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়। তারপর ঝম-ঝম শব্দে। পার্কে বসে থাকা কপোত কপোতীগুলো ভিজছে। ওদের ডানায় ডানায় প্রেমের গন্ধ। অন্তু আর শিল্পী ঝিলের ধার থেকে উঠে একটা বটগাছের নীচে গিয়ে দাঁড়ায়। জলের ঝাপটায় জামা-কাপড় ভিজতে থাকে। এমন ভাবে ওরা কখনো ভেজেনি এর আগে। এই ভেজাটার আনন্দ অনুভূতি আলাদা। শিল্পীর ঠোঁটে বৃষ্টির মুক্ত দানা। হাওয়ায় উড়ছে চুলগুলো। বারবার সামলে নেওয়ার পরেও পাখা মেলতে চাইছে ওড়নাটা। অন্তু শিল্পীর কাছে এগিয়ে আসে। আরও কাছে। আরও কিছুটা কাছে। শিল্পীর নাকের গরম বাতাস অন্তুর ঠোঁটে ধাক্কা মারে। তারপর চারটা ঠোঁট স্বপ্নের ভেলায় চড়ে ভাসতে থাকে। ওদের কোনও গন্তব্য নেই। অন্তুর হাত নিজের অজান্তেই ঠিকানা খুঁজে নিয়েছে। কেঁপে কেঁপে উঠছে শিল্পীর নিটোল শরীরটা। এক সময় বৃষ্টিভেজা শরীর দুটোতে দুর্নিবার শিহরণ জাগে। কাছাকাছি কাশির শব্দ পেতেই সরে দাঁড়ায় দুজনে। ছেলে আর মেয়েটা হাসতে হাসতে পেরিয়ে যাচ্ছে। ওরা কী কিছু দেখেছে ? হয়তো দেখেছে। লজ্জায় শিল্পীর গালদুটো রাঙা হয়ে যায়। অন্তু ওকে অনেকবার চুমু খেয়েছে ঠিক কথা কিন্তু ওর বুকে হাত দেয়নি এর আগে। এতদিন শিল্পী বান্ধবীদের মুখে শুনে এসেছে...। সত্যি কেমন যেন পাগল-পাগল নেশা লাগে।

বৃষ্টি কমে এসেছে এতক্ষণে। আর একটু পরেই সন্ধা এসে কাজুবাদামের জঙ্গলে ঝুপ করে ঝাঁপিয়ে পড়বে। দুজনে দুজনার হাত ধরে হাঁটতে থাকে রাস্তার দিকে। পার্কটা ফাঁকা হয়ে আসছে। ‘আমি তোমার প্রেমে হব...’ অন্তুর মোবাইলে কল। ‘হ্যালো মা। আরে বোলো না রাজাদের বাড়িতে এসে বৃষ্টির জন্য আটকা পড়েছি। চিন্তা করো না আটটার আগেই বাড়ি ফিরে যাব। আচ্ছা ঠিক আছে..., আচ্ছা।’ মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে অন্তু বলে, ‘জানিস মা না আমাকে চোখের আড়াল করতেই চায় না। হয়তো বাবাকে হারানোর ভয়টা মায়ের পিছু ছাড়েনি। মাঝে মাঝে খেয়াল করে দেখেছি মা আমার মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মায়ের জন্য খুব খারাপ লাগে।’
‘আমারও।’
‘আমাদের দুজনের এই একটা জায়গা এক্কেবারে এক বল ?’
‘হুম’
‘এই তুই কী এত ভাবছিস বল তো। সেই কখন থেকে দেখছি তুই মনমরা। কিছু হয়েছে তো বল না।’
‘না না হবে আর কী। এমনি কেমন যেন লাগছে।’
অন্তু কিছুক্ষণের জন্য গুম মেরে যায়। তারপর বলে, ‘আমাকে খুব বাজে ভাবছিস তাই তো ? তুই যেমনটা ভাবছিস আমি কিন্তু মোটেও তেমন নই। নিজের অজান্তেই কী করে কী যে হয়ে গেল...’
‘আমি কি সেই নিয়ে তোমায় কিছু বলেছি ?’
‘বলবি আর কী। তুই তো ধরেই নিয়েছিস আমি ছেলেটা...’ কথাটা শেষ করতে পারে না অন্তু। অভিমানের চোটে ওরা গলা ভেঙে যাচ্ছে।
‘বিশ্বাস করো অন্তুদা আমি মোটেও ওসব ভাবিনি। তোমার দিব্বি বলছি।’
অন্তু আর কিছুই বলে না। একটা সিগারেট ধরিয়ে শিল্পীর পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। পার্কের থেকে বেরিয়ে আসে ওরা। সাইকেলে চড়ে। খানিক আগেই পিচরাস্তার উপর সন্ধা আঁচল পেতে দিয়ে গেছে। এখন বাতাসে কাজুবাদাম জঙ্গলের গন্ধ। সাইকেলটা ছুটছে বিবড়দার দিকে... 

। ২।
এখনো মুখ ভার করেই আছে আকাশটা। মাঝে মাঝেই গুড়-গুড় শব্দ ভেসে আসছে দূরের আকাশ থেকে। বিদ্যুৎ ঝলকাচ্ছে। ঘরের দাওয়ায় বসে অন্যমনস্ক ভাবে একটা বিড়িকে রগড়াচ্ছে মহিম। ভাবনার ভেতর ঘরে ঢুকে নিজের ফেলে আসা দিনগুলোর কথাই হয়তো মনে করছে। তখন ভাদু বঠের মতো ছায়ার বেড়ায় ঘিরেছিল মহিমের জীবনটাকে। ভাদুর গায়ের রঙ ফর্সা না হলেও কালো ছিল না কোনও কালেই। টানাটানা চোখ। টিকালো নাক। তুলিতে দিয়ে আঁকা মুক্তা রঙের দাঁত। প্রথমবার দেখেই মন ভরে গিয়েছিল মহিমের। তাই বিয়েটা সেরেই নিয়েছিল। স্বপ্নের মতোই কাটছিল ওদের এক একটা দিন। দেশলাইটা ফোঁস করে জ্বালিয়ে বিড়িটা ধরায় মহিম। ঘরের দাওয়াটা দেশলাইয়ের আলোতে আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে ডুব মারে। মহিমের ঘরে যদিও ইলেকট্রিক আছে তবুও বিলের অত্যাচারে ওই একখানি বাল্ব টিমটিম করে ভেতর ঘরে।
বিয়ের প্রথম প্রথম ভাদুর সঙ্গে খুনসুটি করেই রাত কেটে যেত মহিমের। বছর পার হতে না হতেই একটা মেয়ে জন্মাল। মেয়েই চেয়েছিল ওরা। স্বাদ করে নাম রাখল পূর্ণিমা। দোলপূর্ণিমার রাতে জন্মেছিল বলেই এমন নাম রেখেছিল ভাদু। এই বছর দশেকের মেয়েটা দিনরাত এখন মায়ের সেবা করে। শুধু সেবা নয় কলের থেকে জল আনা। দুবেলা রান্না করা। এর সঙ্গে স্কুল। যদিও এখন ঠিকঠাক আর স্কুলে যাওয়া হয় না ওর। হঠাৎ করে আছড়ে পড়া অন্ধকারটাই যেন সময়ের আগেই কচি মেয়েটাকে সব শিখিয়ে দিয়েছে। গাঁয়ের লোকে বলে লক্ষ্মী জন্মেছে ভাদুর কোলে। পূর্ণিমা দেখতেও হয়েছে টুকটুকে। কে বলবে দশ বছরের মেয়ে ? দেখলে মনে হয় চোদ্দ পনেরোর কম হবে না। তবে চাঁদের গায়ে যেমন কলঙ্ক থাকে ঠিক তেমন ভাবেই পূর্ণিমারও কলঙ্ক আছে। কথা বলতে পারে না মেয়েটা। না জন্ম থেকে নয়। কার্তিকদের গাছে কুল পাড়তে গিয়ে গাছের থেকে পড়েছিল। সেই থেকে কী করে যে কী হল... মেয়েটা আর কথা বলে না। তখন কত আর বয়স হবে ? ওই বছর চারেক। তবে শুনতে পায় সব। হাত-মুখের ইশারায় বুঝিয়েও দিতে পারে। তবুও তো...  
বিড়িটায় শেষ টান দিয়ে উঠোনে টুকরোটা ছুড়ে ফেলে মহিম। এখন আর ভ্যাপসা গরমটা নেই। বিকেলের ঝড় বৃষ্টিতে এখন ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। ভেতর থেকে পূর্ণিমা হাতের ইশারায় ডাকে। ঘরের ভেতরে ঢোকে মহিম। ভাদুর পাশে বসে। মাথায় হাত বোলায়। এখন আর ভাদুর মাথায় চুল নেই। রেডিও থ্যেরাপির অত্যাচারে সব চুল গেছে। এক সময় চুলের খোপায় জবা ফুল গুঁজে মাঠের কাজে যেত ভাদু। শীতের দুপুরে ভেজা চুলে পিঠ ঢেকে রোদ খাওয়াত। ভাদুর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে মহিম জিজ্ঞেস করে, ‘বল কী বলবি বলছিলি।’
ডাগর চোখে ভাদু চেয়ে থাকে মহিমের দিকে। চোখের কোনায় জল জমা হয়। কিছু একটা বলতে গিয়েও কিছু বলে না ভাদু। ভেতরের কষ্টটা দলা পাকিয়ে গলায় যেন বারবার আটকে যাচ্ছে। মহিম জানে ভাদু বলদ দুটোর কথা বলবে। বলবে নাই বা কেন ? সে বছর চাষের আগে যখন মহিম হাজার খানেক টাকার জন্য হন্যে হয়ে এর ওর কাছে চেয়ে ফিরছিল, তখন নিজের সোনার চুড়ি দুটোকে বিক্রি করে মহিমের হাতে টাকা-কটা তুলে দিয়েছিল ভাদু। বিয়ের সময় ভাদুর মা দিয়েছিল ভাদুকে। ধান বিক্রির টাকার সঙ্গে ভাদুর দেওয়া টাকাতেই বলদ দুটো কিনেছিল মহিম। দুধসাদা বলদ দুটোকে দেখেই ওদের নামকরণ করেছিল ভাদু। ভোলা-শঙ্কর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভোলা-শঙ্কর নিজেদের নাম চিনে নিয়েছিল। পাড়াতে ওদের খাতির ছিল আলাদা। যেমন হাল টানার চটক তেমনেই গাড়ি টানার। কাদাখেত থেকেও অনায়াসে ধানবোঝাই গাড়ি টেনে তুলত ভোলা-শঙ্কর। আজকে যখন হাটে ওদেরকে রেখে ফিরে আসছিল মহিম ? করুণ ভাবে তাকিয়ে ছিল ভোলা-শঙ্কর। ওরা অবলা কিন্তু অবুঝ তো নয়।
‘সোনাপুর‍্যের চাইর বিঘা জমি বিক্কির দিন অত কইর‍্যে বইল্লম ভোলা-শঙ্করকে মন্যেক বিক্কি কইর না...’ কান্নার চোটে কথাটা শেষ করতে পারে না ভাদু। মহিম পাথরের মতো বসে থাকে। ভাদুকে বোঝানোর মতো কিছু নেই ওর কাছে। ভাদু জানে ওর দিন ঘনিয়ে আসছে। ওষুধ দিয়ে ওকে বেশিদিন আটকে রাখা যাবে না। মহিম ও জানে ভাদু চলে যাবে। তবুও যে কটা দিন নিজেকে নিগড়ে আঁকড়ে রাখা যায়।
নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে আসে পূর্ণিমা। ওর ছোট্ট বুকের ভেতর মাকে হারিয়ে ফেলার ভয়টা ঝড়ের মতো বইছে কদিন ধরে। ওর বয়সি ছেলেমেয়ে গুলো ছাড়া ওর মায়ের সুস্থ হওয়ার গল্প আর কেউ ওকে বলে না। সেদিন পরানের কাছে গিয়েছিল পূর্ণিমা। ও জানে পাড়ায় পাড়ায় কবিরাজি করে পরানদাদু। ভূত ছাড়ায়। ডাইনি তাড়ায়। গাঁয়ে মন্দ বাতাস বইলে ঠিক বুঝতে পারে। পূর্ণিমা ইশারায় ইশারায় জানতে চেয়েছিল, ওর মা কবে সুস্থ হবে? 
‘জানি নাই। ঠাকুর জানে।’ বলে কেটে পড়েছিল পরান। পরানের মতো লোকও পারেনি নিষ্পাপ মেয়েটার মুখের উপর মিথ্যে কথা বলতে। কিন্তু পূর্ণিমা? ওর ছোট্ট মনটা তো উত্তর পায়নি ঈশ্বরের দরবারে। কেঁদেছে। একলা একলা কেঁদেছে পূর্ণিমা। পুকুর ঘাটে বসে বাসন ঘষতে ঘষতে উত্তর খুজেছে হাঁসের কাছে, মাছের কাছে, গাছের কাছে এমনকি জলের কাছেও। ওরা হয়তো বলেছে, ‘কাঁদছ কেন খুকু তোমার মা আবার সুস্থ হবে।’ কিন্তু পূর্ণিমা খেয়াল করে দেখেছে দিনকে দিন দড়ির মতো শুকিয়ে যাচ্ছে ওর মা। এখন মায়ের বুকে মাথা রাখলে বালিশের মতো আর মনে হয় না। মনে হয়, গুটিয়ে পড়া কাপড়ের উপর মাথা রেখেছে ও। পূর্ণিমা জানে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে ওর মা। মায়ের কষ্টের গভীরতা মাপতে গিয়ে হাঁপিয়ে পড়ে মেয়েটা। তারপর দু’চোখ জলে ডুবিয়ে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে।

বামুন পুকুরের জলে এক টুকরো চাঁদ দুলছে এখন। আকাশে ছেঁড়া-ফাটা সাদাকালো মেঘ চরে বেড়াচ্ছে। অশ্বত্থ গাছটার ছায়া পড়ছে জলের উপর। পলাশ গাছের ঝোপঝাড় পেরিয়ে চৌধুরীদের জমিগুলোর ওপার থেকে শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে। সাঁওতাল পাড়ার কুকুরগুলো সমানে তাল মিলিয়ে যাচ্ছে শেয়ালেরগুলোর সঙ্গে। ঘুমিয়ে পড়েছে জয়নগর গ্রামটা। একা পুকুর পাড়ে বসে আছে মহিম। হাঁড়িয়ার মাতাল গন্ধ বাতাসে বাতাসে। নেশা ধরছে মহিমের। হাঁড়িয়ার গন্ধের সঙ্গে বিড়ির গন্ধ আর চানাচুরের গন্ধ মিলে মহিমকে পায়ে ধরে অতীতে টানছে।
‘আমার পিরিতি তুমার পিরিতি শ্মশাইন পার‍্যেতে সব শ্যেষ
কার লাইগ্যে এত মিছিমিছি বাঁচা ? কার লাইগ্যে এত ক্ল্যেশ ?   
তুমি রোজ যে অগুনেতি ছাই আমিও ত পুড়ি তাতে
আমি যাব-ক্ষণ ভোর‍্যের বেলা তুমি যাবে আইজ রাইতে...’ চাপা কান্নায় লটপট করতে থাকে গানের লাইনগুলো। ভাদুর মুখটা মনে করে আরও একগ্লাস গিলে নেয় মহিম। কয়েক দানা চানাচুর মুখে দিয়ে আধমরা বিড়িটায় ফোঁস-ফোঁস করে কটা টান মেরে ওটাকে আরও চাগিয়ে তোলে। গানটা আবার একবার গাইবার চেষ্টা করে। সুর কেটে যায়। মাথাটা ঝিমঝিম করছে এখন।
চাঁদটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে জলের উপর জ্যোৎস্না ঢালছে। মহিম উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। পারে না। ওর পা নড়বড় করছে। ভেতরটা গুল্লিয়ে আসছে বারবার। বমি হবে হয়তো। মহিম অন্যমনস্ক হওয়ার চেষ্টা করে। অন্যমনস্ক ? অন্যমনস্ক হতে গেলেও তো মনটাকে ঝোলানোর মতো একটা ডাল লাগে। মহিমের সে ডাল নেই। ডালটায় ঘুন ধরেছে। ওটা তো কদিন পরেই ভেঙে পড়বে। প্রথম প্রথম মহিম ঈশ্বরের কাছে নানান কৈফিয়ত চাইত। এখন আর চায় না। এত দিনে মহিম এটুকু বেশ ভালমতোই বুঝেছে, গরীবের কোনও ঈশ্বর থাকে না।
পুকুর পাড়ে বসে বসেই ঝিমোচ্ছিল মহিম। হঠাৎ কানে আসে কারা যেন পাড়ের ওপারে ফিস-ফিস করছে। সোজা হয়ে উঠে বসে। কান খাড়া করে শব্দগুলোকে ধরার চেষ্টা করে মহিম। দুটো দুরকমের শব্দ কানে এসে ধরা দেয় মহিমের। একটা ‘বোল হরি হরি বোল...’ এই শব্দটা নদীর দিক থেকে ভেসে আসছে। আরেকটা শব্দ খুব কাছাকাছি। চোরের মতো ফিসফিসে গলায়। খানিকবাদে গলাদুটা চিনতে পারে মহিম। একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘বেশ্যামাগী। ভাতারটাকে খ্যায়েও ভোক মিটে নাই।’ মহিম জানে ওরা কারা। শুধু মহিম কেন জয়নগরের প্রায় সবাই জানে। পরিমল মরার আগে থেকেই তপনার সঙ্গে কাবেরীর লটরপটর চলছে। কতবার হাতেনাতে ধরা পড়েছে। একবার তো মার খেতে খেতে বেঁচেছিল তপনা। 
এই কাবেরীর উপর পুরানো একটা রাগ আছে মহিমের। পাতমাকে সঙ্গে নিয়ে মহিম একবার বামুন পুকুরে মাছ ধরতে এসেছিল। কাবেরী পলাশ গাছের আড়ালে পায়খানা বসে দেখে ফেলেছিল সেটা। পরেরদিন গ্রামের কারু জানতে বাকি ছিল না। কাবেরী ফলাও করে রটিয়েছিল। সেদিনের পর থেকে মহিম একটা সুযোগ খুঁজছিল। আজকে পেয়েছে। অশ্বত্থ গাছটার আড়ালে সরে আসে মহিম। মোক্ষম সময়ের অপেক্ষা করতে থাকে...

। ৩।
মাকে বোঝাতে বেশি সময় লাগে না অন্তুর। শিল্পীর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আগেই ও ঠিক করে রাখে বাড়িতে ফিরে কী বলবে। আজকে তো বরুণ দেব পবন দেব দুজনেই সহায় ছিলেন। কলেজের পরই শিল্পীর টিউশন থাকে। সোম-বুধ-শুক্র। শিল্পীর মা আর দাদা জানে রবি-সোম-বুধ-বৃহস্পতি-শুক্র। সপ্তাহে দুটোদিন অন্তুর জন্য রাখা।
ঘরে ফিরে ভেজা জামাকাপড় পাল্টে স্নান ঘরে ঢোকে অন্তু। বৃষ্টি ভেজার পর স্নান না করলে সর্দি হয়ে যায় ওর। স্নান ঘরে ঢুকে গামছাটা খুলে দাঁড়ায়। ভাল করে দেখে শরীরটা। আজ সারা শরীর জুড়ে প্রেমের ছোঁয়া। হাতের তালুতে শিল্পীর বুকের গন্ধ। চোখ বন্ধ করে হাতের তালুটা শোঁকে অন্তু। সারা শরীরে নেশা ধরে। গায়ে জল ঢালার সময় আবার একবার শিল্পীর বৃষ্টি ভেজা শরীরটা মনে পড়ে। পুরুষ পুরুষ ইচ্ছেগুলো মনের ভেতর লাফিয়ে বেড়ায়। সাবানটাকে তালুতে মুড়ে চটকাতে ইচ্ছে করে ওর। পরে ‘ধ্যাত’- শব্দ করে হাসি মুখে নিজেই নিজের মাথায় একটা টোকা মারে।
বাথরুম থেকে ফিরে এসেই মোবাইলের ডাটা অন করে অন্তু। ফেসবুকে দুটো মেসেজ জ্বলজ্বল করছে। ইনবক্স ওপেন করে দেখে, নদী পাঠিয়েছে মেসেজ দুটো। নদী শিল্পীরই ফেসবুক আইডি। দাদার চোখ এড়াবার জন্য ওকে নদীতে নামতে হয়েছে। অন্তু মেসেজটা ওপেন করে দেখে, প্রথমের মেসেজটা কবিতা। পরেরটা একটা স্মাইলি। নদী এখন অফলাইন। মোবাইলটাকে সোফায় নামিয়ে সূতির পাজামায় পা দুটোকে গলিয়ে নেয় অন্তু। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আরেকবার নিজের বুকটাকে দেখে। মনে মনে নিজের বুকের মাঝে শিল্পীর বুক দুটোকে কল্পনা করে।
অন্তুর মা টেবিলে চা-চানাচুর-মুড়ি নামিয়ে দিয়ে যায়। চায়ে চুমুক দিয়ে কবিতাটা পড়তে থাকে অন্তু-
‘নিজের জীবনের কাছে কাটিয়েছি আজও এক বেলা
বুকের ভেতর হরিণ হরিণ ঢেউ সবুজ নিয়ে খেলা
আজ সারারাত বৃষ্টি পড়ুক, পুড়ুক জোয়ার ভাসা বুক
আজ শরীর সাগরে শরীর শুয়ে থাক, শরীরে লুকিয়ে মুখ’- চার লাইন লেখার পর বেশ কিছু ডট দিয়েছে শিল্পী। এটা ওর অভ্যাস। এই ডট দিয়ে দিয়ে লিখতেই ও ভালবাসে। 
‘...তবুও
কেন যেন মনে হয় তুমি শুধু স্বপ্নে দেখা সোনার পাহাড়
আমি গতিহারা নদী, যার দুই পারে স্বপ্নভঙ্গ পড়ে আছে ভাঙা দুই পাড়।’

- এর পরের মেসেজ স্মাইলি। কবিতাটা আরও একবার পড়ে অন্তু। মনে মনে ভাবে কয়েক লাইন ছন্দ মিলিয়ে উত্তর দেবে। পারে না। অন্তু শিল্পীকে অনেকবার বলেছে কবিতাগুলো ভাল কোনও পত্রিকায় পাঠাতে। শিল্পী পাঠায় না। পাঠায় না বললে ভুল হবে, পাঠাতে চায় না। প্রথম প্রথম কবিতাগুলো বিরক্তি নিয়ে পড়ত অন্তু। তারপর কবে নিজের অজান্তেই ভাললাগা জন্ম নিয়েছে। এখন শিল্পীর প্রতিটা কবিতা অন্তু পড়ে। ভাবে। আবার পড়ে।
‘মা রান্না করছে। একটা কল করবে...’ আবার নদীর মেসেজ। ও কখন অনলাইন এসেছে খেয়াল করেনি অন্তু। ফেসবুক বন্ধ করে কল করে।
‘কী করছিলে?’
‘তোর কবিতাটাই পড়ছিলাম।’ 
‘ও...। কেমন লাগল ? বাড়িতে এসেই লাইনগুলো মাথায় এলো, লিখে ফেললাম। না লিখলে আর মনেও পড়ে না জানো। এই শোনো না...’
‘হ্যাঁ বল।’
‘আমার মনে হয় মা জানতে পেরেছে আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম।’
‘ধুর কেমন করে জানবে ?’
‘মা বলছিল, দিন দিন এমন ঘুরে বেড়ালে লোকে পাঁচ কথা বলবে কিন্তু।’
‘তুই কী বললি ?’
‘কী বলব কিছুই বলিনি। জানুক না, জানলেই তো ভাল।’
‘হুম... তাই ? তাহলে বলে দে আজকে কোথায় গিয়েছিলি কী কী...’
অন্তুর কথা কেড়ে নিয়ে শিল্পী বলে, ‘তুমি না বেশি বেশি কর।’
‘শোন না বাড়িতে এসে যখন স্নানে গেলাম শরীরটা কেমন কেমন...’
‘প্লিজ প্লিজ এখন না রাত্রিতে যা বলার বোলো। প্রবলেম হয় খুব।’
‘কী প্রবলেম ?’
‘ন্যাকা। আচ্ছা পার্ক থেকে বেরনোর সময় হঠাৎ অমন মনমরা হয়ে গিয়েছিলে কেন ?’ জিজ্ঞেস করে শিল্পী।
‘কী জানি। মাঝে মাঝে মনে হয় ইচ্ছে করেই নিজেকে অপরাধি সাজিয়ে কষ্ট পাই। এই কষ্ট পাওয়ার আনন্দই আলাদা। ও তুই বুঝবি না।’
‘বুঝব না কেন ? এটা সবাই করে, আমিও। আমিও মনে মনে ভাবি আমার দোষ নেই তবুও তুমি বকছ আমাকে। পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে নিজেই আদর করছ।’
‘আহারে বেচারি বালিকা। এবার একটা অন্যকথা বলি ?’
‘হুম, বলো।’
‘তুই এখন কী পরে আছিস ?’
‘আমি ঠিক জানতাম এটাই জিজ্ঞেস করবে। নাইটি। আর যে গুলোর রঙ জিজ্ঞেস করবে ওসব কিছু পরে নেই। হয়েছে ?’
‘কেন ?’
‘কী কেন ? গরম করছে তাই পরিনি। আর কোনও প্রশ্ন না। রাতে কথা হবে, এখন রাখি।’
‘আচ্ছা আচ্ছা রাখ।’
‘উম্ম...আ। বাই।’ ফোনটা রেখে দেয় শিল্পী।
ইদানিং প্রায় প্রতিদিন রাতেই ওদের কথা হয়। শিল্পী পড়ার নামে ঠাকুর ঘরে শুয়ে শুয়ে ফোনে কথা বলে। কোনও কোনওদিন রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে আসে তবুও ওদের কথা শেষ হয় না। ফোন চার্জে লাগিয়ে কথা চলতেই থাকে। তবে মাস কয়েক হল অন্তু-শিল্পী দুজনেই খেয়াল করেছে, ওরা রাতের আঁধারে শুধু শরীর নিয়ে কথা বলে। প্রথম শুরু হয়েছিল শিল্পীর পেচ্ছাবের সমস্যা নিয়ে। তারপর থেকে...। এই তো কয়েক সপ্তাহ আগে যেদিন প্রথম অন্তু জানতে চেয়েছিল, ‘তোর ডেট কবে ?’ লজ্জা পেয়ে কয়েক মিনিট চুপ করে গিয়েছিল শিল্পী।
গালভর্তি লজ্জা নিয়ে বলেছিল, ‘বার থেকে পনেরোর ভেতর শুরু হয়।’
‘কতটা করে...’ জানতে চেয়েছিল অন্তু। উত্তর না দিয়েই সেদিন ফোনটা রেখে দিয়েছিল শিল্পী। অথচ এখন যথারীতি ফোনে সেক্স চলে। ভাললাগে শিল্পীর। এখন নিজের শরীরকে খোলা বই এর মতো তুলে ধরে অন্তুর সামনে। অন্তুর শরীরের প্রতিটা অনুচ্ছেদ জানতে ইচ্ছে করে। আরও বেশি বেশি করে জানতে ইচ্ছে করে।   


রাত্রির খাবার খেয়ে ছাদে এসে দাঁড়ায় অন্তু। একটা সিগারেট ধরায়। বিকেলে বৃষ্টি হয়েছে বলেই গরমের গুমোট ভাবটা নেই এখন। বেশ ফুরফুরে হাওয়া বইছে ছাদের উপর। গাছে গাছে চাঁদের আলো লেগে আছে। পার্কের ঘটনাগুলো পরপর মনে পড়ে অন্তুর। ‘আবার ভুল করছি না তো...?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে। শিল্পীর সঙ্গে ফোনে সেক্স করার পরেও অন্তু নিজেকে এই প্রশ্নটা করে। প্রতিদিন করে। নিজের যুক্তিতে নিজেকে বোঝায়। তবুও কোথায় যেন একটা অপরাধ বোধ কাজ করে। হয়তো সেই অপরাধ বোধ থেকেই বুদ্বুদের মতো প্রতিদিন এই একটা প্রশ্ন উঠে আসে। কথাটা শিল্পীকে বলেছিল অন্তু। শিল্পী বলেছে, ‘ভালবাসায় ভুল বলে কিছুই হয় না। বরং নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়াটাই ভুল। আমরা পূজা করছি না, প্রেম করছি। প্রেমে শরীর এলে ক্ষতি কী ?’ কথাটা অস্বীকার করতে পারেনি অন্তু, কিন্তু শিল্পী তো অন্তুর গোপন ইতিহাস জানে না। মনের ভেতরকার নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে অন্তু প্রতিদিন নিজেকে নানান প্রশ্ন করে। নিজেই উত্তর দেয়। তবু চলতেই থাকে শরীরের খেলা। শরীর শরীর নেশাটা দুজনকে পেয়ে বসেছে।
‘অন্...তু এই অন্তু... ঘুমিয়ে পড়লি নাকি ?’ নিজের ভাবনার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে অন্তু খেয়াল করে দরজায় রাজা ডাকছে। ‘এখন রাজা ?’ 
নীচে নেমে আসে অন্তু। দরজা খুলে দেখে রাজা বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেমন যেন এলোমেলো লাগছে রাজাকে।
‘ঘুমিয়ে পড়েছিলি ?’
‘না ঘুমাইনি। কিন্তু তুই এখন ? আয় ভেতরে আয়।’
‘না না ভেতরে যাব না। একটা খারাপ খবর আছে বুঝলি।’
‘কী খবর ?’ অন্তুর মুখটা থমথমে হয়ে পড়ে। রাজার বাড়ি শিল্পীদের গ্রামে। এক পাড়াতেই। শিল্পীর কিছু...
‘কৌশিক গলায় দড়ি নিয়েছে। পুলিশ-টুলিশ বিশাল ঝামেলা।’
‘কৌশিক ?’ ঝপ করে অন্তুর চোখে কৌশিকের মুখটা ভেসে উঠে। বিশ্বাস হয় না। সেই পাঁচ ক্লাস থেকে কৌশিক অন্তুর বন্ধু। দুজনেই হাই স্কুলে পড়েছে বারো ক্লাস পর্যন্ত।   
‘দাহ করতে যেতে হবে। যাবি ?’
‘দু’মিনিট দাঁড়া।’ কথাটা বলেই অন্তু হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢোকে।
‘তোর মাকে বলে আসিস। দেরি হবে ফিরতে।’
‘মা ঘুমের ওষুধ নিয়েছে। সকালের আগে উঠবে না...’ 


লাল মাটির কাঁচা রাস্তা দিয়ে ছুটছে মোটর বাইকটা। কারু মুখে কোনও কথা নেই। ঘর থেকে বেরনোর আগেই অন্তু শিল্পীকে মেসেজ করে জানিয়ে দিয়েছে, আজকে রাতে কথা হবে না। কিন্তু কৌশিক এমনটা করল কেন ? বারবার জলে ভরে আসছে অন্তুর চোখদুটো। তাহলে কী কণিকার জন্যই...। তাছাড়া আর কী হতে পারে ? কদিন আগেও কৌশিক বলছিল, ‘ঠকছি ভাই নিখুঁত ঠকছি। আমি সিওর ওর জামাই বাবুর ভাই এর সঙ্গে ওর একটা...’ এটাই কারণ ? কিন্তু এর জন্য কেউ... 
আলো-অন্ধকারে অন্তুর ভাবনাগুলো জটলা পাকিয়ে যাচ্ছে। কিছুই মাথায় ঢুকছে না। ‘কণিকা যদি আমাকে ছেড়ে চলে যায় পাশে থাকিস ভাই নতুবা এক্কেবারে একা হয়ে যাব।’ সেদিন ঠিক এই মেসেজটাই ফেসবুকে না হোয়াটস্অ্যাপ-এ করেছিল কৌশিক। কেউ না জানুক অন্তু জানে কৌশিক কতটা ভালবাসত কণিকাকে। সেই এগার ক্লাস থেকে ওরা জুটি বেঁধেছিল প্রেমের খেলায়। খেলাটা এভাবে শেষ হয়ে যাবে জানত না অন্তু। দু’চোখ ঝাপসা করে স্মৃতি গড়িয়ে পড়ছে।
‘খুব খারাপ লাগছে তাই না ? প্রথমে আমারও বিশ্বাস হয়নি। যখন ওদের বাড়ি পৌঁছলাম তখন ওকে গাছের থেকে নামানো হয়েছে। দেখতে পারতিস না। ভয়ংকর লাগছিল ওর মুখটা।’
‘ইদানিং কিছু হয়েছিল ওদের ভেতর ?’ জিজ্ঞেস করে অন্তু।
‘কী করে বলি বলত। ও কয়েক মাস থেকেই ক্লাবে আসাও ছেড়ে দিয়েছিল। তবে রাস্তায় দেখা হলে খেয়াল করতাম কেমন যেন অন্যমনস্ক থাকত। খুব একটা কথাও বলত না। কিন্তু এমনটা হবে ভাবিনি। খুব খারাপ লাগছে মাইরি...’ রাজা কি কাঁদছে ? হবে হয়তো। কৌশিক ছেলেটা আর যাই হোক খারাপ তো ছিল না। সবার পাশে দাঁড়াত, সব্বার। এই রাজার জন্যেও কম করেনি কৌশিক।
ডাংরা নদীর ব্রিজ দিয়ে ছুটছে বাইকটা। নদীর এপারে জয়নগর ওপারে সোনাপুর। দুটো গ্রামের মাঝে ডাংরা রুগ্ন শরীর নিয়ে বয়ে গেছে। এই ডাংরার মরা বুকেই দু’গ্রামের শ্মশান। খানিক বাদে কৌশিককেও এখানেই আনা হবে। এই নদীটার রুগ্ন নীরস বুকেও দুটো গ্রামের মানুষের শৈশব খেলা করে। তারপর শৈশব বুকে নিয়েই বার্ধক্য পুড়ে শেষ হয়। কৌশিকের বার্ধক্য আসেনি। তবুও কৌশিক পুড়বে আজকে। স্কুল থেকে ফেরার পথে এই নদীটার তীরে কৌশিকের সঙ্গে বসত অন্তু। শরৎকালে কাশ ফুলে ভরে থাকত নদীর চর। বর্ষায় দুজনে দেখত, দূরে অনেক দূরে জেলে-ডিঙা ভেসে যাচ্ছে। অকারণে মনটা হু-হু করত। অন্ধকারেও অন্তুর মনে হয় একটা ডিঙা ভাসছে অনেক দূরে। ডান হাতে করে চোখের জল মোছে অন্তু।
অন্তু ভেবেছিল কৌশিকদের ঘরের সামনে প্রচুর ভিড় হবে। না, যতটা ভেবেছিল তার চেয়ে লোক অনেক কম। আত্মহত্যা বলে হয়তো অনেকেই ঝামেলার ভয়ে আসেনি। কিংবা এসেছিল ফিরে গেছে। কয়েকজন লোক একটা খাট আগলে বসে আছে। একটা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছে কৌশিকের মা। বাইক থেকে নেমে দুজনেই কৌশিকের মৃত দেহটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ঘরের ভেতর থেকে কান্না ভেসে আসছে। কারা কাঁদছে ? জানে না অন্তু। আপন কেউ হবে হয়তো। ‘আপন...?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে অন্তু। কণিকার মুখটা মনে পড়ে। রাগে ঘেন্নায় অভিমানে হাতে হাত ঘষে অন্তু। কৌশিকের মুখে কি হাসি লেগে আছে ? ও কি ব্যঙ্গ করছে ? ভাল ভাবে তাকিয়ে দেখে অন্তু। না হাসি লেগে নেই। জিবটা অল্প বেরিয়ে আছে। তাহলে ও কি ভেংচি কাটছে কাউকে ? কাকে ভেংচি কাটছে কৌশিক ? কণিকাকে ?
‘চল ওদিকটা থেকে একটু ঘুরে আসি। ওর মামা ওরা আসছে। ওরা এলে তবেই বেরোবে।’ অন্তুর কাঁধে হাত রেখে ওকে নিরালায় নিয়ে আসে রাজা। বলে, ‘তুই কষ্ট পাবি জেনেও তোকে আনলাম, না আনলে তুই আরও কষ্ট পেতিস।’
‘কণিকা খবর পেয়েছে ?’
‘হাঁ আমি কল করেছিলাম।’
‘আসেনি ?’
‘না।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজা।
‘কী বলল ?’
‘কিছুই না। হয়তো আমার আগেই কেউ জানিয়েছে ওকে ?’
‘কাঁদছিল ?’
‘মনে হয়।’
‘তোর মনে আছে রাজা এই মেয়েটাই কৌশিক স্কুলে না এলে কেমন মনমরা হয়ে বসে থাকত দেবদারু গাছটার নীচে। কৌশিক রাগ করে কথা না বললে কাঁদো কাঁদো হয়ে আমাদেরকে রিকোয়েস্ট করত কৌশিককে বোঝানোর জন্য। সময় সব এলোমেলো করে দেয় বল ? সময় অতীতকেও মাড়িয়ে দেয় হয়তো। স্কুল জীবনে দাঁড়িয়ে ভেবে দেখ কৌশিক মারা গেছে। কণিকার মুখটা কল্পনা করতেও পারবি না। অথচ আজকে দেখ...’ অন্তুর হাতটা শক্ত করে ধরে রাজা। কিছু বলে না। 

★ পরের অংশ পড়তে এখাএ ক্লিক করুন ★

No comments:

Post a Comment